রক্তে বিষাক্ত পদার্থ দূর করতে যা খাবেন

করতে যা খাবেন

স্বাস্থ্য ডেস্ক : একুশ শতকের একটি বহুল আলোচিত শব্দ হলো ডিটক্স। রক্ত বা শরীর থেকে বিষাক্ত/ক্ষতিকারক পদার্থ দূর করার প্রক্রিয়াকে ডিটক্স বলা হয়। স্বাস্থ্যের ঝুঁকি কমাতে রক্তকে দূষণমুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। রক্তের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় উপকরণ পৌঁছায়, যেমন- অক্সিজেন, হরমোন, শর্করা, চর্বি ও ইমিউন সিস্টেমের কোষ। রক্ত শরীরে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে বলে ডিটক্সের জনপ্রিয়তা দিনদিন বেড়ে চলেছে। আপনি জেনে খুশি হবেন যে, আমাদের শরীরে ইতোমধ্যে রক্তকে দূষণমুক্ত করার জন্য প্রাকৃতিক উপায় রয়েছে। শরীর লিভার ও কিডনির মাধ্যমে রক্তের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ করে থাকে। তাই রক্তকে দূষণমুক্ত করতে আমাদের বেশি কিছু করার দরকার নেই। আমরা যা করতে পারি তা হলো, লিভার ও কিডনির কাজকে সহজ করে এমন খাবার খাওয়া। রক্তের ক্ষতিকারক পদার্থ অপসারণে শরীরের অঙ্গকে সাহায্য করতে কোনো নির্দিষ্ট অলৌকিক খাবার নেই। প্রকৃতপক্ষে, ডিটক্স হলো অনেক স্বাস্থ্যকর খাবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। এখানে রক্ত পরিষ্কারকরণে যেসব খাবার লিভার ও কিডনির সক্ষমতা বাড়াতে পারে তার একটি তালিকা দেয়া হলো।
পানি : কিডনির কার্যক্ষমতা বাড়ানোর সর্বোত্তম উপায় হলো যথেষ্ট পরিমাণে পানি পান করা। আমাদের কিডনিগুলো শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ দূর করতে প্রধানত পানির ওপর নির্ভর করে। পানি রক্তনালীকে খোলা রাখতেও সাহায্য করে, তাই বাধা বিঘœতা ছাড়াই রক্ত চলাচল করতে পারে। তীব্র পানিশূন্যতায় কিডনি ড্যামেজ হতে পারে। প্রস্রাবের রঙ হালকা হলুদ অথবা স্বচ্ছ হওয়া উচিত, অন্যথায় বুঝতে হবে শরীর যথেষ্ট পানি পাচ্ছে না। পর্যাপ্ত পানির পরিমাণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত আট গ্লাস পানি পানের নিয়ম রয়েছে, তবে কঠোর পরিশ্রম করলে বা ওজন বেশি হলে আরো বেশি পানি প্রয়োজন হতে পারে।
বাঁধাকপি : কেবল বাঁধাকপি নয়, অন্যান্য ক্রুসিফেরাস শাকসবজিও (যেমন- ব্রোকলি ও ফুলকপি) কিডনি রোগীকে খেতে পরামর্শ দেয়া হয়। এসব শাকসবজি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও উচ্চ পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ক্রুসিফেরাস শাকসবজি কিডনিতে ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে পারে ও কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে কিডনি ফেইলিউর প্রতিরোধ করতে পারে। কিডনি যত সুস্থ থাকবে, রক্তের বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ তত সহজ হবে।
বেরি : ব্লুবেরিতে অবিশ্বাস্য উচ্চ মাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট রয়েছে, যা লিভারকে ড্যামেজ থেকে রক্ষা করতে পারে। প্রাণীজ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ব্লুবেরি লিভারকে সুস্থ রাখতে পারে। আরেকটি উপকারী বেরি হলো ক্রেনবেরি, যা প্রস্রাবতন্ত্রের উপকার করতে পারে বলে মনে করা হয়। এই ফল প্রস্রাবতন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার সংযুক্তি প্রতিরোধ করতে পারে, যার ফলে কিডনিগুলো সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকবে। এছাড়া বেশিরভাগ বেরিতে উচ্চ পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট থাকে বলে অন্যান্য বেরি (যেমন- স্ট্রবেরি) খেয়েও লিভারের উপকার করা যায়।
কফি : এই পানীয় পানে লিভার প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া পেয়ে থাকে। গবেষণায় প্রতীয়মান হয়েছে, কফি পানে স্থায়ী লিভার রোগে ভুগছেন এমন রোগীদের সিরোসিসের ঝুঁকি কমতে পারে। এছাড়া লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও কমতে পারে। কফি হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত লোকদের অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসাকে আরো কার্যকর করতে পারে। এর কারণ হলো, এই পানীয় লিভারে ফ্যাট ও কোলাজেনের সঞ্চয় প্রতিরোধ করতে পারে।
রসুন : রসুন যেকোনো তরকারিকে দারুণ সুস্বাদু করতে পারে। কেবল তা নয়, এটি শরীরেরও বিস্ময়কর উপকারসাধন করতে পারে। এতে প্রদাহ বিনাশক উপাদান রয়েছে এবং এটি কোলেস্টেরল ও রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। উচ্চ রক্তচাপ কিডনিতে রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে, তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব রয়েছে।
আদা : আদাও তরকারিকে সুস্বাদু করে তোলে। প্রাকৃতিক চিকিৎসার উপকরণ হিসেবেও এর যথেষ্ট আলোচনা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। এই মসলা শরীরে রক্ত শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়াতে পারে। গবেষণায় এটাও দেখা গেছে, আদা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজের চিকিৎসায় বেশ সহায়ক হতে পারে।
মোসাম্বি : অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে সমৃদ্ধ আরেকটি ফল হলো মোসাম্বি। এটি শরীরে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। মোসাম্বি সংক্রান্ত বেশিরভাগ গবেষণাই প্রাণীর ওপর চালানো হয়েছে, কিন্তু ফলাফল যথেষ্ট আশাপ্রদায়ক। গবেষণায় দেখা গেছে, মোসাম্বির অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট লিভারকে সুরক্ষিত রাখতে পারে এবং মদের ক্ষতিকারক প্রভাব কমাতে পারে।
আপেল : এই ফলে উচ্চ পরিমাণে পেকটিন নামক দ্রবণীয় আঁশ রয়েছে। খাবারের দ্রবণীয় আঁশ রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখতে পারে। উচ্চ রক্ত শর্করা কিডনির ক্ষতি করতে পারে বলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করলে কিডনির স্বাস্থ্যে অপ্রত্যক্ষ ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সামুদ্রিক মাছ : সমুদ্রের তৈলাক্ত মাছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড রক্তের ট্রাইগ্লাইসেরাইড ও চাপ কমায়- উভয়টাই লিভার ও কিডনির জন্য সহায়ক। তবে ইতোমধ্যে কিডনি রোগ থাকলে মাছের মতো প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার কমাতে হবে। কিডনি রোগীরা বেশি প্রোটিন খেলে কিডনির পক্ষে কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ধনেপাতা : প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণা ধারণা দিয়েছে যে, ধনেপাতাও লিভারকে রক্ষা করতে পারে। ধনেপাতা ন্যাচারাল ডিউরেটিক (প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক) হিসেবেও কাজ করতে পারে, অর্থাৎ প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে বর্জ্য অপসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে রক্তচাপও কমে।
গ্রিন টি : কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি পানে লিভারের স্বাস্থ্যে উন্নতি এসেছে। এই পানীয় লিভার থেকে চর্বি কমায়। এটি লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও কমাতে পারে। যারা প্রতিদিন কমপক্ষে চার কাপ গ্রিন টি পান করেছেন তাদের ক্ষেত্রে লিভারের স্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন হয়েছে।
জবা ফুল : আমাদের দেশে বেশ পরিচিত একটি ফুল হলো জবা ফুল। এই ফুলও প্রাকৃতিক মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করতে পারে এবং কিডনির পরিস্রাবণ কাজে সাহায্য করতে পারে। এভাবে জবা ফুলও রক্তের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে ও চাপ কমিয়ে থাকে। জবা ফুলের চা পান করতে পারেন অথবা সালাদের সঙ্গে খেতে পারেন।

Please follow and like us: