ঢাকা ১০:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ কেন এই প্রতিকূলতায়?

  • আপডেট সময় : ১০:২৭:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ জুলাই ২০২৪
  • ৪৫ বার পড়া হয়েছে

আনিসুর রহমান : ১৯২১ সালের আজকের এই দিনে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতবছরের অধিক এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে তিনটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়। সাক্ষী হয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার। অবদান রেখেছে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে। এখনো এটি সময়ের কেন্দ্রীয় মনোযোগের একটি বিষয় হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায়ই ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে থাকি আমরা। ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একাদশ শতকের শেষের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রতীচ্যের অক্সফোর্ড। তার আট শতকের অধিক সময় পরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন আমাদের বঙ্গমুল্লুকের ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো পূর্ব বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সূত্র ধরে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হলেও এর ধরন, ধাঁচ এবং উন্নয়ন কাঠামোয় অক্সফোর্ডের আদল অনুসরণের একটা ব্যাপার ছিল শুরুর দিকে।
এরপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও টেকেনি। টিকে থাকতে পারেনি এর পরের গোঁজামিলের পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোও। অভ্যুদয় হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী থেকে হয়েছে স্বাধীন দেশের রাজধানী। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত না গেলেও, এখন তা ক্ষীণকায় হতে হতে চারটি রাজ্যে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের ছোট জনপদে অবস্থিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের সাম্রাজ্যে সূর্য এখনও অস্ত যায়নি। এর বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সময় নেতিবাচক ঘটনার কারণে খবরের শিরোনাম হয়। প্রতিষ্ঠানটি মান নির্ধারক আন্তর্জাতিক সূচকের প্রায় বাইরেই থাকে আর অক্সফোর্ড প্রায়ই এই সূচকে থাকে শীর্ষে। এমনকি ২০২৩ সালে টাইমস উচ্চশিক্ষার বিশ্বসূচকেও প্রথম হয়েছে অক্সফোর্ড, যেখানে দ্বিতীয় হয়েছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী ২৭ হাজার আর শিক্ষকের সংখ্যা ৭ হাজারের মতো। এর বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৪৬ হাজার এবং শিক্ষকের সংখ্যা ২২ শতাধিক। এই চিত্র থেকে সাধারণ বিবেচনাশক্তি দিয়ে বুঝে নিতে পারি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কেন বিশ্বসূচকে জায়গা করে নিতে পারে না। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলনামূলক এই উপাত্ত অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও আমরা কেবল হা-হুতাশ করি। আমাদের সমাজ, রাজনীতি আর প্রশাসনের কোন বিষয়টি বিশ্বসূচকের কোন জায়গায় আছে ওই বিষয়টি কি কেউ দেখিয়ে দিতে পারবেন? চতুর্দিকে গলদের বাড়বাড়ন্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর বাইরে থাকবে কোন শক্তিতে?
আমাদের দেশে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত ত্রিশের অধিক এবং ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে দেড়শতের মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মাতৃপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রেখেই। দিনকয়েক ধরে দেশের জনগণের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সর্বজনীন অবসর ভাতা কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, নতুন অবসর ভাতা নীতি পূর্বে কিন্তু এরকমটাই ছিল। নতুন নীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়। এর বিপরীতে দেশের আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসনযন্ত্রের সকলে সর্বজনীন অবসর ভাতার আওতার ভেতরে ঠিকই থাকছেন।
সাধারণ যুক্তিতে এরকম নীতিমালা আদতে বিধি-বিধান পরিপন্থী। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার প্রতি প্রচ্ছন্ন শত্রুতা প্রদর্শনও বটে। স্বাধীনতার ছয় দশকে এসে এমন তো হবার কথা ছিল না। বিষয়টি অনেক দূর গড়াবার আগেই নীতিনির্ধারকরা নড়েচড়ে বসলে দেশের উচ্চশিক্ষার ওপর থেকে অমঙ্গলের আছর দূর হতে পারে।
এখানেই শেষ নয়, হাল-আমলের রাষ্ট্রাচার মর্যাদা আর অন্যবিধ সুযোগসুবিধাতেও শিক্ষকদের গুরুত্বকে হেয় করা হয়েছে নানা কৌশলে। অথচ একসময় মর্যাদার দিক থেকে একজন পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক একজন পূর্ণাঙ্গ সচিবের সমান বিবেচনা করা হতো। দুনিয়ায় কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এমনটাই রেওয়াজ। আমরা তো কোম্পানি আমলে প্রবেশ করিনি, তাহলে সবকিছু ভেঙেচুরে আমলাতন্ত্র একটার পর একটা গুবলেট অবস্থা সৃষ্টি করতে থাকবে কেন? লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়।
প্রসঙ্গক্রমে একটা বিষয় নজরে আনতে চাই। সর্বজনীন অবসর ভাতার আওতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে আসা যৌক্তিক দাবি। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য যেসব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন দোকানদারি কোর্স চালু রয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। একদিকে দোকানদারি কোর্স চালাবেন অন্যদিকে সর্বজনীন অবসর ভাতার জন্যে আন্দোলন করবেন, তা যেমন ভালো দেখায় না, তেমনি শিক্ষকদের আন্দোলনকে ন্যায্যতাও দেয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্যে দেশ, সমাজ এবং প্রশাসনযন্ত্রের সংশ্লিষ্ট সকলের করণীয় রয়েছে। ঠিক তেমনি শিক্ষকদের নিজেদের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের দায় নিজেদের ওপরও কিছুটা বর্তায়। খেয়াল করে দেখেছি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়ে যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদের জন্যে লালায়িত থাকেন, কিংবা পেয়ে গদগদ হন এখনকার শিক্ষকেরা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তা বা সচিব তার মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপকের সঙ্গে নিজের অধস্তন হিসেবেই রাষ্ট্রাচার দেখান। এক্ষেত্রে দোষটা কাকে দেবেন? অন্যদিকে ফাঁকিঝুঁকির প্রকাশনা এবং দায়সারা গবেষণা, ডক্টরেট দেখিয়ে অধ্যাপক হয়ে যান দ্রুত। তাদের মান এবং যোগ্যতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন তোলা যায়। এক্ষেত্রে প্রতীচ্যের অক্সফোর্ডের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যাবে ওখানকার একজন ‘অধ্যাপক’ আর এখানকার ‘অধ্যাপক’ যোগ্যতা আর প্রাজ্ঞতার নিরিখে সমান্তরাল কিনা? অথচ দেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক শিক্ষাবিদ আব্দুর রাজ্জাক, সরদার ফজলুল করিম, রাজিয়া খান আমিন, কাশীনাথ রায়ের মতো শিক্ষকরা সারাজীবনে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে দুটি উদাহরণ দিতে চাই। কোনো বিষয়ে পরামর্শের দরকার হলে এমন ঘটনাও ঘটেছে স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের দফতরে চলে আসতেন। অন্যদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারুকলার সামনে দিয়ে যাবার সময় গাড়ি থেকে নেমে এসে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে দেখা করতেন।
এর আগে উল্লেখ করেছি তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও কাঠামোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শতবছর পার করেছে। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশ কাঠামো, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানি এবং ১৯৭১ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রধারণায়। মোটাদাগে প্রথম ধাপটিই ছিল এই প্রতিষ্ঠানটির জন্যে দুর্দান্ত উদ্দীপনার কাল। ইউরোপ আর ভারতবর্ষের নানা শিক্ষাবিদ, পণ্ডিত আর গবেষকদের মেলবন্ধনে এ এক সোনালি উত্থান ছিল। এই উত্থানপর্বের রমরমা অবস্থা তুলে ধরার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক ঋত্বিক ঘটকের বাবা সুরেশ ঘটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করতেন। উনি ওই সময় ঢাকার জেলা মুনসেফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯২৫ সালে ঋত্বিক ঘটক আর তার যমজ বোন প্রতীতি দেবীর জন্মের তিন মাস পরে সুরেশ ঘটক মেদিনীপুরে বদলি হন। তাদের পরিবার একপর্যায়ে রাজশাহীতে স্থিত হন। ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধূ প্রতীতি দেবী এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, তার বাবা সুরেশ ঘটক ছিলেন তুখোড় মেধাবী, জীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি, আটটি ভাষায় স্নাতকোত্তর করেছিলেন, উচ্চপদস্থ চাকুরে হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্যে সময় বের করতেন। তার ছেলেমেয়েরা সুরেশ ঘটকের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রশংসা শুনেছেন। সুরেশ ঘটক বলতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপ আর ভারতবর্ষের পণ্ডিত ও মেধাবী শিক্ষাবিদদের পদচারণায় ব্রিটিশপর্বে এই প্রতিষ্ঠান আলোকসঞ্চারী ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তান পর্বে এই প্রতিষ্ঠান বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, আত্মপরিচয় বিনির্মাণ সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা রাখে। বাঙালি জাতির দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রীয় অবস্থানে থেকে অবদান রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর একটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের প্রতিটি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পর্যায় ছিল শাসনযন্ত্রের অনুকূল অবস্থানে প্রতিষ্ঠানটির উত্থানপর্ব। আর দ্বিতীয় পর্ব ছিল অনেকটা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী ভূমিকা পালন। দুনিয়ার বুকে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে না যা একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষা আর রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে এত বড় ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এই ভূমিকার সঙ্গে জ্ঞানচর্চার বিষয়টিও অবারিত এবং বিশ্বমানের ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মেরুদণ্ডে আঘাত করা হয় ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। একদিনেই বিশজনের অধিক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদকে হত্যা করা হয়। একদিনে এত বড় সংখ্যায় বেছে বেছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হত্যার উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। স্বাধীনতার ছয় দশকে এসেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্ষতির ধাক্কা সামাল দিতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে বড় সঙ্কট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় এবং চলমান পর্যায় হচ্ছে বাংলাদেশ পর্ব। ১৯৭৩ সালে স্বায়ত্বশাসন পেল ঠিক, তবে সব ওলটপালট হয়ে গেল ১৯৭৫ সালে এসে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। ওই রাজনৈতিক ওলটপালটের মাশুল প্রাচ্যের অক্সফোর্ডকে দিতে হচ্ছে আজও। রাজনীতি ও প্রশাসনে গলদ থাকলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় তা থেকে মুক্ত থাকবে— এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই।
দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে সুপারিশ ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্বশাসন দিলেন। তার আগে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের সদস্য আনিসুজ্জামান সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে স্বায়ত্বশাসনের তাৎপর্য তুলে ধরেছিলেন, “প্রত্যেককে স্বায়ত্বশাসনকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে, শিক্ষকদের, ছাত্রদের, অভিভাবকদের। এর পর যদি নিজেদের সমস্যা না মিটাতে পারি বা বিভিন্ন মহলের হুমকি যদি সহ্য করার ক্ষমতা না থাকে তবে স্বায়ত্বশাসনের বিশেষ অর্থ থাকবে না।”
৫২ বছর আগের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আজকে মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারব প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের সামনে প্রতিকূলতা কত ব্যাপক। রাজনৈতিক সদিচ্ছায় গলদ থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষমতা নেই ছাত্রসংসদের নির্বাচন দেবার। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিনেট পরিচালিত হয় ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই।
গবেষণা আর জ্ঞানচর্চার গলদ এবং বাধাগুলোও প্রকট। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট তরফ থেকে তহবিল ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নিজস্ব তহবিলের ওপর জোর দেবার কথা বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সতর্ক করে বলতে চাই, নিজস্ব তহবিলের ধাক্কা কোনোক্রমেই যেন শিক্ষার্থীদের ঘাড়ের ওপর এসে না পড়ে। অন্যান্য দেশের কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব তহবিলের বড় জোগান বিশেষ করে গবেষণা বরাদ্দ আসে নানা মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক তহবিল, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অনুদান ও বরাদ্দ থেকে। ওই নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে নিজস্ব লোকবল এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরামর্শক সমন্বয়ে তহবিল জোগানোর জন্যে একটি দফতর চালু করতে পারে। দুনিয়ার প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এরকম কাঠামো আছে। গবেষণা এবং পাঠদানের স্বার্থে একজন শিক্ষক এবং গবেষককে প্রশাসনিক এই ঝক্কি থেকে মুক্ত রাখা জরুরি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা কোন ধারায় হবে, নতুন জ্ঞানের চাহিদা কেমন হবে এবং তা কীভাবে প্রায়োগিক স্তরে কাজে খাটানো হবে তার রূপরেখা সরকারকে প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ওই মোতাবেক কাজে খাটাতে হবে এবং চাহিদা মোতাবেক তহবিলের সরবরাহ করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্ভাবন এবং গবেষণা বরাদ্দ থাকতে হবে। গবেষণা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা হওয়া সঙ্গত নয়। এই পর্যায়ে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রধান কুদরাত-এ-খুদা’র একটি আক্ষেপের কথা উল্লেখ করতে চাই।

১৯৭২ সালে তিনি সংবাদমাধ্যমে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন নামে একটা সংস্থা আছে যাদের কাজ হলো দেশের কলকারখানাগুলোর উৎপাদন, উৎকর্ষ বৃদ্ধি বা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তা সমাধান করার জন্য গবেষণা চালান। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের শিল্পপতিরা এদের তেমন গুরুত্ব দেন না।” স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এসে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে কি? তা হলে তো গবেষণার ফকিরি হাল দেখতে হতো না।
কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আমাদের উচ্চশিক্ষার সামনে সামগ্রিক গলদ দূর করার জন্যে পশ্চিমের নিরিখে বিশ্বসূচকই শেষ কথা নয়। সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে হবে আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে।
নতুন শিক্ষানীতি অনেকটা কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষানীতির পরিবর্তিত সংস্করণ। এর অষ্টম অধ্যায়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ঢুকিয়ে ধাপে ধাপে উচ্চশিক্ষার সামনে পর্বতসমান সঙ্কট দূর করার জন্যে করণীয় ঠিক করা যেতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে সঙ্গে নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকায় একটি একটা সিম্পোজিয়াম আয়োজন করতে পারে। এই সিম্পোজিয়াম থেকে প্রাপ্ত পরামর্শ এবং উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গলদগুলো দূর করা যেতে পারে।
আমরা অনেকেই জেনে থাকব। ক্ষমতা, গবেষণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র তুলে ধরার জন্যে আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’ নাম একটা উপন্যাস রয়েছে। উপন্যাসের বর্ণিত চিত্রের সঙ্গে বর্তমান চিত্রের তুলনা করার একটা সুযোগ নীতিনির্ধারকগণ নিতে পারেন।
‘ডক্টর’ বেনজীর আহমেদ পিএইচডি নিয়েছেন ২০১৯ সালে। এই ‘পিএচডি’ কাণ্ডের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কর্তাদের দুই-একজনের আরও আরও কেলেঙ্কারি ছিল। এসবের পেছনে থাকা দুই-একজনকে ইঙ্গিত করে পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক লেখা তারা মামলার হুমকি অথবা অন্য প্রভাব খাটিয়ে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছিলেন। তাতে কী? গলদ কিন্তু শেষপর্যন্ত ঢেকে রাখা গেল না। বেনজীরকাণ্ডে ডক্টরেট কেলেঙ্কারি ঠিকই বেরিয়ে এল। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যারা বিশ্বসূচক নির্ধারণ করেন তারা কিন্তু এরকম ডক্টরেটকাণ্ডের খবরও আর্কাইভে রাখেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃত শব্দপদবাচ্য ‘যত্র বিশ্বং ভবেত্যকনীড়ম’কে ভিত্তি করে প্রাচীন তপোবন বিদ্যালয়ের আলোকে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ঠিক করেছিলেন, ডযবৎব ঃযব ড়িৎষফ সধশবং ধ যড়সব রহ ধ ংরহমষব হবংঃ; যেখানে বিশ্ব একটি কুটিরে ঠিকানা পায়। কেবল পশ্চিমা ধ্যানধারণা নয় কার্যত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও এমনটা হওয়া চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার গৌরবের জায়গায় দেখতে চাইলে সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। এতে করে একজন যান, আরেকজন আসেন। তাতে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো এবং প্রশাসনযন্ত্র একটা নিয়ামকের ভূমিকায় থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন কেবল একটা লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

 

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

আমানতের অর্থ লুটে খাচ্ছে ব্যাংক : পিআরআই

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ কেন এই প্রতিকূলতায়?

আপডেট সময় : ১০:২৭:৪২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১ জুলাই ২০২৪

আনিসুর রহমান : ১৯২১ সালের আজকের এই দিনে দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতবছরের অধিক এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি পেয়েছে তিনটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়। সাক্ষী হয়েছে নানা ঐতিহাসিক ঘটনার। অবদান রেখেছে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে। এখনো এটি সময়ের কেন্দ্রীয় মনোযোগের একটি বিষয় হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায়ই ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলে থাকি আমরা। ইংল্যান্ডের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে একাদশ শতকের শেষের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল প্রতীচ্যের অক্সফোর্ড। তার আট শতকের অধিক সময় পরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন আমাদের বঙ্গমুল্লুকের ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো পূর্ব বাংলার প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়। ওই সূত্র ধরে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হলেও এর ধরন, ধাঁচ এবং উন্নয়ন কাঠামোয় অক্সফোর্ডের আদল অনুসরণের একটা ব্যাপার ছিল শুরুর দিকে।
এরপর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও টেকেনি। টিকে থাকতে পারেনি এর পরের গোঁজামিলের পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোও। অভ্যুদয় হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের। ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানী থেকে হয়েছে স্বাধীন দেশের রাজধানী। একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত না গেলেও, এখন তা ক্ষীণকায় হতে হতে চারটি রাজ্যে এসে ঠেকেছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের ছোট জনপদে অবস্থিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের সাম্রাজ্যে সূর্য এখনও অস্ত যায়নি। এর বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সময় নেতিবাচক ঘটনার কারণে খবরের শিরোনাম হয়। প্রতিষ্ঠানটি মান নির্ধারক আন্তর্জাতিক সূচকের প্রায় বাইরেই থাকে আর অক্সফোর্ড প্রায়ই এই সূচকে থাকে শীর্ষে। এমনকি ২০২৩ সালে টাইমস উচ্চশিক্ষার বিশ্বসূচকেও প্রথম হয়েছে অক্সফোর্ড, যেখানে দ্বিতীয় হয়েছে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী ২৭ হাজার আর শিক্ষকের সংখ্যা ৭ হাজারের মতো। এর বিপরীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৪৬ হাজার এবং শিক্ষকের সংখ্যা ২২ শতাধিক। এই চিত্র থেকে সাধারণ বিবেচনাশক্তি দিয়ে বুঝে নিতে পারি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় কেন বিশ্বসূচকে জায়গা করে নিতে পারে না। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে তুলনামূলক এই উপাত্ত অজানা থাকার কথা নয়। তারপরও আমরা কেবল হা-হুতাশ করি। আমাদের সমাজ, রাজনীতি আর প্রশাসনের কোন বিষয়টি বিশ্বসূচকের কোন জায়গায় আছে ওই বিষয়টি কি কেউ দেখিয়ে দিতে পারবেন? চতুর্দিকে গলদের বাড়বাড়ন্তে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এর বাইরে থাকবে কোন শক্তিতে?
আমাদের দেশে জনগণের করের টাকায় পরিচালিত ত্রিশের অধিক এবং ব্যক্তিমালিকানায় পরিচালিত প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে দেড়শতের মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে মাতৃপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ধরে রেখেই। দিনকয়েক ধরে দেশের জনগণের টাকায় পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সর্বজনীন অবসর ভাতা কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, নতুন অবসর ভাতা নীতি পূর্বে কিন্তু এরকমটাই ছিল। নতুন নীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এর আওতার বাইরে রাখা হয়। এর বিপরীতে দেশের আমলাতন্ত্র এবং প্রশাসনযন্ত্রের সকলে সর্বজনীন অবসর ভাতার আওতার ভেতরে ঠিকই থাকছেন।
সাধারণ যুক্তিতে এরকম নীতিমালা আদতে বিধি-বিধান পরিপন্থী। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার প্রতি প্রচ্ছন্ন শত্রুতা প্রদর্শনও বটে। স্বাধীনতার ছয় দশকে এসে এমন তো হবার কথা ছিল না। বিষয়টি অনেক দূর গড়াবার আগেই নীতিনির্ধারকরা নড়েচড়ে বসলে দেশের উচ্চশিক্ষার ওপর থেকে অমঙ্গলের আছর দূর হতে পারে।
এখানেই শেষ নয়, হাল-আমলের রাষ্ট্রাচার মর্যাদা আর অন্যবিধ সুযোগসুবিধাতেও শিক্ষকদের গুরুত্বকে হেয় করা হয়েছে নানা কৌশলে। অথচ একসময় মর্যাদার দিক থেকে একজন পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক একজন পূর্ণাঙ্গ সচিবের সমান বিবেচনা করা হতো। দুনিয়ায় কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে এমনটাই রেওয়াজ। আমরা তো কোম্পানি আমলে প্রবেশ করিনি, তাহলে সবকিছু ভেঙেচুরে আমলাতন্ত্র একটার পর একটা গুবলেট অবস্থা সৃষ্টি করতে থাকবে কেন? লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়।
প্রসঙ্গক্রমে একটা বিষয় নজরে আনতে চাই। সর্বজনীন অবসর ভাতার আওতার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ে আসা যৌক্তিক দাবি। একই সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য যেসব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সান্ধ্যকালীন দোকানদারি কোর্স চালু রয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার। একদিকে দোকানদারি কোর্স চালাবেন অন্যদিকে সর্বজনীন অবসর ভাতার জন্যে আন্দোলন করবেন, তা যেমন ভালো দেখায় না, তেমনি শিক্ষকদের আন্দোলনকে ন্যায্যতাও দেয় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের জন্যে দেশ, সমাজ এবং প্রশাসনযন্ত্রের সংশ্লিষ্ট সকলের করণীয় রয়েছে। ঠিক তেমনি শিক্ষকদের নিজেদের আত্মমর্যাদা পুনরুদ্ধারের দায় নিজেদের ওপরও কিছুটা বর্তায়। খেয়াল করে দেখেছি পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক হয়ে যুগ্মসচিব বা অতিরিক্ত সচিব মর্যাদার কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পদের জন্যে লালায়িত থাকেন, কিংবা পেয়ে গদগদ হন এখনকার শিক্ষকেরা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তা বা সচিব তার মন্ত্রণালয়ে প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপকের সঙ্গে নিজের অধস্তন হিসেবেই রাষ্ট্রাচার দেখান। এক্ষেত্রে দোষটা কাকে দেবেন? অন্যদিকে ফাঁকিঝুঁকির প্রকাশনা এবং দায়সারা গবেষণা, ডক্টরেট দেখিয়ে অধ্যাপক হয়ে যান দ্রুত। তাদের মান এবং যোগ্যতা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন তোলা যায়। এক্ষেত্রে প্রতীচ্যের অক্সফোর্ডের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই টের পাওয়া যাবে ওখানকার একজন ‘অধ্যাপক’ আর এখানকার ‘অধ্যাপক’ যোগ্যতা আর প্রাজ্ঞতার নিরিখে সমান্তরাল কিনা? অথচ দেশের প্রথম জাতীয় অধ্যাপক শিক্ষাবিদ আব্দুর রাজ্জাক, সরদার ফজলুল করিম, রাজিয়া খান আমিন, কাশীনাথ রায়ের মতো শিক্ষকরা সারাজীবনে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পাননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মর্যাদার দিকে ইঙ্গিত করে দুটি উদাহরণ দিতে চাই। কোনো বিষয়ে পরামর্শের দরকার হলে এমন ঘটনাও ঘটেছে স্বাধীন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের দফতরে চলে আসতেন। অন্যদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চারুকলার সামনে দিয়ে যাবার সময় গাড়ি থেকে নেমে এসে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে দেখা করতেন।
এর আগে উল্লেখ করেছি তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও কাঠামোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার শতবছর পার করেছে। ১৯২১ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত ব্রিটিশ কাঠামো, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পাকিস্তানি এবং ১৯৭১ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রধারণায়। মোটাদাগে প্রথম ধাপটিই ছিল এই প্রতিষ্ঠানটির জন্যে দুর্দান্ত উদ্দীপনার কাল। ইউরোপ আর ভারতবর্ষের নানা শিক্ষাবিদ, পণ্ডিত আর গবেষকদের মেলবন্ধনে এ এক সোনালি উত্থান ছিল। এই উত্থানপর্বের রমরমা অবস্থা তুলে ধরার জন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করতে চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে চলচ্চিত্র পরিচালক ও লেখক ঋত্বিক ঘটকের বাবা সুরেশ ঘটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করতেন। উনি ওই সময় ঢাকার জেলা মুনসেফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯২৫ সালে ঋত্বিক ঘটক আর তার যমজ বোন প্রতীতি দেবীর জন্মের তিন মাস পরে সুরেশ ঘটক মেদিনীপুরে বদলি হন। তাদের পরিবার একপর্যায়ে রাজশাহীতে স্থিত হন। ঋত্বিক ঘটকের যমজ বোন এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্রবধূ প্রতীতি দেবী এক স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেছেন, তার বাবা সুরেশ ঘটক ছিলেন তুখোড় মেধাবী, জীবনে কখনো দ্বিতীয় হননি, আটটি ভাষায় স্নাতকোত্তর করেছিলেন, উচ্চপদস্থ চাকুরে হয়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর জন্যে সময় বের করতেন। তার ছেলেমেয়েরা সুরেশ ঘটকের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক প্রশংসা শুনেছেন। সুরেশ ঘটক বলতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি বিশ্ববিদ্যালয়। ইউরোপ আর ভারতবর্ষের পণ্ডিত ও মেধাবী শিক্ষাবিদদের পদচারণায় ব্রিটিশপর্বে এই প্রতিষ্ঠান আলোকসঞ্চারী ভূমিকা রাখে।
পাকিস্তান পর্বে এই প্রতিষ্ঠান বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, আত্মপরিচয় বিনির্মাণ সর্বোপরি স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি ভূমিকা রাখে। বাঙালি জাতির দুটো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রীয় অবস্থানে থেকে অবদান রেখেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর একটি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের প্রতিটি আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনস্বীকার্য ভূমিকা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পর্যায় ছিল শাসনযন্ত্রের অনুকূল অবস্থানে প্রতিষ্ঠানটির উত্থানপর্ব। আর দ্বিতীয় পর্ব ছিল অনেকটা রাষ্ট্রযন্ত্রের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে বিদ্রোহী ভূমিকা পালন। দুনিয়ার বুকে আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে না যা একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষা আর রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে এত বড় ভূমিকা রেখেছে। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক এই ভূমিকার সঙ্গে জ্ঞানচর্চার বিষয়টিও অবারিত এবং বিশ্বমানের ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মেরুদণ্ডে আঘাত করা হয় ১৯৭১ সালে ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। একদিনেই বিশজনের অধিক শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদকে হত্যা করা হয়। একদিনে এত বড় সংখ্যায় বেছে বেছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হত্যার উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। স্বাধীনতার ছয় দশকে এসেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্ষতির ধাক্কা সামাল দিতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে বড় সঙ্কট ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় এবং চলমান পর্যায় হচ্ছে বাংলাদেশ পর্ব। ১৯৭৩ সালে স্বায়ত্বশাসন পেল ঠিক, তবে সব ওলটপালট হয়ে গেল ১৯৭৫ সালে এসে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্যে দিয়ে। ওই রাজনৈতিক ওলটপালটের মাশুল প্রাচ্যের অক্সফোর্ডকে দিতে হচ্ছে আজও। রাজনীতি ও প্রশাসনে গলদ থাকলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় তা থেকে মুক্ত থাকবে— এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই।
দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে সুপারিশ ছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্বশাসন দিলেন। তার আগে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের সদস্য আনিসুজ্জামান সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে স্বায়ত্বশাসনের তাৎপর্য তুলে ধরেছিলেন, “প্রত্যেককে স্বায়ত্বশাসনকে শ্রদ্ধার চোখে দেখতে হবে, শিক্ষকদের, ছাত্রদের, অভিভাবকদের। এর পর যদি নিজেদের সমস্যা না মিটাতে পারি বা বিভিন্ন মহলের হুমকি যদি সহ্য করার ক্ষমতা না থাকে তবে স্বায়ত্বশাসনের বিশেষ অর্থ থাকবে না।”
৫২ বছর আগের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আজকে মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারব প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের সামনে প্রতিকূলতা কত ব্যাপক। রাজনৈতিক সদিচ্ছায় গলদ থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ক্ষমতা নেই ছাত্রসংসদের নির্বাচন দেবার। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিনেট পরিচালিত হয় ছাত্র প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই।
গবেষণা আর জ্ঞানচর্চার গলদ এবং বাধাগুলোও প্রকট। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির সংশ্লিষ্ট তরফ থেকে তহবিল ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। নিজস্ব তহবিলের ওপর জোর দেবার কথা বলা হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সতর্ক করে বলতে চাই, নিজস্ব তহবিলের ধাক্কা কোনোক্রমেই যেন শিক্ষার্থীদের ঘাড়ের ওপর এসে না পড়ে। অন্যান্য দেশের কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব তহবিলের বড় জোগান বিশেষ করে গবেষণা বরাদ্দ আসে নানা মন্ত্রণালয়, আন্তর্জাতিক তহবিল, ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত অনুদান ও বরাদ্দ থেকে। ওই নিমিত্তে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে নিজস্ব লোকবল এবং জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরামর্শক সমন্বয়ে তহবিল জোগানোর জন্যে একটি দফতর চালু করতে পারে। দুনিয়ার প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এরকম কাঠামো আছে। গবেষণা এবং পাঠদানের স্বার্থে একজন শিক্ষক এবং গবেষককে প্রশাসনিক এই ঝক্কি থেকে মুক্ত রাখা জরুরি।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা কোন ধারায় হবে, নতুন জ্ঞানের চাহিদা কেমন হবে এবং তা কীভাবে প্রায়োগিক স্তরে কাজে খাটানো হবে তার রূপরেখা সরকারকে প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ওই মোতাবেক কাজে খাটাতে হবে এবং চাহিদা মোতাবেক তহবিলের সরবরাহ করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উদ্ভাবন এবং গবেষণা বরাদ্দ থাকতে হবে। গবেষণা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাথাব্যথা হওয়া সঙ্গত নয়। এই পর্যায়ে দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের প্রধান কুদরাত-এ-খুদা’র একটি আক্ষেপের কথা উল্লেখ করতে চাই।

১৯৭২ সালে তিনি সংবাদমাধ্যমে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “এখানে ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন নামে একটা সংস্থা আছে যাদের কাজ হলো দেশের কলকারখানাগুলোর উৎপাদন, উৎকর্ষ বৃদ্ধি বা কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে তা সমাধান করার জন্য গবেষণা চালান। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের শিল্পপতিরা এদের তেমন গুরুত্ব দেন না।” স্বাধীনতার অর্ধশতক পেরিয়ে এসে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে কি? তা হলে তো গবেষণার ফকিরি হাল দেখতে হতো না।
কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, আমাদের উচ্চশিক্ষার সামনে সামগ্রিক গলদ দূর করার জন্যে পশ্চিমের নিরিখে বিশ্বসূচকই শেষ কথা নয়। সঙ্কট থেকে উত্তরণ করতে হবে আমাদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে।
নতুন শিক্ষানীতি অনেকটা কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষানীতির পরিবর্তিত সংস্করণ। এর অষ্টম অধ্যায়ে উচ্চশিক্ষা নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ঢুকিয়ে ধাপে ধাপে উচ্চশিক্ষার সামনে পর্বতসমান সঙ্কট দূর করার জন্যে করণীয় ঠিক করা যেতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে সঙ্গে নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকায় একটি একটা সিম্পোজিয়াম আয়োজন করতে পারে। এই সিম্পোজিয়াম থেকে প্রাপ্ত পরামর্শ এবং উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার গলদগুলো দূর করা যেতে পারে।
আমরা অনেকেই জেনে থাকব। ক্ষমতা, গবেষণা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্র তুলে ধরার জন্যে আহমদ ছফার ‘গাভী বিত্তান্ত’ নাম একটা উপন্যাস রয়েছে। উপন্যাসের বর্ণিত চিত্রের সঙ্গে বর্তমান চিত্রের তুলনা করার একটা সুযোগ নীতিনির্ধারকগণ নিতে পারেন।
‘ডক্টর’ বেনজীর আহমেদ পিএইচডি নিয়েছেন ২০১৯ সালে। এই ‘পিএচডি’ কাণ্ডের পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কর্তাদের দুই-একজনের আরও আরও কেলেঙ্কারি ছিল। এসবের পেছনে থাকা দুই-একজনকে ইঙ্গিত করে পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক লেখা তারা মামলার হুমকি অথবা অন্য প্রভাব খাটিয়ে সরিয়ে নিতে বাধ্য করেছিলেন। তাতে কী? গলদ কিন্তু শেষপর্যন্ত ঢেকে রাখা গেল না। বেনজীরকাণ্ডে ডক্টরেট কেলেঙ্কারি ঠিকই বেরিয়ে এল। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যারা বিশ্বসূচক নির্ধারণ করেন তারা কিন্তু এরকম ডক্টরেটকাণ্ডের খবরও আর্কাইভে রাখেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সংস্কৃত শব্দপদবাচ্য ‘যত্র বিশ্বং ভবেত্যকনীড়ম’কে ভিত্তি করে প্রাচীন তপোবন বিদ্যালয়ের আলোকে শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য ঠিক করেছিলেন, ডযবৎব ঃযব ড়িৎষফ সধশবং ধ যড়সব রহ ধ ংরহমষব হবংঃ; যেখানে বিশ্ব একটি কুটিরে ঠিকানা পায়। কেবল পশ্চিমা ধ্যানধারণা নয় কার্যত আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও এমনটা হওয়া চাই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে তার গৌরবের জায়গায় দেখতে চাইলে সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিচ্ছিন্নভাবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। এতে করে একজন যান, আরেকজন আসেন। তাতে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো এবং প্রশাসনযন্ত্র একটা নিয়ামকের ভূমিকায় থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্বশাসন কেবল একটা লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।