ঢাকা ০৯:৫০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫

নতুন সমাজের স্বপ্ন যেভাবে মিলিয়ে যায়

  • আপডেট সময় : ০৭:৫২:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
  • ৩১ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমার এক কৌতুকপ্রিয় সহকর্মী বলতে ভালোবাসেন, গরিব দেশের গরিব মধ্যবিত্ত। সকলেই কি গরিব? এই অত্যন্ত গরিব দেশে এমন ধনী কি নেই; যার এক দিনের আয় গরিব মধ্যবিত্তের এক মাসের আয়কে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়? আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা ঠিক তেমনি অল্প, কোনোমতে টিকে-থাকা মধ্যবিত্তের সংখ্যা যেমন প্রচুর। আর ওই যে ধনী, তিনিও বংশপরিচয় ও মানসিকতায় মধ্যবিত্তই। প্রথম পুরুষে ও একবচনেই ধনী তিনি, সম্ভবত। হয়তো তার পিতাই দরিদ্র ছিলেন, হয়তো তার আপন ভাই অথবা বোনের স্বামী এখনও গরিব। নিজেও গরিব তিনি, ধনী দেশের মধ্যবিত্তের তুলনায়। এই যে ধনী ও দরিদ্র– এর নিরূপণে আপেক্ষিকতা, তা একটা মস্ত সত্য। দেশি ধনী বিদেশি ধনীর তুলনায় গরিব। উচ্চ মধ্যবিত্তের তুলনায় নিম্ন মধ্যবিত্ত দরিদ্র। নিম্ন মধ্যবিত্ত আবার সম্পদশালী, নিম্নবিত্তের পাশে দাঁড়ালে।

তুলনাই বলে দেবে আমার কী কী নেই। বন্ধু, প্রতিবেশী, পরিচিতের সুখই জানিয়ে দেয় আমি অসুখী। তার সুখই আমার অসুখ। যেমন তার অসুখ আমার সুখ। দুই দিক থেকেই তাই উদ্বেগ। ওপরে ওঠার চেষ্টায় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত যত না হতে হয়, উঠতে পারি কি না-পারি উদ্বেগে পীড়িত হতে হয় তার চেয়ে ঢের বেশি। আর আতঙ্ক সর্বহারা হবার। দারিদ্র্য সত্য। তার চেয়ে বড় সত্য এই আশঙ্কা।

উদ্বেগ নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনসঙ্গী। উচ্চ মধ্যবিত্তের অবস্থান-ভূমিও এত শক্ত নয়। তার পায়ের জোরও এত বেশি নয় যে নিশ্চিত থাকতে পারবে; ঘুমাতে পারবে নাকে তেল দিয়ে। তেলেতে ভেজাল নাকেতে অসুখ। উচ্চ মধ্যবিত্তও তো প্রথম পুরুষ, একবচনে ধনী। তার ছেলেটা বখাটে হয়ে যাচ্ছে, মেয়েটার পাত্র চাই। নিজের গ্যাস্ট্রিক, গৃহিণীর ডায়েটিং। কর্তৃপক্ষকে ভেট দিতে হবে। প্রতিযোগিতা তাদের সঙ্গে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা অহরহ। ওই বুঝি পেছনে গেল ফেলে! চলে গেল ছাড়িয়ে।

মানুষ যে কতটা উদ্বিগ্ন হতে পারে তার একটা স্পষ্ট হিসাব একাত্তরে পাওয়া গেছে। পুরো বাংলাদেশের শঙ্কাচ্ছন্ন মুখচ্ছবি ভুলবার নয়। একাত্তরে বিদ্রোহ ছিল, সাহস ছিল, আত্মত্যাগ ছিল। একাত্তরে বশ্যতা ছিল, কাপুরুষতা ছিল, ছিল স্বার্থপরতা। সবচেয়ে বেশি ছিল দুশ্চিন্তা। এসব কিছুই মধ্যবিত্ত জীবনে আছে। আলো আছে; আছে তদ্বিপরীতে অন্ধকার। সবচেয়ে বেশি আছে উদ্বেগ।

একাত্তর অতিনাটকীয়ভাবে একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছিল এই দোষ-গুণকে, এইসব অনুভব-অনভূতিকে। তখন ঢাকনা গেছিল খুলে। কিন্তু একাত্তরের উদ্বেগে একটা স্বাতন্ত্র্য ছিল। সে ছিল সমষ্টিগত। সমবেত। সকলেই ছিল উদ্বিগ্ন। লাখ লাখ মানুষের অসাধারণ সাধারণ দুশ্চিন্তা। সাধারণ, সুনির্দিষ্ট, চিহ্নিত শত্রু ছিল সামনে। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনের সার্বক্ষণিক যে দুশ্চিন্তা, সেখানে সাধারণ শত্রু যদিও দেশের দারিদ্র্য, তথাপি সেখানে সমষ্টিবদ্ধ, সমবেত নই আমরা। প্রত্যেকের দারিদ্র্য সেখানে তার নিজের আতঙ্ক। লড়াই সেখানে ঐক্যবদ্ধ নয়, বরঞ্চ প্রত্যেকেই যেন লড়ছে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে। প্রতিদ্বন্দ্বী একে অপরের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ যাত্রী যেন। যেন ইন্টারভিউর জন্য অপেক্ষমাণ প্রার্থী।

একাত্তরে মানুষ প্রায় শ্রেণিহীন হয়ে পড়েছিল। শুরু হয়ে গিয়েছিল শ্রেণিচ্যুতির এক প্রক্রিয়া। অবসাদ, চিন্তা, স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল মানুষ। প্রায়-শ্রেণিহীন মানুষ বিদেশে গেলেও হয়। বিদ্যার্জনে মধ্যবিত্ত বিদেশে যায় (একই ব্যাপার আসলে, নামের তফাত মূলত বিদ্যার্জনও অর্থাজনের প্রয়োজনে)। সেখানে গিয়ে দেশি মানদণ্ডে বিচার করলে বলতে হয় সে অমানুষিক পরিশ্রম করে। দোকান, ট্রেন, অফিসে কোথাও সে বিশেষ সম্মান পায় না।

শ্রেণিহীন প্রাচ্য দেশীয়ের প্রাপ্য সম্বোধন ও বিরক্তিগুলো জোটে তার বিপন্ন কপালে। শ্রেণিচ্যুতি ঘটে তার। কিন্তু যখন দেশে ফেরে, তখন পথিমধ্যেই শ্রেণি পরিচয়ের খানিকটা বিপর্যস্ত গাত্রাবরণটি নেয় টেনে এবং নবার্জিত অর্থের সাহায্যে নিজের অবস্থানকে কেমন করে আরও দৃঢ় করবে, কেমন করে হিংসায় বুক ফাটিয়ে চৌচির করে দেবে আর সকলের- সেই কল্পনার মধুর আমেজে নিমগ্ন হয়ে যায়। শ্রমকে ফেলে আসে বিদেশে। আরও সম্পন্ন, আরও সচ্ছল, আরও দর্পিত মধ্যবিত্তসুলভ হয়ে ওঠে সাজসজ্জা, প্রবাস-স্মৃতি, সর্বোপরি অর্থ সমাগমের দাপটে। ঈর্ষার কারণ হয় অনেকের। বহুজনের দর্প চূর্ণ করে দেয় আপন দর্পের ঘায়ে।

মধ্যবিত্ত একান্তভাবে সামাজিক প্রাণী। এই সামাজিক প্রাণীদের প্রধান বিলাস, প্রিয় ক্রীড়া-কৌতুক অন্যকে জব্দ করা। যেখানেই দেখা-সাক্ষাৎ যোগাযোগ হোক- বিয়ে অথবা মৃত্যু, দোকান বা হাসপাতাল, জন্মবার্ষিকী কিংবা বিয়েবার্ষিকী; পরস্পরকে জব্দ করার কখনো শান্ত, কখনো উগ্র। কিন্তু সদাসর্বদা সক্রিয় দ্বন্দ্ব চলছেই এবং অবস্থানের আপেক্ষিকতা চমৎকারভাবে বেরিয়ে আসছে ওই অহর্নিশ দ্বন্দ্বে; যেন অন্যে ছোট না হলে আমি বড় নই; যেন আরেকজনের অসুখ না হলে আমার সুখ হওয়ার নয়। অন্যকে ছোট করার এই সার্বক্ষণিক লড়াইয়ে মিথ্যা হয়ে যায় আত্মীয়তা; তুচ্ছ হয়ে পড়ে বন্ধুত্ব। ভাই ছেড়ে কথা কয় না ভাইকে; বোন অব্যাহতি দেয় না বোনকে।

কেউ যে উপরে, কেউ বা নিচে- এই উপর-নিচের মানদণ্ডটি কী? মানদণ্ড টাকা। এককালে বংশ ছিল মর্যাদার ভিত্তি। তারপর এসেছিল বিদ্যা। এখন সরাসরি, একেবারে উলঙ্গ হয়ে, সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে সামনে এসে গেছে টাকা। মর্যাদার সম্পর্কের বাণিজ্যিকীকরণ সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন কোনো টাকাই আর কালো নয়; কাগজপত্র, প্রচারমাধ্যমে যা-ই প্রচার করা হোক না কেন। টাকার রং সোনালি; কৃষ্ণ নয় কখনো।

আগের দিনে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি দেখলে লোকে অন্তত ফিসফাস করত। বলত অন্তত- লোকটা সৎ নয়। পরে বলত, উপরি নেয়। নিন্দার সুর থাকত তাতে। এখন যে উপরি নেয় না, তাকে মনে করা হয় বেআক্কেল। বিয়ের বাজারে এখন আর ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নয়; সবচেয়ে দামি পাত্রটি হচ্ছে ব্যবসায়ী। ফার্ম আছে– শুনলে বাবা-মা চোখ বুজে রাজি হন। বিয়ের কনে সবিশেষ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীর নামে নাক সিটকানোর কাল আজ গত হয়েছে। টাকার শাসন এখন অনড়রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশেষভাবে একাত্তরের পরেই ঘটছে এই বৃদ্ধি।

একাত্তর নিজে অন্য কথা বলেছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল- নতুন সমাজের সে জন্ম দেবে। তবে একাত্তর গড়িয়ে যখন বাহাত্তর এলো, স্বাধীন হলো দেশ, অমনি শোনা গেল অনেক দেশপ্রেমিক হাতই পরিণত হয়েছে লুণ্ঠনকারীর হাতে। শুধু শোনা নয়; দেখা গেল। চোখে পড়ল অবাঙালিরা ঘরবাড়ি, কলকারখানা, অফিস-পদবি ফেলে পালাচ্ছে দেখে শাসকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেসব সুযোগের ওপর। এমন বিক্রমে তারা হানাদার বাহিনীর ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়েনি। কোথায় গেল ঐক্য, কোথায় গেল মৈত্রী!

অতিশয় সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেল লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা। মধ্যবিত্তের একাংশের কপাল গেল খুলে। বহু মানুষের অসম্ভব ত্যাগ, রক্ত, দুঃখে লাভ হলো অল্প কিছু মানুষের। বেশির ভাগ মানুষ নিক্ষিপ্ত হলো নতুন দুর্ভোগ, নতুন যন্ত্রণা, নতুন দুর্ভিক্ষে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : prottashasmf@yahoo.com
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

নতুন সমাজের স্বপ্ন যেভাবে মিলিয়ে যায়

আপডেট সময় : ০৭:৫২:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আমার এক কৌতুকপ্রিয় সহকর্মী বলতে ভালোবাসেন, গরিব দেশের গরিব মধ্যবিত্ত। সকলেই কি গরিব? এই অত্যন্ত গরিব দেশে এমন ধনী কি নেই; যার এক দিনের আয় গরিব মধ্যবিত্তের এক মাসের আয়কে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়? আছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা ঠিক তেমনি অল্প, কোনোমতে টিকে-থাকা মধ্যবিত্তের সংখ্যা যেমন প্রচুর। আর ওই যে ধনী, তিনিও বংশপরিচয় ও মানসিকতায় মধ্যবিত্তই। প্রথম পুরুষে ও একবচনেই ধনী তিনি, সম্ভবত। হয়তো তার পিতাই দরিদ্র ছিলেন, হয়তো তার আপন ভাই অথবা বোনের স্বামী এখনও গরিব। নিজেও গরিব তিনি, ধনী দেশের মধ্যবিত্তের তুলনায়। এই যে ধনী ও দরিদ্র– এর নিরূপণে আপেক্ষিকতা, তা একটা মস্ত সত্য। দেশি ধনী বিদেশি ধনীর তুলনায় গরিব। উচ্চ মধ্যবিত্তের তুলনায় নিম্ন মধ্যবিত্ত দরিদ্র। নিম্ন মধ্যবিত্ত আবার সম্পদশালী, নিম্নবিত্তের পাশে দাঁড়ালে।

তুলনাই বলে দেবে আমার কী কী নেই। বন্ধু, প্রতিবেশী, পরিচিতের সুখই জানিয়ে দেয় আমি অসুখী। তার সুখই আমার অসুখ। যেমন তার অসুখ আমার সুখ। দুই দিক থেকেই তাই উদ্বেগ। ওপরে ওঠার চেষ্টায় ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত যত না হতে হয়, উঠতে পারি কি না-পারি উদ্বেগে পীড়িত হতে হয় তার চেয়ে ঢের বেশি। আর আতঙ্ক সর্বহারা হবার। দারিদ্র্য সত্য। তার চেয়ে বড় সত্য এই আশঙ্কা।

উদ্বেগ নিম্ন মধ্যবিত্তের জীবনসঙ্গী। উচ্চ মধ্যবিত্তের অবস্থান-ভূমিও এত শক্ত নয়। তার পায়ের জোরও এত বেশি নয় যে নিশ্চিত থাকতে পারবে; ঘুমাতে পারবে নাকে তেল দিয়ে। তেলেতে ভেজাল নাকেতে অসুখ। উচ্চ মধ্যবিত্তও তো প্রথম পুরুষ, একবচনে ধনী। তার ছেলেটা বখাটে হয়ে যাচ্ছে, মেয়েটার পাত্র চাই। নিজের গ্যাস্ট্রিক, গৃহিণীর ডায়েটিং। কর্তৃপক্ষকে ভেট দিতে হবে। প্রতিযোগিতা তাদের সঙ্গে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা অহরহ। ওই বুঝি পেছনে গেল ফেলে! চলে গেল ছাড়িয়ে।

মানুষ যে কতটা উদ্বিগ্ন হতে পারে তার একটা স্পষ্ট হিসাব একাত্তরে পাওয়া গেছে। পুরো বাংলাদেশের শঙ্কাচ্ছন্ন মুখচ্ছবি ভুলবার নয়। একাত্তরে বিদ্রোহ ছিল, সাহস ছিল, আত্মত্যাগ ছিল। একাত্তরে বশ্যতা ছিল, কাপুরুষতা ছিল, ছিল স্বার্থপরতা। সবচেয়ে বেশি ছিল দুশ্চিন্তা। এসব কিছুই মধ্যবিত্ত জীবনে আছে। আলো আছে; আছে তদ্বিপরীতে অন্ধকার। সবচেয়ে বেশি আছে উদ্বেগ।

একাত্তর অতিনাটকীয়ভাবে একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে ঠেলে দিয়েছিল এই দোষ-গুণকে, এইসব অনুভব-অনভূতিকে। তখন ঢাকনা গেছিল খুলে। কিন্তু একাত্তরের উদ্বেগে একটা স্বাতন্ত্র্য ছিল। সে ছিল সমষ্টিগত। সমবেত। সকলেই ছিল উদ্বিগ্ন। লাখ লাখ মানুষের অসাধারণ সাধারণ দুশ্চিন্তা। সাধারণ, সুনির্দিষ্ট, চিহ্নিত শত্রু ছিল সামনে। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনের সার্বক্ষণিক যে দুশ্চিন্তা, সেখানে সাধারণ শত্রু যদিও দেশের দারিদ্র্য, তথাপি সেখানে সমষ্টিবদ্ধ, সমবেত নই আমরা। প্রত্যেকের দারিদ্র্য সেখানে তার নিজের আতঙ্ক। লড়াই সেখানে ঐক্যবদ্ধ নয়, বরঞ্চ প্রত্যেকেই যেন লড়ছে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে। প্রতিদ্বন্দ্বী একে অপরের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষমাণ যাত্রী যেন। যেন ইন্টারভিউর জন্য অপেক্ষমাণ প্রার্থী।

একাত্তরে মানুষ প্রায় শ্রেণিহীন হয়ে পড়েছিল। শুরু হয়ে গিয়েছিল শ্রেণিচ্যুতির এক প্রক্রিয়া। অবসাদ, চিন্তা, স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল মানুষ। প্রায়-শ্রেণিহীন মানুষ বিদেশে গেলেও হয়। বিদ্যার্জনে মধ্যবিত্ত বিদেশে যায় (একই ব্যাপার আসলে, নামের তফাত মূলত বিদ্যার্জনও অর্থাজনের প্রয়োজনে)। সেখানে গিয়ে দেশি মানদণ্ডে বিচার করলে বলতে হয় সে অমানুষিক পরিশ্রম করে। দোকান, ট্রেন, অফিসে কোথাও সে বিশেষ সম্মান পায় না।

শ্রেণিহীন প্রাচ্য দেশীয়ের প্রাপ্য সম্বোধন ও বিরক্তিগুলো জোটে তার বিপন্ন কপালে। শ্রেণিচ্যুতি ঘটে তার। কিন্তু যখন দেশে ফেরে, তখন পথিমধ্যেই শ্রেণি পরিচয়ের খানিকটা বিপর্যস্ত গাত্রাবরণটি নেয় টেনে এবং নবার্জিত অর্থের সাহায্যে নিজের অবস্থানকে কেমন করে আরও দৃঢ় করবে, কেমন করে হিংসায় বুক ফাটিয়ে চৌচির করে দেবে আর সকলের- সেই কল্পনার মধুর আমেজে নিমগ্ন হয়ে যায়। শ্রমকে ফেলে আসে বিদেশে। আরও সম্পন্ন, আরও সচ্ছল, আরও দর্পিত মধ্যবিত্তসুলভ হয়ে ওঠে সাজসজ্জা, প্রবাস-স্মৃতি, সর্বোপরি অর্থ সমাগমের দাপটে। ঈর্ষার কারণ হয় অনেকের। বহুজনের দর্প চূর্ণ করে দেয় আপন দর্পের ঘায়ে।

মধ্যবিত্ত একান্তভাবে সামাজিক প্রাণী। এই সামাজিক প্রাণীদের প্রধান বিলাস, প্রিয় ক্রীড়া-কৌতুক অন্যকে জব্দ করা। যেখানেই দেখা-সাক্ষাৎ যোগাযোগ হোক- বিয়ে অথবা মৃত্যু, দোকান বা হাসপাতাল, জন্মবার্ষিকী কিংবা বিয়েবার্ষিকী; পরস্পরকে জব্দ করার কখনো শান্ত, কখনো উগ্র। কিন্তু সদাসর্বদা সক্রিয় দ্বন্দ্ব চলছেই এবং অবস্থানের আপেক্ষিকতা চমৎকারভাবে বেরিয়ে আসছে ওই অহর্নিশ দ্বন্দ্বে; যেন অন্যে ছোট না হলে আমি বড় নই; যেন আরেকজনের অসুখ না হলে আমার সুখ হওয়ার নয়। অন্যকে ছোট করার এই সার্বক্ষণিক লড়াইয়ে মিথ্যা হয়ে যায় আত্মীয়তা; তুচ্ছ হয়ে পড়ে বন্ধুত্ব। ভাই ছেড়ে কথা কয় না ভাইকে; বোন অব্যাহতি দেয় না বোনকে।

কেউ যে উপরে, কেউ বা নিচে- এই উপর-নিচের মানদণ্ডটি কী? মানদণ্ড টাকা। এককালে বংশ ছিল মর্যাদার ভিত্তি। তারপর এসেছিল বিদ্যা। এখন সরাসরি, একেবারে উলঙ্গ হয়ে, সম্পূর্ণ নিঃসংকোচে সামনে এসে গেছে টাকা। মর্যাদার সম্পর্কের বাণিজ্যিকীকরণ সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। এখন কোনো টাকাই আর কালো নয়; কাগজপত্র, প্রচারমাধ্যমে যা-ই প্রচার করা হোক না কেন। টাকার রং সোনালি; কৃষ্ণ নয় কখনো।

আগের দিনে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি দেখলে লোকে অন্তত ফিসফাস করত। বলত অন্তত- লোকটা সৎ নয়। পরে বলত, উপরি নেয়। নিন্দার সুর থাকত তাতে। এখন যে উপরি নেয় না, তাকে মনে করা হয় বেআক্কেল। বিয়ের বাজারে এখন আর ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার নয়; সবচেয়ে দামি পাত্রটি হচ্ছে ব্যবসায়ী। ফার্ম আছে– শুনলে বাবা-মা চোখ বুজে রাজি হন। বিয়ের কনে সবিশেষ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। ব্যবসায়ীর নামে নাক সিটকানোর কাল আজ গত হয়েছে। টাকার শাসন এখন অনড়রূপে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিশেষভাবে একাত্তরের পরেই ঘটছে এই বৃদ্ধি।

একাত্তর নিজে অন্য কথা বলেছিল। প্রতিশ্রুতি ছিল- নতুন সমাজের সে জন্ম দেবে। তবে একাত্তর গড়িয়ে যখন বাহাত্তর এলো, স্বাধীন হলো দেশ, অমনি শোনা গেল অনেক দেশপ্রেমিক হাতই পরিণত হয়েছে লুণ্ঠনকারীর হাতে। শুধু শোনা নয়; দেখা গেল। চোখে পড়ল অবাঙালিরা ঘরবাড়ি, কলকারখানা, অফিস-পদবি ফেলে পালাচ্ছে দেখে শাসকেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে সেসব সুযোগের ওপর। এমন বিক্রমে তারা হানাদার বাহিনীর ওপরও ঝাঁপিয়ে পড়েনি। কোথায় গেল ঐক্য, কোথায় গেল মৈত্রী!

অতিশয় সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেল লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা। মধ্যবিত্তের একাংশের কপাল গেল খুলে। বহু মানুষের অসম্ভব ত্যাগ, রক্ত, দুঃখে লাভ হলো অল্প কিছু মানুষের। বেশির ভাগ মানুষ নিক্ষিপ্ত হলো নতুন দুর্ভোগ, নতুন যন্ত্রণা, নতুন দুর্ভিক্ষে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
(মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব)

আজকের প্রত্যাশা/কেএমএএ