ঢাকা ১০:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিচার শুরু দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবনও হতে পারে

  • আপডেট সময় : ০২:৪১:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ জুন ২০২৪
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক : আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের যে মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনূস অভিযুক্ত হয়েছেন, তাতে দোষী সাব্যস্ত হলে এই নোবেলজয়ীর সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী।
ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেন গতকাল বুধবার ইউনূসসহ এ মামলার ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১৫ জুলাই দিন ঠিক করে দিয়েছেন তিনি।
এ মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং ওই অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের শুনানির পর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “জাল জালিয়াতি করে ডকুমেন্ট সৃজন করে শ্রমিকদের জন্য সেটেলড ৪৩৭ কোটির মধ্যে ২৬ কেটি টাকা তারা সরিয়েছিলেন। জাল ডকুমেন্ট তৈরি করেছিলেন তা ব্যবহার করেছিলেন নিজে লাভবান হওয়ার জন্য।
“যে সব গ্রাউন্ডে এ মামলায় ড. ইউনুস, গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী নেতা, তাদের আইনজীবীসহ অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন বিচারক। মামলায় যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সাক্ষ্য প্রমাণের ব্যাপার, সে কারণে চার্জ গঠন করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “এ মামলায় যেসব ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা রয়েছে। এ ধারার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন। অপরাধ প্রমাণিত হলে ড. ইউনূসের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। সর্বনিম্ন ১০ বছরের সাজা হতে পারে।”
দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তি বা কোনো সম্পত্তির উপর কর্তৃত্বের ভারপ্রাপ্ত কেউ সম্পত্তির বিষয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া মানিলন্ডারিংয়ের যে ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে, সেই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে এ মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ ১২ বছর এবং সর্বনিম্ন চার বছরের সাজা হতে পারে বলে জানান কাজল। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাকে ‘শান্তি স্থাপন’ বিবেচনা করে ২০০৬ সালে ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সরকারের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউনূস এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০১১ সালে অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছর মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার বয়স প্রায় ৭১। ইউনূস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যান এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আপিল বিভাগের আদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব হারান। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় ইউনূস গ্রামীণ টেলিকমের চার কর্মকর্তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে শ্রম আপিল আদালতে আপিল করেছেন ইউনূস। তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। সরকারের দিকে ইংগিত করে ইউনূস বলে আসছেন, তিনি ‘হয়রানির’ শিকার।
ইউনূস কী বলছেন: অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ইউনূস। সেখানে তিনি সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সাংবাদিকরা জানতে চান, আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলায় অভিযোগ গঠন হল, এটাকে তিনি ‘হয়রানি’ কেন বলছেন। উত্তরে ইউনূস বলেন, “যেটার বিচার হবে, সেটা বুঝতে পারছি না আর কি। এটাই হচ্ছে হয়রানি। আমার কাছে, আমার সহকর্মীদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। আমরা সারাজীবনতো মানুষের সেবাতেই কাটিয়ে দিই। সেবা করার জন্য অর্থ আত্মসাৎ করতে আমরা আসিনি। অর্থ ব্যয় করার জন্য এসেছি।” আদালতে আসামিকে লোহার খাঁচায় রাখার যে নিয়ম, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইউনূস। তিনি বলেন, “শুনানি চলাকালে একজন নিরপরাধ নাগরিককে একটা লোহার খাঁচার ভেতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত অপমানজনক। অনেক হয়রানির মধ্যে আছি। সেটারই অংশ, এটা চলতে থাকবে।
“আজকে সারাক্ষণ খাঁচার মধ্যে ছিলাম আমরা সবাই মিলে। যদিও আমাকে বলা হয়েছিল যে, আপনি থাকেন। আমি বললাম, সবাই যাচ্ছে, আমিও সঙ্গে থাকি। সারাক্ষণই খাঁচার ভেতরে ছিলাম।” ইউনূস বলেন, “যারা আইনজ্ঞ আছেন, বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত আছেন, তারা পর্যালোচনা করে দেখুন, এটা (খাঁচা) রাখার দরকার আছে? নাকি সারা দুনিয়ায় সভ্য দেশে যেভাবে হয়, আমরাও সভ্য দেশের তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারি?” ইউনূসের মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দুদকের আইনজীবী কাজল বলেন, “সরকার কীভাবেৃ ড. মুহাম্মদ ইউনুস অনেক দিন থেকেই এটা বলছেন। উনি আসলে এটা বলার জন্যই বলছেন। তাকে কখন কী অবস্থায় সরকার কী করেছে তা আমার তো জানা নেই। সুতরাং তা বলতে পরেব না। “সরকারের সাথে তার কী হয়েছে আমরা জানি না। আমরা দুনীতি দমন কমিশন, স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা তদন্ত করে আইনানুগ পদ্ধতিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। আর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে আইন অনুসরণ করে।”
উচ্চ আদালতে যাবেন ইউনূস: অভিযোগ গঠনের এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন ইউনূসের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “অভিযোগের বিষয় হচ্ছে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় উনি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অথচ টাকা চলে গেছে সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টে। ডব্লিউপিপি পের শ্রমিকের পাঁচ শতাংশ পাওনার সিগনেটরি ড. ইউনূস না এবং গ্রামীণ টেলিকমও না। “সেখান থেকে অর্থ তারা ডিস্ট্রিবিউশন করেছে। এখানে বলছে, উনি (ড. ইউনূস) সহযোগিতা করেছেন। রেজ্যুলেশন নিয়েছেন। এইভাবে মানি লন্ডারিংয়ের জন্য উনাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে বেআইনি, আইনের সঙ্গে পড়ে না। কারণ অভিযোগ করতে হলে আমার কাছে কেউ আমানত রাখতে হবে। গ্রামীণ টেলিকম বা ড. ইউনূসের কাছে কেউ আমানত রাখে নাই যে আমানত তিনি খিয়ানত করেছেন। তাহলে এখানে মামলা নাই! অর্থ আত্মসাতের কোনো বিষয় নাই।” দণ্ডবিধির ৪২০ ধারার কোনো বিষয়ও ‘এখানে নেই’ দাবি করে আইনজীবী মামুন বলেন, “উনি প্ররোচিত করেননি যে টাকা দিয়ে দেওয়া হোক। শ্রমিকের টাকা শ্রমিক নিয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আইনজীবীর ফি এক কোটি টাকা হবে, কেন ২৬ কোটি টাকা হল? এখানে সরকার কিন্তু একটা ভূমিকা পালন করেছে।
“এই সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়ার আগে হাই কোর্টে যে মামলা করা হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়িয়েছেন। অথচ তিনি কিন্তু দাঁড়াতে পারেন না শ্রমিকের পক্ষে, কারণ শ্রম অধিদপ্তর সেখানে বিবাদী ছিল। সরকারের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়াতে পারেন না। সরকার এই মামলা গ্রহণ করিয়ে, তারপর সেটেলমেন্ট করিয়ে, চাপ দিয়ে, তাদের প্রাপ্য হয়ত হয় ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা, এই আইনজীবী বলেন, গ্রামীণ টেলিকমের নিজস্ব একটি শেয়ার গ্রামীণ ফোনে আছে দীর্ঘ দিন যাবৎ যেটাতে শ্রমিকের কোনো প্রাপ্য নাই। সরকার সেখানে বাধ্য করেছে গ্রামীণ ফোনের টাকাসহ ১০ বছরের হিসাব দেওয়ার জন্য। তাই এটা হয়েছে ৪৩৭ কোটি টাকা। আইনজীবীর ফি শ্রমিকরা নির্ধারণ করেছিলেন ছয় শতাংশ। যেহেতু ওই টাকা বেড়ে গেছে। এটাও কিন্তু সরকারের একটা চক্রান্ত এবং সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাই কোর্টে এই মামলাটা দায়ের করে এই অভিযোগ আনার জন্য।” ইউনূসের আইনজীবী বলেন, “আগে অভিযোগ করেছে শ্রম আদালতে – ‘আপনি কেন শ্রমিকের প্রাপ্য দিলেন না?’ আর প্রাপ্য দেওয়ার পর বলছে, ‘আপনি তাদের প্রাপ্য দিয়েছেন, কেন দিলেন? কেন নোগোসিয়েশন করলেন?’ এটাই হল অপরাধ।” সরকারপক্ষ মামলাটি অতি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন. “যেহেতু এটা দ্রুত বিচার আইনের মামলা না, ন্যায়বিচারের স্বার্থে অন্যান্য মামলায় যেভাবে তারিখ নির্ধারণ করা হয়, সেখানে তারিখ দেওয়ার অনুরোধ করেছি (আদালতে)। আমরা বলেছি, এটাকে যেন বিশেষ মামলা পরিণত করা না হয়।” এক প্রশ্নের জবাবে মামুন বলেন, “এই অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আমরা হাই কোর্টে যাব। কারণ উনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি। এই প্রাথমিক তথ্য বিবরণী এবং অভিযোগপত্র যদি আদালত সত্য বলেও মনে করে; দণ্ডবিধির ধারাগুলো ড. ইউনূসসহ ১৪ জনকে কোনোভাবেই দায়ী করে না। তাদের দোষী সাব্যস্ত করে না।”
কী আছে মামলায়: দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ২০২৩ সালের ৩০ মে এই মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে গত ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। তার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিরা গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ‘আত্মসাৎ’ করেছেন। সেই অর্থ ‘অবৈধভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ। মামলার এজাহারে বলা হয়, ড. ইউনূস ও নাজমুল ইসলামসহ গ্রামীণ টেলিকম বোর্ড সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয়। তবে ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এক দিন আগেই। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল। এজাহারে বলা হয়, সেটেলমেন্ট চুক্তিতেও ৮ মে ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। ‘ভুয়া’ সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামীণ টেলিকমের ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয় ২০২২ সালের ১০ মে। পরে ২২ জুন অনুষ্ঠিত ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসাবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় ডাচ বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাব থেকে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের পূর্বেই তাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়েই ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামান, মাইনুল ইসলাম ও ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা করে স্থানান্তর করা হয়। একইভাবে আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অফ সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দি সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে ৫ কোটি টাকা এবং আইনজীবী জাফরুল হাসান শরীফ ও আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান নর্থ শাখায় যৌথ হিসাবে ৬ কোটি স্থানান্তর করা হয়, যা তাদের প্রাপ্য ছিল না। দুদকের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ‘অসৎ উদ্দেশে জালিয়াতির আশ্রয়ে গ্রামীণ টেলিকম থেকে উক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।’ এটি দণ্ডবিধি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ উল্লেখ করে এজাহারে বলা হয়, “যে কারণে আসামি ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।”

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

আমানতের অর্থ লুটে খাচ্ছে ব্যাংক : পিআরআই

ড. ইউনূসসহ ১৪ জনের বিচার শুরু দোষী সাব্যস্ত হলে যাবজ্জীবনও হতে পারে

আপডেট সময় : ০২:৪১:২৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ১২ জুন ২০২৪

নিজস্ব প্রতিবেদক : আত্মসাৎ ও মানি লন্ডারিংয়ের যে মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ ইউনূস অভিযুক্ত হয়েছেন, তাতে দোষী সাব্যস্ত হলে এই নোবেলজয়ীর সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী।
ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ আরাফাত হোসেন গতকাল বুধবার ইউনূসসহ এ মামলার ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ১৫ জুলাই দিন ঠিক করে দিয়েছেন তিনি।
এ মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং ওই অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের শুনানির পর দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল সাংবাদিকদের বলেন, “জাল জালিয়াতি করে ডকুমেন্ট সৃজন করে শ্রমিকদের জন্য সেটেলড ৪৩৭ কোটির মধ্যে ২৬ কেটি টাকা তারা সরিয়েছিলেন। জাল ডকুমেন্ট তৈরি করেছিলেন তা ব্যবহার করেছিলেন নিজে লাভবান হওয়ার জন্য।
“যে সব গ্রাউন্ডে এ মামলায় ড. ইউনুস, গ্রামীণ টেলিকম কোম্পানির শ্রমিক-কর্মচারী নেতা, তাদের আইনজীবীসহ অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন বিচারক। মামলায় যেসব অভিযোগ রয়েছে তা সাক্ষ্য প্রমাণের ব্যাপার, সে কারণে চার্জ গঠন করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “এ মামলায় যেসব ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছে, তার মধ্যে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা রয়েছে। এ ধারার সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন। অপরাধ প্রমাণিত হলে ড. ইউনূসের সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। সর্বনিম্ন ১০ বছরের সাজা হতে পারে।”
দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তি বা কোনো সম্পত্তির উপর কর্তৃত্বের ভারপ্রাপ্ত কেউ সম্পত্তির বিষয়ে অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে এবং অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এছাড়া মানিলন্ডারিংয়ের যে ধারায় অভিযোগ গঠন হয়েছে, সেই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে এ মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ ১২ বছর এবং সর্বনিম্ন চার বছরের সাজা হতে পারে বলে জানান কাজল। ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের চেষ্টাকে ‘শান্তি স্থাপন’ বিবেচনা করে ২০০৬ সালে ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংককে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। সরকারের অর্থায়ন ও সহযোগিতায় গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউনূস এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ২০১১ সালে অবসরের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ায় তার পদে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছর মার্চে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন ইউনূসকে অব্যাহতি দেয়, তখন তার বয়স প্রায় ৭১। ইউনূস কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যান এবং দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আপিল বিভাগের আদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্তৃত্ব হারান। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় ইউনূস গ্রামীণ টেলিকমের চার কর্মকর্তাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। ওই রায়ের বিরুদ্ধে শ্রম আপিল আদালতে আপিল করেছেন ইউনূস। তিনি বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। সরকারের দিকে ইংগিত করে ইউনূস বলে আসছেন, তিনি ‘হয়রানির’ শিকার।
ইউনূস কী বলছেন: অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন ইউনূস। সেখানে তিনি সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানান। সাংবাদিকরা জানতে চান, আনুষ্ঠানিকভাবে এ মামলায় অভিযোগ গঠন হল, এটাকে তিনি ‘হয়রানি’ কেন বলছেন। উত্তরে ইউনূস বলেন, “যেটার বিচার হবে, সেটা বুঝতে পারছি না আর কি। এটাই হচ্ছে হয়রানি। আমার কাছে, আমার সহকর্মীদের কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। আমরা সারাজীবনতো মানুষের সেবাতেই কাটিয়ে দিই। সেবা করার জন্য অর্থ আত্মসাৎ করতে আমরা আসিনি। অর্থ ব্যয় করার জন্য এসেছি।” আদালতে আসামিকে লোহার খাঁচায় রাখার যে নিয়ম, তা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ইউনূস। তিনি বলেন, “শুনানি চলাকালে একজন নিরপরাধ নাগরিককে একটা লোহার খাঁচার ভেতরে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি অত্যন্ত অপমানজনক। অনেক হয়রানির মধ্যে আছি। সেটারই অংশ, এটা চলতে থাকবে।
“আজকে সারাক্ষণ খাঁচার মধ্যে ছিলাম আমরা সবাই মিলে। যদিও আমাকে বলা হয়েছিল যে, আপনি থাকেন। আমি বললাম, সবাই যাচ্ছে, আমিও সঙ্গে থাকি। সারাক্ষণই খাঁচার ভেতরে ছিলাম।” ইউনূস বলেন, “যারা আইনজ্ঞ আছেন, বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত আছেন, তারা পর্যালোচনা করে দেখুন, এটা (খাঁচা) রাখার দরকার আছে? নাকি সারা দুনিয়ায় সভ্য দেশে যেভাবে হয়, আমরাও সভ্য দেশের তালিকার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারি?” ইউনূসের মন্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দুদকের আইনজীবী কাজল বলেন, “সরকার কীভাবেৃ ড. মুহাম্মদ ইউনুস অনেক দিন থেকেই এটা বলছেন। উনি আসলে এটা বলার জন্যই বলছেন। তাকে কখন কী অবস্থায় সরকার কী করেছে তা আমার তো জানা নেই। সুতরাং তা বলতে পরেব না। “সরকারের সাথে তার কী হয়েছে আমরা জানি না। আমরা দুনীতি দমন কমিশন, স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান। আমরা তদন্ত করে আইনানুগ পদ্ধতিতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছি। আর অভিযোগ গঠন করা হয়েছে আইন অনুসরণ করে।”
উচ্চ আদালতে যাবেন ইউনূস: অভিযোগ গঠনের এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলেছেন ইউনূসের আইনজীবী আব্দুল্লাহ আল মামুন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “অভিযোগের বিষয় হচ্ছে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারায় উনি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অথচ টাকা চলে গেছে সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্টে। ডব্লিউপিপি পের শ্রমিকের পাঁচ শতাংশ পাওনার সিগনেটরি ড. ইউনূস না এবং গ্রামীণ টেলিকমও না। “সেখান থেকে অর্থ তারা ডিস্ট্রিবিউশন করেছে। এখানে বলছে, উনি (ড. ইউনূস) সহযোগিতা করেছেন। রেজ্যুলেশন নিয়েছেন। এইভাবে মানি লন্ডারিংয়ের জন্য উনাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে বেআইনি, আইনের সঙ্গে পড়ে না। কারণ অভিযোগ করতে হলে আমার কাছে কেউ আমানত রাখতে হবে। গ্রামীণ টেলিকম বা ড. ইউনূসের কাছে কেউ আমানত রাখে নাই যে আমানত তিনি খিয়ানত করেছেন। তাহলে এখানে মামলা নাই! অর্থ আত্মসাতের কোনো বিষয় নাই।” দণ্ডবিধির ৪২০ ধারার কোনো বিষয়ও ‘এখানে নেই’ দাবি করে আইনজীবী মামুন বলেন, “উনি প্ররোচিত করেননি যে টাকা দিয়ে দেওয়া হোক। শ্রমিকের টাকা শ্রমিক নিয়েছে। আরেকটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, আইনজীবীর ফি এক কোটি টাকা হবে, কেন ২৬ কোটি টাকা হল? এখানে সরকার কিন্তু একটা ভূমিকা পালন করেছে।
“এই সেটেলমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়ার আগে হাই কোর্টে যে মামলা করা হয়েছে, অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়িয়েছেন। অথচ তিনি কিন্তু দাঁড়াতে পারেন না শ্রমিকের পক্ষে, কারণ শ্রম অধিদপ্তর সেখানে বিবাদী ছিল। সরকারের বিরুদ্ধে অ্যাটর্নি জেনারেল দাঁড়াতে পারেন না। সরকার এই মামলা গ্রহণ করিয়ে, তারপর সেটেলমেন্ট করিয়ে, চাপ দিয়ে, তাদের প্রাপ্য হয়ত হয় ২৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা, এই আইনজীবী বলেন, গ্রামীণ টেলিকমের নিজস্ব একটি শেয়ার গ্রামীণ ফোনে আছে দীর্ঘ দিন যাবৎ যেটাতে শ্রমিকের কোনো প্রাপ্য নাই। সরকার সেখানে বাধ্য করেছে গ্রামীণ ফোনের টাকাসহ ১০ বছরের হিসাব দেওয়ার জন্য। তাই এটা হয়েছে ৪৩৭ কোটি টাকা। আইনজীবীর ফি শ্রমিকরা নির্ধারণ করেছিলেন ছয় শতাংশ। যেহেতু ওই টাকা বেড়ে গেছে। এটাও কিন্তু সরকারের একটা চক্রান্ত এবং সরকার অ্যাটর্নি জেনারেলের মাধ্যমে হাই কোর্টে এই মামলাটা দায়ের করে এই অভিযোগ আনার জন্য।” ইউনূসের আইনজীবী বলেন, “আগে অভিযোগ করেছে শ্রম আদালতে – ‘আপনি কেন শ্রমিকের প্রাপ্য দিলেন না?’ আর প্রাপ্য দেওয়ার পর বলছে, ‘আপনি তাদের প্রাপ্য দিয়েছেন, কেন দিলেন? কেন নোগোসিয়েশন করলেন?’ এটাই হল অপরাধ।” সরকারপক্ষ মামলাটি অতি দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ করেন আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন. “যেহেতু এটা দ্রুত বিচার আইনের মামলা না, ন্যায়বিচারের স্বার্থে অন্যান্য মামলায় যেভাবে তারিখ নির্ধারণ করা হয়, সেখানে তারিখ দেওয়ার অনুরোধ করেছি (আদালতে)। আমরা বলেছি, এটাকে যেন বিশেষ মামলা পরিণত করা না হয়।” এক প্রশ্নের জবাবে মামুন বলেন, “এই অভিযোগ গঠনের আদেশের বিরুদ্ধে আমরা হাই কোর্টে যাব। কারণ উনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিকভাবে গ্রহণ করা হয়নি। এই প্রাথমিক তথ্য বিবরণী এবং অভিযোগপত্র যদি আদালত সত্য বলেও মনে করে; দণ্ডবিধির ধারাগুলো ড. ইউনূসসহ ১৪ জনকে কোনোভাবেই দায়ী করে না। তাদের দোষী সাব্যস্ত করে না।”
কী আছে মামলায়: দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ২০২৩ সালের ৩০ মে এই মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে গত ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ইউনূসসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। তার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিরা গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের কল্যাণ তহবিলের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা ‘আত্মসাৎ’ করেছেন। সেই অর্থ ‘অবৈধভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ। মামলার এজাহারে বলা হয়, ড. ইউনূস ও নাজমুল ইসলামসহ গ্রামীণ টেলিকম বোর্ড সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয়। তবে ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এক দিন আগেই। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল। এজাহারে বলা হয়, সেটেলমেন্ট চুক্তিতেও ৮ মে ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। ‘ভুয়া’ সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামীণ টেলিকমের ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয় ২০২২ সালের ১০ মে। পরে ২২ জুন অনুষ্ঠিত ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসাবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়। অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় ডাচ বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাব থেকে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের পূর্বেই তাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়েই ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামান, মাইনুল ইসলাম ও ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা করে স্থানান্তর করা হয়। একইভাবে আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অফ সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দি সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে ৫ কোটি টাকা এবং আইনজীবী জাফরুল হাসান শরীফ ও আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান নর্থ শাখায় যৌথ হিসাবে ৬ কোটি স্থানান্তর করা হয়, যা তাদের প্রাপ্য ছিল না। দুদকের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ‘অসৎ উদ্দেশে জালিয়াতির আশ্রয়ে গ্রামীণ টেলিকম থেকে উক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।’ এটি দণ্ডবিধি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ উল্লেখ করে এজাহারে বলা হয়, “যে কারণে আসামি ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।”