The Daily Ajker Prottasha

জয় বাংলা বলতে মনরে এখনও কেন ভাবো

0 0
Read Time:9 Minute, 59 Second

প্রভাষ আমিন : স্বাধীনতার ৫১ বছর পর ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করা হয়েছে। এটা একই সঙ্গে আনন্দ এবং বেদনারও। ‘জয় বাংলা’ নিছক দুটি শব্দ নয়; এটি আমাদের চেতনায়, আমাদের অস্তিত্বে মিশে যাওয়া স্লোগান। আমাদের আনন্দে, আমাদের বেদনায় আমরা চিৎকার করে উঠি ‘জয় বাংলা’। এই স্লোগান বলাতে হাইকোর্টের আদেশ, মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে কেন? এটা তো বাংলাদেশের সব মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণের স্লোগান হওয়ার কথা।
‘জয় বাংলা’ এই দুটি শব্দকে একত্রে প্রথম ব্যবহার করেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২২ সালে ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থের ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতায় প্রথম কাজী নজরুল একত্রে জয় বাংলা লেখেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক কর্মীরা প্রথম এই স্লোগানটি ব্যবহার করেন। তবে ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তখনকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিন থেকে। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ বলে। বঙ্গবন্ধু সেদিন তাঁর কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন কোটি বাঙালির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে। আবার সেদিন বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়েছিল কোটি মানুষের কণ্ঠ হয়ে বাংলার আকাশে বাতাসে। সেই গানের মতো ‘শোন, একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে ওঠে রণি।’ সেই থেকে জয় বাংলা আমাদের প্রাণের স্লোগান। ৭১ সালের ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তখনকার মেজর জিয়াউর রহমানের পাঠ করা স্বাধীনতার ঘোষণাও শেষ হয়েছিল ‘জয় বাংলা’ দিয়েই। একাত্তর সালের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আধুনিক অস্ত্রের বিপক্ষে মুক্তিযোদ্ধারা লড়াই করেছে অদম্য সাহস আর অপরিসীম দেশপ্রেম নিয়ে। মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র ছিল ‘জয় বাংলা’। মুক্তিযোদ্ধারা ‘জয় বাংলা’ বলে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তো, যুদ্ধ জয় করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে উল্লাস করতো। একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুরু হতো ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গান দিয়ে আর শেষ হতো ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে। ছোট্ট এই স্লোগান ধারণ করে আছে আমাদের ২৩ বছরের মুক্তিসংগ্রাম, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, বিজয়ের স্বপ্ন, আমাদের ভাষা, আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্যকে। যারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, এমনকি যারা বিপক্ষে ছিলেন, তারাও জানেন; ‘জয় বাংলা’ কী অসাধারণ শক্তি ছিল। স্বাধীনতা বিরোধীদের কাছে ‘জয় বাংলা’ আতঙ্ক নিয়ে আসতো।
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্ব মানচিত্রে নতুন একটি দেশের আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশ নামের সেই দেশটি যাত্রা শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়- উন্নত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার। সেই পথচলায় সাহস জোগায় ‘জয় বাংলা’। হঠাৎ একদিন বদলে যায় সবকিছু। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোররাতে হারিয়ে গেলেন বঙ্গবন্ধু, হারিয়ে গেলো তার প্রিয় বাংলাদেশও। রাতারাতি ‘জয় বাংলা’ বদলে গেলো ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-এ। এ যেন ভূতের মতো পেছনের পায়ে হাঁটা। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান থেকে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশ গড়ে উঠেছিল অসাম্প্রদায়িক চেতনায়। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেই বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তান ভাবধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু হয়। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়ে যান বঙ্গবন্ধু, নিষিদ্ধ হয়ে যায় ‘জয় বাংলা’। সেই ষড়যন্ত্র চলে পরের ২১ বছর ধরে। গর্তে ঢুকে পড়া স্বাধীনতাবিরোধীরা চলে আসে ক্ষমতার কাছাকাছি। সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বারবার কাটাছেঁড়া হয় সংবিধানে। ২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় হারানো বাংলাকে ফিরে পাওয়ার লড়াই। ধাপে ধাপে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, সংবিধান সংশোধন করে ২১ বছরের ক্ষত সারানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো কোথাও কোথাও সেই ক্ষতটা এতই গভীর, সারানো খুব কঠিন। আবার ভোটের হিসাবে আওয়ামী লীগও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে আপস করেছে। তাই ৭৫-এ হারিয়ে যাওয়া বাংলাকে এখনও আমরা পুরোপুরি ফিরে পাইনি। তবে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চলছে, সেই চেষ্টাটা চালিয়ে যেতে হবে।
সেই চেষ্টার ধারাবাহিকতায় আবারও ফিরে এলো ‘জয় বাংলা’। ৭৫-এর পরও মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান ধরে রেখেছিল। তাতে কেউ জয় বাংলাকে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে অভিহিত করার চেষ্টা করেছেন। জয় বাংলা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, বাংলাদেশের স্লোগান। ‘জয় বাংলা’ মোটেই আওয়ামী লগের দলীয় স্লোগান নয়। ২০১৭ সালে জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট করা হয়। ২০২০ সালের ১০ মার্চ ‘জয় বাংলা’কে বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হিসেবে গ্রহণের রায় দেয় হাইকোর্ট। গত ২০ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর ২ মার্চ জয় বাংলাকে জাতীয় স্লোগান ঘোষণা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। শেষ পর্যন্ত ‘জয় বাংলা’ স্বীকৃতি পেলো। জয় বাংলাকে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগানের গ-ি থেকে বের করে আনার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। তবে শুরুতে যেমনটি বলেছি, জয় বাংলাকে প্রজ্ঞাপন দিয়ে জাতীয় স্লোগান করতে হয়েছে, এটা যেমন আনন্দের, তেমনি বেদনারও। জয় বাংলা স্লোগান তো আমরা প্রাণের আনন্দে স্বতঃস্ফূর্ততায় দেবো। এর জন্য প্রজ্ঞাপন লাগবে কেন?
আরেকটি বেদনার বিষয় হলো, স্বাধীনতার ৫১ বছর পরও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষ এবং বিপক্ষ শক্তি আছে। একটি গণতান্ত্রিক দেশে অনেক দল থাকবে, মত থাকবে। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে না, যারা স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি; তাদের স্বাধীনতার বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। আমরা চাই বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের। সেখান থেকে জনগণ বেছে নেবে তাদের পছন্দের দলকে।
জয় বাংলা মোটেই আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান নয়- মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান, বাংলাদেশের স্লোগান। আমরা সবাই যেন কোনও দ্বিধা ছাড়া, প্রাণ খুলে, মনের আনন্দে বলতে পারি- জয় বাংলা। আমাদের কারও কারও দ্বিধার কথা ভেবেই হয়তো গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছিলেন-
‘জয় বাংলা বলতে মনরে আমার এখনো কেন ভাবো,
আমার হারানো বাংলাকে আবার তো ফিরে পাবো’।
এই হারানো বাংলাকে ফিরিয়ে আনার লড়াইটা আমাদের চালিয়ে যেতে হবে।
লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *