ঢাকা ০২:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

কন্যাশিশুরা বিভিন্ন নির্যাতনসহ সহিংসতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত

  • আপডেট সময় : ০৬:২০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
  • ৮৬ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

শিশুরা আগামী দিনের কর্ণধার। একটি নিরাপদ শৈশব পাওয়া এবং শিশুবান্ধব সমাজে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক শিশুর অধিকার। অথচ শৈশবেই এ দেশের কন্যাশিশুরা শিকার হচ্ছে নানা ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার। পরিবার শিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল হলেও নিজ পরিবারেও তারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- যেখানে প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষা পায়, ওই আদর্শ বিদ্যাপীঠেও অপরাধের শিকার হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ছেলেশিশুর তুলনায় কন্যাশিশুরা বেশি অপরাধের শিকার হয়ে থাকে। যেমন- জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, পর্নোগ্রাফি ও অনলাইনে হয়রানিসহ নানা অপরাধ। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার

অনেক শিশুই এত ছোট থাকে যে, তারা বুঝতে পারে না তাদের সঙ্গে কীভাবে কী ঘটেছে। ফলে তারা অপরাধ চিহ্নিত করতে বা মা-বাবাকে কিছু জানাতে পারে না- যদি না গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটে। অপরাধীরা সাধারণত ওই অজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সুযোগ নেয়। কখনো খেলার ছলে, বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে, কখনো খাবার বা খেলনার প্রলোভনে আবার কখনো জোর করে তারা শিশুকে নির্যাতন করে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত ৩০৬ মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৭৫ এবং ইতোমধ্যেই গত বছরের মোট সংখ্যা ২৩৪-কে অতিক্রম করেছে। তাদের অধিকাংশের বয়স শূন্য থেকে ১২ বছরের মধ্যে। এর পাশাপাশি কিশোরীরাও রয়েছে। ছেলেশিশুরাও এর বাইরে নয়। এই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০ জন ছেলেশিশু বলাৎকালের শিকার হয়েছে- যাদের বেশির ভাগের বয়স ৭ থেকে ১৮ বছরের নিচে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ১০ মাসে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ৮৩ জনকে, এবং অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ৩৪ শিশু। আত্মহত্যা করেছে ১০৪ জন শিশু। এ ছাড়া ৫৪ কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

গত ১০ মাসে ৩০৬ মেয়ে শিশুর ধর্ষণ ঘটনার মধ্যে মাত্র ২৫১টি ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে এবং ৩০টি ছেলে শিশুর মধ্যে ২০টি ঘটনার মামলা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো আসলে পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ সামাজিক বাধা, লোকলজ্জা, অপরাধ সম্পর্কে অসচেতনতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং অপরাধ পরবর্তী হয়রানির ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনাগুলো গোপন রাখে ও আইনি সহায়তা নিতে চায় না। একবিংশ শতাব্দীতেও ধর্ষণকে অপরাধের চেয়ে ‘লজ্জার বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়।

শিশুরা অনেক সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তির দ্বারাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়। ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই অন্তত মাসে একবার পরিবারে সহিংসতার শিকার হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অপরাধী সাধারণত অপরাধ সংঘটনের পর শিশুকে নানা ভয় দেখিয়ে নির্যাতনের কথা গোপন রাখতে বাধ্য করে। আর এভাবেই অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এধরনের নির্যাতন চক্রাকারে চলতে থাকে। অনেক সময় এ ধরনের সহিংসতা শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। কখনো অপরাধী ঘটনা গোপন রাখতে হত্যা করে, আবার কখনো শিশু নিজেই লজ্জা ও ট্রমা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

শৈশবের যে কোনো শারীরিক সহিংসতার পাশাপাশি যৌন সহিংসতা একটি শিশুর মনে গভীর ট্রমা ও দাগ ফেলে যায়; যা সঠিকভাবে মোকাবিলা না করলে সারাজীবনের জন্য গুরুতর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা পরবর্তী জীবনে আত্মহত্যার চেষ্টাসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগতে পারে। যেমন-অনিরাপত্তা, অবিশ্বাস, অনিদ্রা, হতাশা এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কলঙ্ক; যা শিশুকে বাকিটা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। অনেক সময় তারা আর স্কুলে ফিরতে পারে না বা বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না, এমনকি অনেক অভিভাবক সামাজিক অপমান এড়াতে নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সাধারণত শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল থাকে এবং তাদের ভয় দেখানো সহজ হয়। তাই অপরাধীরা শিশুদেরই বেছে নেয়, কারণ তারা বিশ্বাস করে এই অপরাধের কথা কেউ জানতে পারবে না এবং তারা সহজেই পার পেয়ে যাবে।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি- পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুরক্ষার কিছু কৌশল শেখাতে হবে। যেমন- ভালো ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, অপরিচিত এবং পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে তা নির্ধারণ করে দিতে হবে, মা-বাবা বা ভাইবোন ছাড়া শিশুকে কারো সঙ্গে একা না রাখা, বিভিন্ন বিপদ সংকেত সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, জরুরি ফোন নম্বর ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক জ্ঞানের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ও প্রতিরক্ষার কৌশল শিক্ষা কারিকুলামে সংযুক্ত করা অত্যাবশ্যক। এই সামাজিক সংকট মোকাবিলায় শিশুদের নিরাপদ শৈশবের জন্য আজ তাদের আগে প্রতিরক্ষামূলক শৈশবের জন্য প্রুস্তুত করতে হবে।

শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমাদের দেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার জন্য আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সামাজিকভাবে অপমানজনক; বিশেষ করে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় অপরাধের আলামত নষ্ট হয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী, তার পরিবার ও সাক্ষীরা নানাবিধ হুমকি ও ঝুঁকির মুখে পড়েন। এই কারণে অধিকাংশ অভিভাবক আইনি সহায়তা নিতে মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেন, আর অনেকে মামলা করতেও চান না। এ ছাড়া অনেক অভিভাবক আইনি জটিলতা, মেডিকেল পরীক্ষার ভয় এবং সংশ্লিষ্ট সেবা পেতে হয়রানির আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না। এর ফলে অনেক অপরাধীকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তাই এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আইন ও সেবা সংক্রান্ত তথ্যের প্রচার বাড়ানো জরুরি। সেবা প্রদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান তথা থানা, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ফরেনসিক ল্যাব, ডিএনএ ল্যাব ও লিগ্যাল এইড অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আচরণ অরো সংবেদনশীল হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যা ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সবার জানা উচিত। ২০১৮ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনা যেখানেই ঘটুক না কেন, যেকোনো নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দায়ের করা যাবে। অভিযোগ গ্রহণকারী থানা পুলিশের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার অথবা হাসপাতালে অবস্থিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে প্রদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও অনেক প্রান্তিক এলাকায় ধর্ষণের ঘটনাগুলো এখনো গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়; যা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। ধর্ষণের ঘটনা কোনোভাবেই মীমাংসাযোগ্য নয়; বরং কেউ সালিশের মাধ্যমে এমন বেআইনি সমঝোতা করলে বা ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দিলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীর দৃশ্যমান শাস্তি । শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যখন মানুষ দেখবে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, তখন সমাজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং আমাদের শিশুরা পাবে একটি নিরাপদ শৈশব।

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

দুই সন্তানকে নিয়ে ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিলেন মা, মারা গেলেন ৩ জনই

কন্যাশিশুরা বিভিন্ন নির্যাতনসহ সহিংসতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত

আপডেট সময় : ০৬:২০:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

শিশুরা আগামী দিনের কর্ণধার। একটি নিরাপদ শৈশব পাওয়া এবং শিশুবান্ধব সমাজে বেড়ে ওঠা প্রত্যেক শিশুর অধিকার। অথচ শৈশবেই এ দেশের কন্যাশিশুরা শিকার হচ্ছে নানা ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার। পরিবার শিশুর জন্য সবচেয়ে সুরক্ষিত আশ্রয়স্থল হলেও নিজ পরিবারেও তারা বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান- যেখানে প্রকৃত মানুষ হওয়ার শিক্ষা পায়, ওই আদর্শ বিদ্যাপীঠেও অপরাধের শিকার হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ছেলেশিশুর তুলনায় কন্যাশিশুরা বেশি অপরাধের শিকার হয়ে থাকে। যেমন- জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, বাল্যবিয়ে, যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, অপহরণ, পর্নোগ্রাফি ও অনলাইনে হয়রানিসহ নানা অপরাধ। এ বিষয় নিয়েই এবারের নারী ও শিশু পাতার প্রধান ফিচার

অনেক শিশুই এত ছোট থাকে যে, তারা বুঝতে পারে না তাদের সঙ্গে কীভাবে কী ঘটেছে। ফলে তারা অপরাধ চিহ্নিত করতে বা মা-বাবাকে কিছু জানাতে পারে না- যদি না গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটে। অপরাধীরা সাধারণত ওই অজ্ঞতা ও বিশ্বাসের সুযোগ নেয়। কখনো খেলার ছলে, বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে, কখনো খাবার বা খেলনার প্রলোভনে আবার কখনো জোর করে তারা শিশুকে নির্যাতন করে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে শিশুর প্রতি যৌন সহিংসতা বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত ৩০৬ মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে; যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১৭৫ এবং ইতোমধ্যেই গত বছরের মোট সংখ্যা ২৩৪-কে অতিক্রম করেছে। তাদের অধিকাংশের বয়স শূন্য থেকে ১২ বছরের মধ্যে। এর পাশাপাশি কিশোরীরাও রয়েছে। ছেলেশিশুরাও এর বাইরে নয়। এই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০ জন ছেলেশিশু বলাৎকালের শিকার হয়েছে- যাদের বেশির ভাগের বয়স ৭ থেকে ১৮ বছরের নিচে।

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত ১০ মাসে ৩৯০ জন কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ৮৩ জনকে, এবং অপহরণ ও পাচারের শিকার হয়েছে ৩৪ শিশু। আত্মহত্যা করেছে ১০৪ জন শিশু। এ ছাড়া ৫৪ কন্যাশিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

গত ১০ মাসে ৩০৬ মেয়ে শিশুর ধর্ষণ ঘটনার মধ্যে মাত্র ২৫১টি ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে এবং ৩০টি ছেলে শিশুর মধ্যে ২০টি ঘটনার মামলা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো আসলে পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না, বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। কারণ সামাজিক বাধা, লোকলজ্জা, অপরাধ সম্পর্কে অসচেতনতা, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ এবং অপরাধ পরবর্তী হয়রানির ভয়ে অনেক পরিবার ঘটনাগুলো গোপন রাখে ও আইনি সহায়তা নিতে চায় না। একবিংশ শতাব্দীতেও ধর্ষণকে অপরাধের চেয়ে ‘লজ্জার বিষয়’ হিসেবে দেখা হয়।

শিশুরা অনেক সময় পরিবারের সদস্য, আত্মীয় বা পরিচিত ব্যক্তির দ্বারাও যৌন সহিংসতার শিকার হয়। ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে ৯ জনই অন্তত মাসে একবার পরিবারে সহিংসতার শিকার হয়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

অপরাধী সাধারণত অপরাধ সংঘটনের পর শিশুকে নানা ভয় দেখিয়ে নির্যাতনের কথা গোপন রাখতে বাধ্য করে। আর এভাবেই অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে এধরনের নির্যাতন চক্রাকারে চলতে থাকে। অনেক সময় এ ধরনের সহিংসতা শিশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। কখনো অপরাধী ঘটনা গোপন রাখতে হত্যা করে, আবার কখনো শিশু নিজেই লজ্জা ও ট্রমা থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

শৈশবের যে কোনো শারীরিক সহিংসতার পাশাপাশি যৌন সহিংসতা একটি শিশুর মনে গভীর ট্রমা ও দাগ ফেলে যায়; যা সঠিকভাবে মোকাবিলা না করলে সারাজীবনের জন্য গুরুতর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যেসব শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তারা পরবর্তী জীবনে আত্মহত্যার চেষ্টাসহ বিভিন্ন মানসিক রোগে ভুগতে পারে। যেমন-অনিরাপত্তা, অবিশ্বাস, অনিদ্রা, হতাশা এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়। এ ছাড়া এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক কলঙ্ক; যা শিশুকে বাকিটা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়। অনেক সময় তারা আর স্কুলে ফিরতে পারে না বা বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে পারে না, এমনকি অনেক অভিভাবক সামাজিক অপমান এড়াতে নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা সাধারণত শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল থাকে এবং তাদের ভয় দেখানো সহজ হয়। তাই অপরাধীরা শিশুদেরই বেছে নেয়, কারণ তারা বিশ্বাস করে এই অপরাধের কথা কেউ জানতে পারবে না এবং তারা সহজেই পার পেয়ে যাবে।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কিছু মৌলিক পরিবর্তন জরুরি- পরিবার, সমাজ ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সুরক্ষার কিছু কৌশল শেখাতে হবে। যেমন- ভালো ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, অপরিচিত এবং পরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে তা নির্ধারণ করে দিতে হবে, মা-বাবা বা ভাইবোন ছাড়া শিশুকে কারো সঙ্গে একা না রাখা, বিভিন্ন বিপদ সংকেত সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, জরুরি ফোন নম্বর ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা ও পাঠ্যপুস্তক জ্ঞানের পাশাপাশি বিভিন্ন অপরাধ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা ও প্রতিরক্ষার কৌশল শিক্ষা কারিকুলামে সংযুক্ত করা অত্যাবশ্যক। এই সামাজিক সংকট মোকাবিলায় শিশুদের নিরাপদ শৈশবের জন্য আজ তাদের আগে প্রতিরক্ষামূলক শৈশবের জন্য প্রুস্তুত করতে হবে।

শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতার প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমাদের দেশে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার জন্য আইনি সহায়তা এবং ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়াটি বেশ দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সামাজিকভাবে অপমানজনক; বিশেষ করে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেক সময় অপরাধের আলামত নষ্ট হয়ে যায়, আর ভুক্তভোগী, তার পরিবার ও সাক্ষীরা নানাবিধ হুমকি ও ঝুঁকির মুখে পড়েন। এই কারণে অধিকাংশ অভিভাবক আইনি সহায়তা নিতে মাঝপথেই হাল ছেড়ে দেন, আর অনেকে মামলা করতেও চান না। এ ছাড়া অনেক অভিভাবক আইনি জটিলতা, মেডিকেল পরীক্ষার ভয় এবং সংশ্লিষ্ট সেবা পেতে হয়রানির আশঙ্কায় কোনো পদক্ষেপ নিতে চান না। এর ফলে অনেক অপরাধীকেই আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। তাই এ ধরনের অপরাধ সম্পর্কে আরও সচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং প্রান্তিক পর্যায়ে আইন ও সেবা সংক্রান্ত তথ্যের প্রচার বাড়ানো জরুরি। সেবা প্রদানকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান তথা থানা, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার, ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ফরেনসিক ল্যাব, ডিএনএ ল্যাব ও লিগ্যাল এইড অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আচরণ অরো সংবেদনশীল হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; যা ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে ন্যায়বিচার পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।

ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতা বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সবার জানা উচিত। ২০১৮ সালে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্ষণের ঘটনা যেখানেই ঘটুক না কেন, যেকোনো নিকটস্থ থানায় অভিযোগ দায়ের করা যাবে। অভিযোগ গ্রহণকারী থানা পুলিশের সহযোগিতায় ভুক্তভোগীর মেডিকেল পরীক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার অথবা হাসপাতালে অবস্থিত ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে প্রদান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও অনেক প্রান্তিক এলাকায় ধর্ষণের ঘটনাগুলো এখনো গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়; যা সম্পূর্ণ আইনবিরোধী। ধর্ষণের ঘটনা কোনোভাবেই মীমাংসাযোগ্য নয়; বরং কেউ সালিশের মাধ্যমে এমন বেআইনি সমঝোতা করলে বা ভুক্তভোগীর পরিবারকে চাপ দিলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং অপরাধীর দৃশ্যমান শাস্তি । শিশু নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত সময়ে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যখন মানুষ দেখবে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত হচ্ছে, তখন সমাজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শক্তিশালী হবে এবং আমাদের শিশুরা পাবে একটি নিরাপদ শৈশব।

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ