The Daily Ajker Prottasha

পথের খোলা শরবত যেন গ্লাস ভরা রোগের ডিপো

0 0
Read Time:6 Minute, 42 Second

প্রচ- গরমে জর্জরিত পথচারিদের অনেকেই টাকা বাঁচাতেই হোক আর স্বাদের জন্য এই শরবত গলায় ঢেলে দেন। পান করার সময় নোংরা পরিবেশ স্বাস্থ্যঝুঁকি ইত্যাদি মনে আসলেও বরফশীতল লেবুর শরবতের প্রচ- লোভনীয় প্রশান্তির কথা মনে করে ক্রেতা নিজেকে সাহস যোগান, ‘আরে একদিন খেলে কিছু হবে না।’
এভাবেই আরেকদিন ভাবেন, ‘ওইদিন খেয়ে তো কিছু হয়নি, তাহলে বোধহয় ভালোই।” এভাবেই পথের এসব শরবতের দোকানে ভীড়ও লেগে থাকে প্রায় সারাক্ষণ।
ঢাকার নিউমার্কেট সায়েন্স ল্যাবরেটরির সিগনাল, পান্থপথসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় ঘুরে দেখা গেছে, লেবুর শরবত তৈরির পদ্ধতি সবারই এক। কাঠ কিংবা লোহার একটি যন্ত্রের মাঝে অর্ধেকটা লেবু রেখে চাপ দেওয়া হয়। এতে রস গিয়ে পড়বে নিচে রাখা গ্লাস কিংবা মগে। এবার তাতে যোগ করা হবে বরফশীতল পানি আর বিট লবণ। কেউ আবার শরবতের রং সুন্দর করার জন্য মেশায় কৃত্রিম রং, ‘অরেঞ্জ পাউডার’। স্বাদ মিষ্টি করার জন্য স্যাকারিন, টেস্টিং সল্ট ইত্যাদি মেশানো হয়।
আখের রস বানানোর প্রক্রিয়া দেখতে সম্ভবত সবচাইতে বেশি অস্বাস্থ্যকর। লোহার কলে আখ পিষে রস বানানো হয়। সেই কল কখনও চলে হাতে ঘুরিয়ে কখন আবার ইঞ্জিনে। সারাদিন আখ পেষা রসে ভিজে আর ধুলাবালি আটকে যন্ত্রটা কালচে হয়ে যায়। অন্যান্য ফলের রস বিক্রিতে ব্যবহার হয় ব্লেন্ডার। এগুলোর দাম একটু বেশি হওয়ার সুবাদে তুলনামূলক বেশি পরিষ্কার। তবে স্বাস্থ্যকর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
সমস্যা কোথায়? যেসব ফল থেকে এসব পানীয় তৈরি হচ্ছে, তা বেশিরভাগ সময়ই খোলাভাবে রেখে দেওয়া হয়। এর ওপর অনবরত পড়তে থাকে ধুলোবালি, উড়তে থাকে মশা মাছি। শরবতে যে পানি বা বরফ ব্যবহার হয়, তা থাকে অপরিশোধিত। বিক্রেতারা এই পানি ও বরফকে বাড়িয়ে ফুটানো পানি থেকে তৈরি বলে দাবি করলেও বরফের মূল উৎস হলো বিভিন্ন স্থানের বরফকল। শরবত বানানোর জন্য বিশেষভাবে বরফ বানানো হয় না।
কারওয়ানবাজার গিয়ে দেখা গেছে, মাছ সংরক্ষণের জন্য যে বরফ বিক্রি হচ্ছে, সেখান থেকেই লেবু-পানি বিক্রেতারা বরফ সংগ্রহ করছেন। তাই পানির বিশুদ্ধতা নিয়ে বরফ কলের শঙ্কা না থাকাই স্বাভাবিক। আর পানি হলো সাধারণ পাইপ লাইনের পানি। সঙ্গে আছে রাস্তার ধুলাবালি।
বিক্রেতার হাতের ও শরীরের বিভিন্ন অংশের জীবাণু, ঘাম। এসব মিলিয়ে প্রতি গ্লাস শরবত যেন গ্লাস ভরা রোগের ডিপো।
এরকম শরবত পানে স্বাস্থ্য ঝুঁকি কেমন? রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘লিভার’ বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ বলেন, “ভ্রাম্যমান এসব দোকানের শরবত পানে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। হেপাটাইটিস বি-ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।”
ফলের রস নিয়ে সমস্যা না থাকলেও এখানে সমস্যা প্রক্রিয়াটি নিয়ে। যেমন- আখের রস খুবই একটি উপকারী এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রাস্তা ঘাটে যেভাবে আখের রসের তৈরি করা হয়, তা খুবই দূষিত অবস্থায় হয়। এই চিকিৎসক বলেন, “যারা এই রস তৈরি করেন তারা বেশিরভাগ সময় অপরিষ্কার থাকেন। গরমে সে ঘেমে যায়, ঘাম সেই রসের ওপরে পড়ে। বিক্রেতা গায়ের বিভিন্ন অংশ চুলকান আবার সেই হাতেই শরবত বানান।”
যিনি শরবত বানাচ্ছেন তিনি টাকা নিচ্ছেন, ফেরত দিচ্ছেন। যে মগে বা গ্লাসে পানীয় পরিবেশন করা হচ্ছে তা প্রতিদিন হাজারও মানুষ ব্যবহার করছে। পাশেই একটি বালতি পানিতে রাখা, সেই পানিতেই গ্লাসগুলো ধোয়া হয়। পানিটা কতবার ধোয়ার পর বদলানো হয় কে জানে।
“হাইজিন’ নিয়ে চিন্তা করতে গেলে হাসি পায়। আর মিষ্টি পানীয় হওয়াতে মাছি উড়ছে সবসময়। ফলে টাকার, গায়ের বিভিন্ন অংশের জীবাণু, গ্লাস থেকে আসা অসংখ্য মানুষের লালা, মাছি সবকিছুরই শরবত এগুলো। আর তা পান করার পর রোগ না হওয়াটাই অবিশ্বাস্য ব্যাপার”, বললেন ডা. রশীদ।
শরবতে মেশানো রংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, “কৃত্রিম খাবারের রং’য়ে ‘কারসিনোজেনিক’ উপাদান থাকে যা ভবিষ্যতে মানুষের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে।” তার পরামর্শ, “কোনো অবস্থায় এই গরমে রাস্তার পাশের এসব শরবত খাওয়া উচিত না। কারণ এদের পানির ফিল্টার, বরফ, পানি কোনোটাই পরিচ্ছন্ন না। এতে জন্ডিস, টাইফয়েড মতো পানিবাহিত রোগ হতে পারে। তাই ঘর থেকে ঠা-া পানি বোতলে ভরে বের হওয়াই ভালো। পারলে ঘর থেকে শরবত বানিতে বোতলে করে নিয়ে যান।” আর রাস্তার পাশের এসব পানীয়র চাইতে ডাবের পানি নিরাপদ। তবে যে স্ট্র দিয়ে পান করা হবে সেটা পরিষ্কার ও নতুন কিনা তা অবশ্যই দেখে নিতে হবে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *