ঢাকা ১০:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থান

  • আপডেট সময় : ১০:১৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১
  • ১৫০ বার পড়া হয়েছে

রাশেদ খান মেনন : সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংঘর্ষিক এই অবস্থান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতির জটিল অবস্থাটাই তুলে ধরে। বামদের আশংকা সত্য পরিণত করে বরং এতে সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক মানসিকতাই আরও পরিপুষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসের সাথে যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও, যুদ্ধাপরাধের ওই বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে জামায়াত দেশে এক চরম সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দেশে সরকারের নারী নীতি, শিক্ষানীতি, মুক্তবুদ্ধির চর্চার বিরুদ্ধে নতুন নামে হেফাজতে ইসলামের ছত্রছায়ায় সকল ধর্মবাদী দল সংগঠিত হয় এবং ৫ মে ২০১৩ সালে তারা রীতিমত অভ্যুত্থান ঘটাতে চেষ্টা করে- যাতে বিরোধী বিএনপি, জাতীয় পার্টি শরীক হয়। হেফাজতের ৫ মে’র ওই সমাবেশ ও অভ্যুত্থান চেষ্টায় কিছু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে আইন শৃংখলাবাহিনীর বলপ্রয়োগে তাদের শাপলা চত্বর থেকে হটিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও ইতিমধ্যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে অগ্ন্যুৎসব, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনার সাক্ষী রেখে যায়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ছিল আল জাজিরাসহ কিছু আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার নামধারী কিছু সংগঠন একে ইসলামি রাজনীতি ও আলেম-ওলামাদের হত্যাকা- বলে মিথ্যা চিত্র ও বর্ণনায় ব্যাপক প্রচার করে। এর পরিণামে আওয়ামী লীগ দেশের প্রায় প্রতিটি সিটি করপোরেশনে হেরে যায়।
ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজতের সাথে সন্ধি স্থাপনে উদ্যোগী হয় এবং তার দলীয় কিছু নেতা ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের দাবি মেনে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সংশোধন আনে। নারী-নীতি কার্যকর করা থেকে সরকার বিরত থাকে এবং সর্বশেষ হেফাজতের দাবি অনুসারে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ পরীক্ষা সনদ ‘দাওরায়ে হাদিস’কে স্নাতকোত্তর মর্যাদা প্রদান করে। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয়। কিন্তু এই সমঝোতা যে কত ঠুনকো ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে হেফাজতের বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এবং সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটানোসহ আরেকটা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায়। হেফাজতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নিলে এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ হেফাজতকে যতই তোষণ করা হোক না হেফাজত তার মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে সরে আসেনি-আসবে না। আওয়ামী লীগসহ দেশবাসী যত দ্রুত এটা বুঝবে ততই মঙ্গল।
অন্যদিকে সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে বিস্তীর্ণ জায়গা দখল করে আইসিএস-এর কর্তৃত্ব দখলের পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী রাজনীতি নতুন রূপ নেয়। সরকার বৈশ্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশে কোনও আইসিস নেই বলে অস্বীকার করে চললেও বাংলাদেশের এক শ্রেণির তরুণদের মধ্যে তা বিশেষ উন্মাদনা তৈরি করে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে সিরিয়া-ইরাকে ‘হিজরত’ করে। অপরদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ব্যক্তিবর্গ-লেখক-প্রকাশক-ব্লগার, যাজক, পুরোহিত, ভিন্ন মতাবলম্বী ইমামদের নৃশংসভাবে হত্যা করার উপুর্যপুরি ঘটনা ঘটে। এর সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে ২০১৬ সালের ২ জুলাই রমজান মাসের সন্ধ্যায় হলি আর্টিজান নামক রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের হত্যার ঘটনায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গিয়ে নিজেরাও আহত-নিহত হয়। সর্বশেষে সেনাবাহিনী কমান্ডো অভিযান চালিয়ে আইসিস সদস্যদের হত্যার মধ্য দিয়ে অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
হলি আর্টিজানের ঘটনার পরও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে আইসিস-এর অনুসারীদের হত্যা ও গ্রেফতার অব্যাহত থাকে। সরকার এদের নাম দেন ‘নব্য জেএমবি’। অবশেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আইসিস, আল-কায়েদা-ভারত, আনসার আল ইসলাম, জেএমবি, নব্য জেএমবি, আল্লাহর দল বিভিন্ন নামে এই সব সশস্ত্র জঙ্গি গ্রুপগুলোর অবস্থান এখনও রয়েছে। তথ্য যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারাভিযান চালিয়ে তারা উচ্চ, উচ্চ মধ্যবিত্ত, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রিক্রুট করে। এদের প্রধান রিক্রুটিং কেন্দ্র অবশ্য দেশের মাদ্রাসাগুলো। সরকার এই ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট খুলেছে। তারা সর্বদা এই জঙ্গি কার্যক্রম মনিটরিং করছে।
দেশে ইসলামি জঙ্গি তৎপরতা কমে এলেও ইতিমধ্যে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও বিশালভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক প্রচারের মাধ্যম ওয়াজ ও ইসলামি জনসভাসমূহ। এসব ইউটিউব-এ প্রচার হয় এবং লক্ষ লক্ষ দর্শক পায়। লাইক ও শেয়ার পড়ে প্রচুর।
গত দশ বছরে বর্তমান অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সরকারের আমলেই দেশে কক্সবাজারে রামুর বৌদ্ধবিহার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু মন্দিরসহ হিন্দুগ্রাম, ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটে। এর বাইরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। এর সর্বশেষ প্রকাশ ঘটে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হেফাজতের নেতৃত্বে হিন্দুগ্রাম আক্রমণ, মন্দির-বিগ্রহ ভাংচুর, মারপিট ও লুটপাটের ঘটনায়। দুর্ভাগ্যক্রমে এসব ক্ষেত্রে হেফাজত বা ওই জাতীয় ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকলেও আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের মধ্য ও নি¤œস্তরের কর্মীরাও যুক্ত হয়ে পড়ে। জামায়াত-বিএনপি তো রয়েছেই।
অর্থাৎ উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশে বর্তমানে যখন ঘোষিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে সেখানে মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতার ক্রম বিস্তার ঘটছে। এই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের মূল সংগঠিত দল জামায়াতে ইসলামি কোণঠাসা অবস্থায় পড়লেও তারা দ্রুত পুনঃসংগঠিত হচ্ছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বামসংগঠনসমূহের শক্তি ক্ষীণ, তারা বিভক্ত ও পরস্পরের সাথে বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় একমাত্র শক্তিশালী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্তভাবে ক্ষমতায় থাকলেও নির্বাচন ও ভোটের স্বার্থে তাদের বিভিন্ন সময় জামায়াত-হেফাজতের সাথে সমঝোতা, পৃথিবীব্যাপী ধর্মবাদী উত্থানের প্রেক্ষিতে তাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তার প্রভাব- সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যস্তরের নেতৃত্ব সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী ধ্যান ধারণা দ্বারা প্রভাবিত। বঙ্গবন্ধু যে আওয়ামী লীগ রেখে গিয়েছিলেন তার চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার সাম্প্রতিক লেখায় আওয়ামী লীগকে সেই প্রথম দিকের আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
শক্তি সামর্থ্য বিবেচনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির দুর্বল এই অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে সামনের যে কোনও পরিবর্তনে সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা। এবং সেটা যেমন বাংলাদেশের জন্য তেমনি উপমহাদেশের জন্যও এক অন্ধকারময় ভবিষ্যত সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের আজ সকল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রেণি-পেশা, নারী ও ছাত্র-যুব সংগঠনের প্রধান কর্তব্য এই সাম্প্রদায়িকতা- মৌলবাদের এই উত্থানকে প্রতিহত করা। বাংলাদেশের সংবিধানে বিধৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সর্বাত্মকভাবে সুদৃঢ় করা। (চলবে)

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নুরুল হকের ওপর নৃশংস হামলার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থান

আপডেট সময় : ১০:১৯:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ জুন ২০২১

রাশেদ খান মেনন : সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সাংঘর্ষিক এই অবস্থান বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী রাজনীতির জটিল অবস্থাটাই তুলে ধরে। বামদের আশংকা সত্য পরিণত করে বরং এতে সমাজ ও রাষ্ট্রে সাম্প্রদায়িক মানসিকতাই আরও পরিপুষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসের সাথে যুদ্ধাপরাধীর বিচার সম্পন্ন করতে সক্ষম হলেও, যুদ্ধাপরাধের ওই বিচারকে চ্যালেঞ্জ করে জামায়াত দেশে এক চরম সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। অন্যদিকে দেশে সরকারের নারী নীতি, শিক্ষানীতি, মুক্তবুদ্ধির চর্চার বিরুদ্ধে নতুন নামে হেফাজতে ইসলামের ছত্রছায়ায় সকল ধর্মবাদী দল সংগঠিত হয় এবং ৫ মে ২০১৩ সালে তারা রীতিমত অভ্যুত্থান ঘটাতে চেষ্টা করে- যাতে বিরোধী বিএনপি, জাতীয় পার্টি শরীক হয়। হেফাজতের ৫ মে’র ওই সমাবেশ ও অভ্যুত্থান চেষ্টায় কিছু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাও যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তবে শেষ মুহূর্তে আইন শৃংখলাবাহিনীর বলপ্রয়োগে তাদের শাপলা চত্বর থেকে হটিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও ইতিমধ্যে বিশাল অঞ্চল জুড়ে অগ্ন্যুৎসব, লুটপাট ও ভাংচুরের ঘটনার সাক্ষী রেখে যায়। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ছিল আল জাজিরাসহ কিছু আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যম ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানবাধিকার নামধারী কিছু সংগঠন একে ইসলামি রাজনীতি ও আলেম-ওলামাদের হত্যাকা- বলে মিথ্যা চিত্র ও বর্ণনায় ব্যাপক প্রচার করে। এর পরিণামে আওয়ামী লীগ দেশের প্রায় প্রতিটি সিটি করপোরেশনে হেরে যায়।
ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ সরকার হেফাজতের সাথে সন্ধি স্থাপনে উদ্যোগী হয় এবং তার দলীয় কিছু নেতা ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তার মাধ্যমে তাদের দাবি মেনে নিয়ে পাঠ্যপুস্তকে তাদের ইচ্ছানুযায়ী সংশোধন আনে। নারী-নীতি কার্যকর করা থেকে সরকার বিরত থাকে এবং সর্বশেষ হেফাজতের দাবি অনুসারে কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ পরীক্ষা সনদ ‘দাওরায়ে হাদিস’কে স্নাতকোত্তর মর্যাদা প্রদান করে। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দেয়। কিন্তু এই সমঝোতা যে কত ঠুনকো ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে হেফাজতের বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা এবং সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটানোসহ আরেকটা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায়। হেফাজতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকার শেষ পর্যন্ত ব্যবস্থা নিলে এই অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। অর্থাৎ হেফাজতকে যতই তোষণ করা হোক না হেফাজত তার মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক রাজনীতি থেকে সরে আসেনি-আসবে না। আওয়ামী লীগসহ দেশবাসী যত দ্রুত এটা বুঝবে ততই মঙ্গল।
অন্যদিকে সিরিয়া-ইরাক সীমান্তে বিস্তীর্ণ জায়গা দখল করে আইসিএস-এর কর্তৃত্ব দখলের পর বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী রাজনীতি নতুন রূপ নেয়। সরকার বৈশ্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশে কোনও আইসিস নেই বলে অস্বীকার করে চললেও বাংলাদেশের এক শ্রেণির তরুণদের মধ্যে তা বিশেষ উন্মাদনা তৈরি করে। খেলাফত প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় তাদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে সিরিয়া-ইরাকে ‘হিজরত’ করে। অপরদিকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে মুক্তিবুদ্ধি চর্চার ব্যক্তিবর্গ-লেখক-প্রকাশক-ব্লগার, যাজক, পুরোহিত, ভিন্ন মতাবলম্বী ইমামদের নৃশংসভাবে হত্যা করার উপুর্যপুরি ঘটনা ঘটে। এর সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটে ২০১৬ সালের ২ জুলাই রমজান মাসের সন্ধ্যায় হলি আর্টিজান নামক রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের হত্যার ঘটনায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাতে গিয়ে নিজেরাও আহত-নিহত হয়। সর্বশেষে সেনাবাহিনী কমান্ডো অভিযান চালিয়ে আইসিস সদস্যদের হত্যার মধ্য দিয়ে অভিযানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
হলি আর্টিজানের ঘটনার পরও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে আইসিস-এর অনুসারীদের হত্যা ও গ্রেফতার অব্যাহত থাকে। সরকার এদের নাম দেন ‘নব্য জেএমবি’। অবশেষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। আইসিস, আল-কায়েদা-ভারত, আনসার আল ইসলাম, জেএমবি, নব্য জেএমবি, আল্লাহর দল বিভিন্ন নামে এই সব সশস্ত্র জঙ্গি গ্রুপগুলোর অবস্থান এখনও রয়েছে। তথ্য যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারাভিযান চালিয়ে তারা উচ্চ, উচ্চ মধ্যবিত্ত, ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করা বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রিক্রুট করে। এদের প্রধান রিক্রুটিং কেন্দ্র অবশ্য দেশের মাদ্রাসাগুলো। সরকার এই ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশের আইনশৃঙ্খলা বিভাগে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট খুলেছে। তারা সর্বদা এই জঙ্গি কার্যক্রম মনিটরিং করছে।
দেশে ইসলামি জঙ্গি তৎপরতা কমে এলেও ইতিমধ্যে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, জনগণের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মানসিকতাও বিশালভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক প্রচারের মাধ্যম ওয়াজ ও ইসলামি জনসভাসমূহ। এসব ইউটিউব-এ প্রচার হয় এবং লক্ষ লক্ষ দর্শক পায়। লাইক ও শেয়ার পড়ে প্রচুর।
গত দশ বছরে বর্তমান অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সরকারের আমলেই দেশে কক্সবাজারে রামুর বৌদ্ধবিহার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে হিন্দু মন্দিরসহ হিন্দুগ্রাম, ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংস ঘটনা ঘটে। এর বাইরে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা অহরহ ঘটে চলেছে। এর সর্বশেষ প্রকাশ ঘটে সুনামগঞ্জের শাল্লায় হেফাজতের নেতৃত্বে হিন্দুগ্রাম আক্রমণ, মন্দির-বিগ্রহ ভাংচুর, মারপিট ও লুটপাটের ঘটনায়। দুর্ভাগ্যক্রমে এসব ক্ষেত্রে হেফাজত বা ওই জাতীয় ব্যক্তিরা নেতৃত্বে থাকলেও আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের মধ্য ও নি¤œস্তরের কর্মীরাও যুক্ত হয়ে পড়ে। জামায়াত-বিএনপি তো রয়েছেই।
অর্থাৎ উপমহাদেশের সর্বপ্রথম ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশে বর্তমানে যখন ঘোষিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে সেখানে মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতার ক্রম বিস্তার ঘটছে। এই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের মূল সংগঠিত দল জামায়াতে ইসলামি কোণঠাসা অবস্থায় পড়লেও তারা দ্রুত পুনঃসংগঠিত হচ্ছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বামসংগঠনসমূহের শক্তি ক্ষীণ, তারা বিভক্ত ও পরস্পরের সাথে বিচ্ছিন্ন। এই অবস্থায় একমাত্র শক্তিশালী দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শক্তভাবে ক্ষমতায় থাকলেও নির্বাচন ও ভোটের স্বার্থে তাদের বিভিন্ন সময় জামায়াত-হেফাজতের সাথে সমঝোতা, পৃথিবীব্যাপী ধর্মবাদী উত্থানের প্রেক্ষিতে তাদের নেতা-কর্মীদের মধ্যে তার প্রভাব- সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যস্তরের নেতৃত্ব সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী ধ্যান ধারণা দ্বারা প্রভাবিত। বঙ্গবন্ধু যে আওয়ামী লীগ রেখে গিয়েছিলেন তার চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী তার সাম্প্রতিক লেখায় আওয়ামী লীগকে সেই প্রথম দিকের আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
শক্তি সামর্থ্য বিবেচনায় অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির দুর্বল এই অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে সামনের যে কোনও পরিবর্তনে সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী শক্তির উত্থানের আশঙ্কা। এবং সেটা যেমন বাংলাদেশের জন্য তেমনি উপমহাদেশের জন্যও এক অন্ধকারময় ভবিষ্যত সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের আজ সকল অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রেণি-পেশা, নারী ও ছাত্র-যুব সংগঠনের প্রধান কর্তব্য এই সাম্প্রদায়িকতা- মৌলবাদের এই উত্থানকে প্রতিহত করা। বাংলাদেশের সংবিধানে বিধৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সর্বাত্মকভাবে সুদৃঢ় করা। (চলবে)