ড. জাহাঙ্গীর আলম সরকার
একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে মুদ্রা ব্যবস্থা আজ আর শুধু আর্থিক লেনদেনের নিরপেক্ষ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, কৌশলগত প্রভাব বিস্তার ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার একটি মৌলিক স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্রেটন উডস ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন ডলার যে বৈশ্বিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিল, তা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ প্রবাহ, জ্বালানি বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে এসেছে।
সাম্প্রতিক দশকে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ, একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বিস্তার, আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট ও উদীয়মান শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান আত্মপ্রকাশ ডলারনির্ভর বিশ্ব ব্যবস্থাকে গভীর প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে চীন ও ব্রিকস জোট ধীরে ধীরে ডলার-উত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার সম্ভাব্য রূপকার হিসেবে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
ডলারের আধিপত্য ও মুদ্রা রাজনীতির বাস্তবতা: মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে এক অনন্য কৌশলগত সুবিধা প্রদান করেছে; যা ইতিহাসে খুব কম রাষ্ট্রই ভোগ করেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ; বিশেষ করে জ্বালানি ও কাঁচামাল বাণিজ্য, ডলারে নিষ্পত্তি হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক আর্থিকপ্রবাহের ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সুইফট নেটওয়ার্ক ও বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থার ওপর ডলারের আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে।
ইরান, রাশিয়া কিংবা ভেনিজুয়েলার মতো রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, ডলারনির্ভরতার অর্থ শুধু আর্থিক সুবিধা নয়; বরং রাজনৈতিক চাপ ও সার্বভৌমত্বহানির ঝুঁকিও বহন করা। ফলে মুদ্রা আজ আর নিছক অর্থনৈতিক উপকরণ নয়; কার্যত একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতা উন্নয়নশীল ও উদীয়মান বহু রাষ্ট্রকে ডলারনির্ভরতার বিকল্প অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করছে।
চীনের কৌশল- ইউয়ান আন্তর্জাতিকীকরণ ও আর্থিক স্বনির্ভরতার সন্ধান: ডলার আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করে চীন একটি ধীর, বহুমাত্রিক ও সুসংহত কৌশল গ্রহণ করেছে। এই কৌশলের মূল স্তম্ভ হলো ইউয়ানের আন্তর্জাতিকীকরণ। চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি করছে; বিশেষ করে রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) মাধ্যমে অবকাঠামো বিনিয়োগের পাশাপাশি একটি বিকল্প আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার চেষ্টাও স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। এ ছাড়া ডিজিটাল ইউয়ানের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চীনের আর্থিক কৌশলে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ডিজিটাল মুদ্রা ভবিষ্যতে সীমান্তপাড়ের লেনদেনে মধ্যস্থতাকারী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে; যা ডলারনির্ভর আর্থিক কাঠামোর জন্য একটি নীরব। কিন্তু গভীর চ্যালেঞ্জ। চীনের দৃষ্টিতে মুদ্রা নিরাপত্তা শুধু অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়; জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
ব্রিকস ও বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামোর অনুসন্ধান: ব্রিকস জোট- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা ডলারনির্ভর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকল্প অনুসন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি), স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ প্রদান, বাণিজ্য নিষ্পত্তির নতুন ব্যবস্থা এবং যৌথ আর্থিক সহযোগিতা এই উদ্যোগের প্রধান উপাদান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং সম্ভাব্য যৌথ মুদ্রা বা বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার আলোচনা এই জোটের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও ব্রিকসের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত স্বার্থে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে; তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট- ডলার আধিপত্যের বিকল্প কাঠামো নির্মাণে ব্রিকস একটি পরীক্ষাগার হিসেবে কাজ করছে। এটি হয়তো দ্রুত কোনো একক মুদ্রা চালু করতে পারবে না। তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বহুমুখী মুদ্রা ব্যবস্থার ধারণাকে শক্তিশালী করছে।
অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাস: ডলার-উত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার দিকে অগ্রযাত্রা মূলত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা। বৈদেশিক ঋণ সংকট, নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা এবং বৈশ্বিক আর্থিক অস্থিরতা বহু রাষ্ট্রকে তাদের মুদ্রা নীতি ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য ধীরে ধীরে পুনর্বিন্যাসের পথে এগোচ্ছে; যেখানে আর্থিক ক্ষমতা আর একক রাষ্ট্রের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকবে না। তবে এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক বিপ্লব নয়। এটি হবে ধীর, অসম ও অঞ্চলভিত্তিক। ডলারের আধিপত্য হঠাৎ বিলুপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও এর একচেটিয়া প্রভাব যে ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
সার্বিকভাবে বলা যায়, ডলার-উত্তর বিশ্ব ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে চীন ও ব্রিকসের ভূমিকা আধুনিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। মুদ্রা রাজনীতি, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও বিকল্প আর্থিক কাঠামোর অনুসন্ধান বৈশ্বিক শক্তির পুনর্বিন্যাসকে ত্বরান্বিত করছে। এই প্রক্রিয়া শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, নিরাপত্তা নীতি ওং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার চরিত্রকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে।
ভবিষ্যৎ বিশ্ব ব্যবস্থা কতটা বহু মেরু, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে; তা অনেকাংশেই নির্ভর করবে চীন, ব্রিকস এবং অন্যান্য উদীয়মান শক্তির এই মুদ্রাকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক প্রচেষ্টার সফলতার ওপর।
লেখক: আইনজীবী ও গবেষক
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ






















