আমরা এখন এমন এক সময়ে বাস করছি- যেখানে আমাদের জীবনের প্রতিটি সুখ-দুঃখের মুহূর্ত নিমেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস বা ছবি হিসেবে আপলোড হয়ে যায়। মনের কথা থেকে শুরু করে পরিবারের ব্যক্তিগত মুহূর্ত- সবই এখন পাবলিক প্ল্যাটফর্মে। ফলে পুরোনো দিনের ওই ডায়েরি বা জার্নাল লেখার অভ্যাসটি আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। কিন্তু এই অতি ডিজিটাল যুগে এসেও নিজের নিভৃত ব্যক্তিগত জার্নাল বা ডায়েরি লেখার গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। বিজ্ঞান ও সফল ব্যক্তিদের জীবন বলছে, একদমই নয়। নিজের দুর্বলতা ও শক্তিকে চেনা, ভয়কে জয় করা এবং স্বপ্নের পেছনে দৌড়াতে এটি একজন নীরব মেন্টরের মতো সাহায্য করবে। এ বিষয় নিয়েই এবারে লাইফস্টাইল পাতার প্রধান ফিচার
সোশ্যাল মিডিয়ার এই কোলাহলের যুগে নিজের জন্য অন্তত ১০ মিনিট সময় বের করে ডায়েরি লেখা আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়া বনাম ব্যক্তিগত জার্নাল: সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা লিখি, তা অনেক সময় অন্যের বিচারের ভয়ে বা লোকদেখানোর জন্য ফিল্টার করা থাকে। কিন্তু জার্নালিং হলো নিজের ভেতর আলো ফেলার মতো একটি বিষয়, যেখানে কোনো ভয় নেই। ডায়েরির পাতায় নিজের সবচেয়ে অন্ধকার অনুভূতি বা ভয়গুলোকেও নির্ভয়ে নামিয়ে রাখা যায়। এটি কোনো হাহাকার নয়, বরং এটি বিশৃঙ্খল চিন্তাগুলোর মধ্যে একধরনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনে। গবেষণা বলছে, প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট করে সপ্তাহে ৩ দিন জার্নাল লিখলে মানসিক চাপ ও বিষণ্নতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মতে, ঘুমানোর আগে আগামীকালের কাজ বা কৃতজ্ঞতার কথা লিখে রাখলে দ্রুত এবং গভীর ঘুম হয়। এমনকি পেনবেকারের গবেষণা বলছে, যারা মনের কথা লিখে রাখেন, তাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে এবং চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন কম হয়। এটি স্মৃতিশক্তি বাড়াতে এবং কঠিন সময়ে মানসিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতেও সাহায্য করে।
সফলদের গোপন সঙ্গী যখন ডায়েরি: সবাই একভাবে লেখেন না। কেউ দিনলিপি লেখেন, কেউ শুধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ‘গ্রেটিটিউড জার্নাল’ লেখেন। আবার কেউ শুধু তালিকার মাধ্যমে নিজের চিন্তা গুছিয়ে নেন। একেকজনের কাছে এর ধরন একেক রকম হতে পারে। আমরা অপরাহ উইনফ্রে, ওয়ারেন বাফেট, লেডি গাগা বা জেনিফার অ্যানিস্টনের মতো সফল মানুষদের কথা জানি। এমনকি ইতিহাসের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মারি কুরি বা মার্ক টোয়েনের মতো ব্যক্তিত্বরাও নিয়মিত জার্নাল লিখতেন। ডায়েরির পাতা শুধু তাদের দিনলিপি ছিল না, বরং ছিল সফলতার পথপ্রদর্শক। বিখ্যাত হতে হবে না, সাধারণ মানুষের জন্য ডায়েরি লেখা হতে পারে মানসিক প্রশান্তি আর নিজের সঙ্গে কথা বলার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ২০২০ সালে ‘ব্রিটিশ জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে ৩ দিন মাত্র ১৫ মিনিট করে জার্নাল লিখলে ৪ সপ্তাহ পর মানসিক চাপ ও উদ্বেগ অনেক কমে যায়।
কেন ডায়েরি লেখা: ১৯৮৬ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা জীবনের কোনো ট্রমা বা নেতিবাচক অভিজ্ঞতা নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন, তাদের মানসিক চাপের সূচক বা ইন্ডিকেটরগুলো অন্য সাধারণ বিষয় নিয়ে লেখা ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক কম ছিল। মার্কিন দুই মনোবিজ্ঞানী ইমোস এবং ম্যাককালফের ২০০৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের ইতিবাচক বা কৃতজ্ঞতা জানানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে লিখলে শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণগুলো কমে যায় এবং মানুষ ব্যায়ামের প্রতি বেশি আগ্রহী হয়। নিয়মিত জার্নাল লিখলে মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং যে কোনো তথ্য প্রসেস করার ক্ষমতা উন্নত হয়।
২০১৮ সালে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে আগামীকালের কাজগুলো ডায়েরিতে লিখে রাখলে মানুষ দ্রুত ঘুমাতে পারে। আবার ২০২১ সালের জার্নাল অব হেলথ সাইকোলজির এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমানোর আগে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে লিখলে ঘুমের মান ভালো হয় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমানো সম্ভব হয়; এমনকি যারা নিয়মিত জার্নাল লেখেন, তাদের অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা কমে যায় এবং তাদের চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন কম পড়ে বলেও দেখা গেছে গবেষণায়। ২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী উচ্চ মানসিক চাপের সময় জার্নাল লিখলে মানুষের প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা বা রেজিলিয়েন্স বাড়ে এবং সামাজিক বন্ধনগুলো আরও মজবুত হয়।
যেভাবে করতে হবে শুরু: জার্নাল বা ডায়েরি লেখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় দিতে হবে না। দিনের শেষে মাত্র ২ থেকে ৫ মিনিটের একটি প্রচেষ্টাই যথেষ্ট হতে পারে। এই সময়টুকু নিজের জন্য বরাদ্দ রাখুন। কারণ এটা নিজের জন্য দরকার। আপনি যদি নিজের জন্য সময় বের না করেন, তাহলে অন্য কেউ ওই সময়টুকু আপনার কাছ থেকে কেড়ে নেবে। অর্থাৎ অন্য কোনো কাজে ব্যয় হয়ে যাবে। ডায়েরি লেখার জন্য কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম বা পরিকল্পনার প্রয়োজন নেই। লেখার জন্য জরুরি হলো-
সময় নির্বাচন: সকালে বা রাতে ঘুমানোর আগে যখন সময় পাবেন, তখনই বসুন। অথবা সকালে নাশতা করার সময় বা কফি খাওয়ার ফাঁকে লিখে ফেলতে পারেন। এমনকি আপনি চাইলে সারা দিন ধরে ছোট ছোট সেশনেও আপনার ভাবনাগুলো ভাগ করে লিখে রাখতে পারেন।
মাধ্যম: হাতেকলমে লিখতে পারেন, অথবা কোনো নোট-টেকিং অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
যা খুশি লেখা: আজকে কী করলেন, আপনার অনুভূতি কেমন, জীবনে কী পরিবর্তন চান- এসব নিয়ে কোনো ব্যাকরণ বা শৈলীর চিন্তা ছাড়াই লিখে ফেলুন।
গোপন কথা রইবে গোপন: রবীন্দ্রনাথের ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’ গানের মতন অন্যকে ভাবেন, ডায়েরিতে লেখা কথা কেউ পড়ে ফেলবেই। কিন্তু জানেন কি? জে. কে. রাউলিংয়ের হ্যারি পটার সিরিজ ১২ জন প্রকাশক ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ মানুষের পড়ার আগ্রহ তৈরি করা অত সহজ নয়। আপনার ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ার সময় বা আগ্রহ অন্যের না থাকার সম্ভাবনাই বেশি। তবু ভয় থাকলে আপনি পাসওয়ার্ডযুক্ত অ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন। অথবা ডায়েরিটি তালাবন্দী করে রাখতে পারেন কোনো গোপন জায়গায়। যার সন্ধান শুধু আপনার কাছেই থাকবে। সূত্র: মিডিয়াম।
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ




















