চন্দন কুমার লাহিড়ী
মানুষের জীবন মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে- আবেগ, যুক্তি ও মন। এই তিনের ভারসাম্যেই ব্যক্তি ও সমাজের চরিত্র গড়ে ওঠে। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার মানুষ এই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে বলেই হয়তো আজ চারদিকে অস্থিরতা, প্রতিযোগিতা আর হিংস্রতার বিস্তার। আবেগ এখানে ভোগের দিকে ধাবিত হয়, যুক্তি পরিণত হয় হিসাবি স্বার্থে, আর মন হয়ে ওঠে দ্বন্দ্বে ভরা এক যুদ্ধক্ষেত্র। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যদি আমরা এমন কোনো জনগোষ্ঠীর দিকে তাকাই, যাদের জীবনে এই তিন উপাদান এখনো স্বাভাবিক ছন্দে প্রবাহিত; তাহলে তাদের জীবন আমাদের কাছে হয়ে ওঠে এক নীরব প্রশ্ন। কড়া জনগোষ্ঠী ঠিক তেমনই এক প্রশ্নচিহ্ন। এই প্রশ্নচিহ্নের বাস্তব রূপ খুবই ছোট ও সীমিত। চব্বিশটি পরিবার। ছোট্ট একটি পাড়া। একশত দুইজন মানুষ। পাশে মাত্র একটি স্কুল এই নিয়েই তাদের পৃথিবী।
আমি বলছি কড়া সম্প্রদায়ের মানুষদের কথা। কোড়া (কুডা, কুরা, কাওড়া, ধাঙ্গর, ধাঙ্গের নামেও পরিচিত) নামে ভিন্নতা থাকলেও অস্তিত্বের সংকট এক ও অভিন্ন। কড়া সম্প্রদায় বাংলাদেশের একটি বিপন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠী। বিপন্নতা মানে কেবল দারিদ্র্য নয়; বিপন্নতা মানে এমন এক অবস্থায় পৌঁছানো, যেখানে একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঝুঁকি নিয়েই তাদের এগিয়ে চলে।
এই বিপন্নতার পেছনে রয়েছে একাধিক স্তরের বঞ্চনা। কড়া জনগোষ্ঠী কেবল সংখ্যালঘু নয় সংখ্যালঘুতারও নিচের এক অদৃশ্য স্তরে তারা অবস্থান করে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু পরিচয়ের ওপর যুক্ত হয়েছে ভিন্ন ভাষা, ক্ষুদ্র সংখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব। জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের কথা শোনা গেলেও দেশের আইন-বিধান কিংবা নাগরিক সভ্যতার কোনো কার্যকর রক্ষাকবচ তাদের জন্য বাস্তবায়িত হয়নি। এর কারণেই তারা হারিয়েছে জমি, ব্যবসা, সঞ্চিত অর্থ অবশিষ্ট আছে কেবল সামান্য ভিটেমাটি, তাও উচ্ছেদের হুমকিতে। কেউ কেউ জীবন বাঁচাতে বিসর্জন দিয়েছেন পূর্বপুরুষের ধর্ম ও পরিচয়, মূলধারায় যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু নাগরিক জীবনে সেই আত্মসমর্পণ কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারেনি। অবস্থা পাল্টায়নি রয়েছে একই রকম। এই বঞ্চনা ও অনিশ্চয়তার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে তাদের জৌলসহীন জীবন।
আমাদের তথাকথিত -সভ্য চোখে এই জীবন মানবেতর মনে হয়। কিন্তু কাছে গিয়ে দাঁড়ালে দেখা যায় ভিন্ন এক বাস্তবতা। অভাবের ভেতরেও সেখানে রয়েছে এক অপার প্রশান্তি। হাসি আছে, বিশ্বাস আছে, একে অপরের প্রতি নির্ভরতা আছে। এই বৈপরীত্য আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে কারণ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, পাওয়া-না-পাওয়ার দোলাচলে আমাদের মন যতা ব্যাকুল হয়ে ওঠে, কড়াদের হৃদয় ঠিক ততাই শান্ত। অবিচল। ঝিরঝির করে বয়ে যাওয়া শান্ত নদীর মতো, অবিরাম বয়ে চলে; যা জীবন এবং সময়ের নিরন্তর প্রবাহকে বোঝায় কোনো কিছুই স্থির নয়, সবকিছুই পরিবর্তনশীল। যেমন- হেরাক্লিটাস বলেছিলেন যে- ‘আপনি একই নদীতে দুবার পা রাখতে পারবেন না’। ঠিক তেমনি কড়াদের জীবন। তাদের দর্শন।
অন্যদিকে লোকায়ত দর্শনে আদিবাসীদের মন ধারণাটি তাদের প্রথাগত বিশ্বাস, প্রকৃতি-কেন্দ্রিক জীবনধারা, মৌখিক ঐতিহ্য (লোককথা, মিথ, উপকথা), এবং জগৎ সম্পর্কে তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, যা মূলত তাদের পরিবেশ ও জীবন সংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত; যেখানে প্রকৃতি, আত্মা, পূর্বপুরুষ এবং সামাজিক সম্পর্কই তাদের মূল ভিত্তি; যা আধুনিক দর্শনের চেয়ে ভিন্ন এবং নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়। তাই জনজীবনের সাথে কড়াদের মন এবং মননে এই লোকায়ত ধারা বহমান।
ওই পার্থক্যের মূল নিহিত আছে মনের গঠনে। মূলধারার মানুষের মন গড়ে ওঠে সচেতন, প্রাক-সচেতন ও অবচেতনের জটিল দ্বন্দ্বে যেখানে লোভ, লালসা, প্রতিযোগিতা ও ভোগবাদিতা প্রতিনিয়ত বাসা বাঁধে। এরই প্রতিফলন দেখা যায় ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে।
ভোগবাদিতা, দখল ও বেদখলের মানসিকতা মানুষের মনকে অস্থির করে তোলে; ভেঙে পড়ে সমাজ; মানুষ, প্রাণী, পরিবেশ ও প্রতিবেশ; শ্রেণিবিভেদ ও বৈষম্য পাকাপোক্ত হয়ে বসে। অথচ এই নাগরিক দোলাচল কড়াদের জীবনে তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। কারণ তাদের মনোজগৎ গড়ে উঠেছে প্রকৃতিবাদী জীবন দর্শনের ওপর। প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত নয়; বরং সহাবস্থান- এ নীতিতেই তারা অভ্যস্ত। তাদের মন যেন এক সন্ন্যাসীর হৃদয়- যেখানে চাওয়া সীমিত, প্রত্যাশা সংযত আর গ্রহণযোগ্যতা গভীর।
ওই দর্শনের বাস্তব রূপ দেখা যায় বাংরাদেশের দিনাজপুরের বিরল উপজেলার শালবনের পাশের ছোট্ট গ্রাম ঝিনাইকুড়িতে দেশের একেবারে প্রান্তে, ভারতের সীমান্তঘেঁষা এক অদৃশ্য মানচিত্রে। এই প্রকৃতিবাদী মনোভাব কেবল তাদের ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিন ধরে তা তাদের শ্রম, জীবিকা ও সামাজিক আচরণের ভেতরেও গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের এই দর্শন থেকেই গড়ে উঠেছিল তাদের ঐতিহ্যবাহী কর্মসংস্কৃতি যেখানে শ্রম ছিল সম্মিলিত, মর্যাদা ছিল আত্মসম্মানের, আর জীবন ছিল স্বাধীনতার অন্বেষায় নিবদ্ধ। এই দৃষ্টিভঙ্গির নৃতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিতেও।
ভারতের বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের গবেষক অমিত কুম্ভকার -কোড়া জনজাতির আদিবাস ভূমি ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় শীর্ষক আলোচনায় উল্লেখ করেন যে, কোড়া সম্প্রদায়ের পরিচয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় তাদের বংশপরম্পরায় প্রবাহমান সমবেত সংগীত বিশেষত ঝুমুর গানের মাধ্যমে। সমবেত কণ্ঠে গীত এই গানগুলো কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; বরং তা তাদের জীবনদর্শন, শ্রমনৈতিকতা ও সামাজিক অবস্থানের মৌখিক দলিল। ঝুমুর গানের কথায় উঠে আসে জাতপাতের অস্বীকার, ক্ষমতার প্রতি অনাসক্তি, স্বাধীনভাবে বসতি গড়ার আকাঙ্ক্ষা এবং শ্রমনির্ভর আত্মমর্যাদার ঘোষণা-
‘পরোয়া করি না উঁচু জাত পাত, পদসেবা কারো করবো না
নোয়াবোনো মাথা, ঝড়ে ঝঞ্জায় নাগপুর নয় চলে যাব
সাথে নেব ঝুড়ি, কোদাল গাইতি, খড়গপুরে তুলব বসতি
বাটি বাটি মদ ছেলে আর বড় মাথা উঁচু করে থাকবো।’
ওই গান কড়াদের কেবল সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, বরং তাদের মন, যুক্তি ও আবেগের সম্মিলিত প্রকাশ যেখানে স্বাধীনতা, সহাবস্থান এবং আত্মসম্মান একসঙ্গে মূর্ত হয়ে ওঠে। মূলত ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্য থেকে আসা ঐতিহ্যগতভাবে কড়ারা ছিল দক্ষ মাটি খননকারী। পুকুর খনন, বাঁধ নির্মাণ এবং রাস্তা তৈরির কাজে তাদের বিশেষ খ্যাতি ছিল। প্রকৃতির রূপ বদলে দেওয়া নয়, বরং তাকে টিকিয়ে রেখে মানুষের প্রয়োজন মেটানোই ছিল তাদের শ্রমের মূল দর্শন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেশাগত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা সঙ্কুচিত হয়েছে, এবং বর্তমানে তারা মূলত পশুপালন, কৃষিশ্রমিক বা দিনমজুর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করছে যেখানে শ্রম আছে, কিন্তু মর্যাদা ও নিরাপত্তা ক্রমশ কমে যাচ্ছে। এই প্রান্তিক অবস্থান তাদের জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। আধপেটা খেয়ে থাকা তারা শিখে গেছে। ক্ষুধার সঙ্গে সহাবস্থান তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী।
সরু পাকা রাস্তার পাশে আধা-পাকা ঘরে তাদের নিবাস। সরকার ঘর দিয়েছে বিনামূল্যে। কিন্তু পেটের আহারের জন্য প্রতিদিনের সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তবু এই সংগ্রাম তাদের মন ভাঙতে পারেনি। সমাজের মূলধারায় বাস করেও তারা তাদের জীবনমানে এর কোনো প্রভাব ফেলতে দেয়নি।
এখানেই কড়াদের যুক্তিবোধ আমাদের নতুন করে ভাবায়। তারা প্রাতিষ্ঠানিক বা বই-পড়া যুক্তিতে বিশ্বাসী না হলেও তাদের জীবনযাপনে রয়েছে এক গভীর ব্যবহারিক যুক্তি সীমিত সম্পদে টিকে থাকার যুক্তি, প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলার যুক্তি, আজকের ক্ষুধাকে আগামী দিনের সঙ্গে মেলানোর যুক্তি। যেখানে মূলধারার মানুষের যুক্তি বলে-আরও চাই, সেখানে কড়াদের যুক্তি বলে-যা আছে, তাই যথেষ্ট। আর এই যুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক স্থির মন।
ভোগবাদী সমাজে মন ক্রমাগত তুলনা, প্রতিযোগিতা, হিংসা ও নিরাপত্তাহীনতায় জর্জরিত হয়। কিন্তু কড়াদের মন প্রকৃতির ছন্দে বাঁধা। তাদের মন জানে সূর্য উঠবে, অস্ত যাবে; বৃষ্টি আসবে, যাবে; সুখ-দুঃখ আসবে, যাবে। এই অনিত্যতার বোধই তাদের মনকে স্থির রাখে। তাই অভাব তাদের মনকে ভাঙে না, বরং সহনশীল করে তোলে। সাহসী করে তোলে। নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। এ যেন জীবনকে নিয়ে চুপিচুপি নির্বাণের পথে হাঁটা। এ কারণেই তথাকথিত সভ্য সমাজের চোখে তারা পিছিয়ে পড়া হলেও মানসিক স্থিতি ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক এগিয়ে।
কড়া জনগোষ্ঠীর জীবন আমাদের শেখায় উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো বা আয়ের হিসাব নয়; মানুষের মন কতা শান্ত, আবেগ কতা মানবিক এবং যুক্তি কতা ন্যায্য সেই প্রশ্নগুলোই আসল। অতএব কড়া জনগোষ্ঠীর বিপন্নতা কেবল একটি জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তির আশঙ্কা নয়। এটি আমাদের এক বিকল্প মানবিক দর্শনের হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও বটে।
লেখক: অধিকারকর্মী
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)
আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ


























