বাহাউদ্দিন গোলাপ
আকাশের নিভৃত কোল থেকে কোনো নক্ষত্র খসে পড়লে ব্রহ্মাণ্ডের বিশালতায় কতা শূন্যতা তৈরি হয় তা হয়তো তর্কের বিষয়। কিন্তু যখন একটি জাতির শৈশবকে ছন্দ শেখানো জাদুকর বিদায় নেন, তখন সেই জাতির সামষ্টিক মননের আকাশটি নিশ্চিতভাবেই মøান হয়ে যায়। আজ বাংলা শিশুসাহিত্যের সেই বৈভবশালী গগনের এক অবিনাশী জ্যোতিষ্ক নিভে গেল।
২০২৬ সালে ২ জানুয়ারির বিষণ্ন ভোরে, চট্টগ্রামের রাউজানের এক নিভৃত কক্ষে মহাকালের অনন্ত পথে পা বাড়ালেন ছন্দের ঋষি সুকুমার বড়ুয়া। ৮৮ বছরের এক দীর্ঘ ও ঋদ্ধ পরিব্রাজন শেষে তার এই মহাপ্রয়াণ কেবল একটি ব্যক্তিগত প্রস্থান নয়, বরং বাংলা ভাষার এক অকৃত্রিম, নির্মল ও অমল স্বরলিপির যবনিকাপাত। ১৯৩৮ সালের ৫ জানুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজানের মধ্যম বিনাজুরি গ্রামে যে প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছিল, তা আট দশক ধরে বাঙালির আবেগ, হাস্যরস আর মানবিক বোধের এক অনন্য আকর হয়ে উঠেছিল।
সুকুমার বড়ুয়ার জীবন-আলেখ্য কোনো অলৌকিক রূপকথা ছিল না, বরং তা ছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এক সৃজনশীল আত্মার নিরন্তর সংগ্রাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে জন্ম নেওয়া এই নিভৃতচারী মানুষটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার খুব একটা সুযোগ পাননি ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতির অবারিত পাঠশালা তাকে দুহাত ভরে দিয়েছিল শব্দের গূঢ় রহস্য। ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সাধারণ কর্মচারী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হলেও তোপখানা রোডের সেই ছিমছাম ভাড়া ঘরে বসে তিনি যখন শব্দের স্থাপত্য নির্মাণ করতেন, তখন কার সাধ্য ছিল বোঝার যে- এই মানুষটিই একদিন বাংলা ছড়াসাহিত্যের ব্যাকরণ বদলে দেবেন!
১৯৯৯ সালে স্টোরকিপার হিসেবে অবসর নেওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি সাধারণের ভিড়ে থেকেও এক অসাধারণ মরমি শিল্পী হিসেবে নিজেকে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিলেন। তার বিনয় ও সারল্য ছিল সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক ঐতিহ্যেরই নান্দনিক প্রতিফলন। বৌদ্ধ দর্শনের মৈত্রী ও করুণা তার কলমে এমন এক স্নিগ্ধ রসিকতা তৈরি করেছিল; যা তিক্ত ব্যঙ্গকেও এক ধরনের উচ্চাঙ্গের কৌতুক এবং শুভবোধে রূপান্তর করতে সক্ষম। তার ছড়াশৈলী অনেকটা জাপানি হাইকুর মতো পরিমিত ও মিনিমালিস্টিক আবার পারস্যের মরমি রসবোধের মতো গভীর এবং অর্থবহ।
সুকুমার বড়ুয়ার সাহিত্যদর্শন ছিল মূলত সারল্যের এক গূঢ় উদযাপন। আন্তর্জাতিক সাহিত্যতত্ত্বের নিরিখে তিনি ছিলেন একজন ‘সংক্ষিপ্তবাদী দার্শনিক’। তিনি বিশ্বাস করতেন, জগতের কঠিনতম সত্যগুলো কেবল সহজতম শব্দের মাধ্যমেই হৃদয়ে সঞ্চারিত হওয়া সম্ভব। ১৯৭০ সালে প্রকাশিত তার প্রথম ছড়াগ্রন্থ ‘পাগলা ঘোড়া’ বাংলা শিশুসাহিত্যে এক বৈপ্লবিক মোড় নিয়ে আসে। এরপর ‘ভিজে বেড়াল’, ‘চন্দনা রঞ্জনার ছড়া’, ‘এলোপাতাড়ি’, ‘নানা রঙের দিন’, ‘চিচিং ফাঁক’, ‘কিছু না কিছু’, ‘প্রিয় ছড়া শতক’, ‘নদীর খেলা’, ‘মজার পড়া ১০০ ছড়া’ এবং ‘জীবনের ভিতরে বাইরে’-র মতো প্রতিটি সংকলন তার সৃষ্টিশীলতার অনন্য দালিলিক স্বাক্ষর হয়ে আছে।
তিনি সুকুমার রায়ের উত্তরসূরি হয়েও প্রথাগত ‘ননসেন্স রাইম’-এর বৃত্ত ভেঙে এক নতুন ‘হিউম্যানিস্টিক রাইম’ বা মানবিক ছড়া-দর্শনের প্রবর্তন করেছিলেন। তার ছড়া কেবল কৌতুক নয়, বরং তা ছিল জীবনের গভীরতম বেদনাবোধকে এক চিলতে হাসির প্রলেপে ঢেকে রাখার এক নিপুণ অস্তিত্ববাদী প্রচেষ্টা। তার এই বিচিত্র হাস্যরসের নমুনা পাওয়া যায় ‘পাগলা ঘোড়া’ ছড়াগ্রন্থের সেই কালজয়ী চরণে, যেখানে তিনি লিখেছিলেন— ‘পাগলা ঘোড়া খ্যাপাটে খুব/দিচ্ছে জলে মরণ ডুব/তেড়ে এলে ডাইনে বাঁয়ে/উঠবে ঘোড়া তোমার গায়ে!’
বিশ্বসাহিত্যের মানদণ্ডে সুকুমার বড়ুয়াকে অনায়াসেই তুলনা করা যায় ডক্টর সিউস কিংবা মাইকেল রোজেনের সঙ্গে। সিউস যেমন তার চরিত্রের আড়ালে রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা দিতেন, সুকুমার বড়ুয়াও তেমনি তার ‘চিচিং ফাঁক’ কিংবা ‘কিছু না কিছু’ গ্রন্থের মাধ্যমে সমাজের দ্বিমুখী আচরণ ও ভণ্ডামিকে শাণিত ব্যঙ্গের তুড়িতে উড়িয়ে দিতেন। ‘ভিজে বেড়াল’ ছড়ায় তিনি যখন বিদ্রুপের ছলে বলেন- ‘ভাজা মাছটি উল্টে খেতে/জানে না তো কেউ/লেজ নেড়ে সে ডাকছে শুধু/মিউ মিউ মিউ!’- তখন সমাজতাত্ত্বিক বিচারে লুই ক্যারলের গাণিতিক যুক্তি ও পরাবাস্তবতার মেলবন্ধনের মতোই বড়ুয়ার গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও আধুনিক নাগরিক বোধের এক অনবদ্য শৈল্পিক সমন্বয় ফুটে ওঠে। সমাজ ও সময়ের অসংগতি তুলে ধরতে তার ‘কিছু না কিছু’ ছড়াগ্রন্থে যখন তিনি প্রশ্ন তোলেন- ‘টাকা দিয়ে কেনা যায়/সবই বুঝি আজ?/মানুষের কেনা যায়/মানবিক লাজ!’- তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, তার কলম কেবল শিশুদের বিনোদনের জন্য চলেনি; বরং তা ছিল একটি ঘুমন্ত সমাজের বিবেক জাগানোর নিরন্তর ইশতেহার।
সুকুমার বড়ুয়ার প্রস্থান কেবল একটি জীবনের যবনিকাপাত নয়, বরং এক অনন্ত ছন্দের রূপান্তর। আজ ডিজিটাল যান্ত্রিকতার ভিড়ে যখন শৈশব তার সারল্য হারাচ্ছে, তখন তার রেখে যাওয়া শব্দমালা একমুঠো শুদ্ধ বাতাসের মতো আমাদের মাটির শিকড়ে ফিরিয়ে নেয়। মৃত্যু তাকে কেড়ে নিতে পারে। কিন্তু তার সৃষ্ট সেই জাদুকরী ছন্দ কোনোদিন স্তব্ধ হবে না।
মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে তিনি বেঁচে থাকবেন প্রতিটি শিশুর অমলিন হাসিতে আর আমাদের হারানো শৈশবের চিরন্তন স্বরলিপিতে। বিদায়, হে ছন্দের রাজপুত্র; আপনি ঘুমিয়ে থাকুন আপনারই সৃজিত কুহকি সুরের চাদর গায়ে।
লেখক: ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ























