ঢাকা ০৫:১৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬

কল সেন্টারের কাঠামো ও কর্মপ্রবাহের আমূল বদলে দিচ্ছে এআই

  • আপডেট সময় : ০৮:২৩:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে কল সেন্টার ও গ্রাহক সাপোর্ট আউটসোর্সিং সেক্টরটি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এ খাতের কাঠামো ও কর্মপ্রবাহকে আমূল বদলে দিচ্ছে। আগে যেখানে একজন কর্মী গ্রাহকের ফোনকল রিসিভ করে বিল সংক্রান্ত সমস্যা বা পাসওয়ার্ড রিসেট কিংবা অন্য কোনো কারিগরি সমস্যা সমাধান করতেন, অনেক ক্ষেত্রে এখন ওই কাজগুলো করছে বুদ্ধিমান চ্যাটবট ও ভয়েস এআই। এখন এ শিল্পের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রের গতিকে একত্র করে ‘মানুষ ও এআই’ সহযোগিতার মডেল তৈরি করা। যারা এ পরিবর্তনকে গ্রহণ করে অভিযোজিত হতে পারবে, ভবিষ্যতের গ্রাহকসেবায় তারাই নেতৃত্ব দেবে। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

এআইচালিত সিস্টেমগুলো ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারে, বিরতি লাগে না এবং একসঙ্গে হাজার হাজার অনুরোধ সামলাতে পারে। ফলে কোম্পানিগুলোর খরচ কমছে এবং গ্রাহকসেবার গতি বাড়ছে। কিন্তু মানুষের জন্য এটি এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখন অনেক রুটিন বা সহজ কাজের জায়গায় মানুষকে আর দরকার হচ্ছে না।

ভারত, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে লাখ লাখ মানুষ কল সেন্টারে কাজ করে। শুধু ভারতেই এ খাতে কর্মীর সংখ্যা ৫০ লক্ষাধিক। এসব দেশে এখন দ্রুত ‘রিস্কিলিং’ বা পুনঃপ্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যাতে কর্মীরা শিখতে পারেন নতুন দক্ষতা, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ডাটা বিশ্লেষণ বা গ্রাহকের জটিল সমস্যায় নির্ভরযোগ্য সমাধান দেয়া। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কল সেন্টার শিল্পকে ধ্বংস করছে না, বরং তাকে নতুন আকার দিচ্ছে।

কল সেন্টার শিল্প একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের ভূমিকা রক্ষার প্রয়াস চালাচ্ছে। তা হলো-

প্রথমত, রুটিন কাজ থেকে জটিল কাজের দিকে সবার নজর। যেসব কাজ খুব স্ট্যান্ডার্ড, পুনরাবৃত্তি, সেগুলো দ্রুত বট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে করে নেয়া হচ্ছে। এ পরিবর্তনে কল সেন্টারের কর্মী বা এজেন্টদের এখন শিখতে হচ্ছে সিস্টেমগুলো তত্ত্বাবধান করা, জটিল গ্রাহক পরিস্থিতি সমাধান করা, রুটিন বাঁধা কোনো সাপোর্ট স্ক্রিপ্ট নয়, বরং মানবিক অনুভূতিমূলক কথোপকথন করা।

দ্বিতীয়ত, মানুষ+যন্ত্র এর একটি হাইব্রিড যুগলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ‘মানুষ ছাড়া কাজ হয় না’ ভেবেই রইল না, বরং ‘মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করবে’ এ মডেলে যাচ্ছে। অর্থাৎ এজেন্টদের সামনে দেয়া হচ্ছে এআইয়ের টুলগুলো (যেমন তাৎক্ষণিক কী উত্তর দিলে ভালো তার পরামর্শ, ভয়েস অ্যানালিটিকস, বট-অ্যাসিস্ট), যা তাদের সার্ভিসকে বহুগুণে বাড়াবে।

তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ। কল সেন্টার প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কোর্স ও কর্মশালা চালাচ্ছে, যেখানে ফোকাস হচ্ছে: প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং (বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভালোভাবে নির্দেশ দেয়ার পদ্ধতি), বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা, আবেগ-বিচার সক্ষমতা, বহুভাষিক যোগাযোগ। এ দক্ষতাগুলো গ্রহণ করার মধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা যন্ত্র সরাসরি মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে না পারে।

চতুর্থত, উচ্চমূল্যের পরিষেবায় পরিবর্তন। যেমন ফিলিপাইনে দেখা যাচ্ছে, শুধুই কল সেন্টারই নয়, ‘বিজনেস প্রসেস ম্যানেজমেন্ট’ (বিপিএম) খাতে প্রবেশ করছে, ডেটা অ্যানালিটিকস, সলিউশন ডিজাইন, রিমোট সফটওয়্যার সাপোর্ট ইত্যাদিতে। পাশাপাশি কম খরচের মডেল থেকে ‘মানুষসেবা+প্রযুক্তি’ মডেলে পরিবর্তন হতে দেখা যাচ্ছে।

পঞ্চমত, মানুষের সেবার ক্ষমতা পুনর্র্নিধারণ হচ্ছে। এখন যেসব সহায়তা সত্যিই মানুষের মৌলিকত্ব ও সংবেদনশীলতা দাবি করে, যেমন মানসিক উদ্বেগ, জটিল আইনগত/অর্থনৈতিক বিষয়ে গ্রাহক-আলোচনা, বানোয়াট রাগ বা ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, সেসব ক্ষেত্রে মানুষ কর্মী এখনো অপরিহার্য। কল সেন্টার শিল্প এখন সে ধরনের ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ প্রজেক্টগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক বাংলাদেশের দিকে। আমাদের দেশে বর্তমানে এ শিল্পের অবস্থান মন্দ না হলেও ভবিষ্যতে ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি কল সেন্টার রয়েছে, যেখানে ৭০ হাজার কর্মী এ খাতে কাজ করছেন। এ খাতে বর্তমান আয় প্রায় ৭০০-৮০০ মিলিয়ন ডলার। এ পরিসর কম হলেও এটা সম্ভাবনার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভবিষ্যতে টিকে থাকার জন্য অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অত্যাবশ্যক হবে পুনঃপ্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারীর সঙ্গে মিল রেখে কাজ করার দক্ষতা অর্জন।

এ শিল্পের সামনে রয়েছে একই সঙ্গে সংকট ও সুযোগ। প্রথমত, সংকট হলো রুটিন কার্যাবলি দ্রুত অটোমেটেড হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে; দক্ষতাবিহীন কর্মীরা দ্রুত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। উদাহরণস্বরূপ দেখা গেছে, ব্যাক-অফিস খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্র কমছে। তবে এর বিপরীতে সুযোগ হলো নতুন উচ্চমূল্যের সেবা, এআইসহ মানব ও যন্ত্র মডেল, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা (যেমন অনেক দক্ষিণ এশীয় দেশে রয়েছে বহুভাষিক জনশক্তি), এসব এলাকা বিস্তার লাভ করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপ এদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

পরিশেষে বলব কল সেন্টার বা গ্রাহক সাপোর্ট শিল্প একাধিক কারণে ‘সংকট’ নয়, বরং একটি ‘রূপান্তর’ সময় অতিক্রম করছে। রুটিন কাজ যন্ত্র করবে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ, সংস্কৃতি-জ্ঞান, আর সংবেদনশীল সমাধান এখন আরো মূল্যবান হয়ে উঠছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে এ প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে এবং সক্রিয়ভাবে দক্ষতা উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ দক্ষ জনবলকেন্দ্রিক মডেল গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য এটি এক বিরল সুযোগের মুহূর্ত, ভালো ইংরেজিতে কথোপকথন করা দক্ষ জনশক্তি রয়েছে, তবে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না গেলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই সময় নিজেকে রূপান্তরিত করা, দ্রুত শিখতে থাকা এবং প্রতিযোগিতার নতুন মডেল গ্রহণ করা। এভাবে কল সেন্টার শিল্পের ‘চ্যালেঞ্জ’কে গঠনমূলক পথে গ্রহণ করলে সেটি এক সংকট নয়, এক পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্র হবে। আগামী দশকে আমরা হয়তো দেখব কল সেন্টার না হয় ভেঞ্চার ল্যাব, ভাষা ও অনুভূতির স্টুডিও অথবা এআইসহ মানুষের সাপোর্ট হাব। তবে সেটাই হবে অন্য রকম, আরো মানবিক, আরো প্রযুক্তিসম্পৃক্ত।

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

কল সেন্টারের কাঠামো ও কর্মপ্রবাহের আমূল বদলে দিচ্ছে এআই

আপডেট সময় : ০৮:২৩:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬

বিশ্বজুড়ে কল সেন্টার ও গ্রাহক সাপোর্ট আউটসোর্সিং সেক্টরটি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এ খাতের কাঠামো ও কর্মপ্রবাহকে আমূল বদলে দিচ্ছে। আগে যেখানে একজন কর্মী গ্রাহকের ফোনকল রিসিভ করে বিল সংক্রান্ত সমস্যা বা পাসওয়ার্ড রিসেট কিংবা অন্য কোনো কারিগরি সমস্যা সমাধান করতেন, অনেক ক্ষেত্রে এখন ওই কাজগুলো করছে বুদ্ধিমান চ্যাটবট ও ভয়েস এআই। এখন এ শিল্পের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রের গতিকে একত্র করে ‘মানুষ ও এআই’ সহযোগিতার মডেল তৈরি করা। যারা এ পরিবর্তনকে গ্রহণ করে অভিযোজিত হতে পারবে, ভবিষ্যতের গ্রাহকসেবায় তারাই নেতৃত্ব দেবে। এ বিষয় নিয়েই এবারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাতার প্রধান ফিচার

এআইচালিত সিস্টেমগুলো ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে পারে, বিরতি লাগে না এবং একসঙ্গে হাজার হাজার অনুরোধ সামলাতে পারে। ফলে কোম্পানিগুলোর খরচ কমছে এবং গ্রাহকসেবার গতি বাড়ছে। কিন্তু মানুষের জন্য এটি এক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ এখন অনেক রুটিন বা সহজ কাজের জায়গায় মানুষকে আর দরকার হচ্ছে না।

ভারত, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে লাখ লাখ মানুষ কল সেন্টারে কাজ করে। শুধু ভারতেই এ খাতে কর্মীর সংখ্যা ৫০ লক্ষাধিক। এসব দেশে এখন দ্রুত ‘রিস্কিলিং’ বা পুনঃপ্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে, যাতে কর্মীরা শিখতে পারেন নতুন দক্ষতা, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, ডাটা বিশ্লেষণ বা গ্রাহকের জটিল সমস্যায় নির্ভরযোগ্য সমাধান দেয়া। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কল সেন্টার শিল্পকে ধ্বংস করছে না, বরং তাকে নতুন আকার দিচ্ছে।

কল সেন্টার শিল্প একদিকে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চাপ সামলাচ্ছে, অন্যদিকে মানুষের ভূমিকা রক্ষার প্রয়াস চালাচ্ছে। তা হলো-

প্রথমত, রুটিন কাজ থেকে জটিল কাজের দিকে সবার নজর। যেসব কাজ খুব স্ট্যান্ডার্ড, পুনরাবৃত্তি, সেগুলো দ্রুত বট বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে করে নেয়া হচ্ছে। এ পরিবর্তনে কল সেন্টারের কর্মী বা এজেন্টদের এখন শিখতে হচ্ছে সিস্টেমগুলো তত্ত্বাবধান করা, জটিল গ্রাহক পরিস্থিতি সমাধান করা, রুটিন বাঁধা কোনো সাপোর্ট স্ক্রিপ্ট নয়, বরং মানবিক অনুভূতিমূলক কথোপকথন করা।

দ্বিতীয়ত, মানুষ+যন্ত্র এর একটি হাইব্রিড যুগলতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন ‘মানুষ ছাড়া কাজ হয় না’ ভেবেই রইল না, বরং ‘মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একসঙ্গে কাজ করবে’ এ মডেলে যাচ্ছে। অর্থাৎ এজেন্টদের সামনে দেয়া হচ্ছে এআইয়ের টুলগুলো (যেমন তাৎক্ষণিক কী উত্তর দিলে ভালো তার পরামর্শ, ভয়েস অ্যানালিটিকস, বট-অ্যাসিস্ট), যা তাদের সার্ভিসকে বহুগুণে বাড়াবে।

তৃতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন ও পুনঃপ্রশিক্ষণ। কল সেন্টার প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কোর্স ও কর্মশালা চালাচ্ছে, যেখানে ফোকাস হচ্ছে: প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং (বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ভালোভাবে নির্দেশ দেয়ার পদ্ধতি), বিশ্লেষণাত্মক চিন্তা, আবেগ-বিচার সক্ষমতা, বহুভাষিক যোগাযোগ। এ দক্ষতাগুলো গ্রহণ করার মধ্যমে চেষ্টা করা হচ্ছে যেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা যন্ত্র সরাসরি মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে না পারে।

চতুর্থত, উচ্চমূল্যের পরিষেবায় পরিবর্তন। যেমন ফিলিপাইনে দেখা যাচ্ছে, শুধুই কল সেন্টারই নয়, ‘বিজনেস প্রসেস ম্যানেজমেন্ট’ (বিপিএম) খাতে প্রবেশ করছে, ডেটা অ্যানালিটিকস, সলিউশন ডিজাইন, রিমোট সফটওয়্যার সাপোর্ট ইত্যাদিতে। পাশাপাশি কম খরচের মডেল থেকে ‘মানুষসেবা+প্রযুক্তি’ মডেলে পরিবর্তন হতে দেখা যাচ্ছে।

পঞ্চমত, মানুষের সেবার ক্ষমতা পুনর্র্নিধারণ হচ্ছে। এখন যেসব সহায়তা সত্যিই মানুষের মৌলিকত্ব ও সংবেদনশীলতা দাবি করে, যেমন মানসিক উদ্বেগ, জটিল আইনগত/অর্থনৈতিক বিষয়ে গ্রাহক-আলোচনা, বানোয়াট রাগ বা ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ, সেসব ক্ষেত্রে মানুষ কর্মী এখনো অপরিহার্য। কল সেন্টার শিল্প এখন সে ধরনের ‘ভ্যালু অ্যাডেড’ প্রজেক্টগুলোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

এবার দৃষ্টি ফেরানো যাক বাংলাদেশের দিকে। আমাদের দেশে বর্তমানে এ শিল্পের অবস্থান মন্দ না হলেও ভবিষ্যতে ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩০০টি কল সেন্টার রয়েছে, যেখানে ৭০ হাজার কর্মী এ খাতে কাজ করছেন। এ খাতে বর্তমান আয় প্রায় ৭০০-৮০০ মিলিয়ন ডলার। এ পরিসর কম হলেও এটা সম্ভাবনার দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভবিষ্যতে টিকে থাকার জন্য অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অত্যাবশ্যক হবে পুনঃপ্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহকারীর সঙ্গে মিল রেখে কাজ করার দক্ষতা অর্জন।

এ শিল্পের সামনে রয়েছে একই সঙ্গে সংকট ও সুযোগ। প্রথমত, সংকট হলো রুটিন কার্যাবলি দ্রুত অটোমেটেড হলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে; দক্ষতাবিহীন কর্মীরা দ্রুত পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। উদাহরণস্বরূপ দেখা গেছে, ব্যাক-অফিস খাতে ব্যবহারের ক্ষেত্র কমছে। তবে এর বিপরীতে সুযোগ হলো নতুন উচ্চমূল্যের সেবা, এআইসহ মানব ও যন্ত্র মডেল, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা (যেমন অনেক দক্ষিণ এশীয় দেশে রয়েছে বহুভাষিক জনশক্তি), এসব এলাকা বিস্তার লাভ করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা ও পূর্ব ইউরোপ এদিকেই মনোযোগ দিচ্ছে।

পরিশেষে বলব কল সেন্টার বা গ্রাহক সাপোর্ট শিল্প একাধিক কারণে ‘সংকট’ নয়, বরং একটি ‘রূপান্তর’ সময় অতিক্রম করছে। রুটিন কাজ যন্ত্র করবে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা, যোগাযোগ, সংস্কৃতি-জ্ঞান, আর সংবেদনশীল সমাধান এখন আরো মূল্যবান হয়ে উঠছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এরই মধ্যে এ প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে এবং সক্রিয়ভাবে দক্ষতা উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ দক্ষ জনবলকেন্দ্রিক মডেল গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর জন্য এটি এক বিরল সুযোগের মুহূর্ত, ভালো ইংরেজিতে কথোপকথন করা দক্ষ জনশক্তি রয়েছে, তবে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না গেলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই সময় নিজেকে রূপান্তরিত করা, দ্রুত শিখতে থাকা এবং প্রতিযোগিতার নতুন মডেল গ্রহণ করা। এভাবে কল সেন্টার শিল্পের ‘চ্যালেঞ্জ’কে গঠনমূলক পথে গ্রহণ করলে সেটি এক সংকট নয়, এক পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্র হবে। আগামী দশকে আমরা হয়তো দেখব কল সেন্টার না হয় ভেঞ্চার ল্যাব, ভাষা ও অনুভূতির স্টুডিও অথবা এআইসহ মানুষের সাপোর্ট হাব। তবে সেটাই হবে অন্য রকম, আরো মানবিক, আরো প্রযুক্তিসম্পৃক্ত।

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ