The Daily Ajker Prottasha

ডেঙ্গু জ্বর থেকে মুক্তির উপায়

0 0
Read Time:11 Minute, 36 Second

স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা ডেস্ক : আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। চরম আতঙ্ক নিয়ে জীবন যাপন করছেন দেশের সকল মানুষ। তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারত, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুরসহ আরও কয়েকটি দেশে বর্তমানে ব্যাপকভাবে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুও হচ্ছে অনেকের। বর্তমানে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হাজার হাজার ডেঙ্গু রোগী। অনেক ডেঙ্গু রোগীরাই কখন ও কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাবেন তা নিয়ে চিন্তিত থাকেন। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়ে যায় বেশিরভাগেরই। রোগীর অবস্থা আরও খারাপের দিকে চলে যায়। তাই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে বা বিশেষ করে শিশুদের ডেঙ্গু জ্বর হলে কোন কোন লক্ষণ দেখলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাবেন তা জানা জরুরি। ডেঙ্গু জ্বর গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চলে একটি সাধারণ ভাইরাল সংক্রমণ, যা মশার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শহরাঞ্চলে ডেঙ্গু জ্বর বেশি দেখা যায় তার কারণ হলো অনেক মানুষের আগমন, অপরিকল্পিত রাস্তাঘাট ও বাড়ি নির্মাণ। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে একদিকে শরীর যেমন দুর্বল হয়ে পড়ে অন্যদিকে এর প্রভাব শরীরে থেকে যায় দীর্ঘদিন। তবে বিশ্রাম ও নিয়ম মেনে চললে এর থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়াও সম্ভব।
ডেঙ্গু জ্বরের উৎপত্তি ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা এবং এই ভাইরাস বাহিত এডিস ইজিপ্টাই নামক মশার কামড়ে। স্বল্প ক্ষেত্রে অসুখটি প্রাণঘাতী ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভারে পরিণত হয়। যার ফলে রক্তপাত, রক্ত অনুচক্রিকার কম মাত্রা এবং রক্ত প্লাজমার নিঃসরণ অথবা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে রূপ নেয়। যেখানে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কম থাকে। সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেবার পর আবারো জ্বর আসতে পারে। এর সাথে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চেখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‌্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে। ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশা কোন ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তি ৪ থেকে ৬ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়। এবার এই আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো জীবাণুবিহীন এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহী মশায় পরিণত হয়। এভাবে একজন থেকে অন্যজনে মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়িয়ে থাকে। অনেকেই প্রথম প্রথম সামান্য জ্বর বলে পাশ কাটিয়ে গেলেও, এর প্রভাবে দীর্ঘদিন ভোগেন। কমে যায় ইমিউনিটিও।
ডেঙ্গুর হবার পরে ডাক্তাররা ভীষণ সাবধানে থাকতে বলেন। এই অসুখে রোগী দুর্বল হয়ে পড়েন। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া না করলে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে এনার্জি পান না। ফলে পুরোপুরি সেরে উঠতেও বেশ অনেকটা সময় লেগে যায়। ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করা উচিত নয়। একজন ব্যক্তি সাধারণত প্রতিদিন যেসব পরিশ্রমের কাজ করে, সেগুলো না করাই ভালো। পরিপূর্ণ বিশ্রাম প্রয়োজন। ওষুধের পাশাপাশি খাওয়া দাওয়ার দিকেও তাই এসময় বিশেষ নজর দিতে বলেন ডাক্তারেরা। জ্বর সারার পরেও সুস্থ হতে দেরি হয়। সেটা ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া না করার কারণেই। তাই সেদিকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত মানুষের পরিবারের অন্যান্য লোকের খেয়াল রাখতে বলেন। জানেন কি আপনার রান্নাঘরেই এমন অনেক কিছু আছে, যা নিয়মিত খেলে ডেঙ্গু থেকে সেরে উঠতে পারবেন! শাক সবজি, ফল এমনিতেই সবসময় খেতে বলেন ডাক্তারেরা। এই সময় বিশেষ কিছু ফলের রস খেলেও এনার্জি পাবেন। শর্করা, প্রোটিন ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ সাধারণ খাবার বন্ধ করা যাবে না। স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ঘরে বানানো খাবার খাওয়ার অভ্যাস করুন। প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন – ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। জেনে নিন ডেঙ্গু জ্বর থেকে মুক্তি পেতে যেসব খাবার খাবার খাবেন-
সবজির রস : ডেঙ্গু জ্বরে জ্বরে সবজি প্রতিদিন খাওয়া উচিত। ডেঙ্গুর জ্বরে যদি আক্রান্ত হন, তাহলে নিজের পছন্দমতো সবজির রস করে এই সময় খেতে পারেন। স্বাদ বদলের জন্য অল্প লেবুর রসও দিতে পারেন। লেবুতে ভিটামিন সি থাকে। সেটা শরীরের ইমিউনিটি ব্যুস্ট করে।
পেঁপে পাতার রস : ডেঙ্গু জ্বরের ক্ষেত্রে পেঁপে পাতার রস কতটা উপকারী সেটা আবার অনেকেই জানেন না। এই রস নিয়মিত খেলে জ্বর ধীরে ধীরে কমে যায়, শরীরে প্লেটলেট কাউন্ট বাড়ে, এমনকি ইমিউনিটি ব্যুস্ট ও হয়। বাড়ির আশেপাশে একটা দুটো পেঁপে গাছ তো থাকেই। তারই পাতা কুচিকুচি করে কেটে ব্লেন্ডারে অল্প জল দিয়ে মিশিয়ে রস তৈরি করতে পারেন। দিনে অন্তত দুবার এটা খাবেন।
হলুদ : হলুদ শরীরে মেটাবলিজম ব্যুস্ট করে। ডাক্তাররা এর গুণাবলির জন্যই গোল্ডেন মিল্ক বা হলুদ মেশানো দুধ খেতে সাজেস্ট করেন। অনেকেই দুধ খেতে পছন্দ করেন না। পানিতে অল্প হলুদ মিশিয়ে খেতে পারেন। এতে দ্রুত সুস্থ হবেন।
আমলকীর রস : আমলকী ভিটামিন এ ও সি তে ভরপুর। বাজারে সারা বছরই এখন আমলকি পাওয়া যায়। অনেক সময় ভিটামিন সি ট্যাবলেট পাওয়া যায় না বলে, তার বদলে দিনে একটা আমলকী খান। প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় শরীরের ট্রেস কমায়। ইমিউনিটি ব্যুস্ট করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
চিকেন স্যুপ : ফ্লু বা জ্বরের সময় ডাক্তাররা দিনে অন্তত একবার চিকেন স্যুপ খেতে সাজেস্ট করেন। এটা শরীর হাইড্রেটেড রাখে। আবার জ্বরের সময় অনেকেই মুখে খাবারের স্বাদ পান না ঠিকমতো। তাদের চিকেন স্যুপ খেতে বলেন।
নিমপাতার রস : নিমপাতার ঔষধি গুণ নিয়ে করোর মনে একটুও সংশয় নেই। জানেন কি, ডেঙ্গু জ্বরেও সমান উপকারী! এই রস শরীরে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করে। দিনের শুরুতেই ডাক্তাররা এটা খেতে বলেন।
হার্বাল টি : বাজারে এখন নানারকম ফ্লেভারের চা পাওয়া যায়। তুলসী, আদা, দারুচিনি, প্রভৃতি সমৃদ্ধ। এগুলো নিয়মিত খেলে উপকার পাওয়া যায়। সাধারণত ডেঙ্গু জ্বরের পরে অনেকেই খুব দুর্বল হয়ে পড়ে। সেই সময় এই ধরণের চা খেলে শরীর মন দুটোই চাঙ্গা থাকে।
ডেঙ্গু জ্বরে সতর্কতা : চিকিৎসকের মতে, ডেঙ্গু জ্বর হলে প্যারাসিটামলের সর্বোচ্চ ডোজ হচ্ছে প্রতিদিন চার গ্রাম। কিন্তু কোন ব্যক্তির যদি লিভার, হার্ট এবং কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা থাকে, তাহলে প্যারাসিটামল সেবনের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে গায়ে ব্যথার জন্য অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ খাওয়া যাবে না। ডেঙ্গুর সময় অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করলে রক্তক্ষরণ হতে পারে। তেলেভাজা যেকোনো কিছু, কোল্ডড্রিংকস, ফাস্টফুড, কফি, ফ্যাটজাতীয় যেকোনো খাবার জ্বরের সময় খাবেন না। ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী এডিস মশা অন্ধকারে কামড়ায় না। সাধারণত সকালের দিকে এবং সন্ধ্যার কিছু আগে এডিস মশা তৎপর হয়ে উঠে। এডিস মশা কখনো অন্ধকারে কামড়ায় না। চিকিৎসকের মতে, এডিস মশা ‘ভদ্র মশা’ হিসেবে পরিচিত। এসব মশা সুন্দর-সুন্দর ঘরবাড়িতে বাস করে। এডিস মশা সাধারণত ডিম পাড়ে স্বচ্ছ পানিতে। কোথাও যাতে পানি তিন থেকে পাঁচ দিনের বেশি জমা না থাকে। এ পানি যে কোন জায়গায় জমতে পারে। বাড়ির ছাদে কিংবা বারান্দার ফুলের টবে, নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন পয়েন্টে, রাস্তার পাশে পড়ে থাকা টায়ার কিংবা অন্যান্য পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে।
এডিস মশার সংক্রমণ প্রতিরোধে মশারি ব্যবহার করুন। ডেঙ্গু কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। কেবল ভাইরাসবাহী এডিস মশার কামড়েই ডেঙ্গু হতে পারে। মশারির বাইরে বের হলে ফুল হাতা পোশাক পরতে হবে। সুরক্ষার জন্য মশা মারার স্প্রে বা জেল ব্যবহার করা যেতে পারে। ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published.