ঢাকা ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সিন্ডিকেটের পরে এবার বাণিজ্যমন্ত্রীর লিপস্টিক তত্ত্ব!

  • আপডেট সময় : ০৯:৫৪:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ নভেম্বর ২০২৩
  • ৫৮ বার পড়া হয়েছে

আমীন আল রশীদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যখন বললেন যে-‘দেশের অর্থনীতি তলানিতে’, সেই সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তার এলাকার নারীরা তিন বেলা লিপস্টিক লাগান, চার বেলা জুতা বদলান।
কথাটি তিনি প্রতীকী অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই যে বলেছেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফলে যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো, তিনি যে এলাকার কথা বলছেন, সেই গ্রাম বা মফস্বল শহরের নারীরা কি আসলেই তিনবেলা লিপস্টিক মাখেন এবং চার বেলা জুতা পরিবর্তন করেন? এটি কি আদৌ বাস্তবসম্মত? উপরন্তু গ্রাম বা মফস্বল শহর তো দূরে থাক, ঢাকা শহরে বসবাসকারী নারীরাও কি এই কাজ করেন? ফলে অনেকে রসিকতা করে প্রশ্ন করছেন, তিন বেলা লিপস্টিক মাখেন কি খাওয়ার জন্য?
এর আগে বাজারের সিন্ডিকেট ইস্যুতে মন্তব্য করেও সমালোচিত হয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একজন সিনিয়র সাংবাদিক এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীকে ‘ধরবেন’। যদিও পরে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোনও কথা হয়নি।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, ‘বাজারে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়। এটা ঠিক যে বড় বড় গ্রুপগুলো একসাথে অনেক বেশি ব্যবসা করে। আমাদের লক্ষ্য রাখা দরকার- আমরা জেলে ভরলাম, জরিমানা করলাম। সেটা হয়তো করা সম্ভব। কিন্তু তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে, সেটা সইতে তো আমাদের কষ্ট হবে। এজন্য আমরা আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে থেকে চেষ্টা করি।’ তবে শুধু বাণিজ্যমন্ত্রী একা নন, আরও একাধিক মন্ত্রী বাজার সিন্ডিকেটের ব্যাপারে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলেছেন। তাতে জনমনে এই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে, সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীরা কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী?
এরকম বাস্তবতায় গত প্রসঙ্গত, গত ৮ নভেম্বর সচিবালয়ে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি মনিটরিং ও রিভিউ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এলাকা আলুভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক। কৃষকের কোনও কষ্ট নেই। সেখানকার নারীরা দিনে তিনবার করে লিপস্টিক লাগাচ্ছে। চারবার করে স্যান্ডেল বদলাচ্ছে। আমি খুব ভালো জানি, আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু সারা দেশের অবস্থাটা ভিন্ন। শহরের যারা দিনমজুর, নি¤œশ্রেণির তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।’
কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলছেন তার এলাকায় কোনও সংকট নেই বরং সেখানে ‘নারীরা তিনবেলা লিপস্টিক মাখছেন’, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলছেন, ‘অর্থনীতি তলানিতে’। গত ৬ নভেম্বর অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) নেতাদের সঙ্গে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘আমার ৩৬ বছরের সিভিল ও পাবলিক সার্ভিসে কখনোই এমন অর্থনৈতিক সংকট প্রত্যক্ষ করিনি। আমার কর্মজীবনে দুই ধরনের ঘাটতি দেখেছি; তা হচ্ছে— চলতি হিসাবের ঘাটতি ও রাজস্ব ঘাটতি। একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি হতে কখনোই দেখিনি।’ স্বয়ং গভর্নরও নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, মূল্যস্ফীতি যেন না বাড়ে, সে জন্য দীর্ঘদিন ডলারের দর বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতে ফল হয়েছে উল্টো। একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি, অপরদিকে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও পাচ্ছেন না ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োগ করা মুদ্রানীতির কোনও সূত্রই যেন এ ক্ষেত্রে কাজ করছে না। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ কমে এখন ১৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডলারের দাম। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে ১২৪ টাকা দিয়ে ডলার কিনে আমদানিকারকদের কাছে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করছে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। (বাংলা ট্রিবিউন, ০৯ নভেম্বর ২০২৩)

বলা হয়, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ও বেড়েছে। কথাটি আংশিক হলেও সত্যি। কিছু লোকের আয় দুই বা তিন গুণ নয়, আরও অনেক বেড়েছে। অবৈধ টাকার লেনদেন ও ছড়াছড়ি বেড়েছে। অবৈধ পথে ধনি হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। সুতরাং সমাজের একটি অংশের উপার্জন নিঃসন্দেহে বেড়েছে। বৈধ পথেও অনেকের উপার্জন বেড়েছে—সেটিও সত্য। কিন্তু সেটি কত শতাংশ? ১৭ কোটি মানুষের দেশে গত এক দশকে কত শতাংশ লোকের আয় দুই বা তিন গুণ বেড়েছে?
উপরন্তু করোনার অতিমারির কালে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অনেকেরই আয় কমে গেছে। সুতরাং মানুষের আয় বেড়েছে—এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রার অন্যপিঠও ভাবতে হবে যে, কত শতাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নি¤œমধ্যবিত্ত এবং নি¤œমধ্যবিত্ত থেকে নি¤œবিত্তে নেমে এসেছে। বছর দশেক আগেও যিনি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করলে চলতে পারতেন, তিনি কি এখন ওই টাকায় চলতে পারছেন? সুতরাং রাষ্ট্রের গুটিকয়েক লোকের উপার্জন বেড়েছে বলে, কিছু সংখ্যক মানুষ ধনি হচ্ছে বলে, রাস্তায় দামি গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে বলেই দেশের সব মানুষ ভালো আছে কিংবা সবার ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে—এই উপসংহারে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো বৈষম্য। অর্থাৎ যে জিনিস একজন স্বল্প আয়ের বা মধ্য আয়ের লোকেরও ক্রয়সীমার বাইরে, সেই একই জিনিস মুহূর্তেই আরেকজন ক্রেতা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। যার কাছে দাম কোনও বিষয় নয়। যিনি যেকোনও দামেই পছন্দের পণ্যটি কিনতে চান।
বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আরেকটি কথা বলা হয় যে, এখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন। কারসাজি করতে পারেন। কালেভদ্রে কিছু অভিযান হলেও এবং ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার কোনও প্রভাব বাজারে পড়ে না। কারণ ব্যবসায়ীরা যতটা সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী—সাধারণ ভোক্তার মধ্যে সেই ঐক্য নেই। তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও খুব একটা শক্তিশালী নয়। তাদের জনবলেরও সংকট আছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির দুনিয়ায় যখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে রাষ্ট্রকেও জিম্মি করার মতো ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে, তখন সাধারণ মানুষের উপায় কী? সরকারের ভেতরেই যদি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি থাকেন; সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ভয় পায় কিংবা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে কী করে? বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই বা কী করতে পারে?
সরকারের কাজ শুধু বড় বড় ভবন, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ নয়—বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার নাগালের মধ্যে রাখা তার প্রধান দায়িত্ব। অন্তত বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্বল্প আয়ের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেখানে চাকরিজীবী এবং ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষের আয়ের বিরাট অংশ চলে যায় বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়ালেখা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে; সেখানে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে গেলে সেটি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভুত হয়। যে কারণে রাষ্ট্রকে ভাবতে হয়, সবচেয়ে কম আয়ের মানুষটিও যাতে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস না ফেলেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে যা খুশি করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাদের, তারাই যখন নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন কিংবা এমন সব মন্তব্য করেন যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল হয়—তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
নারীদের তিনবেলা লিপস্টিক দেওয়া আর চারবেলা জুতা বদলানোর কথাটি বাণিজ্যমন্ত্রী যে অর্থেই বলুন না কেন, এটি ‘গরমের দিনে শীতের ওয়াজ’ হয়ে গেছে। কেননা দেশের অর্থনীতি যে সংকটে সে কথা খোদ গভর্নরও বলছেন। দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন। কেউ বলুক বা না বলুক, মানুষ বাজারে গেলেই সংকট টের পাচ্ছে। সুতরাং, তার এলাকার নারীরা যদি আসলেই তিনবেলা লিপস্টিক মাখেনও, সেটি এই মুহূর্তে বলার বিষয় নয়।
বাংলাদেশের গ্রাম বা মফস্বলের নারীরা যে তিনবেলা লিপস্টিক মাখেন না বা চারবেলা জুতা পরিবর্তন করেন না, এটি জানার জন্য কোনও গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। একজন নারী কেন তিনবেলা লিপস্টিক মাখবেন? লিপস্টিক সাধারণত নারীরা কোনও অনুষ্ঠানে বা কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা কাজে গেলে ঠোঁটে মাখেন। যখন তিনি নিজের ঘরে আছেন কিংবা তিনি যদি মাঠেঘাটে কাজ করতে যান, সেখানে কি লিপস্টিক ব্যবহার করেন? কর্মজীবী নারীরাও কি দিনের মধ্যে চার বেলা জুতা পরিবর্তন করেন? এরকম অবাস্তব ও উদ্ভট কথা একজন মন্ত্রী কী করে বলেন? কারো মধ্যে ন্যূনতম দায়িত্বশীলতা থাকলে তিনি এই ধরনের কথা বলতে পারেন? আর দায়িত্বশীলতা না থাকলে একজন লোক কী করে একটা মন্ত্রণালয় চালান? গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যা খুশি বলা যায়? তাছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে নারীকে হেয় করারও একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কেননা নারীদের ব্যাপারে সমাজের মানুষের যে গড়পরতা ধারণা, তিনি সেখান থেকে সরে আসতে পারেননি। এখনও বাংলাদেশের মানুষের বিরাট অংশ যেমন মনে করে, নারী মানেই ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে ঘুরে বেড়াবে, ঘন ঘন জুতা ও পোশাক বদলাবে—এই ক্লিশে ধারণাটি একজন মন্ত্রীর মগজেও গেঁথে আছে।
অর্থনৈতিক উন্নতির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি নারীর লিপস্টিককেই বেছে নিলেন। তিনবেলা ঠোঁটে লিপস্টিক মাখাই কি উন্নয়নের সূচক? তিনবেলা লিপস্টিক লাগানো আর চারবেলা স্যান্ডেল পাল্টানোই কি সুখে-শন্তিতে বসবাসের মানদ-? মন্ত্রী-এমপি বা এরকম গুরুত্বপূর্ণ পদে উচ্চশিক্ষিত, রুচিবান, জেন্ডার সংবেদনশীল ও স্বল্পবাক মানুষদের বাছাই করা উচিত। কিন্তু খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের এমপি-মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের শিক্ষা, রুচি ও সাংস্কৃতিক মান যে কতটা ‘উন্নত’—তা তাদের কথাবার্তাতেই প্রকাশিত হয়।
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।

 

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

সিন্ডিকেটের পরে এবার বাণিজ্যমন্ত্রীর লিপস্টিক তত্ত্ব!

আপডেট সময় : ০৯:৫৪:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ নভেম্বর ২০২৩

আমীন আল রশীদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর যখন বললেন যে-‘দেশের অর্থনীতি তলানিতে’, সেই সময়ে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, তার এলাকার নারীরা তিন বেলা লিপস্টিক লাগান, চার বেলা জুতা বদলান।
কথাটি তিনি প্রতীকী অর্থে নয়, আক্ষরিক অর্থেই যে বলেছেন, তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ফলে যে প্রশ্নটি উঠছে তা হলো, তিনি যে এলাকার কথা বলছেন, সেই গ্রাম বা মফস্বল শহরের নারীরা কি আসলেই তিনবেলা লিপস্টিক মাখেন এবং চার বেলা জুতা পরিবর্তন করেন? এটি কি আদৌ বাস্তবসম্মত? উপরন্তু গ্রাম বা মফস্বল শহর তো দূরে থাক, ঢাকা শহরে বসবাসকারী নারীরাও কি এই কাজ করেন? ফলে অনেকে রসিকতা করে প্রশ্ন করছেন, তিন বেলা লিপস্টিক মাখেন কি খাওয়ার জন্য?
এর আগে বাজারের সিন্ডিকেট ইস্যুতে মন্তব্য করেও সমালোচিত হয়েছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে একজন সিনিয়র সাংবাদিক এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন তিনি বাণিজ্যমন্ত্রীকে ‘ধরবেন’। যদিও পরে বাণিজ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, বাজারে সিন্ডিকেট নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কোনও কথা হয়নি।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ জুন জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছিলেন, ‘বাজারে সিন্ডিকেটের কথা বলা হয়। এটা ঠিক যে বড় বড় গ্রুপগুলো একসাথে অনেক বেশি ব্যবসা করে। আমাদের লক্ষ্য রাখা দরকার- আমরা জেলে ভরলাম, জরিমানা করলাম। সেটা হয়তো করা সম্ভব। কিন্তু তাতে হঠাৎ করে ক্রাইসিসটা তৈরি হবে, সেটা সইতে তো আমাদের কষ্ট হবে। এজন্য আমরা আলোচনার মাধ্যমে নিয়মের মধ্যে থেকে চেষ্টা করি।’ তবে শুধু বাণিজ্যমন্ত্রী একা নন, আরও একাধিক মন্ত্রী বাজার সিন্ডিকেটের ব্যাপারে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা বলেছেন। তাতে জনমনে এই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক যে, সিন্ডিকেটকারী ব্যবসায়ীরা কি সরকারের চেয়েও বেশি শক্তিশালী?
এরকম বাস্তবতায় গত প্রসঙ্গত, গত ৮ নভেম্বর সচিবালয়ে ন্যাশনাল ট্যারিফ পলিসি মনিটরিং ও রিভিউ কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমার এলাকা আলুভিত্তিক, কৃষিভিত্তিক। কৃষকের কোনও কষ্ট নেই। সেখানকার নারীরা দিনে তিনবার করে লিপস্টিক লাগাচ্ছে। চারবার করে স্যান্ডেল বদলাচ্ছে। আমি খুব ভালো জানি, আমার কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু সারা দেশের অবস্থাটা ভিন্ন। শহরের যারা দিনমজুর, নি¤œশ্রেণির তাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।’
কিন্তু বাণিজ্যমন্ত্রী যখন বলছেন তার এলাকায় কোনও সংকট নেই বরং সেখানে ‘নারীরা তিনবেলা লিপস্টিক মাখছেন’, তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদার বলছেন, ‘অর্থনীতি তলানিতে’। গত ৬ নভেম্বর অর্থনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) নেতাদের সঙ্গে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, ‘আমার ৩৬ বছরের সিভিল ও পাবলিক সার্ভিসে কখনোই এমন অর্থনৈতিক সংকট প্রত্যক্ষ করিনি। আমার কর্মজীবনে দুই ধরনের ঘাটতি দেখেছি; তা হচ্ছে— চলতি হিসাবের ঘাটতি ও রাজস্ব ঘাটতি। একই সঙ্গে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি হতে কখনোই দেখিনি।’ স্বয়ং গভর্নরও নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পেছনে সিন্ডিকেটকে দায়ী করেন।
গণমাধ্যমের খবর বলছে, মূল্যস্ফীতি যেন না বাড়ে, সে জন্য দীর্ঘদিন ডলারের দর বেঁধে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তাতে ফল হয়েছে উল্টো। একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি, অপরদিকে ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও পাচ্ছেন না ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োগ করা মুদ্রানীতির কোনও সূত্রই যেন এ ক্ষেত্রে কাজ করছে না। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ কমে এখন ১৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমেছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ডলারের দাম। ব্যাংকগুলো প্রবাসীদের কাছ থেকে ১২৪ টাকা দিয়ে ডলার কিনে আমদানিকারকদের কাছে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি করছে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। (বাংলা ট্রিবিউন, ০৯ নভেম্বর ২০২৩)

বলা হয়, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের আয়ও বেড়েছে। কথাটি আংশিক হলেও সত্যি। কিছু লোকের আয় দুই বা তিন গুণ নয়, আরও অনেক বেড়েছে। অবৈধ টাকার লেনদেন ও ছড়াছড়ি বেড়েছে। অবৈধ পথে ধনি হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। সুতরাং সমাজের একটি অংশের উপার্জন নিঃসন্দেহে বেড়েছে। বৈধ পথেও অনেকের উপার্জন বেড়েছে—সেটিও সত্য। কিন্তু সেটি কত শতাংশ? ১৭ কোটি মানুষের দেশে গত এক দশকে কত শতাংশ লোকের আয় দুই বা তিন গুণ বেড়েছে?
উপরন্তু করোনার অতিমারির কালে অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়েছেন। অনেকেরই আয় কমে গেছে। সুতরাং মানুষের আয় বেড়েছে—এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রার অন্যপিঠও ভাবতে হবে যে, কত শতাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত থেকে নি¤œমধ্যবিত্ত এবং নি¤œমধ্যবিত্ত থেকে নি¤œবিত্তে নেমে এসেছে। বছর দশেক আগেও যিনি মাসে ২০ হাজার টাকা আয় করলে চলতে পারতেন, তিনি কি এখন ওই টাকায় চলতে পারছেন? সুতরাং রাষ্ট্রের গুটিকয়েক লোকের উপার্জন বেড়েছে বলে, কিছু সংখ্যক মানুষ ধনি হচ্ছে বলে, রাস্তায় দামি গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে বলেই দেশের সব মানুষ ভালো আছে কিংবা সবার ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে—এই উপসংহারে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো বৈষম্য। অর্থাৎ যে জিনিস একজন স্বল্প আয়ের বা মধ্য আয়ের লোকেরও ক্রয়সীমার বাইরে, সেই একই জিনিস মুহূর্তেই আরেকজন ক্রেতা এসে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। যার কাছে দাম কোনও বিষয় নয়। যিনি যেকোনও দামেই পছন্দের পণ্যটি কিনতে চান।
বাংলাদেশের বাজার সম্পর্কে আরেকটি কথা বলা হয় যে, এখানে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ইচ্ছামতো পণ্যের দাম বাড়াতে পারেন। কারসাজি করতে পারেন। কালেভদ্রে কিছু অভিযান হলেও এবং ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার কোনও প্রভাব বাজারে পড়ে না। কারণ ব্যবসায়ীরা যতটা সংগঠিত এবং রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী—সাধারণ ভোক্তার মধ্যে সেই ঐক্য নেই। তদারকি ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও খুব একটা শক্তিশালী নয়। তাদের জনবলেরও সংকট আছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির দুনিয়ায় যখন ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে রাষ্ট্রকেও জিম্মি করার মতো ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে, তখন সাধারণ মানুষের উপায় কী? সরকারের ভেতরেই যদি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের প্রতিনিধি থাকেন; সরকার যদি ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে ভয় পায় কিংবা বাধাগ্রস্ত হয়, তখন বাজার নিয়ন্ত্রণ হবে কী করে? বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই বা কী করতে পারে?
সরকারের কাজ শুধু বড় বড় ভবন, রাস্তা ও সেতু নির্মাণ নয়—বরং বাজার নিয়ন্ত্রণ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার নাগালের মধ্যে রাখা তার প্রধান দায়িত্ব। অন্তত বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে স্বল্প আয়ের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। যেখানে চাকরিজীবী এবং ছোটখাটো ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষের আয়ের বিরাট অংশ চলে যায় বাসা ভাড়া, সন্তানের পড়ালেখা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে; সেখানে নিত্যপণ্যের দাম নাগালের বাইরে চলে গেলে সেটি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে আবির্ভুত হয়। যে কারণে রাষ্ট্রকে ভাবতে হয়, সবচেয়ে কম আয়ের মানুষটিও যাতে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস না ফেলেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা যাতে যা খুশি করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারকে সচেষ্ট থাকতে হয়। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব যাদের, তারাই যখন নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন কিংবা এমন সব মন্তব্য করেন যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রল হয়—তখন সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে?
নারীদের তিনবেলা লিপস্টিক দেওয়া আর চারবেলা জুতা বদলানোর কথাটি বাণিজ্যমন্ত্রী যে অর্থেই বলুন না কেন, এটি ‘গরমের দিনে শীতের ওয়াজ’ হয়ে গেছে। কেননা দেশের অর্থনীতি যে সংকটে সে কথা খোদ গভর্নরও বলছেন। দেশের অর্থনীতিবিদরা বলছেন। কেউ বলুক বা না বলুক, মানুষ বাজারে গেলেই সংকট টের পাচ্ছে। সুতরাং, তার এলাকার নারীরা যদি আসলেই তিনবেলা লিপস্টিক মাখেনও, সেটি এই মুহূর্তে বলার বিষয় নয়।
বাংলাদেশের গ্রাম বা মফস্বলের নারীরা যে তিনবেলা লিপস্টিক মাখেন না বা চারবেলা জুতা পরিবর্তন করেন না, এটি জানার জন্য কোনও গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না। একজন নারী কেন তিনবেলা লিপস্টিক মাখবেন? লিপস্টিক সাধারণত নারীরা কোনও অনুষ্ঠানে বা কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা কাজে গেলে ঠোঁটে মাখেন। যখন তিনি নিজের ঘরে আছেন কিংবা তিনি যদি মাঠেঘাটে কাজ করতে যান, সেখানে কি লিপস্টিক ব্যবহার করেন? কর্মজীবী নারীরাও কি দিনের মধ্যে চার বেলা জুতা পরিবর্তন করেন? এরকম অবাস্তব ও উদ্ভট কথা একজন মন্ত্রী কী করে বলেন? কারো মধ্যে ন্যূনতম দায়িত্বশীলতা থাকলে তিনি এই ধরনের কথা বলতে পারেন? আর দায়িত্বশীলতা না থাকলে একজন লোক কী করে একটা মন্ত্রণালয় চালান? গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে যা খুশি বলা যায়? তাছাড়া বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মধ্যে নারীকে হেয় করারও একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। কেননা নারীদের ব্যাপারে সমাজের মানুষের যে গড়পরতা ধারণা, তিনি সেখান থেকে সরে আসতে পারেননি। এখনও বাংলাদেশের মানুষের বিরাট অংশ যেমন মনে করে, নারী মানেই ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে ঘুরে বেড়াবে, ঘন ঘন জুতা ও পোশাক বদলাবে—এই ক্লিশে ধারণাটি একজন মন্ত্রীর মগজেও গেঁথে আছে।
অর্থনৈতিক উন্নতির উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি নারীর লিপস্টিককেই বেছে নিলেন। তিনবেলা ঠোঁটে লিপস্টিক মাখাই কি উন্নয়নের সূচক? তিনবেলা লিপস্টিক লাগানো আর চারবেলা স্যান্ডেল পাল্টানোই কি সুখে-শন্তিতে বসবাসের মানদ-? মন্ত্রী-এমপি বা এরকম গুরুত্বপূর্ণ পদে উচ্চশিক্ষিত, রুচিবান, জেন্ডার সংবেদনশীল ও স্বল্পবাক মানুষদের বাছাই করা উচিত। কিন্তু খুব ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের এমপি-মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকদের শিক্ষা, রুচি ও সাংস্কৃতিক মান যে কতটা ‘উন্নত’—তা তাদের কথাবার্তাতেই প্রকাশিত হয়।
লেখক: কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স এডিটর, নেক্সাস টেলিভিশন।