করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে দ্রুত এন্টিজেন-এন্টিবডি টেস্টিং-এ যেতে হবে

করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে দ্রুত এন্টিজেন-এন্টিবডি টেস্টিং-এ যেতে হবে

মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন : বিশ্বময় করোনাভাইরাস মহামারীর প্রলয়কা- চলছেই। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে যাত্রা শুরু করে দুনিয়ার প্রতিটি অঞ্চলে তার ভয়ংকর থাবা ছড়িয়ে দিয়েছে এ অদৃশ্য দানব। মাত্র পাঁচ মাস সময়ের ব্যবধানে আক্রান্ত হয়েছে ৭০ লক্ষাধিক বনি আদম, ঝরে গেছে ৪ লাখের বেশি অমূল্য প্রাণ। দিনের পর দিন আক্রান্ত হচ্ছে নিত্য নতুন এলাকা। বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাকাল অবস্থার যখন দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি, ইতালি ও স্পেনের মত চরম ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের বেহাল দশা যখন সবেমাত্র তিথিয়ে আসছে, করোনাভাইরাস তখন নতুন করে তার জোরালো থাবা বসাতে শুরু করেছে ব্রাজিল ও রাশিয়ায়। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশেও করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।
করোনাভাইরাস মহামারীর এই যে ক্ষিপ্র গতিতে অপ্রতিরোধ্য বিস্তার তার মূলে রয়েছে এর ভয়ানক ছোঁয়াচে প্রকৃতি। আক্রান্ত ব্যক্তি ভালমতো বুঝে উঠার আগেই তার সংস্পর্শে জন থেকে বহুজনে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে। একারণে এ মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বের প্রায় সব দেশই উপদ্রুত এলাকায় লকডাউন আরোপ করেছে। উদ্দেশ্য, সংক্রমণ যেন উপদ্রুত এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায়, আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে আইসোলেট/কোয়ারেন্টিন করা যায় এবং প্রয়োজনমাফিক চিকিৎসা/পরিচর্যা দেয়া যায়। বিশ্বের অনেক দেশই এরই মধ্যে লকডাউন শিথিল করেছে, তবে তা করেছে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আসার পরেই। বাংলাদেশও গত ৩১ মে থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছাড়া সব ধরনের অফিস-আদালত খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পাশের দেশ ভারতে লকডাউন শিথিল করার পর সংক্রমণের হার বাড়তে দেখা গেছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও লকডাউন শিথিলের পর সংক্রমণের আরেকটি ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতি দ্রুত আয়ত্তে নিয়ে আসতে কি করণীয় আছে, তা নির্মোহভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারী মোকাবেলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) শুরু থেকেই যে মৌলিক কর্মপরিকল্পনা দিয়ে এসেছে তা হল: ঞবংঃ, ঞবংঃ ্ ঞবংঃ। অর্থাৎ যত বেশি পারুন, পরীক্ষা করুন, আক্রান্তদের খুঁজে বের করুন। কেবল এভাবেই সংক্রমণের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। বিষয়টিকে জটিল করে তুলেছে, জনসংখ্যার একটি বড় অংশে জ্জ যা বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে হতে পারে মোট আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ২০-৮০% জ্জ সংক্রমণের তেমন কোন উপসর্গ দেখা যায় না। বিজ্ঞানীদের জোরালো বিশ্বাস, সংক্রমণ চলাকালে নিজেদের মধ্যে তেমন কোনো উপসর্গ দেখা না গেলেও এরা অন্যদের মধ্যে রোগ ছড়াতে সক্ষম। আপনি যদি সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে চান, নিয়ন্ত্রণে আনতে চান, তাহলে এসব ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার একটি উপায় বের করতেই হবে। কেবল অসুস্থ বোধ করছে, এমন লোকদের পরীক্ষা করে এসব নীরব করোনাবাহীদের খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। আপনাকে পরীক্ষার আওতা আরও আরও বাড়াতে হবে। কন্টাক্ট ট্রেসিং-এর মাধ্যমে হোক কিংবা দৈবচয়নের ভিত্তিতে, আপনাকে আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ লোকদেরও পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে। আপনি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইলে এটাই হতে পারে বাস্তবভিত্তিক কর্মপন্থা, এর বাইরে প্রকৃত অর্থে কোনো শর্টকাট বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। ধারণা করা হচ্ছে, করোনা সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে একটি শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছার পর স্থির হয়ে আসবে, তারপর কমতে শুরু করবে। এমনটি কেবল তখনই ঘটতে পারে, যদি ইতোমধ্যে যেসব লোক সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের দ্রুত ব্যাপক ভিত্তিতে শনাক্ত করে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানোর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, দক্ষিণ কোরিয়ার মত যেসব দেশ সংক্রমিতদের ব্যাপক ভিত্তিক শনাক্তকরণের ত্বরিৎ ব্যবস্থা নিয়েছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভাল সাফল্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি কিংবা স্পেনের মত যেসব দেশ দেরিতে তৎপর হয়েছে, সেখানে সংক্রমণ সমাজের ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। ফলে, তারা পরবর্তীতে শনাক্তকরণের সংখ্যা বিপুলভাবে বাড়িয়েও সংক্রমণের গতির সাথে তাল মেলাতে পারছিল না। একারণে বিশ্বময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গ এবং সেই সাথে বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনের নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন যা খুব দ্রুত সুনির্দিষ্টভাবে করোনাভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।
ইতোপূর্বেকার করোনাভাইরাস গোত্রীয় সার্স/মার্স এসব মহামারী মোকাবেলা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনার আলোকে বিশ্বময় সব দেশই করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে আরটি-পিসিআর পদ্ধতির উপর নির্ভর করে আসছিল। বাংলাদেশেও এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস শনাক্তকরণে এ পদ্ধতিটিই অনুসৃত হচ্ছে। শুরুর দিকে টেস্টিং সামর্থ্য খুব সীমিত থাকলেও এখন বিভিন্ন হাসপাতাল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি মিলিয়ে ৫২টি ল্যাবে আরটি-পিসিআর টেস্ট চলছে এবং প্রতিদিন ১০ হাজারের উপর পরীক্ষা সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা এখনো অন্য কোনো পদ্ধতি বিবেচনায় নেইনি। আরটি-পিসিআর পদ্ধতিটি খুবই সুনির্দিষ্ট (ংঢ়বপরভরপ) এবং সংবেদনশীল (ংবহংরঃরাব); করোনা শনাক্তকরণে এখন পর্যন্ত আর কোনো পদ্ধতিই এর চেয়ে ভাল কাজ করে বলে প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু, প্রশ্ন হচ্ছে, ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে টেস্টিং-এর আওতায় আনতে হলে শুধুমাত্র এই একটি পদ্ধতির উপর নির্ভর করা চলবে কিনা। আমেরিকা, ইউরোপ, এমনকি পাশের দেশ ভারতের দিকেও যদি তাকান, আপনি দেখতে পাবেন, তারা অনেক আগেই বিকল্প পদ্ধতির দিকে হাত বাড়িয়েছে। খোদ মার্কিন মুলুকে অনেক চেষ্টা করেও আরটি-পিসিআরের মাধ্যমে পরীক্ষার সংখ্যা দৈনিক দুই থেকে আড়াই লাখের উপরে উঠানো যাচ্ছিল না। আর ওদিকে স্বাস্থ্যবিদেরা চেঁচিয়ে যাচ্ছিলেন, স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরায় চালু করার আগে প্রত্যেককে পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে, দৈনিক টেস্টের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে উন্নীত করতে হবে। [তথ্যসূত্রঃ অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, ০৯ মে, ২০২০]।
এ প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে যেসব পরীক্ষা পদ্ধতি বিবেচনায় এসেছে, তা নতুন কিছু নয়। এর আগে সার্স/মার্সের মতো ভাইরাসজনিত রোগেও এগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। এসব পরীক্ষায় রোগীর নিকট থেকে সংগৃহীত নমুনায় করোনাভাইরাস দেহের কোন এন্টিজেনিক প্রোটিন কিংবা এর বিরুদ্ধে মানবদেহে যেসব এন্টিবডি তৈরি হয়, তা শনাক্তকরণের উদ্যোগ নেয়া হয়। সাধারণভাবে এসব পরীক্ষা পদ্ধতিকে রসসঁহড়ধংংধু নামে আখ্যায়িত করা হয়। আরটি-পিসিআরের ক্ষেত্রে যেখানে একটি টেস্ট রান করাতে কয়েক ঘন্টা লেগে যায়, সেখানে এ সব টেস্ট এমনভাবে ডিজাইন করা সম্ভব যাতে আপনি মিনিট পনেরোর মধ্যেই রেজাল্ট পেয়ে যাবেন। টেস্টগুলো খুবই সহজ প্রকৃতির, পয়েন্ট অব কেয়ার (চঙঈ) অর্থাৎ যখন যেখানে রোগীর পরীক্ষা করা হচ্ছে সরাসরি সেখানেই পরীক্ষার ফল পাওয়া সম্ভব। নমুনা সংগ্রহ করে আলাদা কোনো ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো লাগে না। এছাড়া, আরটি-পিসিআর পদ্ধতিতে মেশিনের দাম, বিশেষ ধরনের ল্যাব সেট-আপ এবং নমুনা প্রসেসিং ও পরীক্ষা পরীচালনার জন্য দক্ষ টেকনিশিয়ানের প্রয়োজনীয়তা জ্জ এসব মিলিয়ে পরীক্ষা প্রতি খরচটাও অনেক বেড়ে যায়।
এন্টিবডি টেস্টিং আপনার কাছে অধিকতর আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কারণ, এখানে নমুনা হিসেবে দরকার কেবল অল্প একটু রক্ত, যা এমনকি সুঁই দিয়ে আঙ্গুল ফুটো করে রোগী নিজেই দিতে পারেন। পিসিআর টেস্টের জন্য সোয়াব ব্যবহার করে যে প্রক্রিয়ায় নাসারন্ধ্রের পেছনে ফ্যারিংস (ঢ়যধৎুহী) থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হয়, তার জন্য দক্ষ হাতের প্রয়োজন তো আছেই, রোগীর জন্যেও তা আরামপ্রদ নয়। তবে এন্টিবডি টেস্টের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হল, এ পদ্ধতিতে সরাসরি ভাইরাস বা ভাইরাসের কোনো উপাদান নয়, ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শরীর যে সব এন্টিবডি তৈরি করে তা শনাক্ত করা হয়। সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন সবে শরীরে করোনাবিরোধী এন্টিবডিসমুহ তৈরি হচ্ছে, তখন এসব এন্টিবডি শনাক্তকরণ পরীক্ষায় ধরা নাও পড়তে পারে। একারণে এন্টিবডি টেস্ট চলমান সংক্রমণ (পঁৎৎবহঃ রহভবপঃরড়হ) শনাক্তকরণের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ নাই [ঊটঅ অঁঃযড়ৎরুবফ ঝবৎড়ষড়মু ঞবংঃ চবৎভড়ৎসধহপব।ঋউঅ, ০৬ অঢ়ৎরষ, ২০২০]। বিপরীতে, এন্টিজেন টেস্টে পিসিআরের ন্যায় ন্যাসাল/ওরাল সোয়াব নমুনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে জেনেটিক মেটেরিয়াল (জঘঅ)-এর পরিবর্তে এখানে ভাইরাসের প্রোটিন শনাক্ত করা হয়। দেখা গেছে, এ ধরনের পরীক্ষা আরটি-পিসিআরের মতোই বেশ স্পেসিফিক, কিন্তু সেনসিটিভিটি তুলনামূলকভাবে কম। তার মানে, এ টেস্টে রেজাল্ট যদি পজিটিভ আসে তা নিশ্চিত ধরে নেয়া যায়, তবে নেগেটিভ হলে তা ‘ঋধষংব -ঠব’-ও হতে পারে। কাজেই, রোগীর যদি সুস্পষ্ট করোনাভাইরাস উপসর্গ থাকে, রেজাল্ট নেগেটিভ হলে জঞ-চঈজ দিয়ে তার নমুনা পুনরায় পরীক্ষা করে দেখতে হবে [তথ্যসূত্রঃ এফডিএ স্টেটমেন্ট, ০৯ মে, ২০২০]। প্রশ্ন আসতে পারে, এ পদ্ধতিটি আরটি-পিসিআরের চেয়ে কম সংবেদনশীল হওয়ার কারণ কী? এর কারণ, আরটি-পিসিআর ভাইরাসের জেনেটিক মেটেরিয়ালকে বিবর্ধিত (ধসঢ়ষরভু) করে, ফলে সংগৃহীত নমুনায় ভাইরাস পরিমাণে নগন্য হলেও শনাক্ত করতে পারে। এন্টিজেন টেস্টে ভাইরাসের প্রোটিনকে বিবর্ধিত করার সেরূপ কোনো ব্যবস্থা নেই, ফলে নমুনায় ভাইরাসের পরিমাণ কম হলে এটি আর শনাক্ত করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অব মেডিসিনের প্রফেসর ডা. আলবার্ট শ’-এর ভাষায়ঃ “এন্টিজেন টেস্ট পিসিআরের চেয়ে কম সংবেদনশীল হবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। কারণ, পিসিআরে একটি বিবর্ধন ধাপ আছে, ফলে তা (নমুনায়) ভাইরাসের জেনেটিক মেটেরিয়াল পরিমাণে খুব সামান্য হলেও শনাক্ত করতে পারে।” [হেলথ, ১১ মে, ২০২০]।
সেনসিটিভিটির মানদ-ে আরটি-পিসিআরের চেয়ে কিছুটা নি¤œমার্গের হলেও এন্টিজেন টেস্টে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায় যে বিপুল গতি সঞ্চারের সম্ভাবনা নিহিত, তার কারণে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যে এ পদ্ধতির ব্যাপারে ব্যাপক উচ্ছাস দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক ও বিশেষজ্ঞের মন্তব্য উদ্ধৃত করা হল। গত এপ্রিলে হোয়াইট হাউজ করোনাভাইরাস টাস্কফোর্সের প্রধান ডা. দেবোরাহ বার্ক্স এক ব্রিফিংয়ে বলেন: “নিউক্লিয়িক এসিড টেস্টের মাধ্যমে দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন পরীক্ষা করা কিংবা কাজে বা স্কুলে ফেরার পূর্বে প্রতিটি ব্যক্তিকে পরীক্ষার আওতায় আনার সামর্থ্য অর্জন কখনই সম্ভবপর হবে না। তবে, এন্টিজেন টেস্টের মাধ্যমে এটা সম্ভবপর হতে পারে।” [সিবিএস নিউজ, ০৯ মে, ২০২০]। ইউএস এফডিএ করোনাভাইরাস শনাক্তকরণের জন্যে প্রথমবারের মত কোনো এন্টিজেন টেস্টিং কিট হিসেবে কুইডেল কর্পোরেশনের ঝড়ভরধ ২ ঝঅজঝ অহঃরমবহ ঋওঅ নামীয় কিটের জরুরি অনুমোদন (ঊটঅ) দেয়; এ প্রসঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায় হার্ভার্ড গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. আশীষ ঝা বলেন, “এন্টিজেন টেস্টিং-এর ব্যাপারে আমি খুবই উচ্ছসিত, কারণ এ পদ্ধতিতে দৈনিক টেস্টের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে উন্নীত করার সামর্থ্য রয়েছে। তাছাড়া এতে অনেক দ্রুত গতিতে কাজ হবে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেকেই এ মুহূর্তটির প্রতীক্ষায় ছিলাম।” [দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, ০৯ মে, ২০২০]। সাবেক এফডিএ প্রধান স্কট গটলিয়েভ এ অনুমোদনকে “সত্যিকারের গেম-চেঞ্জার” বলে অভিহিত করেন। [ফরচুন, ১১ মে, ২০২০]।
এন্টিবডি টেস্টিং করোনাভাইরাসের চলমান সংক্রমণ শনাক্তকরণে ব্যবহার করা না গেলেও ভিন্ন আঙ্গিকে এটি করোনা সংক্রমণের শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো ব্যক্তি পূর্বে সংক্রমিত হয়েছিল কিনা এই টেস্টের মাধ্যমে আমরা তা নির্ধারণ করতে পারি। বিপরীতে আরটি-পিসিআর ও এন্টিজেন টেস্ট কেবল চলমান সংক্রমন শনাক্ত করতে পারে, কোনো ব্যক্তি পূর্বে সংক্রমিত হয়েছিল কিনা এ ব্যাপারে এ দুটি পদ্ধতি কোনো ধারণা দিতে পারে না। [দ্য জনস হপকিনস সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি রিপোর্ট, ২২ এপ্রিল, ২০২০]। এ বিষয়টির দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। প্রথমত, এন্টিবডি তৈরি মূলত অণুজীবের বিরুদ্ধে শরীরের প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়ার একটি অংশ। কাজেই, কোনো ব্যক্তির শরীরে করোনা-বিরোধী এন্টিবডি শনাক্ত হলে আপনি ধরে নিতে পারেন তার মধ্যে একরকম প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে যা তাকে পুনঃসংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে। এ বিষয়টি একজন ব্যক্তিকে নির্ভয়ে তার কাজে ফিরতে উৎসাহ যোগাতে পারে। এটি ডাক্তার, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তাদের সবসময় রোগী নিয়ে কাজ করতে হয় বলে তারা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। তবে সাধারণভাবে বিষয়টি সত্য হলেও এন্টিবডি তৈরির ফলে পুনরায় করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিরুদ্ধে কতটুকু প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জিত হয় এবং তা কতদিন স্থায়ী হতে পারে এ বিষয়ে এখনো সম্যক ধারণা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হেলথকেয়ার কোম্পানি গ্র্যান্ড রাউন্ডস-এর মেডিকেল ডিরেক্টর রোগতত্ত্ববিদ ডা. তিস্তা ঘোষের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্যঃ “তত্ত্বগতভাবে, একজন ব্যক্তির শরীরে এ ধরনের এন্টিবডি পাওয়া গেলে তার পুনঃসংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে কতটুকু প্রতিরোধক্ষমতা অর্জিত হয় কিংবা তা কতদিন স্থায়ী হতে পারে তা আমরা এখনো জানি না।” [তথ্যসূত্রঃ বিজনেস ইনসাইডার, ০৯ মে, ২০২০]। কিছু দেশ যেসব লোকের দেহে করোনা-বিরোধী এন্টিবডি পাওয়া গেছে তাদেরকে ‘রসসঁহরঃু ঢ়ধংংঢ়ড়ৎঃ’ বা ‘ৎরংশ-ভৎবব পবৎঃরভরপধঃব’ ইস্যুর কথা ভাবছিল, যাতে তারা এখানে সেখানে যেতে পারেন কিংবা কাজে ফিরতে পারেন। ২৪ এপ্রিল ২০২০ তারিখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এক সায়েন্টিফিক ব্রিফে এ প্রসঙ্গে সতর্কবাণী দিয়ে বলে, “এখন পর্যন্ত যেসব লোক ঈড়ারফ-১৯ থেকে সেরে উঠেছেন এবং শরীরে এন্টিবডি তৈরি হয়েছে, তারা পুনঃ সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত থাকবেন এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”
এন্টিবডি টেস্টিং-এর দ্বিতীয় ও সম্ভবত অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, যেহেতু এন্টিবডি টেস্টিং-এর মাধ্যমে, উপসর্গ দেখা দিয়ে থাকুক বা না থাকুক, অতীতে সংক্রমিত হয়েছে এমন সবাইকেই শনাক্ত করা সম্ভব, দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাছাই করে জনসাধারণের অংশবিশেষের উপর পরীক্ষা চালিয়ে কোনো একটি জায়গায় সংক্রমণের ব্যাপ্তির সঠিক চিত্র পাওয়া সম্ভব। এ ধরনের পরীক্ষাকে সেরোসার্ভে (ংবৎড়ংঁৎাবু) বলা হয়ে থাকে। এরকম পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংক্রমণের ব্যাপকতার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে এবং সে মোতাবেক সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যার জন্য সক্রিয় পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব। বিশেষ করে সংক্রমণের “হট স্পটগুলো” চিহ্নিত করা গেলে প্রাধিকার ভিত্তিতে ওখানে মনোযোগ নিবদ্ধ করা সম্ভবপর হবে। সম্প্রতি ভারতীয় রাজ্যসমূহের উদ্দেশ্যে দেয়া এক নির্দেশনায় ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর) উল্লেখ করে, “(জনসাধারণের মধ্যে) সংক্রমণের বিপরীতে সৃষ্ট এন্টিবডির ব্যাপকতার মাত্রার (ষবাবষ ড়ভ ংবৎড়-ঢ়ৎবাধষবহপব) উপর ভিত্তি করে রোগের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নিমিত্তে জনস্বাস্থ্যের জন্য যথাযথ পদক্ষেপের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। মাঝে মাঝে সেরোসার্ভে পরিচালনা করলে তা নীতিনির্ধারকদের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করবে।” [তথ্যসূত্রঃ দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩০ মে, ২০২০]
এখানে এন্টিবডি টেস্টের আরেকটি সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ না করলে এ আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২৪ এপ্রিল, ২০২০ এর সায়েন্টিফিক ব্রিফ অনুসারে, করোনা পরিবারের অন্যান্য ভাইরাস, যারা সাধারণ সর্দি-কাশি, সার্স এবং মার্সের জন্য দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মানবদেহে যেসব এন্টিবডি তৈরি হয় তারা সার্স-কোভ-২ (অর্থাৎ নভেল করোনাভাইরাস)-এর বিরুদ্ধে সৃষ্ট এন্টিবডির সাথে ক্রস-রিঅ্যাক্ট (পৎড়ংং-ৎবধপঃ) করতে পারে। অর্থাৎ এই টেস্ট ভুলক্রমে সমগোত্রীয় অন্য কোনো করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে সৃষ্ট এন্টিবডিকে নভেল করোনা ভাইরাসের এন্টিবডি হিসেবে শনাক্ত করে ভধষংব রেজাল্ট দিতে পারে। বিভিন্ন রিপোর্টে দেখা যায়, বিশ্ববাজার এরকম বহু ত্রুটিপূর্ণ কিটে সয়লাব হয়ে গেছে। একারণে টেস্টিং কিটটি যথেষ্ট স্পেসিফিক কিনা তা ভালভাবে পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন আছে। সম্প্রতি সুইস ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি রোশে একটি টেস্টিং কিট বাজারে এনেছে, যেটা তাদের দাবি অনুযায়ী পজিটিভ কেসের ক্ষেত্রে ১০০% এবং নেগেটিভ কেসের ক্ষেত্রে ৯৯.৮% সঠিক ফলাফল দিতে সক্ষম। ইউএস এফডিএ সহ বিভিন্ন দেশের রেগুলেটরি অথরিটি ইতোমধ্যে বেশ কিছু এন্টিবডি টেস্টিং কিটের অনুমোদন দিয়েছে।
করোনাভাইরাস মহামারীর প্রলয়ঙ্কর ছোবলের মুখে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে দেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে আগাচ্ছে। করোনাভাইরাস রোগী শনাক্তকরণ ও ব্যবস্থাপনায় অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে, সংক্রমণের হার দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। আমরা যদি উপসর্গযুক্ত বা উপসর্গবিহীন সকল সংক্রমিত ব্যক্তিকে দ্রুত শনাক্ত করে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে না পারি, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বর্তমানে অনুসৃত পিসিআর পদ্ধতিতে আমাদের যত সংখ্যক টেস্ট করার সামর্থ্য আছে তা দিয়ে আমরা সুস্পষ্ট উপসর্গ আছে এমন লোকদেরকেই শনাক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছি, অথচ সংক্রমণের বিস্তার রোধ করতে হলে আমাদের উপসর্গ নাই এমন লোকাদেরকেও শনাক্ত করা প্রয়োজন। এমতাবস্থায়, সমাজের বিস্তৃত পরিসরে ব্যাপকভিত্তিক শনাক্তকরণ কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যে আমাদের টেস্টিং সামর্থ্য আরও বাড়ানোর জন্য আরটি-পিসিআর পদ্ধতির পরিপূরক হিসেবে জরুরি ভিত্তিতে এন্টিজেন ও এন্টিবডি ভিত্তিক টেস্টিং-এ যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। করোনাভাইরাসকে পরাভূত করতে হলে আমাদেরকে করোনার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছুটতে হবে। সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সিদ্ধান্তহীনতা কিংবা বিলম্বিত সিদ্ধান্তের জন্য দীর্ঘ পরিসরে অনেক বেশি মূল্য দিতে হতে পারে।
লেখক : অধ্যাপক এবং ছাত্র উপদেষ্টা, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Please follow and like us: