ঢাকা ০৫:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ইউনেস্কো পুরস্কার, বিজ্ঞপ্তি ও ভুলভ্রান্তি সমাচার

  • আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মার্চ ২০২৪
  • ৪৬ বার পড়া হয়েছে

বিপ্লব কুমার পাল : পুরস্কার পেতে কার না ভালো লাগে। সেটি হোক স্কুল-কলেজে প্রতিযোগিতার পুরস্কার। কিংবা পাড়ার কোনও সংগঠনকে টাকা দেওয়ার পর পাওয়া পুরস্কার। আর ভালো কাজ করায় রাষ্ট্র যদি পুরস্কার দেয় তাহলে তো কথাই নেই। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পেতে শত শত আবেদন পড়ে। বাছাই করতে সরকারের রীতিমত ঘাম ঝরে যায়। যারা পুরস্কার পান তারা বা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষিরা খুশি হন। আর যারা এসব পদক পান না তাদের শুভানুধ্যায়ীরা বেজায় রুষ্ট হন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ ঝাড়েন।
দেশের ভেতরে পদক বা পুরস্কারের পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে কথা হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু দেশের বাইরের কোনও পুরস্কার কেউ পেলে সমস্বরে সবাই খুশি হন। যেটি হোক কোনও চলচ্চিত্রের জন্য বা অন্য কোনও সেবামূলক কাজের। আর নোবেল পুরস্কার? বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পদক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নোবেল পুরস্কার একবারই অর্জন হয়েছে। ২০০৬ সালে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের মানুষ খুশি হয়েছিল। ড. ইউনূসকে নাগরিক সংবর্ধনাও দিয়েছিল রাষ্ট্র।
১৯৭৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ড. ইউনূস জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ প্রায় ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করেছেন। আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬২টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেছেন তিনি। সারাজীবন মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে কারও কারও কপালে একটি পুরস্কারও জোটে না। সেক্ষেত্রে ড. ইউনূস খুবই ভাগ্যবান। তিনি একমাত্র বাংলাদেশি যিনি নোবেলসহ সর্বোচ্চ সংখ্যক পুরস্কার অর্জন করেছেন।
ড. ইউনূসের পুরস্কার পাওয়া এই লম্বা তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার। এই অর্জন নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ইউনূস সেন্টারের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি দাবি করা হয়েছে– ড. ইউনূস ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার পেয়েছেন। যদিও কিছু গণমাধ্যম প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে – ড. ইউনূস ইউনেস্কোর কোনও পুরস্কার পাননি। শিক্ষামন্ত্রীও একই দাবি করায় সারাদেশে এনিয়ে শোরগোল পড়ে গেছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে ড. ইউনূস কি ইউনেস্কোর পুরস্কার পাননি? ইউনূস সেন্টার মিথ্যাচার করছে? ড. ইউনূসের ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করার পর আবার পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া নিয়ে বিতর্ক কেন? পুরস্কার নিয়ে ড. ইউনূসের প্রতারণা নাকি ইউনূস সেন্টার মিথ্যাচার? সরকারের মন্ত্রীরা অহেতুক বিতর্ক তুলেছেন? এমন অসংখ্য প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। আসুন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। প্রথমে আলোচনা হোক পুরস্কার পাওয়া নিয়ে। ইউনেস্কোর মতো মর্যাদাপূর্ণ সংস্থার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেই সে খবর ঝড়ের বেগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। চলে আগাম অভিনন্দন জানানো। কিন্তু ড. ইউনূসের এবারের ইউনেস্কোর পুরস্কার পাওয়া নিয়ে আগাম কোনও খবর জানা যায়নি। কিংবা পুরস্কার পাওয়ার পরও বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কোথাও সেই খবরটি দেখা যায়নি। ২১ মার্চ প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের “ইউনূস সেন্টার”। বিজ্ঞপ্তি পেয়ে তা ঢালাওভাবে প্রকাশ করে বেশিরভাগ গণমাধ্যম। ব্যস! এরপরই সারাদেশের মানুষ জেনে গেলে ড. ইউনূস আবারও পুরস্কার পেয়েছেন। ইউনূস সেন্টারের বিজ্ঞপ্তির শিরোনাম ছিল ‘একাদশ গ্লোবাল বাকু কনফারেন্সে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে প্রফেসর ইউনূসের বিশেষ ভাষণ, ইউনেস্কা থেকে “দি ট্রি অব পিস” পুরস্কার গ্রহণ।” কিন্তু বিজ্ঞপ্তির ছয় প্যারা পর্যন্ত এবিষয়ে কিছু লেখা ছিল না। ছয় প্যারোর পর লেখা হয়েছে– ‘একাদশ গ্লোবাল বাকু সম্মেলনের শেষ দিনে প্রফেসর ইউনূসকে ইউনেস্কার “দি ট্রি অব পিস” পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী নৈশ ভোজে তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেয়া হয়।’

সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটিই সবার প্রথমে অর্থাৎ ভূমিকায় লেখা হয়। অথচ পুরস্কার পাওয়ার এই তথ্যটি পেতে বড় বড় ছয়টি প্যারা অতিক্রম করতে হয়েছে। গণমাধ্যম কিন্তু এই ভুলটি করেনি, সংবাদের ইন্ট্রো বা ভূমিকাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি অর্থাৎ পুরস্কার পাওয়া খবরটি লিখেছে। তাহলে ইউনূস সেন্টার কেন, পুরস্কার পাওয়ার তথ্যটি এত নিচে লিখলেন। তারা কি জানতেন– এটি ইউনেস্কো পুরস্কার নয়, মেমোন্টো মাত্র?
ড. ইউনূস ইউনেস্কো পুরস্কার পাননি এমন খবর প্রকাশ করে বেশি কয়েকটি গণমাধ্যম। শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী একই দাবি করে সাংবাদিকদের জানান, ‘ইউনূস সেন্টার ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বরাত দিয়ে এই যে পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইউনেসকোর পুরস্কারের কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে।’
পুরস্কার বিতর্ক নিয়ে প্রথম জবাব দেন ড. ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ–আল–মামুন, যিনি ইউনূসকে মহাসমুদ্র মনে করেন। সেই আইনজীবী ২৮ মার্চ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেই অনুষ্ঠানে থেকে ড. ইউনূস প্রেস রিলিজ (সংবাদ বিজ্ঞপ্তি) পাঠিয়েছেন? এখান থেকে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি একজন কেরানি টাইপের কোনও ব্যক্তি হয়তো দিয়েছেন, সেখানে হয়তোবা ভুলভ্রান্তি হতে পারে। অথচ এটাকে বলা হচ্ছে প্রতারণা, যা দুঃখজনক।’
ড. ইউনূসের আইনজীবীও স্বীকার করেছেন ইউনেস্কো পুরস্কার নিয়ে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তিনি বলেছেন- ইউনূস সেন্টারের কেরানি টাইপের কোনও ব্যক্তির লেখা প্রেস বিজ্ঞপ্তির কারণে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এক প্রকার তিনিও স্বীকার করে নিয়েছেন ইউনেস্কো পুরস্কার ড. ইউনূস পাননি। তবে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বক্তব্য রেখেছেন।

ড. ইউনূসের আইনজীবীর ভুলভ্রান্তি হতে পারে বলার কয়েক ঘণ্টা পর আবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ইউনূস সেন্টার। সেখানে বলা হয় ড. ইউনূসকে আজারবাইজানের বাকুতে ১৪-১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত একাদশ বিশ্ব বাকু ফোরামে বিশেষ বক্তা হিসেবে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাকু ফোরামের আয়োজক নিজামি গানজাভি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের মহাসচিব রভশান মুরাদভ অধ্যাপক ইউনূসকে পাঠানো ই-মেইলে জানান, এ সম্মেলনে বক্তব্য রাখা ছাড়াও এর সমাপনী দিনে অধ্যাপক ইউনূসকে ইউনেসকো–প্রদত্ত একটি পুরস্কার প্রদান করা হবে।
“ট্রি অব পিস” প্রদান বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের বক্তব্যে শুধু বলা হয়েছে ভাষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিংবা পুরস্কার প্রদান করা হবে, পুরস্কার গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ হবে, হচ্ছে মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইউনূস সেন্টার বলছে- ‘নিজামী গানজাভি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার থেকে প্রফেসর ইউনূসকে পাঠানো বাকু ফোরামের অফিসিয়াল প্রোগ্রামেও প্রফেসর ইউনূস ইউনেস্কো’র পুরস্কার গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ আছে। প্রফেসর ইউনূসকে বাকু ফোরামের সমাপনী ডিনারে যোগদানের বিষয়টি বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যাতে তিনি “ট্রি অব পিস” পুরস্কারটি গ্রহণের জন্য স্টেজে সশরীরে উপস্থিত থাকেন। ইউনূস সেন্টার একারণে তার প্রেস রিলিজে ইউনেস্কোর পুরস্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে।’
অনুষ্ঠান হবে, পুরস্কার দেবে, ডিনার হবে এমন চিঠির প্রেক্ষিতে প্রমাণিত হয় না যে, অনুষ্ঠান হয়েছে, তিনি পুরস্কার পেয়েছেন, ডিনার হয়েছে। কোনও কারণে সেটি নাও হতে পারে, বাতিল হতে পারে। অনুষ্ঠান ‘হয়েছে’, পুরস্কার ‘পেয়েছেন’ ডিনার ‘হয়েছে’ তবেই বলা যেতে পারে পেয়েছেন-হয়েছে। ইউনূস সেন্টার বলতে পারেনি, ড. ইউনূসের হাতে ইউনেস্কো পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে অমুক অমুক অতিথি ছিলেন, সেখানে আরও অমুককে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পুরস্কার বিতরণের কোনও ছবিও প্রকাশ করতে পারেনি ইউনূস সেন্টার। ইউনেস্কো ওয়েবসাইটে ড. ইউনূসের পুরস্কার দেওয়ার তথ্য ও ছবি নেই।

ইউনূস সেন্টার বলছে– “প্রফেসর ইউনূসকে প্রদত্ত “ট্রি অব পিস” ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রদত্ত একই ভাস্করের একই ভাস্কর্য।” একই দেখতে হলে সেটি একই পদক হয়? নোবেল প্রাইজের মতো দেখতে কোনও পদক যদি কাউকে দেওয়া হয় তখন কি তিনি বলতে পারবেন, এই পদকটি ড. ইউনূস পেয়েছেন?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

ইউনেস্কো পুরস্কার, বিজ্ঞপ্তি ও ভুলভ্রান্তি সমাচার

আপডেট সময় : ০৯:৫৩:৫১ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ৩১ মার্চ ২০২৪

বিপ্লব কুমার পাল : পুরস্কার পেতে কার না ভালো লাগে। সেটি হোক স্কুল-কলেজে প্রতিযোগিতার পুরস্কার। কিংবা পাড়ার কোনও সংগঠনকে টাকা দেওয়ার পর পাওয়া পুরস্কার। আর ভালো কাজ করায় রাষ্ট্র যদি পুরস্কার দেয় তাহলে তো কথাই নেই। বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক পেতে শত শত আবেদন পড়ে। বাছাই করতে সরকারের রীতিমত ঘাম ঝরে যায়। যারা পুরস্কার পান তারা বা তাদের শুভাকাঙ্ক্ষিরা খুশি হন। আর যারা এসব পদক পান না তাদের শুভানুধ্যায়ীরা বেজায় রুষ্ট হন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ক্ষোভ ঝাড়েন।
দেশের ভেতরে পদক বা পুরস্কারের পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে কথা হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু দেশের বাইরের কোনও পুরস্কার কেউ পেলে সমস্বরে সবাই খুশি হন। যেটি হোক কোনও চলচ্চিত্রের জন্য বা অন্য কোনও সেবামূলক কাজের। আর নোবেল পুরস্কার? বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পদক পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে নোবেল পুরস্কার একবারই অর্জন হয়েছে। ২০০৬ সালে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এই পুরস্কার পাওয়া বাংলাদেশের মানুষ খুশি হয়েছিল। ড. ইউনূসকে নাগরিক সংবর্ধনাও দিয়েছিল রাষ্ট্র।
১৯৭৮ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ড. ইউনূস জাতীয় ও আন্তর্জাতিকসহ প্রায় ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করেছেন। আর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬২টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেছেন তিনি। সারাজীবন মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে কারও কারও কপালে একটি পুরস্কারও জোটে না। সেক্ষেত্রে ড. ইউনূস খুবই ভাগ্যবান। তিনি একমাত্র বাংলাদেশি যিনি নোবেলসহ সর্বোচ্চ সংখ্যক পুরস্কার অর্জন করেছেন।
ড. ইউনূসের পুরস্কার পাওয়া এই লম্বা তালিকায় এবার যুক্ত হয়েছে ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার। এই অর্জন নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক। ইউনূস সেন্টারের পাঠানো বিজ্ঞপ্তি দাবি করা হয়েছে– ড. ইউনূস ইউনেস্কোর ‘ট্রি অব পিস’ পুরস্কার পেয়েছেন। যদিও কিছু গণমাধ্যম প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে – ড. ইউনূস ইউনেস্কোর কোনও পুরস্কার পাননি। শিক্ষামন্ত্রীও একই দাবি করায় সারাদেশে এনিয়ে শোরগোল পড়ে গেছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে ড. ইউনূস কি ইউনেস্কোর পুরস্কার পাননি? ইউনূস সেন্টার মিথ্যাচার করছে? ড. ইউনূসের ১৪৫টি পুরস্কার অর্জন করার পর আবার পুরস্কার পাওয়া না পাওয়া নিয়ে বিতর্ক কেন? পুরস্কার নিয়ে ড. ইউনূসের প্রতারণা নাকি ইউনূস সেন্টার মিথ্যাচার? সরকারের মন্ত্রীরা অহেতুক বিতর্ক তুলেছেন? এমন অসংখ্য প্রশ্ন ওঠাও স্বাভাবিক। আসুন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি। প্রথমে আলোচনা হোক পুরস্কার পাওয়া নিয়ে। ইউনেস্কোর মতো মর্যাদাপূর্ণ সংস্থার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেই সে খবর ঝড়ের বেগে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়। চলে আগাম অভিনন্দন জানানো। কিন্তু ড. ইউনূসের এবারের ইউনেস্কোর পুরস্কার পাওয়া নিয়ে আগাম কোনও খবর জানা যায়নি। কিংবা পুরস্কার পাওয়ার পরও বাংলাদেশে গণমাধ্যমের কোথাও সেই খবরটি দেখা যায়নি। ২১ মার্চ প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের “ইউনূস সেন্টার”। বিজ্ঞপ্তি পেয়ে তা ঢালাওভাবে প্রকাশ করে বেশিরভাগ গণমাধ্যম। ব্যস! এরপরই সারাদেশের মানুষ জেনে গেলে ড. ইউনূস আবারও পুরস্কার পেয়েছেন। ইউনূস সেন্টারের বিজ্ঞপ্তির শিরোনাম ছিল ‘একাদশ গ্লোবাল বাকু কনফারেন্সে বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশ্যে প্রফেসর ইউনূসের বিশেষ ভাষণ, ইউনেস্কা থেকে “দি ট্রি অব পিস” পুরস্কার গ্রহণ।” কিন্তু বিজ্ঞপ্তির ছয় প্যারা পর্যন্ত এবিষয়ে কিছু লেখা ছিল না। ছয় প্যারোর পর লেখা হয়েছে– ‘একাদশ গ্লোবাল বাকু সম্মেলনের শেষ দিনে প্রফেসর ইউনূসকে ইউনেস্কার “দি ট্রি অব পিস” পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপনী নৈশ ভোজে তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেয়া হয়।’

সাধারণত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটিই সবার প্রথমে অর্থাৎ ভূমিকায় লেখা হয়। অথচ পুরস্কার পাওয়ার এই তথ্যটি পেতে বড় বড় ছয়টি প্যারা অতিক্রম করতে হয়েছে। গণমাধ্যম কিন্তু এই ভুলটি করেনি, সংবাদের ইন্ট্রো বা ভূমিকাতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি অর্থাৎ পুরস্কার পাওয়া খবরটি লিখেছে। তাহলে ইউনূস সেন্টার কেন, পুরস্কার পাওয়ার তথ্যটি এত নিচে লিখলেন। তারা কি জানতেন– এটি ইউনেস্কো পুরস্কার নয়, মেমোন্টো মাত্র?
ড. ইউনূস ইউনেস্কো পুরস্কার পাননি এমন খবর প্রকাশ করে বেশি কয়েকটি গণমাধ্যম। শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী একই দাবি করে সাংবাদিকদের জানান, ‘ইউনূস সেন্টার ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বরাত দিয়ে এই যে পুরস্কারের কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইউনেসকোর পুরস্কারের কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা হয়েছে।’
পুরস্কার বিতর্ক নিয়ে প্রথম জবাব দেন ড. ইউনূসের আইনজীবী আবদুল্লাহ–আল–মামুন, যিনি ইউনূসকে মহাসমুদ্র মনে করেন। সেই আইনজীবী ২৮ মার্চ সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেই অনুষ্ঠানে থেকে ড. ইউনূস প্রেস রিলিজ (সংবাদ বিজ্ঞপ্তি) পাঠিয়েছেন? এখান থেকে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি একজন কেরানি টাইপের কোনও ব্যক্তি হয়তো দিয়েছেন, সেখানে হয়তোবা ভুলভ্রান্তি হতে পারে। অথচ এটাকে বলা হচ্ছে প্রতারণা, যা দুঃখজনক।’
ড. ইউনূসের আইনজীবীও স্বীকার করেছেন ইউনেস্কো পুরস্কার নিয়ে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। তিনি বলেছেন- ইউনূস সেন্টারের কেরানি টাইপের কোনও ব্যক্তির লেখা প্রেস বিজ্ঞপ্তির কারণে ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এক প্রকার তিনিও স্বীকার করে নিয়েছেন ইউনেস্কো পুরস্কার ড. ইউনূস পাননি। তবে সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বক্তব্য রেখেছেন।

ড. ইউনূসের আইনজীবীর ভুলভ্রান্তি হতে পারে বলার কয়েক ঘণ্টা পর আবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ইউনূস সেন্টার। সেখানে বলা হয় ড. ইউনূসকে আজারবাইজানের বাকুতে ১৪-১৬ মার্চ অনুষ্ঠিত একাদশ বিশ্ব বাকু ফোরামে বিশেষ বক্তা হিসেবে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাকু ফোরামের আয়োজক নিজামি গানজাভি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারের মহাসচিব রভশান মুরাদভ অধ্যাপক ইউনূসকে পাঠানো ই-মেইলে জানান, এ সম্মেলনে বক্তব্য রাখা ছাড়াও এর সমাপনী দিনে অধ্যাপক ইউনূসকে ইউনেসকো–প্রদত্ত একটি পুরস্কার প্রদান করা হবে।
“ট্রি অব পিস” প্রদান বিষয়ে ইউনূস সেন্টারের বক্তব্যে শুধু বলা হয়েছে ভাষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে কিংবা পুরস্কার প্রদান করা হবে, পুরস্কার গ্রহণ করবেন। অর্থাৎ হবে, হচ্ছে মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ইউনূস সেন্টার বলছে- ‘নিজামী গানজাভি ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার থেকে প্রফেসর ইউনূসকে পাঠানো বাকু ফোরামের অফিসিয়াল প্রোগ্রামেও প্রফেসর ইউনূস ইউনেস্কো’র পুরস্কার গ্রহণ করবেন বলে উল্লেখ আছে। প্রফেসর ইউনূসকে বাকু ফোরামের সমাপনী ডিনারে যোগদানের বিষয়টি বিশেষভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয় যাতে তিনি “ট্রি অব পিস” পুরস্কারটি গ্রহণের জন্য স্টেজে সশরীরে উপস্থিত থাকেন। ইউনূস সেন্টার একারণে তার প্রেস রিলিজে ইউনেস্কোর পুরস্কারের বিষয়টি উল্লেখ করে।’
অনুষ্ঠান হবে, পুরস্কার দেবে, ডিনার হবে এমন চিঠির প্রেক্ষিতে প্রমাণিত হয় না যে, অনুষ্ঠান হয়েছে, তিনি পুরস্কার পেয়েছেন, ডিনার হয়েছে। কোনও কারণে সেটি নাও হতে পারে, বাতিল হতে পারে। অনুষ্ঠান ‘হয়েছে’, পুরস্কার ‘পেয়েছেন’ ডিনার ‘হয়েছে’ তবেই বলা যেতে পারে পেয়েছেন-হয়েছে। ইউনূস সেন্টার বলতে পারেনি, ড. ইউনূসের হাতে ইউনেস্কো পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে অমুক অমুক অতিথি ছিলেন, সেখানে আরও অমুককে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। পুরস্কার বিতরণের কোনও ছবিও প্রকাশ করতে পারেনি ইউনূস সেন্টার। ইউনেস্কো ওয়েবসাইটে ড. ইউনূসের পুরস্কার দেওয়ার তথ্য ও ছবি নেই।

ইউনূস সেন্টার বলছে– “প্রফেসর ইউনূসকে প্রদত্ত “ট্রি অব পিস” ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রদত্ত একই ভাস্করের একই ভাস্কর্য।” একই দেখতে হলে সেটি একই পদক হয়? নোবেল প্রাইজের মতো দেখতে কোনও পদক যদি কাউকে দেওয়া হয় তখন কি তিনি বলতে পারবেন, এই পদকটি ড. ইউনূস পেয়েছেন?
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী