করোনাভাইরাস: প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যে কারণে জরুরি

করোনাভাইরাস: প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া যে কারণে জরুরি

মহিবুর রৌফ শৈবাল : আধুনিক বিশ্বায়ন ও সময়ের প্রয়োজনে মানবজাতিকে প্রতিবন্ধিত্ব সর্ম্পকে জানতে হয়েছে। কেননা সমাজে প্রতিবন্ধীদের যে অংশ রয়েছে, তাদের বাদ দিয়ে বা অবহেলা করে টেকসই উন্নয়নের অসম্ভব। এমন একটা সময় ছিল যে সময় বুদ্ধি-প্রতিবন্ধীদের পাগল বা অপ্রকৃতস্থ হিসেবে আখ্যায়িত করে মূল জনগোষ্ঠির বাইরে রাখা হত। ফলে যুগে যুগে তারা মৌলিক অধিকারগুলো থেকে বঞ্চিত হয়েছে, কিংবা এখনও হচ্ছে। একটা সময়ে দেখা যেত, আমাদের দেশের অন্ধকারচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজের স্বাভাবিক মানুষের সামনেও নিয়ে আসা হত না;
এমনও দেখা যেত পৈতৃক সম্পত্তিতে তাদের অধিকার না দিয়ে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত। আর নারী-প্রতিবন্ধীদের অবস্থা ছিল আরও বেশি অসহায়। বয়োসন্ধিকালীন থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার জন্য যে ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দরকার, তা তারা পেতেন না। শারীরিক অসুস্থতা তাদের গ্রাস করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিত। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন আবিষ্কার এবং প্রসারের ফলে মানুষ প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সচেতন হতে শুরু করেছে। অবস্থা যে রাতারাতি বদলে গিয়েছে- তা নয়। তবে ধীরে হলেও পরিবর্তন হচ্ছে।
বয়স, লিঙ্গ, জাতি সংস্কৃতি বা সামাজিক অনুযায়ী আর দশজন যে কাজগুলো করতে পারে জন্মগতভাবে শারীরিক বা মানসিক সমস্যার কারণে সেগুলো প্রতিবন্ধীরা করতে পারেন না।
পৃথিবী আক্রান্ত কোভিড-১৯ এ। নতুন বাস্তবতায় চলে যাচ্ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। নতুন বাস্তবতায় প্রতিবন্ধীদের অবস্থান আমাদের মতো একটি দেশে কী দাঁড়াবে সেটি ভাবার সময় এখনই।
তবে তার আগে করোনাভাইরাসের এ সময়টায় প্রতিবন্ধীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জোর দিতে হবে। কোভিড-১৯ মারাত্মক ছোঁয়াচে বলেই হাত ধোওয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারটি বারবার প্রচার করা হচ্ছে। প্রতিবন্ধীরাই এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
প্রতিবন্ধীরা অনেক বেশি সংবেদনশীল। করোনাভাইরাস তাদের প্রতিদিনের পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশু বা মানুষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা, শোনা, গন্ধ, স্বাদ অথবা স্পর্শের প্রতি অতিসংবেদনশীল অথবা প্রতিক্রিয়াশীল থাকার কারণে তাদের ভেতরে স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত জ্ঞান অপ্রতুল; কোনও কোনও ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চঞ্চলতার কারণে প্রতিবন্ধী শিশুরা যত্রতত্র ছুটে বেড়ায় আর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে ময়লা, আর্বজনা, অপরিষ্কার জিনিস ধরার প্রবণতাও রয়েছে।
এই সংকটের সময়ে, যেখানে সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষই সাধারণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নিয়মাবলী মেনে চলতে বিস্তর ঝামেলার মুখোমুখি হচ্ছে, সেখানে প্রতিবন্ধীদের ঝুঁকি কতটুকু তা খুব বিস্তারিত বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রতিবন্ধীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অপরের সহযোগিতা নিয়ে চলাফেরা করেন। তাদের এ চলাফেরায় সাহায্য করে থাকেন পরিবারের মানুষগুলো। যেকোনও ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বিশেষ পরিষেবা এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনগুলো প্রাথমিকভাবে মেটাতে পারে পরিবারের মানুষগুলো। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির নিরাপত্তা তার পরিবারের উপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল ।
মহামারী চলার দিনগুলোতে বিশেষ করে পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে তাদের প্রতিবন্ধী পারিবারিক সদস্যটি তার স্বাভাবিক আচরণ ঠিকমতো করছে কিনা। যদি অসঙ্গতি দেখা যায় তবে তা ঠিক করে দিতে হবে। বিশুদ্ধ ও পরিষ্কার পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। থেরাপি নেওয়ার সময় থেরাপিস্টকে অবশ্যই হাতে গ্লাভস ও মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। চঞ্চলতার কারণে যত্রতত্র ছুটে বেড়াবার সময় অপরিষ্কার কিছু না ধরে সেটি খেয়াল রাখতে হবে। যদি ধরেই ফেলে তবে সাথে সাথেই সাবান দিয়ে হাত-মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করিয়ে জীবাণুমুক্ত করে দিতে হবে।
কোভিড-১৯ সংক্রমণের পর বাংলাদেশে প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ের উদ্যোগ অপ্রতুল। মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ কোভিড-১৯ মোকাবেলায় প্রতিবন্ধীদের বাছ-বিচারের ক্ষমতা কম, কাজেই এদিকটায় গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে বেশি। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব মানুষ মহামারীর এ সময়ে সবচেয়ে অসহায়।
এসময়টা প্রতিবন্ধীদের পরিবারকে তো বটেই, এমনকি সাধারণ সুস্থ মানুষকেও খেয়াল রাখতে হবে বৈষম্য বা কুসংস্কারের জন্য নতুন কোনও ধরনের প্রতিবন্ধকতা যেন তৈরি না হয়। প্রতিবন্ধীদের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের ব্যাপারটি বেড়ে যেতে পারে। সেই ধরনের অবস্থা যাতে তৈরি না হয়, সেজন্য সামাজিক সচেতনতা তৈরি এখনই মাঠে নামতে হবে।

অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্বাস্থ্যহীনতা ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব যেন না হয় সেটি খেয়াল রাখতে হবে। এ কারণে কোভিড-১৯ এ ত্রাণ সহায়তার সাথে যুক্ত সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে প্রতিবন্ধী পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যাপারটি বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে ।
যেহেতু ‘লকডাউন’ বা ঘর থেকে না বের হওয়ার মধ্য দিয়েই আপাতত কোভিড-১৯ সংক্রমণ সীমিত রাখার চেষ্টা চলছে সে কারণে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষাকার্যক্রমের জটিলতা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে। পরিবারগুলো চেষ্টা করতে পারে তাদের প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য সৃষ্টিশীল নানাধরনের খেলনা বা উপকরণ দিয়ে ঘরে বসেই কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালানো যায় সেসব বিকল্প নিয়ে গুরুত্বসহকারে ভাবা। প্রতিবন্ধী নারীদের বয়োসন্ধিকালীন চিকিৎসা উপকরণ ঘরে ঘরে পৌঁছানো হতে পারে একটি চমৎকার আইডিয়া।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষগুলোর অনেকেরই খাবার ও ওষুধ হয়তো শেষ হয়ে গেছে। অনেকেই হয়তো তাদের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে পারছেন না দৈনন্দিন প্রয়োজনগুলো মেটাতে।
প্রয়োজনের তুলনায় প্রতিবন্ধীদের জন্য বাজেট বরাবরই খুবই কম। তাছাড়া কোভিড-১৯ মোকাবেলায়ও তাদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ খুবই কম। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশ প্রতিবেদনে জানা যায়, সরকার ৪ দফায় প্রতিবন্ধীদের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে। রাজধানীসহ ৬৩টি জেলার জন্য ৩ মে পর্যন্ত ১ কোটি টাকা দেওয়াও হয়েছে; কিন্তু তখনো প্রতিবন্ধীদের হাতে পৌঁছেনি।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনকৃত প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ১৫ লাখ। আর তাদের জরিপ অনুযায়ী, দেশে মোট ১৮ লাখ প্রতিবন্ধী রয়েছেন। ১ কোটি টাকা ১৫ বা ১৮ লাখ প্রতিবন্ধীর জন্য কতোটা অপ্রতুল তা আলোচনা করাটা খুবই হাস্যকর হবে।
পত্রিকার খবর এও বলছে যে, প্রতিবন্ধীদের ভাতাও নিয়মিত হচ্ছে না। আবার কোভিড-১৯ এর বরাদ্দকৃত অর্থও তাদের ৯৯ ভাগ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রদেয় এই অর্থ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। তবে আমরা সবাই যদি মানবিক দায়িত্ব নিয়ে প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াই তা হলে হয়তো এ কোভিড-১৯ সংকটে প্রতিবন্ধীদের জীবনযাপনের দুর্দশা খুব সামান্য হলেও কমাতে পারবো।
প্রতিবন্ধীদের ‘প্রতি-বন্ধু’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এ সংকটে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সহমর্মিতায় তাদের কল্যাণে আতœনিয়োগ করাটা জরুরি। এক্ষেত্রে আরও একটা বিষয় মাথায় রাখাটা জরুরি সেটি হলো- প্রতিবন্ধীরা কোভিড-১৯ সংক্রমণের শিকার হলে সামাজিক সংক্রমণের ঝুঁকিও কিন্তু উচ্চমাত্রায় বাড়বে। কেননা আগেই বলেছি, স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে তাদের স্বভাবতই জ্ঞান খুব সীমিত।
কাজেই সংকটের এ সময়ে তাদের পাশে থাকি; বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এসব মানুষের জীবনযাপন উন্নয়নে তহবিল গঠন করি ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবন রক্ষার জন্য দ্রুত কাজ করি।
লেখক : মানবাধিকারকর্মী

Please follow and like us: