ঢাকা ০৬:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৫

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থান

  • আপডেট সময় : ১০:২৯:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ জুন ২০২১
  • ১৩৮ বার পড়া হয়েছে

রাশেদ খান মেনন : এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। এই উদযাপনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমধারা এবং ওই স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বদানের বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলেও ওই স্বাধীনতা লড়াইয়ে বামপন্থীদের ভূমিকার বিষয়টি অনুল্লেখিতই থেকে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও তার প্রাক-পর্বে বামপন্থীদের যে বলিষ্ঠ এবং এক পর্যায়ে অগ্রগামী ভূমিকা ছিল তা কেবল অনুল্লেখিতই নয়, অস্বীকৃতও বটে। তবে কোনও কালের কোনও ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কথা জনগণকে ভুলিয়ে দেওয়ার যে ক্ষমাহীন অপচেষ্টা হয়েছিল তাকে ভেদ করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালেই নয় এই সর্বসময়ে তা ওই বিভ্রান্তি, বিকৃতি ছাপিয়ে উঠে এসেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বামপন্থী ধারার উপস্থিতি, প্রাক-পর্বে তাদের অগ্রগামী ভূমিকাকে তাই যতই উল্লেখ বা স্বীকার করা না হোক তাও যে একসময় দেশবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে, সেটিও আমোঘ সত্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ১৯৭১-এর ২রা জুন ছিল একটি অনবদ্য দিন। এদিন এদেশের বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধকালে বাম মহলে যে বিভ্রান্তি ছিল তাকে কাটিয়ে উঠে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি যেমন একদিকে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল, তেমন ভারতের মাটিতে ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে দেশের চৌদ্দটি জায়গায় নিজস্ব লড়াই পরিচালনা করেছিল, দেশের অভ্যন্তরেই মুক্তাঞ্চল গঠন করেছিল। পাশাপাশি প্রতিটি সেক্টরে সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে যে সকল বাহিনী গড়ে উঠেছিল তাতেও এই কমিটির অনুসারীরা কেবল অংশগ্রহণই করেনি, পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে লড়াইয়ে সাহস ও দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় দিয়েছে, হাসিমুখে শাহদাত বরণ করেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আগরতলার মেলাঘরে যে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, ২ নম্বর সেক্টরসহ ঢাকা মহানগরে পাকিদের ব্যতিব্যস্ত রাখতে, রুখে দিতে যারা অংশ নিয়েছিল তারা এই বামপন্থী কর্মীবাহিনীর অংশ ছিল। আর এটা সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে এমনই ক্ষুব্ধ করেছিল তারা সেনা সদরকে দিয়ে সেটা ভেঙে দিতে চেয়েছে।

সে যাই হোক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের সময়কালে এই ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটির’ও পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সুবর্ণজয়ন্তীকালে এই ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’র প্রধান মওলানা ভাসানীর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। বস্তুত পাকবাহিনীর হাতে টাঙ্গাইল পতনের দিন ৩ এপ্রিল’৭১ নরসিংদীর শিবপুর থেকে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ ঘুরে আমি আর বন্ধু সহকর্মী রনো মওলানা ভাসানীর কাছে তার বিন্নাফৈরের অবস্থান স্থলে পৌঁছুলে তিনি প্রথমে যে কথাটি আমাদের বলেন তা’ হলো পাক-বাহিনীর সাথে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়তে দেশের সকল বামপন্থীদের সাথে যোগাযোগ করা। আর তার দ্বিতীয় কথা ছিল জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্টসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে অবিলম্বে বার্তা প্রেরণের। তিনি ওই রাতেই আমাকে ও রনোকে ওই বার্তা লেখার জন্য বলেন। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওই আক্রমণের অবস্থায় ওই বার্তা কীভাবে পাঠাব ভেবে আমরা কুল পাইনি। তাকে বরং আমরা ভারতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি। আমার ‘একজীবন’ প্রথম পর্ব ও রনোর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইয়ে এ বিষয়ে মওলানা ভাসানীর যে উত্তর ছিল তা আমার লিখেছি। তিনি বলেছিলেন, ইন্দিরা জওহরলালের মেয়ে। জওহরলাল আমার বন্ধু ছিল। ভারতে গেলে ওরা আমার মাথায় করে রাখবে। কিন্তু সুভাষ বোসের অবস্থা দেখনি? সে দেশে ফিরতে পারে নাই। ওই বইতেই আমরা উল্লেখ করেছি পরদিন সকালে পাক-বাহিনী সন্তোষে মওলানা ভাসানীর বাড়ি আক্রমণ করে ও সন্তোষের দরবার হলে আগুন দিলে মওলানা ভাসানী রাস্তার উপর গিয়ে সেটা দেখার কথা বলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আমরা দেখি মওলানা ভাসানী নেই পেছনের ধান ক্ষেতে দূরে তার অপসৃয়মান অবয়ব দেখা যাচ্ছিল।

মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইল থেকে নদীপথে সিরাজগঞ্জ হয়ে আসাম দিয়ে ভারত প্রবেশ করেন। সিরাজগঞ্জ থেকে সাথী হিসাবে ভাসানী ন্যাপের মুরাদুজ্জামান ও ওয়ালী ন্যাপের সাইফুল আলমকে নৌকায় তুলে নেন। মওলানা ভাসানী আসামে পৌঁছুলে আসামের কর্তৃপক্ষ তাকে সাদরে স্বাগত জানায় এবং ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, আসামের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ সাহেব তাকে দিল্লি নিয়ে যান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার তাকে আর জনসমক্ষে আসতে দেয়নি। তারা তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে বিভিন্ন সময় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রাখেন। তবে এই সময়কালেও মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যায্যতার কথা বলে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট, চীনের চেয়ারম্যান মাও জে দং প্রমুখের কাছে বার্তা পাঠান যা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সে দেশের গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। এভাবে মওলানা ভাসানীর বার্তা-বিবৃতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও মওলানা ভাসানী কোথায় কীভাবে অবস্থান করছেন তা রহস্যজনকই রয়ে যায়। পশ্চিমবাংলা রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দল নেতা সিপিআই (এম)-এর কমরেড জ্যোতিবসু এ ব্যাপারে ভারত সরকারকে বারবার প্রশ্ন করেও জবাব পাননি। মওলানা ভাসানীকে হারিয়ে টাঙ্গাইল থেকে আমি নরসিংদীর শিবপুরে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’র মুক্তিযুদ্ধের হেড কোয়ার্টারে এসে জানতে পারি যে সমন্বয় কমিটির নেতা কাজী জাফর আমার জন্য খবর রেখে গেছেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা দেবেন শিকদার জানিয়েছেন যে এপ্রিলের ২৯ তারিখ জলপাইগুড়িতে বামপন্থী দলসমূহের এক বৈঠক হবে। সেখানে মওলানা ভাসানী আসবেন। আমি আর রনো যেন খবর পাওয়া মাত্র আগরতলায় গিয়ে সেখানকার সিপিআই (এম) নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমাদের সেখানে পৌঁছে দেবেন। তিনি শ্রমিক নেতা আবুল বাশারকে নিয়ে জলপাইগুড়ি বৈঠকে যোগ দিতে চলে যান। আমার ইতিমধ্যে দেরী হয়ে যাওয়ায় ১লা মে কুমিল্লার চিওড়া হয়ে আগরতলা পৌঁছাই। ইতিমধ্যে ওই বৈঠকের তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ায় আমি পরবর্তী খবরের জন্য আগরতলায় অপেক্ষায় করতে থাকি। পরে জানতে পারি যে নির্ধারিত সময় বামপন্থীদের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও মওলানা ভাসানী সেখানে উপস্থিত হননি বা তাকে উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি। ন্যাপ নেতা মশিউর রহমানকে তার বন্ধু পশ্চিম বাংলার উপমুখ্যমন্ত্রী ত্রিগুনা সেন কথা দিয়েছিলেন যে তিনি ভারত সরকারকে বলে মওলানা ভাসানীকে ওই বৈঠকে উপস্থিত হবার ব্যবস্থা করে দেবেন। মওলানা ভাসানী ওই বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় সেখানে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান তার ক’দিন পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যান ও পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

এদিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) সহায়তায় আমরা দেশের সকল বামপন্থী দল ও গ্রুপগুলোর সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট (এম-এল) যার নেতা ছিলেন মহম্মদ তোয়াহা-আবদুল হক-সুখেন্দু দস্তিদার, তারা চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-র লাইন অনুসারে আগেই শ্রেণীশত্রু খতমের লাইন গ্রহণ করেছিল। তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ওই সিপিআই (এম-এল) এর মূল্যায়ন অনুযায়ী ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’ বলে অভিহিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। অপরদিকে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মতিন-আলাউদ্দিন) প্রথম দিকে পাবনা অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরোচিত লড়াই করলেও তারাও কিছুদিনের মধ্যে একই পথ নেয়।

এই অবস্থায় একদিকে মওলানা ভাসানীর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে এই সকল বামদলগুলির মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান বামপন্থীদের জন্য এক বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করে। আমরা যারা (কমিউনিস্ট) বিপ্লবীদের ‘পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ গঠন করেছিলাম তারা ১৯৭০-এর ২২ শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপের শহীদ দিবসের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ ঘোষণা দিয়ে এহিয়ার সামরিক আদালতের দন্ডাদেশ লাভ করি। এ অবস্থায় আত্মগোপনে আমরা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। তবে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যে প্রচ-তা নিয়ে আক্রমণ শুরু করে ওই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কোনও সম্যক ধারণাই ছিল না। তারপরও ২৫ মার্চের কালো রাতের পর কারফিউ উঠে গেলে আমরা ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরে ঘাঁটি তৈরি করে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করেছিলাম। ভারতের বিভিন্ন সেক্টরে বিশেষ করে আগরতলার মেলাঘর, নির্ভয়পুর প্রভৃতি ক্যাম্পে থেকে আমাদের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা বিডিআর পুলিশের ফেলে যাওয়া অস্ত্র আমাদের প্রথম অস্ত্র ছিল। এভাবে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির’ কর্মীরা শিবপুর ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুরে, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। প্রয়োজন ছিল এর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক রূপ দিয়ে সমস্ত লড়াইকে ঐক্যবদ্ধ করা।

এই ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের পরামর্শে জুন মাসের ১লা ও ২রা তারিখ কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধরত সকল বামপন্থী শক্তিকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করি। এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) প্রবীণ নেতৃবৃন্দ আমরা কী নীতি বা কৌশল নেব, কোন সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেব সে সম্পর্কে কোনও মতামত দিতে সবসময় বিরত থাকতেন। তাদের কথা ছিল তারা তাদের ও অন্য দেশের বিভিন্ন লড়াই ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারেন। কিন্তু আমরা কী করব সেটা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। তবে আমাদের কাজ এগিয়ে নিতে সর্বপ্রকার সাংগঠনিক ও আর্থিক সহায়তা তারা প্রদান করেছিলেন। কমরেড জ্যোতিবসুর নেতৃত্বে সিপিআই (এম) ইতিমধ্যে ‘বাংলাদেশ সহায়তা তহবিল’ গড়ে তুলেছে। ওই নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ছিল ভারত সরকারতো প্রবাসী সরকারকে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছে। আমাদের সংগৃহীত এই অর্থ বামপন্থীদের কাজে লাগুক। ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত ভাসানী ন্যাপসহ বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপের মধ্যে আলোচনা করে কলকাতায় বামপন্থীদের কর্তব্যকর্ম নির্ধারণ ও তাদের পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোয় আনার জন্য ১লা ও ২রা জুন এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সিপিআই(এম) বেলেঘাটার এক স্কুলে ওই বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে বৈঠকের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সিপিআই(এম) -এর স্থানীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এর কারণ ছিল একদিকে ভারত সরকার বাম-কমিউনিস্টদের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ছিল, তাই তারা সর্বদা তাদের নজরদারিতে রেখেছিল। অন্যদিকে নকশালরা, যারা কলকাতার বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত, তারা মুক্তিযুদ্ধের বৈরী ছিল। (চলবে)
লেখক: সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির পুনরুত্থান

আপডেট সময় : ১০:২৯:২৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ জুন ২০২১

রাশেদ খান মেনন : এ বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। এই উদযাপনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ক্রমধারা এবং ওই স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বদানের বিষয়টি সঠিকভাবে উপস্থাপিত হলেও ওই স্বাধীনতা লড়াইয়ে বামপন্থীদের ভূমিকার বিষয়টি অনুল্লেখিতই থেকে গেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ ও তার প্রাক-পর্বে বামপন্থীদের যে বলিষ্ঠ এবং এক পর্যায়ে অগ্রগামী ভূমিকা ছিল তা কেবল অনুল্লেখিতই নয়, অস্বীকৃতও বটে। তবে কোনও কালের কোনও ইতিহাস কেউ মুছে ফেলতে পারেনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কথা জনগণকে ভুলিয়ে দেওয়ার যে ক্ষমাহীন অপচেষ্টা হয়েছিল তাকে ভেদ করে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালেই নয় এই সর্বসময়ে তা ওই বিভ্রান্তি, বিকৃতি ছাপিয়ে উঠে এসেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বামপন্থী ধারার উপস্থিতি, প্রাক-পর্বে তাদের অগ্রগামী ভূমিকাকে তাই যতই উল্লেখ বা স্বীকার করা না হোক তাও যে একসময় দেশবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে, সেটিও আমোঘ সত্য।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে ১৯৭১-এর ২রা জুন ছিল একটি অনবদ্য দিন। এদিন এদেশের বামপন্থীরা মুক্তিযুদ্ধকালে বাম মহলে যে বিভ্রান্তি ছিল তাকে কাটিয়ে উঠে জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি যেমন একদিকে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল, তেমন ভারতের মাটিতে ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে শত প্রতিকূলতা কাটিয়ে দেশের চৌদ্দটি জায়গায় নিজস্ব লড়াই পরিচালনা করেছিল, দেশের অভ্যন্তরেই মুক্তাঞ্চল গঠন করেছিল। পাশাপাশি প্রতিটি সেক্টরে সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে যে সকল বাহিনী গড়ে উঠেছিল তাতেও এই কমিটির অনুসারীরা কেবল অংশগ্রহণই করেনি, পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সাথে লড়াইয়ে সাহস ও দৃঢ়চিত্ততার পরিচয় দিয়েছে, হাসিমুখে শাহদাত বরণ করেছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আগরতলার মেলাঘরে যে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়েছিল, ২ নম্বর সেক্টরসহ ঢাকা মহানগরে পাকিদের ব্যতিব্যস্ত রাখতে, রুখে দিতে যারা অংশ নিয়েছিল তারা এই বামপন্থী কর্মীবাহিনীর অংশ ছিল। আর এটা সে সময়ের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে এমনই ক্ষুব্ধ করেছিল তারা সেনা সদরকে দিয়ে সেটা ভেঙে দিতে চেয়েছে।

সে যাই হোক স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের সময়কালে এই ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটির’ও পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হচ্ছে। সুবর্ণজয়ন্তীকালে এই ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’র প্রধান মওলানা ভাসানীর প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। বস্তুত পাকবাহিনীর হাতে টাঙ্গাইল পতনের দিন ৩ এপ্রিল’৭১ নরসিংদীর শিবপুর থেকে ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জ ঘুরে আমি আর বন্ধু সহকর্মী রনো মওলানা ভাসানীর কাছে তার বিন্নাফৈরের অবস্থান স্থলে পৌঁছুলে তিনি প্রথমে যে কথাটি আমাদের বলেন তা’ হলো পাক-বাহিনীর সাথে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়তে দেশের সকল বামপন্থীদের সাথে যোগাযোগ করা। আর তার দ্বিতীয় কথা ছিল জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্টসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে অবিলম্বে বার্তা প্রেরণের। তিনি ওই রাতেই আমাকে ও রনোকে ওই বার্তা লেখার জন্য বলেন। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওই আক্রমণের অবস্থায় ওই বার্তা কীভাবে পাঠাব ভেবে আমরা কুল পাইনি। তাকে বরং আমরা ভারতে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করি। আমার ‘একজীবন’ প্রথম পর্ব ও রনোর ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইয়ে এ বিষয়ে মওলানা ভাসানীর যে উত্তর ছিল তা আমার লিখেছি। তিনি বলেছিলেন, ইন্দিরা জওহরলালের মেয়ে। জওহরলাল আমার বন্ধু ছিল। ভারতে গেলে ওরা আমার মাথায় করে রাখবে। কিন্তু সুভাষ বোসের অবস্থা দেখনি? সে দেশে ফিরতে পারে নাই। ওই বইতেই আমরা উল্লেখ করেছি পরদিন সকালে পাক-বাহিনী সন্তোষে মওলানা ভাসানীর বাড়ি আক্রমণ করে ও সন্তোষের দরবার হলে আগুন দিলে মওলানা ভাসানী রাস্তার উপর গিয়ে সেটা দেখার কথা বলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আমরা দেখি মওলানা ভাসানী নেই পেছনের ধান ক্ষেতে দূরে তার অপসৃয়মান অবয়ব দেখা যাচ্ছিল।

মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইল থেকে নদীপথে সিরাজগঞ্জ হয়ে আসাম দিয়ে ভারত প্রবেশ করেন। সিরাজগঞ্জ থেকে সাথী হিসাবে ভাসানী ন্যাপের মুরাদুজ্জামান ও ওয়ালী ন্যাপের সাইফুল আলমকে নৌকায় তুলে নেন। মওলানা ভাসানী আসামে পৌঁছুলে আসামের কর্তৃপক্ষ তাকে সাদরে স্বাগত জানায় এবং ভারতের তৎকালীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, আসামের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ফখরুদ্দীন আলী আহমেদ সাহেব তাকে দিল্লি নিয়ে যান। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নয়মাসে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার তাকে আর জনসমক্ষে আসতে দেয়নি। তারা তাকে নিরাপত্তা হেফাজতে বিভিন্ন সময় ভারতের বিভিন্ন জায়গায় রাখেন। তবে এই সময়কালেও মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ন্যায্যতার কথা বলে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্ট, চীনের চেয়ারম্যান মাও জে দং প্রমুখের কাছে বার্তা পাঠান যা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সে দেশের গণমাধ্যমে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। এভাবে মওলানা ভাসানীর বার্তা-বিবৃতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও মওলানা ভাসানী কোথায় কীভাবে অবস্থান করছেন তা রহস্যজনকই রয়ে যায়। পশ্চিমবাংলা রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দল নেতা সিপিআই (এম)-এর কমরেড জ্যোতিবসু এ ব্যাপারে ভারত সরকারকে বারবার প্রশ্ন করেও জবাব পাননি। মওলানা ভাসানীকে হারিয়ে টাঙ্গাইল থেকে আমি নরসিংদীর শিবপুরে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’র মুক্তিযুদ্ধের হেড কোয়ার্টারে এসে জানতে পারি যে সমন্বয় কমিটির নেতা কাজী জাফর আমার জন্য খবর রেখে গেছেন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির নেতা দেবেন শিকদার জানিয়েছেন যে এপ্রিলের ২৯ তারিখ জলপাইগুড়িতে বামপন্থী দলসমূহের এক বৈঠক হবে। সেখানে মওলানা ভাসানী আসবেন। আমি আর রনো যেন খবর পাওয়া মাত্র আগরতলায় গিয়ে সেখানকার সিপিআই (এম) নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ করি। তারা আমাদের সেখানে পৌঁছে দেবেন। তিনি শ্রমিক নেতা আবুল বাশারকে নিয়ে জলপাইগুড়ি বৈঠকে যোগ দিতে চলে যান। আমার ইতিমধ্যে দেরী হয়ে যাওয়ায় ১লা মে কুমিল্লার চিওড়া হয়ে আগরতলা পৌঁছাই। ইতিমধ্যে ওই বৈঠকের তারিখ অতিক্রান্ত হওয়ায় আমি পরবর্তী খবরের জন্য আগরতলায় অপেক্ষায় করতে থাকি। পরে জানতে পারি যে নির্ধারিত সময় বামপন্থীদের ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও মওলানা ভাসানী সেখানে উপস্থিত হননি বা তাকে উপস্থিত হতে দেওয়া হয়নি। ন্যাপ নেতা মশিউর রহমানকে তার বন্ধু পশ্চিম বাংলার উপমুখ্যমন্ত্রী ত্রিগুনা সেন কথা দিয়েছিলেন যে তিনি ভারত সরকারকে বলে মওলানা ভাসানীকে ওই বৈঠকে উপস্থিত হবার ব্যবস্থা করে দেবেন। মওলানা ভাসানী ওই বৈঠকে উপস্থিত না হওয়ায় সেখানে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে ন্যাপ নেতা মশিউর রহমান তার ক’দিন পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যান ও পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

এদিকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) সহায়তায় আমরা দেশের সকল বামপন্থী দল ও গ্রুপগুলোর সাথে যোগাযোগ করি। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট (এম-এল) যার নেতা ছিলেন মহম্মদ তোয়াহা-আবদুল হক-সুখেন্দু দস্তিদার, তারা চারু মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)-র লাইন অনুসারে আগেই শ্রেণীশত্রু খতমের লাইন গ্রহণ করেছিল। তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ওই সিপিআই (এম-এল) এর মূল্যায়ন অনুযায়ী ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’ বলে অভিহিত করে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান গ্রহণ করেছে। অপরদিকে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মতিন-আলাউদ্দিন) প্রথম দিকে পাবনা অঞ্চলে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে বীরোচিত লড়াই করলেও তারাও কিছুদিনের মধ্যে একই পথ নেয়।

এই অবস্থায় একদিকে মওলানা ভাসানীর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, অন্যদিকে এই সকল বামদলগুলির মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী অবস্থান বামপন্থীদের জন্য এক বিরাট সমস্যার সৃষ্টি করে। আমরা যারা (কমিউনিস্ট) বিপ্লবীদের ‘পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি’ গঠন করেছিলাম তারা ১৯৭০-এর ২২ শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপের শহীদ দিবসের জনসভায় ‘স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার’ ঘোষণা দিয়ে এহিয়ার সামরিক আদালতের দন্ডাদেশ লাভ করি। এ অবস্থায় আত্মগোপনে আমরা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকি। তবে ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের রাতে গণহত্যার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যে প্রচ-তা নিয়ে আক্রমণ শুরু করে ওই পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাদের কোনও সম্যক ধারণাই ছিল না। তারপরও ২৫ মার্চের কালো রাতের পর কারফিউ উঠে গেলে আমরা ঢাকার অদূরে নরসিংদীর শিবপুরে ঘাঁটি তৈরি করে প্রতিরোধ লড়াই শুরু করেছিলাম। ভারতের বিভিন্ন সেক্টরে বিশেষ করে আগরতলার মেলাঘর, নির্ভয়পুর প্রভৃতি ক্যাম্পে থেকে আমাদের কর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করে। ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা বিডিআর পুলিশের ফেলে যাওয়া অস্ত্র আমাদের প্রথম অস্ত্র ছিল। এভাবে দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটির’ কর্মীরা শিবপুর ছাড়াও উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, রংপুরে, বরিশাল, পিরোজপুর, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। প্রয়োজন ছিল এর আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক রূপ দিয়ে সমস্ত লড়াইকে ঐক্যবদ্ধ করা।

এই ক্ষেত্রে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ নেতৃবৃন্দের পরামর্শে জুন মাসের ১লা ও ২রা তারিখ কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধরত সকল বামপন্থী শক্তিকে নিয়ে বৈঠকের আয়োজন করি। এখানে একটি কথা উল্লেখযোগ্য ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) প্রবীণ নেতৃবৃন্দ আমরা কী নীতি বা কৌশল নেব, কোন সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেব সে সম্পর্কে কোনও মতামত দিতে সবসময় বিরত থাকতেন। তাদের কথা ছিল তারা তাদের ও অন্য দেশের বিভিন্ন লড়াই ও জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারেন। কিন্তু আমরা কী করব সেটা আমাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। তবে আমাদের কাজ এগিয়ে নিতে সর্বপ্রকার সাংগঠনিক ও আর্থিক সহায়তা তারা প্রদান করেছিলেন। কমরেড জ্যোতিবসুর নেতৃত্বে সিপিআই (এম) ইতিমধ্যে ‘বাংলাদেশ সহায়তা তহবিল’ গড়ে তুলেছে। ওই নেতৃবৃন্দের বক্তব্য ছিল ভারত সরকারতো প্রবাসী সরকারকে ও মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করছে। আমাদের সংগৃহীত এই অর্থ বামপন্থীদের কাজে লাগুক। ভারতের কলকাতায় অবস্থানরত ভাসানী ন্যাপসহ বিভিন্ন বামপন্থী গ্রুপের মধ্যে আলোচনা করে কলকাতায় বামপন্থীদের কর্তব্যকর্ম নির্ধারণ ও তাদের পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধকে একটি সাংগঠনিক কাঠামোয় আনার জন্য ১লা ও ২রা জুন এক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সিপিআই(এম) বেলেঘাটার এক স্কুলে ওই বৈঠকের ব্যবস্থা করে দেন। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে বৈঠকের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সিপিআই(এম) -এর স্থানীয় নেতৃত্ব গ্রহণ করে। এর কারণ ছিল একদিকে ভারত সরকার বাম-কমিউনিস্টদের মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে সন্দিহান ছিল, তাই তারা সর্বদা তাদের নজরদারিতে রেখেছিল। অন্যদিকে নকশালরা, যারা কলকাতার বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করত, তারা মুক্তিযুদ্ধের বৈরী ছিল। (চলবে)
লেখক: সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি