ঢাকা ০৯:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ৮ শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সময়ের বোধ

  • আপডেট সময় : ১১:৩২:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪
  • ২১৫ বার পড়া হয়েছে

ফারজানা কাশেমী : বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের চিন্তা ধারা, চাওয়া-পাওয়া, পূর্ণতা-প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে পরিতাপ, অনুতাপ অনেকাংশে কমে যায়। মানুষ যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অধিকাংশ মানুষ নিজের যুক্তির মাপকাঠিতে পরখ করতে চায়।
একটা নিদিষ্ট সময়ে বয়সের সাথে সাথে মানুষ অনেক কিছুই মেনে নিতে শিখে। সময়ের গতিতে প্রয়োজন আর বাস্তবতার প্রবাহের আনুমানিক হিসেবে খুব সহজে নিজেকে বদলে নেয়। সুস্পষ্টভাবে যান্ত্রিক জটিলতার এই গতানুগতিক ধারাপাতে মানুষ নামক পোষা ময়না বুঝতে পারে সকল আয়োজন অনুভূতিতে অংশগ্রহণ করতে আকুলতা জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক পরিবৃত্তি। পরিতাপের জীবনে সমূহ আয়োজনে নিজের পরিপূর্ণতা কিছুটা অলীক, অবান্তর ও কল্পনাবিলাসী। যোগ্যতা অযোগ্যতা, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা এক ধোঁয়াশা রেখাপাত। এই নীল আবরণের আচ্ছন্নতা বুঝতে না পারা জীবনের ব্যর্থতা নয়, জীবনের অজানা রহস্য। কিছু রহস্যের কুলকিনারা কখনোই উন্মোচিত হয় না। জীবন ব্যথাতুর নাকি উপভোগ্য বা বৈচিত্র্যময় হিসেবে সমাদৃত তাও সময়, সুযোগ, চাহিদা ও পারিপার্শ্বিকতায় নির্ভরশীল। মা, বাবা হারানো অবুঝ শিশুটি একটা নিদিষ্ট সময়ের গন্ডি পেরিয়ে গেলে বুঝতে পারে মা, বাবা আর কোনদিনও ফিরবে না। অপেক্ষার বালুচরে অলিখিত এক মৌন মলিন মায়ার বাঁধনে নিষ্পলক অপেক্ষার পালা কিছু আপেক্ষিকতার সাপেক্ষে স্তব্ধ হয়।
কিছু সময় মানুষ নিরুপায় হয়, তাই মেনে নেয়। সময়ের প্রয়োজন ও গতিতে বহমান ধারায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মেনে নিতে শিখে যায়। এই ধারাবাহিক উপখ্যানের বহুমাত্রিক ছন্দে আরণ্যক জীবন থেকে বুঝে যায় যতটুকু প্রাপ্তি, ততোটুকুতেই সন্তুষ্টি। এক জীবনের সকল চাওয়ার পরিপূর্ণতা হয়তো আমাদের প্রাপ্য নয়। না পাওয়া, হারানোর শূন্যতা, দুস্পাপ্যতার ভারিক্কি হিসেবে মানুষ একটা নিদিষ্ট সময়ের পর এড়িয়ে চলে। নিজের সাথে কপট গোপনতায় দৃশ্যমান সত্যে পরাবাস্তববাদী হয়ে অগোচরে অস্বীকার করে মানুষ। কিছু স্বীকৃতি মানুষকে কষ্ট দেয়। এজন্য স্বগোপনে অস্বীকৃতি জানানোই কৌশলমুখী জীবনবিদ্যা। পরিস্থিতি মেনে নিয়ে, বা বাধ্য হয়ে অথবা হিসেবের নিকষ আঁধারে আমরা অধিকাংশ মানুষ হয়তো নিজেকে সান্তনা দিই, আমরা চারপাশের কিছু মানুষের চেয়ে ভালোভাবে বেঁচে আছি। ঁেবচে থাকার নামই স্বার্থকতা।
বোধ হয় জীবন থেকে, চারপাশ দেখে, অভিজ্ঞতা থেকে আহরিত শিক্ষায়, অনুমান সাপেক্ষ অনুভূতি সাপেক্ষ আর দশটা মানুষের সাথে তুলনায় সত্যিই আমরা অধিকাংশ মানুষ হয়তো মানবিক দিক বিবেচনায় ভালো আছি। মাথা গোঁজার আশ্রয় আছে, দু’ মুঠো অন্ন আছে, আছে বট গাছের মতো একটা পরিবার। রাগ, মান অভিমান, ক্ষোভ দেখানোর পরিবারটাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ অভয়ারণ্য। অপূর্ণতার চুলচেরা আক্ষেপ উপেক্ষা করে তাই পরিণত বয়সে অধিকাংশ মানুষ হয়তো বুক ভরা নিঃশ্বাসে বলতে পারে বেশ ভালো আছি।

কিশোরী বেলায় প্রত্যাশিত গ্রেড পয়েন্ট থেকে সামান্য বিচ্যুতিতে, যে চোখের জলে অস্থির হতো, পরিণত জীবন বোধে পৌঁছানোর পর এসব ভেবে সে হয়তো কিছুটা অবাক হয়। সেদিনের সেই কিশোরী আজ পরিণত জীবন বেলায় উপলব্ধি করে জীবন নিছক সময়ের ফ্রেমে বন্দিত্বের এক শৃঙ্খল অভিলাষী ধ্রপদী আয়োজন।
০.২৫ পয়েন্ট এর জন্য যখন কেউ একটা অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া থেকে ছিটকে পড়ে, হয়তো তার ভীষণ আক্ষেপ হয়। সময়ের অচলায়তনে বাঁধা আটপৌরে জীবন বুঝিয়ে দেয়-এত সামান্য বিচ্যুতি অপূর্ণতা নয়।
সময়ের সাথে হাজারো পথচলার মুখরিত জীবন বুঝিয়ে দেয়-দোলাচলের জীবনে অনেকাংশে স্বীকৃতি, পূর্ণতায়, সন্তুষ্টি বোধে আমরা অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত অর্থেই নির্মমতার গ্রাসের ভয়াবহ অবস্থার আনুগত্য থেকে পরিত্রাণ পেয়ে ভালো আছি।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

সময়ের বোধ

আপডেট সময় : ১১:৩২:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৪

ফারজানা কাশেমী : বয়স বাড়ার সাথে সাথে মানুষের চিন্তা ধারা, চাওয়া-পাওয়া, পূর্ণতা-প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে পরিতাপ, অনুতাপ অনেকাংশে কমে যায়। মানুষ যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে সব পর্যবেক্ষণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। অধিকাংশ মানুষ নিজের যুক্তির মাপকাঠিতে পরখ করতে চায়।
একটা নিদিষ্ট সময়ে বয়সের সাথে সাথে মানুষ অনেক কিছুই মেনে নিতে শিখে। সময়ের গতিতে প্রয়োজন আর বাস্তবতার প্রবাহের আনুমানিক হিসেবে খুব সহজে নিজেকে বদলে নেয়। সুস্পষ্টভাবে যান্ত্রিক জটিলতার এই গতানুগতিক ধারাপাতে মানুষ নামক পোষা ময়না বুঝতে পারে সকল আয়োজন অনুভূতিতে অংশগ্রহণ করতে আকুলতা জাগ্রত হওয়া স্বাভাবিক পরিবৃত্তি। পরিতাপের জীবনে সমূহ আয়োজনে নিজের পরিপূর্ণতা কিছুটা অলীক, অবান্তর ও কল্পনাবিলাসী। যোগ্যতা অযোগ্যতা, প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা এক ধোঁয়াশা রেখাপাত। এই নীল আবরণের আচ্ছন্নতা বুঝতে না পারা জীবনের ব্যর্থতা নয়, জীবনের অজানা রহস্য। কিছু রহস্যের কুলকিনারা কখনোই উন্মোচিত হয় না। জীবন ব্যথাতুর নাকি উপভোগ্য বা বৈচিত্র্যময় হিসেবে সমাদৃত তাও সময়, সুযোগ, চাহিদা ও পারিপার্শ্বিকতায় নির্ভরশীল। মা, বাবা হারানো অবুঝ শিশুটি একটা নিদিষ্ট সময়ের গন্ডি পেরিয়ে গেলে বুঝতে পারে মা, বাবা আর কোনদিনও ফিরবে না। অপেক্ষার বালুচরে অলিখিত এক মৌন মলিন মায়ার বাঁধনে নিষ্পলক অপেক্ষার পালা কিছু আপেক্ষিকতার সাপেক্ষে স্তব্ধ হয়।
কিছু সময় মানুষ নিরুপায় হয়, তাই মেনে নেয়। সময়ের প্রয়োজন ও গতিতে বহমান ধারায় নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে মেনে নিতে শিখে যায়। এই ধারাবাহিক উপখ্যানের বহুমাত্রিক ছন্দে আরণ্যক জীবন থেকে বুঝে যায় যতটুকু প্রাপ্তি, ততোটুকুতেই সন্তুষ্টি। এক জীবনের সকল চাওয়ার পরিপূর্ণতা হয়তো আমাদের প্রাপ্য নয়। না পাওয়া, হারানোর শূন্যতা, দুস্পাপ্যতার ভারিক্কি হিসেবে মানুষ একটা নিদিষ্ট সময়ের পর এড়িয়ে চলে। নিজের সাথে কপট গোপনতায় দৃশ্যমান সত্যে পরাবাস্তববাদী হয়ে অগোচরে অস্বীকার করে মানুষ। কিছু স্বীকৃতি মানুষকে কষ্ট দেয়। এজন্য স্বগোপনে অস্বীকৃতি জানানোই কৌশলমুখী জীবনবিদ্যা। পরিস্থিতি মেনে নিয়ে, বা বাধ্য হয়ে অথবা হিসেবের নিকষ আঁধারে আমরা অধিকাংশ মানুষ হয়তো নিজেকে সান্তনা দিই, আমরা চারপাশের কিছু মানুষের চেয়ে ভালোভাবে বেঁচে আছি। ঁেবচে থাকার নামই স্বার্থকতা।
বোধ হয় জীবন থেকে, চারপাশ দেখে, অভিজ্ঞতা থেকে আহরিত শিক্ষায়, অনুমান সাপেক্ষ অনুভূতি সাপেক্ষ আর দশটা মানুষের সাথে তুলনায় সত্যিই আমরা অধিকাংশ মানুষ হয়তো মানবিক দিক বিবেচনায় ভালো আছি। মাথা গোঁজার আশ্রয় আছে, দু’ মুঠো অন্ন আছে, আছে বট গাছের মতো একটা পরিবার। রাগ, মান অভিমান, ক্ষোভ দেখানোর পরিবারটাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ অভয়ারণ্য। অপূর্ণতার চুলচেরা আক্ষেপ উপেক্ষা করে তাই পরিণত বয়সে অধিকাংশ মানুষ হয়তো বুক ভরা নিঃশ্বাসে বলতে পারে বেশ ভালো আছি।

কিশোরী বেলায় প্রত্যাশিত গ্রেড পয়েন্ট থেকে সামান্য বিচ্যুতিতে, যে চোখের জলে অস্থির হতো, পরিণত জীবন বোধে পৌঁছানোর পর এসব ভেবে সে হয়তো কিছুটা অবাক হয়। সেদিনের সেই কিশোরী আজ পরিণত জীবন বেলায় উপলব্ধি করে জীবন নিছক সময়ের ফ্রেমে বন্দিত্বের এক শৃঙ্খল অভিলাষী ধ্রপদী আয়োজন।
০.২৫ পয়েন্ট এর জন্য যখন কেউ একটা অ্যাকাডেমিক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া থেকে ছিটকে পড়ে, হয়তো তার ভীষণ আক্ষেপ হয়। সময়ের অচলায়তনে বাঁধা আটপৌরে জীবন বুঝিয়ে দেয়-এত সামান্য বিচ্যুতি অপূর্ণতা নয়।
সময়ের সাথে হাজারো পথচলার মুখরিত জীবন বুঝিয়ে দেয়-দোলাচলের জীবনে অনেকাংশে স্বীকৃতি, পূর্ণতায়, সন্তুষ্টি বোধে আমরা অধিকাংশ মানুষ প্রকৃত অর্থেই নির্মমতার গ্রাসের ভয়াবহ অবস্থার আনুগত্য থেকে পরিত্রাণ পেয়ে ভালো আছি।
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ