ঢাকা ১১:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অর্থহীন আন্দোলন

  • আপডেট সময় : ১০:২৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ জুন ২০২৪
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : অষ্টম পে-স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবমূল্যায়ণ করা হয়। আমলাতন্ত্রের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনের ধাপ সুকৌশলে কমিয়ে দেওয়া হয়। ৭ম পে-স্কেল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রধান, সচিব ও পুলিশ প্রধানসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বেতন পেতেন। কিন্তু অষ্টম পে-স্কেলে বেতনের পূর্ববর্তীধাপগুলো ঠিক রেখে আমলাতন্ত্র সুকৌশলে সুপিরিয়র একটি ধাপ সৃষ্টি করে। সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করে সচিবসহ অন্যান্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তুলনায় তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে নেন। এতদিন সচিবসহ অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের সমান বেতন পেলেও তাদের এই নতুন পদ সৃষ্টির ফলে তাদের বেতন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
উপর্যুক্ত বিষয়টি নিয়ে সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায়ও বিষয়টি আলোচনার পর আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভর্তি পরীক্ষা বর্জনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় সাধারণ শিক্ষকদের নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো দূরের কথা একরাতও বলবৎ রাখা যায়নি। একজন আন্দোলনকারী শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখেছি, রাতের মধ্যে তৎকালীন উপাচার্য কিছু শিক্ষকদের কীভাবে ম্যানেজ করেন। জুনিয়র কয়েকজন শিক্ষককে মাসিক কিছু বর্ধিত অর্থ চুক্তিতে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের প্রলোভন ও সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষককে সিন্ডিকেট মেম্বারসহ বিভিন্ন পদ-পদবী দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
তৎকালীন উপাচার্যের ওই প্রলোভন ফর্মুলায় কাজ হয়। মাসিক বর্ধিত অর্থ (ভাতা) ও পদ-পদবী প্রাপ্তির আশায় শিক্ষকদের অনেকে বিক্রি হয়ে যায় এবং তারা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সদস্যদের অনেকটা অপ্রকাশ্য ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে। তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় গৃহীত সাধারণ শিক্ষকদের ওই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত যদি শেষপর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যেত তাহলে আজকে শিক্ষকদের নতুন করে আন্দোলন করার প্রয়োজন হতো না। শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা, সম্মান ও সম্মানী ফেরত পেতেন। শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নয় সারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তাদের অধিকার ফিরে পেতেন। কিন্তু গুটিকয়েকজনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে এবং শিক্ষকরা তাদের সম্মান ও সম্মানী হারায় যা আজও ফেরত পায়নি।
ওইদিন তৎকালীন উপাচার্যের “মাইম্যান” হিসেবে যারা কাজ করে। কিছু অর্থপ্রাপ্তি ও পদ প্রাপ্তির লোভে নিজের ও নিজের স্বজাতির সম্মান ও সম্মানীর দাবি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, তাদের কেউ কেউ আজ শিক্ষক সমিতির নেতা। মজার বিষয় হচ্ছে, এখন তারাই আবার একই দাবিতে আন্দোলন করছে।

জনপ্রিয় সাহিত্যিক কবি শামসুর রহমান একদা তার ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতায় লিখেছিলেন “উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,/ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।” তার ওই অমর কবিতা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সত্য হয়ে উঠেছে। যারা একসময় উপাচার্যের ‘লাঠিয়াল’ হয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন দমন করেছে তারা আজ শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করছে। কী অদ্ভুত এই দেশ! কী অদ্ভুত এই সব শিক্ষক নেতা! কিন্তু শেষপর্যন্ত এই আন্দোলন যে সফল হবে এবং নেতারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের ইতিহাস বলে কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও পদ-পদবীর প্রস্তাব পেলে সাধারণত কিছু শিক্ষক নেতারা নানা যুক্তি দেখিয়ে আন্দোলন থেকে সরে পড়েন। তখন তাদের কাছে যুক্তির অভাব হয় না। তখন সাধারণ শিক্ষকরা বেকাদায় পড়েন। ফলে তাদেরকে শিক্ষক নেতারা যা বলেন তাই শেষপর্যন্ত মেনে নিতে হয়। এ যেন পুতুল খেলা!
চলমান শিক্ষকদের তিন দাবিতে (ক. অর্থমন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পেনশন সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার, প্রতিশ্রুত সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতনস্কেল প্রবর্তন এর বিষয়ে) যে আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করছেন তার কোনও ভবিষ্যৎ আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
প্রথমত, সরকার যখন সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করে তখন সরকারের ওই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতারা বিবৃতি দেয়। কে কার আগে বিবৃতি দিয়ে সরকারের নজরে পড়বেন তার যেন প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বুঝতে পারেন সরকারের ওই সর্বজনীন পেনশন স্কিমে তারাও পড়ছেন। তখন তারা আবার ওই সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে তাদের বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। কয়দিন আগেই যে কাজের প্রশংসা করা হলো কয়দিন পরেই তার সমালোচনা ও বাতিলের দাবিতে আন্দোলন কতটা গ্রহণযোগ্য?
তাদের এই দ্বিচারিতা জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে হয় না। আর জনপরিসরে গ্রহণযোগ্য নাহলে ওই আন্দোলন জমে না। দাবি বাস্তবায়িত হয় না ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে।
দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে সরকার অষ্টম পে-স্কেলের মাধ্যমে শিক্ষকদের সুপারগ্রেড থেকে বঞ্চিত করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ তথা ৯ বছর পর হঠাৎ শিক্ষক নেতাদের পুরনো ইস্যুর বিষয়ে কেন ঘুম ভাঙলো? এই নয় বছর তারা কি কোমায় ছিলেন?
অন্যদিকে স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি শিক্ষকরা যুগ যুগান্তর ধরে করে আসছেন। কিন্তু কোনও সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। বিচারবিভাগ তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি বাস্তবায়ন করতে পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেন পারছেন না? উত্তর খুব সহজ। ওই দাবি বাস্তবায়ন করার মতো কোনও শিক্ষক নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ‘তেলাপোকার মেরুদণ্ড নিয়ে সিংহের মতো’ গর্জন করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি সফল হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক কার্যক্রম দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করতে হবে। কিন্তু শিক্ষক নেতারা কি অমন কঠোর ও নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলন করতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে ‘না।’ তারা আন্দোলন করতে চান ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার বিরাগভাজন না-হয়। তারা যখনই বুঝতে পারবেন তাদের আন্দোলনের কারণে তারা সরকারের বিরাগভাজন হচ্ছেন পরের দিন থেকেই তাদের আর আন্দোলনের মাঠ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন নেতা দিয়ে আর যাইহোক দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক আন্দোলনেও শিক্ষকদের দ্বিচারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায়, কর্মবিরতি ডাক দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক অনলাইনে ক্লাস নিয়েছেন। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র আন্দোলন দিয়ে আর যাইহোক শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পাওয়ার চিন্তা না করাই ভালো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকরা শেষপর্যন্ত নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘ছায়া বাজীর পুতুল’ হয়ে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবেন কিনা তা একান্ত তাদের বিষয়। কিন্তু অতীত ইতিহাসের আলোকে বলা যায় যে, অর্থের অধিকার প্রাপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন শেষ পর্যন্ত অন্য আন্দোলনের মতোই অর্থহীন আন্দোলনের পরিণতি বরণ করবে। দাবি আদায়ের আন্দোলনের চেহারা ও মেজাজ-মর্জি আলাদা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনে তার কোনও ছাপ নেই। তাই এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ শিক্ষকদের জন্য দাবি আদায় করা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন জাগে মনে!
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

আমানতের অর্থ লুটে খাচ্ছে ব্যাংক : পিআরআই

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অর্থহীন আন্দোলন

আপডেট সময় : ১০:২৭:৩৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ জুন ২০২৪

মো. আবুসালেহ সেকেন্দার : অষ্টম পে-স্কেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবমূল্যায়ণ করা হয়। আমলাতন্ত্রের প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বেতনের ধাপ সুকৌশলে কমিয়ে দেওয়া হয়। ৭ম পে-স্কেল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর প্রধান, সচিব ও পুলিশ প্রধানসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের সমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা বেতন পেতেন। কিন্তু অষ্টম পে-স্কেলে বেতনের পূর্ববর্তীধাপগুলো ঠিক রেখে আমলাতন্ত্র সুকৌশলে সুপিরিয়র একটি ধাপ সৃষ্টি করে। সিনিয়র সচিব পদ সৃষ্টি করে সচিবসহ অন্যান্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের তুলনায় তাদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে নেন। এতদিন সচিবসহ অন্যরা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের সমান বেতন পেলেও তাদের এই নতুন পদ সৃষ্টির ফলে তাদের বেতন বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাপকদের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
উপর্যুক্ত বিষয়টি নিয়ে সারাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলন করেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায়ও বিষয়টি আলোচনার পর আন্দোলনের অংশ হিসেবে ভর্তি পরীক্ষা বর্জনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় সাধারণ শিক্ষকদের নেওয়া ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তো দূরের কথা একরাতও বলবৎ রাখা যায়নি। একজন আন্দোলনকারী শিক্ষক ও প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দেখেছি, রাতের মধ্যে তৎকালীন উপাচার্য কিছু শিক্ষকদের কীভাবে ম্যানেজ করেন। জুনিয়র কয়েকজন শিক্ষককে মাসিক কিছু বর্ধিত অর্থ চুক্তিতে সহকারী প্রক্টর নিয়োগের প্রলোভন ও সিনিয়র কয়েকজন শিক্ষককে সিন্ডিকেট মেম্বারসহ বিভিন্ন পদ-পদবী দেওয়ার প্রলোভন দেখায়।
তৎকালীন উপাচার্যের ওই প্রলোভন ফর্মুলায় কাজ হয়। মাসিক বর্ধিত অর্থ (ভাতা) ও পদ-পদবী প্রাপ্তির আশায় শিক্ষকদের অনেকে বিক্রি হয়ে যায় এবং তারা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সদস্যদের অনেকটা অপ্রকাশ্য ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে। তৎকালীন শিক্ষক সমিতির সাধারণ সভায় গৃহীত সাধারণ শিক্ষকদের ওই সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত যদি শেষপর্যন্ত বাস্তবায়ন করা যেত তাহলে আজকে শিক্ষকদের নতুন করে আন্দোলন করার প্রয়োজন হতো না। শিক্ষকরা তাদের মর্যাদা, সম্মান ও সম্মানী ফেরত পেতেন। শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নয় সারা বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা তাদের অধিকার ফিরে পেতেন। কিন্তু গুটিকয়েকজনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওই আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়ে এবং শিক্ষকরা তাদের সম্মান ও সম্মানী হারায় যা আজও ফেরত পায়নি।
ওইদিন তৎকালীন উপাচার্যের “মাইম্যান” হিসেবে যারা কাজ করে। কিছু অর্থপ্রাপ্তি ও পদ প্রাপ্তির লোভে নিজের ও নিজের স্বজাতির সম্মান ও সম্মানীর দাবি ধুলোয় মিশিয়ে দেয়, তাদের কেউ কেউ আজ শিক্ষক সমিতির নেতা। মজার বিষয় হচ্ছে, এখন তারাই আবার একই দাবিতে আন্দোলন করছে।

জনপ্রিয় সাহিত্যিক কবি শামসুর রহমান একদা তার ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতায় লিখেছিলেন “উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,/ হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।” তার ওই অমর কবিতা আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সত্য হয়ে উঠেছে। যারা একসময় উপাচার্যের ‘লাঠিয়াল’ হয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন দমন করেছে তারা আজ শিক্ষকদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করছে। কী অদ্ভুত এই দেশ! কী অদ্ভুত এই সব শিক্ষক নেতা! কিন্তু শেষপর্যন্ত এই আন্দোলন যে সফল হবে এবং নেতারা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলনের ইতিহাস বলে কিছু আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও পদ-পদবীর প্রস্তাব পেলে সাধারণত কিছু শিক্ষক নেতারা নানা যুক্তি দেখিয়ে আন্দোলন থেকে সরে পড়েন। তখন তাদের কাছে যুক্তির অভাব হয় না। তখন সাধারণ শিক্ষকরা বেকাদায় পড়েন। ফলে তাদেরকে শিক্ষক নেতারা যা বলেন তাই শেষপর্যন্ত মেনে নিতে হয়। এ যেন পুতুল খেলা!
চলমান শিক্ষকদের তিন দাবিতে (ক. অর্থমন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পেনশন সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহার, প্রতিশ্রুত সুপার গ্রেডে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি এবং শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতনস্কেল প্রবর্তন এর বিষয়ে) যে আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা করছেন তার কোনও ভবিষ্যৎ আছে বলে আমার কাছে মনে হয় না।
প্রথমত, সরকার যখন সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করে তখন সরকারের ওই কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেতারা বিবৃতি দেয়। কে কার আগে বিবৃতি দিয়ে সরকারের নজরে পড়বেন তার যেন প্রতিযোগিতা চলে। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তারা বুঝতে পারেন সরকারের ওই সর্বজনীন পেনশন স্কিমে তারাও পড়ছেন। তখন তারা আবার ওই সর্বজনীন পেনশন স্কিম থেকে তাদের বাদ দেওয়ার দাবি তোলে। কয়দিন আগেই যে কাজের প্রশংসা করা হলো কয়দিন পরেই তার সমালোচনা ও বাতিলের দাবিতে আন্দোলন কতটা গ্রহণযোগ্য?
তাদের এই দ্বিচারিতা জনপরিসরে গ্রহণযোগ্যতা পাবে বলে মনে হয় না। আর জনপরিসরে গ্রহণযোগ্য নাহলে ওই আন্দোলন জমে না। দাবি বাস্তবায়িত হয় না ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে।
দ্বিতীয়ত, ২০১৫ সালে সরকার অষ্টম পে-স্কেলের মাধ্যমে শিক্ষকদের সুপারগ্রেড থেকে বঞ্চিত করেছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ তথা ৯ বছর পর হঠাৎ শিক্ষক নেতাদের পুরনো ইস্যুর বিষয়ে কেন ঘুম ভাঙলো? এই নয় বছর তারা কি কোমায় ছিলেন?
অন্যদিকে স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি শিক্ষকরা যুগ যুগান্তর ধরে করে আসছেন। কিন্তু কোনও সরকারই তা বাস্তবায়ন করেনি। বিচারবিভাগ তাদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেলের দাবি বাস্তবায়ন করতে পারলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কেন পারছেন না? উত্তর খুব সহজ। ওই দাবি বাস্তবায়ন করার মতো কোনও শিক্ষক নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। ‘তেলাপোকার মেরুদণ্ড নিয়ে সিংহের মতো’ গর্জন করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের দাবি সফল হতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক কার্যক্রম দাবি বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বন্ধ করতে হবে। কিন্তু শিক্ষক নেতারা কি অমন কঠোর ও নিরবিচ্ছিন্ন আন্দোলন করতে পারবেন? উত্তর হচ্ছে ‘না।’ তারা আন্দোলন করতে চান ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার বিরাগভাজন না-হয়। তারা যখনই বুঝতে পারবেন তাদের আন্দোলনের কারণে তারা সরকারের বিরাগভাজন হচ্ছেন পরের দিন থেকেই তাদের আর আন্দোলনের মাঠ খুঁজে পাওয়া যাবে না। এমন নেতা দিয়ে আর যাইহোক দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন সম্ভব নয়।
সাম্প্রতিক আন্দোলনেও শিক্ষকদের দ্বিচারিতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গণমাধ্যমের সংবাদ থেকে জানা যায়, কর্মবিরতি ডাক দিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক অনলাইনে ক্লাস নিয়েছেন। ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র আন্দোলন দিয়ে আর যাইহোক শিক্ষকদের স্বতন্ত্র বেতন স্কেল পাওয়ার চিন্তা না করাই ভালো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকরা শেষপর্যন্ত নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে ‘ছায়া বাজীর পুতুল’ হয়ে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবেন কিনা তা একান্ত তাদের বিষয়। কিন্তু অতীত ইতিহাসের আলোকে বলা যায় যে, অর্থের অধিকার প্রাপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চলমান আন্দোলন শেষ পর্যন্ত অন্য আন্দোলনের মতোই অর্থহীন আন্দোলনের পরিণতি বরণ করবে। দাবি আদায়ের আন্দোলনের চেহারা ও মেজাজ-মর্জি আলাদা থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের চলমান আন্দোলনে তার কোনও ছাপ নেই। তাই এই আন্দোলনের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ শিক্ষকদের জন্য দাবি আদায় করা যাবে কিনা সেই প্রশ্ন জাগে মনে!
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়