ঢাকা ১২:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ময়লার কাজ পেতে কাউন্সিলরদের আগ্রহের নেপথ্যে

  • আপডেট সময় : ১০:২২:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৩
  • ১১৪ বার পড়া হয়েছে

মহানগর প্রতিবেদন : স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের প্রধান কাজগুলোর অন্যতম হচ্ছে নিজ এলাকার সড়ক, ইমারত ও বিভিন্ন জায়গা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করা। এ ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি আরও বাণিজ্যিকীকরণ করতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
সংস্থাটি নিজেরা বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি না করে ঠিকাদার নিয়োগ করতে যাচ্ছে। এতে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি পাবে, বছরে তাদের পকেটে যাবে কোটি কোটি টাকা। তাই কাজটি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন কাউন্সিলর ও তাঁদের স্বজনেরা।
সিটি করপোরেশন গৃহকর বাবদ যে টাকা নগরবাসীর কাছ থেকে নেয়, সেখানেই পরিচ্ছন্নতা করও আছে। কয়েক বছর ধরে ঠিকাদারের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি করাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি। একই পথে হাঁটছে ঢাকা উত্তর সিটিও। তারাও ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম আলোর হিসাবে ৩৫টি ওয়ার্ডের বিপরীতে দেওয়া দরপত্রে কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ময়লার কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া কাউন্সিলররা কোনো ওয়ার্ডে সরাসরি নিজের নামেই দরপত্র জমা দিয়েছেন। কেউ দরপত্র জমা দিয়েছেন স্ত্রী, ভাগনে-ভাতিজা, জামাতা কিংবা স্বজনের নামে। তবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নিজেদের কর্মীদের দিয়ে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করাচ্ছে। ওই দুই সিটির বাসিন্দাদের প্রতি মাসে অতিরিক্ত কোনো ময়লার বিল দিতে হচ্ছে না।তবে চট্টগ্রাম সিটির কিছু এলাকার বাসিন্দাদের ময়লার জন্য বিল দিতে হয়। এসব এলাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা সংগ্রহ করেন না। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে কিছু ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহ করা হয়।
আর ঢাকা উত্তর সিটি ঠিকাদারকে এ কাজ দিতে প্রতি মাসের ময়লার বিল নির্ধারণ করেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এর মধ্যে পুরোনো ৩৬টি ওয়ার্ডে (১-৩৬) বিল দিতে হবে ১০০ টাকা। আর নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে (৩৭-৫৪) বিল নির্ধারণ হয়েছে ৫০ টাকা।
পরীক্ষার্থী-পরীক্ষক একই: নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন মানদ-ের ওপর যাচাই-বাছাই করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য নিয়োজিত করা হবে। আর নবায়ন করা হবে এক বছর পর। এর আগে ১০টি বিষয়ের ওপর ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে কাজের মান যাচাই করা হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে পরিবেশসম্মতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, বর্জ্য সংগ্রহে নিয়োজিত যানবাহনের মান, বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, অতিরিক্ত ফি আদায়, বাসিন্দাদের সঙ্গে আচরণ, কর্মীদের পোশাক, অন্যান্য জিনিস সরবরাহ ও কাজের সময় পরিধান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রভৃতি। এ মান যাচাই ও গ্রেড প্রদানে পাঁচ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হবে, তাতে কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং সহসভাপতি থাকবেন নারী কাউন্সিলর। তাহলে যদি কাউন্সিলর বা তাদের স্বজনেরাই ঠিকাদার হন তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে যিনি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনিই ওই পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়ার কাজটিও করবেন।
বছরে আসবে ১৯১ কোটি টাকা: ঢাকা উত্তর সিটির রাজস্ব বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১০টি অঞ্চলে মোট হোল্ডিং আছে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার। পুরোনো পাঁচটি অঞ্চলে ৩৬টি ওয়ার্ডে হোল্ডিংয়ের সংখ্যা ২ লাখ ৫৬ হাজার। বাকি প্রায় ১৯ হাজার হোল্ডিং নতুন যুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডে। রাজস্ব বিভাগ থেকে হোল্ডিংয়ের হিসাব পাওয়া গেলেও বাসাবাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যাটি অজানা। কারণ, ঢাকার ভবনগুলোতে ফ্ল্যাট বা বাসার সংখ্যায় ভিন্নতা থাকে। তবে রাজস্ব বিভাগে হোল্ডিংপ্রতি গড়ে ৬-৮টি ফ্ল্যাট বা বাসা ধরে নিয়ে কাজ করা হয়। সে অনুযায়ী প্রথম ৩৬টি ওয়ার্ডে অন্তত ১৫ লাখ ৩৭ হাজার বাসা বা ফ্ল্যাট আছে। বাকি ওয়ার্ডে রয়েছে আরও প্রায় এক লাখ ১৩ হাজারটি। যদিও নতুন ওই ওয়ার্ডের অনেক বাড়ি এখনো গৃহকরের আওতায় আসেনি।
গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তৈরি নীতিমালা বা টার্মস অব রেফারেন্সে প্রথম (পুরোনো) ৩৬টি ওয়ার্ডে ময়লার বিল বাসাপ্রতি ১০০ টাকা আর নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে (৩৭-৫৪) ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালার বাইরে গিয়ে ঠিকাদার যদি এক পয়সাও বাড়তি টাকা আদায় না করে, তবু ১-৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ টাকা এবং ৩৭-৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০ টাকা হিসাবে ঠিকাদারদের বছরে আয় হবে ১৯১ কোটি টাকা। বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে করপোরেশনের রাজস্ব আয় হবে মাত্র ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
খরচ বাদে থাকবে ১১০ কোটি: করপোরেশনকে এককালীন ৬ ও ১০ লাখ করে টাকা দেওয়া ছাড়াও বর্জ্যের কাজ করতে ঠিকাদারদের একটি পিকআপ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যান কিনতে হবে। প্রতিটি ভ্যানের পেছনে দুজন করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডের এসটিএসে (অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র) দিতে হবে আরও দুজন কর্মী, সঙ্গে প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে সুপারভাইজার। এগুলোর বাইরে বর্জ্য সংগ্রহে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ও নির্ধারিত পোশাক দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে যাঁরা বর্জ্যের কাজ করেন এবং যাঁরা দরপত্র জমা দিয়েছেন—এমন ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে এসব খাতের ব্যয় নিয়ে কথা বলেছে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। তারা খরচের যে হিসাবে দিয়েছে, সে অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতনে বছরে প্রায় ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা লাগবে। পিকআপ ও ভ্যানগাড়ি কিনতে লাগবে প্রায় ১৩ কোটি সাড়ে ৮৭ লাখ টাকা। প্রায় ১ কোটি সাড়ে ২৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে কর্মীদের পোশাক, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং বর্জ্যের কাজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। অন্যান্য খরচ বাবদ হিসাব করা হয়েছে ওয়ার্ডপ্রতি বছরে ১২ লাখ টাকা করে মোট ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই সবকিছু হিসাব করলে ৫৪টি ওয়ার্ডে নিয়োজিত ৫৪ জন ঠিকাদারের বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার মতো। সঙ্গে এককালীন করপোরেশনকে দেওয়া ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে যা হয় সাড়ে ৮০ কোটি টাকার মতো। ঠিকাদারদের ব্যয় হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতি ওয়ার্ডে একটি এক টনের পিকআপ গড়ে সাড়ে ৯ লাখ টাকা, ওয়ার্ডপ্রতি ৪০টি করে ভ্যানগাড়ি হিসেবে প্রতিটিতে ৩৯ হাজার টাকা হিসাব করা হয়েছে। ট্রলি, বেলচা, কাটা, ঝাড়ু, বালতি, ড্রাম এবং ভ্যান রং করা বাবদ প্রতিটি ওয়ার্ডে বছরে আরও ৫০ হাজার ধরা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ভ্যানের পেছনে দুজন করে কর্মী ধরলে একটি ওয়ার্ডের ৪০টি ভ্যানে ৮০ জন এবং এসটিএসের জন্য আরও দুজন মোট ৮২ জন কর্মী প্রয়োজন। এভাবে মোট ৪ হাজার ৩২০ জন কর্মীর বেতন গড়ে ১০ হাজার টাকা হিসাবে বছরে ৫১ কোটি ৮৪ লাখ লাগবে। আর ৫৪ জন সুপারভাইজারের পেছনে মাসে সাড়ে ১৬ হাজার টাকা বেতন ধরে প্রয়োজন ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নির্ধারিত রঙের পোশাকে (প্যান্ট ও শার্ট, অ্যাপ্রন, হাতমোজা, টুপি, জুতা, গামবুট) বছরে ন্যূনতম তিন হাজার টাকা ধরে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ওয়ার্ডপ্রতি ১২ লাখ করে বছরে ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
বাণিজ্যিকেও একই বিল: নীতিমালায় বাসাবাড়িতে বা ফ্ল্যাটে যে হারে ময়লার বিল নেওয়া হবে, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ওই হারেই নেওয়া হবে। তবে বাস্তবে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা এত দিন হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা করে বিল নিয়ে আসছে। বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, উত্তর সিটিতে তিন হাজারের বেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রতিটি রেস্তোরাঁ থেকে বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ মাসে কমপক্ষে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোয় চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য রয়েছে। ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নিয়োগের দরপত্রের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এস এম শরিফ-উল ইসলাম জানান, দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে জানা যাবে। প্রত্যয়ন ছাড়া যাঁরা দরপত্র জমা দিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। টার্মস অব রেফারেন্সে যা আছে, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এখন কিছু বলা যাবে না।’ কাউন্সিলরদের দেওয়া দরপত্রের বিষয়ে মেয়র সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

ময়লার কাজ পেতে কাউন্সিলরদের আগ্রহের নেপথ্যে

আপডেট সময় : ১০:২২:১২ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৩

মহানগর প্রতিবেদন : স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশনের প্রধান কাজগুলোর অন্যতম হচ্ছে নিজ এলাকার সড়ক, ইমারত ও বিভিন্ন জায়গা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ করা। এ ক্ষেত্রে বাসাবাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি আরও বাণিজ্যিকীকরণ করতে যাচ্ছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।
সংস্থাটি নিজেরা বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি না করে ঠিকাদার নিয়োগ করতে যাচ্ছে। এতে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি পাবে, বছরে তাদের পকেটে যাবে কোটি কোটি টাকা। তাই কাজটি পেতে মরিয়া হয়ে উঠেপড়ে লেগেছেন কাউন্সিলর ও তাঁদের স্বজনেরা।
সিটি করপোরেশন গৃহকর বাবদ যে টাকা নগরবাসীর কাছ থেকে নেয়, সেখানেই পরিচ্ছন্নতা করও আছে। কয়েক বছর ধরে ঠিকাদারের মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের কাজটি করাচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি। একই পথে হাঁটছে ঢাকা উত্তর সিটিও। তারাও ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় রয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটির ৫৪টি ওয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম আলোর হিসাবে ৩৫টি ওয়ার্ডের বিপরীতে দেওয়া দরপত্রে কাউন্সিলরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ময়লার কাজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া কাউন্সিলররা কোনো ওয়ার্ডে সরাসরি নিজের নামেই দরপত্র জমা দিয়েছেন। কেউ দরপত্র জমা দিয়েছেন স্ত্রী, ভাগনে-ভাতিজা, জামাতা কিংবা স্বজনের নামে। তবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নিজেদের কর্মীদের দিয়ে বাসাবাড়ির বর্জ্য সংগ্রহ করাচ্ছে। ওই দুই সিটির বাসিন্দাদের প্রতি মাসে অতিরিক্ত কোনো ময়লার বিল দিতে হচ্ছে না।তবে চট্টগ্রাম সিটির কিছু এলাকার বাসিন্দাদের ময়লার জন্য বিল দিতে হয়। এসব এলাকায় সিটি করপোরেশনের কর্মীরা ময়লা সংগ্রহ করেন না। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে কিছু ওয়ার্ডে ময়লা সংগ্রহ করা হয়।
আর ঢাকা উত্তর সিটি ঠিকাদারকে এ কাজ দিতে প্রতি মাসের ময়লার বিল নির্ধারণ করেছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। এর মধ্যে পুরোনো ৩৬টি ওয়ার্ডে (১-৩৬) বিল দিতে হবে ১০০ টাকা। আর নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে (৩৭-৫৪) বিল নির্ধারণ হয়েছে ৫০ টাকা।
পরীক্ষার্থী-পরীক্ষক একই: নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন মানদ-ের ওপর যাচাই-বাছাই করে কোনো প্রতিষ্ঠানকে দুই বছরের জন্য নিয়োজিত করা হবে। আর নবায়ন করা হবে এক বছর পর। এর আগে ১০টি বিষয়ের ওপর ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেডে কাজের মান যাচাই করা হবে। বিষয়গুলো হচ্ছে পরিবেশসম্মতভাবে বর্জ্য সংগ্রহ, বর্জ্য সংগ্রহে নিয়োজিত যানবাহনের মান, বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ, অতিরিক্ত ফি আদায়, বাসিন্দাদের সঙ্গে আচরণ, কর্মীদের পোশাক, অন্যান্য জিনিস সরবরাহ ও কাজের সময় পরিধান, স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রভৃতি। এ মান যাচাই ও গ্রেড প্রদানে পাঁচ সদস্যের যে কমিটি গঠন করা হবে, তাতে কমিটির সভাপতি সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এবং সহসভাপতি থাকবেন নারী কাউন্সিলর। তাহলে যদি কাউন্সিলর বা তাদের স্বজনেরাই ঠিকাদার হন তাহলে বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যে যিনি পরীক্ষা দিচ্ছেন তিনিই ওই পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেওয়ার কাজটিও করবেন।
বছরে আসবে ১৯১ কোটি টাকা: ঢাকা উত্তর সিটির রাজস্ব বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১০টি অঞ্চলে মোট হোল্ডিং আছে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার। পুরোনো পাঁচটি অঞ্চলে ৩৬টি ওয়ার্ডে হোল্ডিংয়ের সংখ্যা ২ লাখ ৫৬ হাজার। বাকি প্রায় ১৯ হাজার হোল্ডিং নতুন যুক্ত ১৮টি ওয়ার্ডে। রাজস্ব বিভাগ থেকে হোল্ডিংয়ের হিসাব পাওয়া গেলেও বাসাবাড়ি বা ফ্ল্যাটের সংখ্যাটি অজানা। কারণ, ঢাকার ভবনগুলোতে ফ্ল্যাট বা বাসার সংখ্যায় ভিন্নতা থাকে। তবে রাজস্ব বিভাগে হোল্ডিংপ্রতি গড়ে ৬-৮টি ফ্ল্যাট বা বাসা ধরে নিয়ে কাজ করা হয়। সে অনুযায়ী প্রথম ৩৬টি ওয়ার্ডে অন্তত ১৫ লাখ ৩৭ হাজার বাসা বা ফ্ল্যাট আছে। বাকি ওয়ার্ডে রয়েছে আরও প্রায় এক লাখ ১৩ হাজারটি। যদিও নতুন ওই ওয়ার্ডের অনেক বাড়ি এখনো গৃহকরের আওতায় আসেনি।
গৃহস্থালির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় তৈরি নীতিমালা বা টার্মস অব রেফারেন্সে প্রথম (পুরোনো) ৩৬টি ওয়ার্ডে ময়লার বিল বাসাপ্রতি ১০০ টাকা আর নতুন ১৮টি ওয়ার্ডে (৩৭-৫৪) ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিমালার বাইরে গিয়ে ঠিকাদার যদি এক পয়সাও বাড়তি টাকা আদায় না করে, তবু ১-৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে ১০০ টাকা এবং ৩৭-৫৪ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০ টাকা হিসাবে ঠিকাদারদের বছরে আয় হবে ১৯১ কোটি টাকা। বিপরীতে ঠিকাদারদের কাছ থেকে করপোরেশনের রাজস্ব আয় হবে মাত্র ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
খরচ বাদে থাকবে ১১০ কোটি: করপোরেশনকে এককালীন ৬ ও ১০ লাখ করে টাকা দেওয়া ছাড়াও বর্জ্যের কাজ করতে ঠিকাদারদের একটি পিকআপ ও প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যান কিনতে হবে। প্রতিটি ভ্যানের পেছনে দুজন করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাখতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডের এসটিএসে (অস্থায়ী বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র) দিতে হবে আরও দুজন কর্মী, সঙ্গে প্রতি ওয়ার্ডে একজন করে সুপারভাইজার। এগুলোর বাইরে বর্জ্য সংগ্রহে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জাম ও নির্ধারিত পোশাক দিতে হবে। বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটির বিভিন্ন ওয়ার্ডে যাঁরা বর্জ্যের কাজ করেন এবং যাঁরা দরপত্র জমা দিয়েছেন—এমন ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সঙ্গে এসব খাতের ব্যয় নিয়ে কথা বলেছে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদক। তারা খরচের যে হিসাবে দিয়েছে, সে অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বেতনে বছরে প্রায় ৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা লাগবে। পিকআপ ও ভ্যানগাড়ি কিনতে লাগবে প্রায় ১৩ কোটি সাড়ে ৮৭ লাখ টাকা। প্রায় ১ কোটি সাড়ে ২৯ লাখ টাকা ব্যয় হবে কর্মীদের পোশাক, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং বর্জ্যের কাজে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে। অন্যান্য খরচ বাবদ হিসাব করা হয়েছে ওয়ার্ডপ্রতি বছরে ১২ লাখ টাকা করে মোট ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এই সবকিছু হিসাব করলে ৫৪টি ওয়ার্ডে নিয়োজিত ৫৪ জন ঠিকাদারের বছরে ব্যয় হবে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার মতো। সঙ্গে এককালীন করপোরেশনকে দেওয়া ৪ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে যা হয় সাড়ে ৮০ কোটি টাকার মতো। ঠিকাদারদের ব্যয় হিসাবের ক্ষেত্রে প্রতি ওয়ার্ডে একটি এক টনের পিকআপ গড়ে সাড়ে ৯ লাখ টাকা, ওয়ার্ডপ্রতি ৪০টি করে ভ্যানগাড়ি হিসেবে প্রতিটিতে ৩৯ হাজার টাকা হিসাব করা হয়েছে। ট্রলি, বেলচা, কাটা, ঝাড়ু, বালতি, ড্রাম এবং ভ্যান রং করা বাবদ প্রতিটি ওয়ার্ডে বছরে আরও ৫০ হাজার ধরা হয়েছে।
নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিটি ভ্যানের পেছনে দুজন করে কর্মী ধরলে একটি ওয়ার্ডের ৪০টি ভ্যানে ৮০ জন এবং এসটিএসের জন্য আরও দুজন মোট ৮২ জন কর্মী প্রয়োজন। এভাবে মোট ৪ হাজার ৩২০ জন কর্মীর বেতন গড়ে ১০ হাজার টাকা হিসাবে বছরে ৫১ কোটি ৮৪ লাখ লাগবে। আর ৫৪ জন সুপারভাইজারের পেছনে মাসে সাড়ে ১৬ হাজার টাকা বেতন ধরে প্রয়োজন ১ কোটি ৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া নীতিমালা অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নির্ধারিত রঙের পোশাকে (প্যান্ট ও শার্ট, অ্যাপ্রন, হাতমোজা, টুপি, জুতা, গামবুট) বছরে ন্যূনতম তিন হাজার টাকা ধরে বছরে প্রায় ১ কোটি ২৯ লাখ এবং অন্যান্য খরচ বাবদ ওয়ার্ডপ্রতি ১২ লাখ করে বছরে ৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা ধরা হয়েছে।
বাণিজ্যিকেও একই বিল: নীতিমালায় বাসাবাড়িতে বা ফ্ল্যাটে যে হারে ময়লার বিল নেওয়া হবে, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও ওই হারেই নেওয়া হবে। তবে বাস্তবে বর্জ্য সংগ্রহকারীরা এত দিন হোটেল-রেস্তোরাঁ কিংবা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে কমপক্ষে দুই হাজার টাকা করে বিল নিয়ে আসছে। বাংলাদেশ রেস্টুরেন্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, উত্তর সিটিতে তিন হাজারের বেশি রেস্তোরাঁ রয়েছে। প্রতিটি রেস্তোরাঁ থেকে বর্জ্য সংগ্রহ বাবদ মাসে কমপক্ষে ২ হাজার টাকা নেওয়া হয়। গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকাগুলোয় চার হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য রয়েছে। ভ্যান সার্ভিস প্রতিষ্ঠান নিয়োগের দরপত্রের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমোডর এস এম শরিফ-উল ইসলাম জানান, দরপত্র মূল্যায়নের কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে জানা যাবে। প্রত্যয়ন ছাড়া যাঁরা দরপত্র জমা দিয়েছেন, তাঁদের নিয়ে সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। টার্মস অব রেফারেন্সে যা আছে, সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এখন কিছু বলা যাবে না।’ কাউন্সিলরদের দেওয়া দরপত্রের বিষয়ে মেয়র সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি।