নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে দাঁড়িয়ে। গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের বাইরে দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ কোম্পানি রুগ্ন অবস্থায় রয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের ওষুধের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি : প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।
বাপি সভাপতি বলেন, দেশের ওষুধ শিল্পের প্রকৃত শক্তি কখনোই কেবল বড় কয়েকটি কোম্পানি ছিল না; বরং ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোই এই শিল্পের চালিকাশক্তি। অথচ বর্তমানে সেই ভিত্তিটাই ভেঙে পড়ছে।
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, তালিকাভুক্ত প্রায় ১০০টি ওষুধ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। বাকি কোম্পানিগুলো নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ৫০ নম্বর থেকে ১০০ নম্বর অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ। তাদের অনেককে গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে একই দামে ওষুধ বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে যে দামে ওষুধ বিক্রি হতো, ২০২৫-২৬ সালেও সরকার সেই দাম বাড়াতে দিচ্ছে না। অথচ উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের দাম, শ্রম ব্যয়– সবকিছুই বহুগুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকা অসম্ভব।
বাপি সভাপতি ১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতিকে বাংলাদেশের ফার্মা শিল্পের স্বর্ণযুগের ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ওই নীতির ফলে দেশ ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে শিল্পের স্বাভাবিক প্রবাহে একের পর এক অন্তরায় তৈরি করা হয়েছে। গত এক দশকে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্যমূলক নীতি ও বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত শিল্পকে দুর্বল করে ফেলেছে।
রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি বোঝাতে তিনি ভেনেজুয়েলার উদাহরণ টেনে বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একসময়ের সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও শিল্পকে ধ্বংস করে দিতে পারে, ভেনেজুয়েলা তার বাস্তব উদাহরণ। একই পথে হাঁটলে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পও অদক্ষ ও অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানিগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে এর প্রভাব যে শুধু শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না, সে বিষয়েও সতর্ক করেন আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, এসব কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে বড় কোম্পানিগুলো দেশের বাজারের চেয়ে রপ্তানিতে বেশি মনোযোগ দেবে। তখন দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের প্রাপ্যতা, দাম ও মান– সবকিছুই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।
তিনি আরো বলেন, এই রুগ্ন কোম্পানিগুলোকে এখনই টেনে তুলতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ওষুধ সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।
সাংবাদিকদের সহায়তা চেয়ে বাপি সভাপতি জানান, তারা যেন এই রুগ্ন কোম্পানিগুলোর বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরেন। একইসঙ্গে সরকারের প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়ে আব্দুল মুক্তাদির বলেন, আমরা চাই সরকার এই ৬০ শতাংশ কোম্পানির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারে কার্যকর নীতি সহায়তা দিক। ওষুধ শিল্পকে আবার ১৯৯৪ সালের ধারায় ফিরিয়ে আনুক।
তার মতে, দেশের ওষুধের স্বয়ংসম্পূর্ণতা রক্ষা এবং বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্ত করতে হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ওষুধ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বাপি সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. জাকির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ ও সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ।
সানা/আপ্র/১৭/০১/২০২৬



















