ঢাকা ০২:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

নাগরিক জীবনে আতংক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা

  • আপডেট সময় : ০৬:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৬ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

নাসরীন সুলতানা

ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস তার লেভিয়াথান গ্রন্থে একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে সেই চিত্র বর্ণনা করেছেন। হবসের মতে রাষ্ট্র উৎপত্তির আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করতো; যেখানে না ছিল কোনো সরকার, না ছিল কোনো ন্যায়বিচার। সরকারবিহীন প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারাক্ষণ একে-অপরের সাথে দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতে লিপ্ত ছিল। তার মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত’ অর্থাৎ প্রকৃতির রাজ্য ছিল এমন একটি হিংস্র এবং বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থা যেখানে প্রত্যেকের প্রতিটি বস্তুর ওপর স্বাভাবিক অধিকার ছিল, যেখানে মানুষ প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুভয়, এবং অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতো।

ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নিজেদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য তারা একত্র হয়ে সরকার গঠন করে। শর্ত থাকে এই যে, সরকার সাধারণ নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে। এর বিনিময়ে জনগণ সরকারের তৈরিকৃত আইন মেনে চলবে। আর এভাবেই সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়, যেখানে জনগণ নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান করে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের মনোনীত সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে।

২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৈনিক কালের কণ্ঠ ‘মব সন্ত্রাসের আতঙ্কের বছর, নিহত ১৯৬’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘সন্দেহ, গুজব ও তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সংঘটিত এসব ঘটনায় গত ১১ মাসে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) অনন্ত ১৮৪ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপে উঠে এসেছে। আসকের জরিপ ও কালের কণ্ঠের তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছর ১৯৬ জন মবের ঘটনায় নিহত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে’ নিহতের সংখ্যা ছিল ২৮ জন।…

ওই পাঁচ বছর সময়ের ব্যবধানে মব সন্ত্রাস বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। সবচেয়ে বেশি ১৯০টি (গত ১১ মাসে ৭৮টি) নিহতের ঘটনা ঘটে ঢাকা বিভাগে। চুরি, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, ছিনতাই, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, কটূক্তি, প্রতারণা ও অপহরণের অভিযোগ এনে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে তাদের” (কালের কণ্ঠ অনলাইন, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫)।

ওই প্রতিবেদন থেকে যে কেউ অনুমান করতে পারে যে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের চিত্র যেন টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্যের এক মূর্ত রূপ। গত কয়েক সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে আছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান শরিফ হাদীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, হাদির হত্যাকে কেন্দ্র করে দেশের দুইটি প্রধান গণমাধ্যম অফিসে অগ্নিসংযোগ এবং হামলা, উদীচী এবং ছায়ানটে ভাংচুর, ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে দলবদ্ধ হয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের এই প্রকাশ্যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট, ছিনতাই, ধর্ষণের রোমহর্ষক বর্ণনা যেন হলিউডের ক্রাইম মুভির চিত্রকেও হার মানায়। রাজধানী ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে শোবার ঘর—কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল আহাজারি আর ভিক্টিমের আর্তনাদ। প্রতি মুহূর্তে মানুষ চরম ভয় এবং দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত্রি যাপন করছে।

বিবিসি বাংলার রিপোর্ট অনুযায়ী ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৪ এনসিপি নেতাসহ ২০ জনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গানম্যান নিযুক্ত করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে- ১৮ কোটি মানুষের দেশে বাকি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ‘গত জানুয়ারিতে দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি; যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি” (সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

প্রথম আলো প্রকাশিত ‘অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ” শিরোনামের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে তিন দিন পুলিশি কার্যক্রম না থাকা, পরে ধীরে ধীরে থানাগুলো চালু হলেও, স্বাভাবিক সময়ের মতো পুলিশ কার্যক্রম সক্রিয় না হওয়া, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় পুলিশে নতুন জনবল, নতুন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সংশ্লিষ্ট শহরের অপরাধী ও অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা, অপরাধের খবর ও অপরাধীকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের সোর্স স্বল্পতা, পুলিশে মনোবলের সংকট, এবং গাড়ি ও আবাসন সমস্যা, কর্মসংস্থানের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে (“অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ”, প্রথম আলো অনলাইন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

আমি মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য প্রথম আলো উল্লেখিত কারণগুলো দায়ী হলেও মূল কারণ মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততা, দেশের যে কোনো সংকট মোকাবিলায় সরকারের জনবলের ওপর নির্ভর না করে ছাত্রদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই তবে দেখতে পাবো জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা বিশ্রামের চিন্তা বাদ দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার থেকে শুরু করে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেছে, রাত জেগে পাড়ায় পাড়ায় ঘুমন্ত মানুষদের পাহারা দিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে।

অন্যদিকে থানা আক্রমণ এবং লুটের কারণে দেশে পুলিশ কাজ করার মনোবল হারিয়ে ফেলে, সরকারের প্রতিটি বডি তার নিজস্ব রীতিতে ফাংশন করতে ব্যর্থ হয়। সেই সুযোগে চারদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মতো তৈরি হতে থাকলো মবের আদালত। প্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্রদের সাথেসাথে কতিপয় স্কুল এবং কলেজগামী ছাত্ররাও রাজনীতি এবং ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নিজেদের পড়াশোনার কথা বা ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে শিক্ষকের হেনস্থা, অপসারণ, আন্ত প্রতিষ্ঠান সংঘর্ষ, ইত্যাদি কাজে জড়িয়ে পড়ে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি আসার কথা ছিল। কিন্তু, আমরা লক্ষ্য করলাম সরকার “সমর্থন করে না” বলে একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অসারতাকে জনগণের সামনে প্রমাণ করতে থাকলো। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সংঘবদ্ধ মবকে “প্রেশার গ্রুপ” হিসেবে জাস্টিফাই করেছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন, “আওয়ামী দোসররা দেশকে অস্তিত্বশীল করার জন্য সব চেষ্টা করছে।… আওয়ামী লীগ যারা এই কাজ করতেছে তাদের আমি ঘুম হারাম করে দিবো” (প্রথম আলো অনলাইন, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৫)।

দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তি যখন এই ধরনের মন্তব্য করেন, তখন একদিকে তিনি যেমন মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে একটি সমস্যার দিকে অতিরিক্ত ফোকাস করেছেন, অন্যদিকে কতিপয় অপরাধীর ক্ষেত্রে ছিনতাই, ধর্ষণ, কিংবা খুনের মতো ফৌজদারি অপরাধের বৈধতা দিয়েছেন। বস্তুত, অপরাধীর কোনো দেশ, জাত, দল কিংবা লিঙ্গ নেই। তাই, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়কে মুখ্য বিবেচনা না করে অপরাধের মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সাধারণ নাগরিকের ওপর যেকোনও বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর অত্যাচার ও নিপীড়নই নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান। বস্তুত, দেশের প্রতিটি নাগরিক রাজনীতি সচেতন। শীতের হিম কিংবা গ্রীষ্মের রোদ উপেক্ষা করে তিন চাকায় প্যাডেল করে জীবিকা নির্বাহ করা রিকশাচালক থেকে শুরু করে বহুতল ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কফির কাপে ধোঁয়া তোলা আড্ডায় বেশিরভাগ আলোচকই দেশ এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আপাদমস্তক রাজনীতি সচেতন এই জাতিকে খুব সহজে কেবল কোনো এক বিশেষ দলের সমর্থনকারীদের ‘রাতের ঘুম হারাম করে দিবো’ বলে সান্ত্বনা দেওয়া কেবল তাদের আত্মসচেতন মনস্তত্ত্বকে বিদ্রƒপ করা নয়; বরং আজীবন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক জাতির মানস পড়ার অক্ষমতা প্রকাশ করা।

জীবন যেখানে বিপন্ন; সেখানে সন্ত্রাসী, ধর্ষক, ছিনতাইকারী কিংবা চাঁদাবাজের জাত, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তাদের সেই মোড়ক দিয়ে বিবেচনা করাও অনুচিত। আপনি যখন বলবেন, কোনো বিশেষ দলের সদস্যদের হেনস্তা করা হবে, স্বাভাবিকভাবেই ছিনতাইকারি তার রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ছিনতাই করার বৈধতা দাবি করতে পারে।

অন্যদিকে দেশবাসীর কাছে সরকার দুর্বল এবং একটি দল ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে অকার্যকর বলে ভুল বার্তা যাবে। তাই তো আমরা দেখি ডেভিল হান্টের মতো অপারেশন পরিচালনার পরেও চারদিকে এত ডেভিলের ছড়াছড়ি! সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে “আইনশৃঙ্খলা কর কমিটি” গঠন করা হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে শেয়ার করা তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বাড়ানো, সেনাবাহিনী, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও বিজিবি সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গণমাধ্যমকে ব্রিফিং, মিথ্যা গুজব এবং প্রপাগন্ডার বিপরীতে সত্য তথ্য প্রচারে পদক্ষেপ গ্রহণসহ মোট ৯ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

কার্যত এই রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ক্রমশ অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-স্মারক রক্ষা করতে।

সামনে নির্বাচন। ইতোমধ্যে দেশে অবস্থিত রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের মাঠে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১৭ মাসের বাংলাদেশের যে চিত্র, তা বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন- আগামীর নির্বাচন খুব সহজ হবে না। অনেকে আশঙ্কা করছেন সহিংসতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির। তবুও এই মুহূর্তে সরকারের সামনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। আর এই কাজটি করতে হলে অভ্যুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর করা জরুরি; জরুরি সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর করার সাথেসাথে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। আসামি গ্রেফতারই কেবল যথেষ্ট নয়, সেই সাথে দরকার যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার শাস্তি বিধান করা। বিচারিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী না হলে, খুন, ভাংচুর, লুট, অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সহজ শর্তে জামিন মঞ্জুর হলে সে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়বে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিয়ে। শেষ করছি মার্কস-অ্যাঙ্গেলসের “পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন নীতি”র আলোচনা দিয়ে। এই নীতি অনুযায়ী প্রকৃতির কোনো এক অবস্থায় যদি ক্রমাগত একটি বিশেষ বস্তু বা অনুঘটকের পরিমাণ বাড়তে থাকে তবে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করার পর ওই অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হয়। যেমন, পানিতে ক্রমাগত তাপের পরিমাণ বাড়াতে থাকলে তার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রিতে পৌঁছালে তরল পানি বাস্পে পরিণত হয়। মার্কস-এঙ্গেলস এই নীতি ব্যবহার করে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজে বঞ্চনা এবং শোষণের পরিমাণ বাড়ার ফলে বিপ্লব সংঘটিত হয়ে সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হয়।

এই নীতি প্রমাণ করে, যে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি অরাজকতা বা আইনের শাসনের অনুপস্থিতি বাড়তে থাকে, তবে সেই সমাজ বা রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তাই এত রক্তপাত এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া দেশের নাগরিক জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের উচিত আজই কঠোর হস্তে অপরাধ দমনের ব্যবস্থা নেওয়া এবং যথাসময়ে একটি সর্বদলীয়, গ্রহণযোগ্য, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও, কানাডা
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

নাগরিক জীবনে আতংক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা

আপডেট সময় : ০৬:৫০:৩৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৯ জানুয়ারী ২০২৬

নাসরীন সুলতানা

ইংরেজ দার্শনিক টমাস হবস তার লেভিয়াথান গ্রন্থে একটি ‘থট এক্সপেরিমেন্টে’র মাধ্যমে রাষ্ট্রের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে সেই চিত্র বর্ণনা করেছেন। হবসের মতে রাষ্ট্র উৎপত্তির আগে মানুষ প্রকৃতির রাজ্যে বসবাস করতো; যেখানে না ছিল কোনো সরকার, না ছিল কোনো ন্যায়বিচার। সরকারবিহীন প্রকৃতির রাজ্যে মানুষ নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য সারাক্ষণ একে-অপরের সাথে দ্বন্দ্ব এবং সংঘাতে লিপ্ত ছিল। তার মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের জীবন ছিল ‘নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত’ অর্থাৎ প্রকৃতির রাজ্য ছিল এমন একটি হিংস্র এবং বিশৃঙ্খল প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থা যেখানে প্রত্যেকের প্রতিটি বস্তুর ওপর স্বাভাবিক অধিকার ছিল, যেখানে মানুষ প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুভয়, এবং অবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতো।

ওই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নিজেদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য তারা একত্র হয়ে সরকার গঠন করে। শর্ত থাকে এই যে, সরকার সাধারণ নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করবে। এর বিনিময়ে জনগণ সরকারের তৈরিকৃত আইন মেনে চলবে। আর এভাবেই সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্রের উৎপত্তি হয়, যেখানে জনগণ নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সংঘাতের অবসান করে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে তাদের মনোনীত সরকারের বশ্যতা স্বীকার করে।

২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর দৈনিক কালের কণ্ঠ ‘মব সন্ত্রাসের আতঙ্কের বছর, নিহত ১৯৬’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘সন্দেহ, গুজব ও তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সংঘটিত এসব ঘটনায় গত ১১ মাসে (জানুয়ারি-ডিসেম্বর) অনন্ত ১৮৪ জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জরিপে উঠে এসেছে। আসকের জরিপ ও কালের কণ্ঠের তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছর ১৯৬ জন মবের ঘটনায় নিহত হয়েছে। এর আগে ২০২১ সালে’ নিহতের সংখ্যা ছিল ২৮ জন।…

ওই পাঁচ বছর সময়ের ব্যবধানে মব সন্ত্রাস বেড়েছে প্রায় সাত গুণ। সবচেয়ে বেশি ১৯০টি (গত ১১ মাসে ৭৮টি) নিহতের ঘটনা ঘটে ঢাকা বিভাগে। চুরি, খুন, ডাকাতি, ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, ছিনতাই, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, কটূক্তি, প্রতারণা ও অপহরণের অভিযোগ এনে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে তাদের” (কালের কণ্ঠ অনলাইন, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫)।

ওই প্রতিবেদন থেকে যে কেউ অনুমান করতে পারে যে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের চিত্র যেন টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্যের এক মূর্ত রূপ। গত কয়েক সপ্তাহের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে আছে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান শরিফ হাদীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, হাদির হত্যাকে কেন্দ্র করে দেশের দুইটি প্রধান গণমাধ্যম অফিসে অগ্নিসংযোগ এবং হামলা, উদীচী এবং ছায়ানটে ভাংচুর, ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্যে দলবদ্ধ হয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে এবং পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।

বর্তমান বাংলাদেশের এই প্রকাশ্যে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুট, ছিনতাই, ধর্ষণের রোমহর্ষক বর্ণনা যেন হলিউডের ক্রাইম মুভির চিত্রকেও হার মানায়। রাজধানী ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে শোবার ঘর—কোথাও মানুষের নিরাপত্তা নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল আহাজারি আর ভিক্টিমের আর্তনাদ। প্রতি মুহূর্তে মানুষ চরম ভয় এবং দুশ্চিন্তা নিয়ে রাত্রি যাপন করছে।

বিবিসি বাংলার রিপোর্ট অনুযায়ী ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ৪ এনসিপি নেতাসহ ২০ জনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গানম্যান নিযুক্ত করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হচ্ছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে- ১৮ কোটি মানুষের দেশে বাকি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?

পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ‘গত জানুয়ারিতে দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৪২টি; যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৯টি বেশি (৬৯ শতাংশ)। ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মামলা হয়েছে ২৩০টি, যা গত বছরের একই মাসের তুলনায় ৯৫টি (৭০ শতাংশ) বেশি” (সূত্র: প্রথম আলো অনলাইন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

প্রথম আলো প্রকাশিত ‘অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ” শিরোনামের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে তিন দিন পুলিশি কার্যক্রম না থাকা, পরে ধীরে ধীরে থানাগুলো চালু হলেও, স্বাভাবিক সময়ের মতো পুলিশ কার্যক্রম সক্রিয় না হওয়া, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় পুলিশে নতুন জনবল, নতুন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের সংশ্লিষ্ট শহরের অপরাধী ও অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা, অপরাধের খবর ও অপরাধীকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের সোর্স স্বল্পতা, পুলিশে মনোবলের সংকট, এবং গাড়ি ও আবাসন সমস্যা, কর্মসংস্থানের অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে (“অপরাধীরা বেপরোয়া, আতঙ্কে মানুষ”, প্রথম আলো অনলাইন, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)।

আমি মনে করি, বিদ্যমান পরিস্থিতির জন্য প্রথম আলো উল্লেখিত কারণগুলো দায়ী হলেও মূল কারণ মূলত অন্তর্বর্তী সরকারের নির্লিপ্ততা, দেশের যে কোনো সংকট মোকাবিলায় সরকারের জনবলের ওপর নির্ভর না করে ছাত্রদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং কর্মসংস্থানের অভাব। আমরা যদি একটু পেছন ফিরে তাকাই তবে দেখতে পাবো জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের পর ছাত্ররা বিশ্রামের চিন্তা বাদ দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার থেকে শুরু করে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেছে, রাত জেগে পাড়ায় পাড়ায় ঘুমন্ত মানুষদের পাহারা দিয়েছে, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করেছে।

অন্যদিকে থানা আক্রমণ এবং লুটের কারণে দেশে পুলিশ কাজ করার মনোবল হারিয়ে ফেলে, সরকারের প্রতিটি বডি তার নিজস্ব রীতিতে ফাংশন করতে ব্যর্থ হয়। সেই সুযোগে চারদিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মতো তৈরি হতে থাকলো মবের আদালত। প্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্রদের সাথেসাথে কতিপয় স্কুল এবং কলেজগামী ছাত্ররাও রাজনীতি এবং ক্ষমতার স্বাদ পেয়ে নিজেদের পড়াশোনার কথা বা ক্লাসরুমে ফিরে যাওয়ার কথা ভুলে শিক্ষকের হেনস্থা, অপসারণ, আন্ত প্রতিষ্ঠান সংঘর্ষ, ইত্যাদি কাজে জড়িয়ে পড়ে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি আসার কথা ছিল। কিন্তু, আমরা লক্ষ্য করলাম সরকার “সমর্থন করে না” বলে একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেদের অসারতাকে জনগণের সামনে প্রমাণ করতে থাকলো। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সংঘবদ্ধ মবকে “প্রেশার গ্রুপ” হিসেবে জাস্টিফাই করেছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মন্তব্য করেছেন, “আওয়ামী দোসররা দেশকে অস্তিত্বশীল করার জন্য সব চেষ্টা করছে।… আওয়ামী লীগ যারা এই কাজ করতেছে তাদের আমি ঘুম হারাম করে দিবো” (প্রথম আলো অনলাইন, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৫)।

দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তি যখন এই ধরনের মন্তব্য করেন, তখন একদিকে তিনি যেমন মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে একটি সমস্যার দিকে অতিরিক্ত ফোকাস করেছেন, অন্যদিকে কতিপয় অপরাধীর ক্ষেত্রে ছিনতাই, ধর্ষণ, কিংবা খুনের মতো ফৌজদারি অপরাধের বৈধতা দিয়েছেন। বস্তুত, অপরাধীর কোনো দেশ, জাত, দল কিংবা লিঙ্গ নেই। তাই, অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়কে মুখ্য বিবেচনা না করে অপরাধের মাত্রার ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

সাধারণ নাগরিকের ওপর যেকোনও বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর অত্যাচার ও নিপীড়নই নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হওয়া উচিত।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান। বস্তুত, দেশের প্রতিটি নাগরিক রাজনীতি সচেতন। শীতের হিম কিংবা গ্রীষ্মের রোদ উপেক্ষা করে তিন চাকায় প্যাডেল করে জীবিকা নির্বাহ করা রিকশাচালক থেকে শুরু করে বহুতল ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কফির কাপে ধোঁয়া তোলা আড্ডায় বেশিরভাগ আলোচকই দেশ এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। আপাদমস্তক রাজনীতি সচেতন এই জাতিকে খুব সহজে কেবল কোনো এক বিশেষ দলের সমর্থনকারীদের ‘রাতের ঘুম হারাম করে দিবো’ বলে সান্ত্বনা দেওয়া কেবল তাদের আত্মসচেতন মনস্তত্ত্বকে বিদ্রƒপ করা নয়; বরং আজীবন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক জাতির মানস পড়ার অক্ষমতা প্রকাশ করা।

জীবন যেখানে বিপন্ন; সেখানে সন্ত্রাসী, ধর্ষক, ছিনতাইকারী কিংবা চাঁদাবাজের জাত, ধর্ম বা রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তাদের সেই মোড়ক দিয়ে বিবেচনা করাও অনুচিত। আপনি যখন বলবেন, কোনো বিশেষ দলের সদস্যদের হেনস্তা করা হবে, স্বাভাবিকভাবেই ছিনতাইকারি তার রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ছিনতাই করার বৈধতা দাবি করতে পারে।

অন্যদিকে দেশবাসীর কাছে সরকার দুর্বল এবং একটি দল ছাড়া বাকিদের ক্ষেত্রে অকার্যকর বলে ভুল বার্তা যাবে। তাই তো আমরা দেখি ডেভিল হান্টের মতো অপারেশন পরিচালনার পরেও চারদিকে এত ডেভিলের ছড়াছড়ি! সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে আনতে “আইনশৃঙ্খলা কর কমিটি” গঠন করা হয়েছিল। প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে শেয়ার করা তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বাড়ানো, সেনাবাহিনী, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ও বিজিবি সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথবাহিনী গঠন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে টহল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গণমাধ্যমকে ব্রিফিং, মিথ্যা গুজব এবং প্রপাগন্ডার বিপরীতে সত্য তথ্য প্রচারে পদক্ষেপ গ্রহণসহ মোট ৯ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল।

কার্যত এই রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে ক্রমশ অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি-স্মারক রক্ষা করতে।

সামনে নির্বাচন। ইতোমধ্যে দেশে অবস্থিত রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের মাঠে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত ১৭ মাসের বাংলাদেশের যে চিত্র, তা বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন- আগামীর নির্বাচন খুব সহজ হবে না। অনেকে আশঙ্কা করছেন সহিংসতা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা ঝুঁকির। তবুও এই মুহূর্তে সরকারের সামনে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই। আর এই কাজটি করতে হলে অভ্যুত্থানের পর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর করা জরুরি; জরুরি সব দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কার্যকর করার সাথেসাথে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। আসামি গ্রেফতারই কেবল যথেষ্ট নয়, সেই সাথে দরকার যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার শাস্তি বিধান করা। বিচারিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী না হলে, খুন, ভাংচুর, লুট, অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তির সহজ শর্তে জামিন মঞ্জুর হলে সে আবারও একই কাজে জড়িয়ে পড়বে।

লেখাটা শুরু করেছিলাম টমাস হবসের প্রকৃতির রাজ্যের বর্ণনা দিয়ে। শেষ করছি মার্কস-অ্যাঙ্গেলসের “পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন নীতি”র আলোচনা দিয়ে। এই নীতি অনুযায়ী প্রকৃতির কোনো এক অবস্থায় যদি ক্রমাগত একটি বিশেষ বস্তু বা অনুঘটকের পরিমাণ বাড়তে থাকে তবে একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করার পর ওই অবস্থার গুণগত পরিবর্তন হয়। যেমন, পানিতে ক্রমাগত তাপের পরিমাণ বাড়াতে থাকলে তার তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রিতে পৌঁছালে তরল পানি বাস্পে পরিণত হয়। মার্কস-এঙ্গেলস এই নীতি ব্যবহার করে দেখিয়েছেন কীভাবে সমাজে বঞ্চনা এবং শোষণের পরিমাণ বাড়ার ফলে বিপ্লব সংঘটিত হয়ে সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন হয়।

এই নীতি প্রমাণ করে, যে কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে যদি অরাজকতা বা আইনের শাসনের অনুপস্থিতি বাড়তে থাকে, তবে সেই সমাজ বা রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তাই এত রক্তপাত এবং বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া দেশের নাগরিক জীবনে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে সরকারের উচিত আজই কঠোর হস্তে অপরাধ দমনের ব্যবস্থা নেওয়া এবং যথাসময়ে একটি সর্বদলীয়, গ্রহণযোগ্য, অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও, কানাডা
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ