ঢাকা ১১:১৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ৯ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আহারে জীবন!

  • আপডেট সময় : ১০:১৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ মে ২০২৩
  • ২৬৬ বার পড়া হয়েছে

ফারজানা কাশেমী : বঙ্গবাজারে নাম না জানা লেহেঙ্গার দোকানে রিপন নামের একটা ছোট ছেলে কাজ করতো। তার ভীষন শখ হয়েছিল বড় বোনের বিয়ের জন্য সে একখানা লেহেঙ্গা নিবে। সাহস করে একদিন সে যেই দোকানে কর্মরত সেই দোকান মালিককে বললো ঈদের পর তার বড় বোনের বিয়ে সে একখানা লেহেঙ্গা নিতে চায়। বেতন, বোনাস আর পরবর্তী মাসের বেতন থেকে সে লেহেঙ্গার দাম পরিশোধ করবে মর্মে দোকান মালিককে জানায়। দোকান মালিক হেসে প্রতিউত্তরে জানিয়েছিল টাকা লাগবে না,যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে যাস।
রিপন নামের ছেলেটা অভাবে অথবা দায়ে পরে কিংবা দুভ্যাগের যাতাকলে, দারিদ্র্য, দুর্দশায় এই বয়সে চাকরির যোগান দিয়েছিল। ছেলেটা প্রতিরাতে দোকানে ঘুমাতো। যেদিন বঙ্গবাজারে আগুন লেগেছে সেই দিন থেকে ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লেহেঙ্গা পোড়া ছাই এর সাথে হয়তো রিপন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।পৃথকভাবে রিপনের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এভাবে কালের নিয়মে রিপন হারিয়ে যায় অজানায়। কেউ হয়তো রিপনকে খুঁজে পাওয়া বৃথা চেষ্টা করে। রিপনের জন্য তার পুরো পরিবার কাঁদছে। সাধারণ মানুষ রিপনের জন্য ব্যাথাতুর হচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া নিয়মে রিপন পথহারা। রিপন কোনদিন ফিরবে না। স্বপ্নভাঙ্গার বিকট চিৎকারের নাম। আহাজারির প্রতিচ্ছবি রিপন। রিপন কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়। কিশোর রিপন আলোর উৎসবের শিখা নয়। রিপন এক কাপড় পোড়া ছাই। ছেলেটা হয়তো দুখের রঙ। স্বপ্ন ভাঙ্গার প্রতিকৃতি। রিপন নামের ছেলেটা হেরে যাওয়া এক মানুষ। রিপনের জন্ম হয়েছে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় নিস্পেষিত হবার জন্য। রিপনের আকুতি, আর্তচিৎকার, কান্না সমাজের উচ্চবর্গের নিকট সবিনয়ে উপস্থাপিত হয় না। রিপন সময়ের স্বাক্ষী হয় না। এ জাতীয় মানুষের পরিচয়ে ডাক, ঢোল পিটানোর প্রয়োজন হয় না। রিপন হয়তো কোন কুলীন বংশে জন্মায়নি। রিপনের পৃথিবীতে আসা কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোন বিশেষ সংবাদ নয়। রিপনের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ মামলি বিষয় হয়তো। রিপন আমাদের ভাই, বন্ধু, স্বজন নয়। রিপনের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। তবে রিপনের অনুপস্থিতিতে আমাদের আবাসস্থল শুন্য হয় না, রিপনের দেহ ত্যাগে আমাদের ঘর ফাঁকা হয় না। তাই রিপন আমাদের চলমান সময়ের সাময়িক উপস্থিতি।
রিপন এক দারিদ্র্যতার নাম। দারিদ্র্যতা অপমানের সামিল। প্রবাদ প্রচলিত আছে দারিদ্র্যতা অভিশাপ। অভিশপ্ত গলিতে কেউ কখনো পা বাড়ায় না। অভিশাপের ছায়া সবাই এড়িয়ে যায়। রিপনের আগমন অযথা অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত। রিপন হয়তো অনার্য। সমাজ ব্যবস্থা শুধু আর্য শ্রেণী নিয়ে বাঁচে। রিপনের মামা যখন হন্নে হয়ে হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নেকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছিল কান্নারত কণ্ঠে সে বলেছিল রিপনের মাকে কি জবাব দেবো। জবাবদিহি বিহীন এই বিধি ব্যবস্থায় শোষিত শ্রেণী শুধু জবাবের ফেরি করে বাকি অংশ জবাবদিহি বিহীন এবং আয়েসি নিয়মে পরিচালিত যেন তাদের জন্য জবাব বিধিবহির্ভূত।
রিপন একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে বলেছিল-তার বড় বোন কোলে পিঠে করে তাকে বড় করছে তাই বোনের বিয়েতে ছোট ভাইটির সামান্যতম কিছু করার প্রয়াস ছিল। কৃতঘœ সামাজিক প্রথায় রিপন এক মানবিক গুনাবলীর প্রতিফলন । রিপন আজ শুধুই ছবি। শ্রেণী বিন্যাসের ফলাফলে রিপনের শ্রেণী, আমার শ্রেণী, আমাদের শ্রেণী ভিন্নতর। তাই রিপনের জীবনের নিরাপত্তা জোরদার করা বিশেষ গুরুত্ববহ নয়। রিপন এসেছো, কতশত রিপন আসবে আর কতশত রিপন হারিয়ে গেছে নিরুদ্দেশে তার হিসেব মহাকালের নিয়মে অজানা। তাইতো দিব্য উচ্চারণ-যে জীবন দোয়েলের, ফরিঙের; মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা……
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ

 

ট্যাগস :

যোগাযোগ

সম্পাদক : ডা. মোঃ আহসানুল কবির, প্রকাশক : শেখ তানভীর আহমেদ কর্তৃক ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার লার রোড, মতিঝিল থেকে মুদ্রিত ও ৫৬ এ এইচ টাওয়ার (৯ম তলা), রোড নং-২, সেক্টর নং-৩, উত্তরা মডেল টাউন, ঢাকা-১২৩০ থেকে প্রকাশিত। ফোন-৪৮৯৫৬৯৩০, ৪৮৯৫৬৯৩১, ফ্যাক্স : ৮৮-০২-৭৯১৪৩০৮, ই-মেইল : [email protected]
আপলোডকারীর তথ্য

আহারে জীবন!

আপডেট সময় : ১০:১৫:৫৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ মে ২০২৩

ফারজানা কাশেমী : বঙ্গবাজারে নাম না জানা লেহেঙ্গার দোকানে রিপন নামের একটা ছোট ছেলে কাজ করতো। তার ভীষন শখ হয়েছিল বড় বোনের বিয়ের জন্য সে একখানা লেহেঙ্গা নিবে। সাহস করে একদিন সে যেই দোকানে কর্মরত সেই দোকান মালিককে বললো ঈদের পর তার বড় বোনের বিয়ে সে একখানা লেহেঙ্গা নিতে চায়। বেতন, বোনাস আর পরবর্তী মাসের বেতন থেকে সে লেহেঙ্গার দাম পরিশোধ করবে মর্মে দোকান মালিককে জানায়। দোকান মালিক হেসে প্রতিউত্তরে জানিয়েছিল টাকা লাগবে না,যেটা পছন্দ সেটা নিয়ে যাস।
রিপন নামের ছেলেটা অভাবে অথবা দায়ে পরে কিংবা দুভ্যাগের যাতাকলে, দারিদ্র্য, দুর্দশায় এই বয়সে চাকরির যোগান দিয়েছিল। ছেলেটা প্রতিরাতে দোকানে ঘুমাতো। যেদিন বঙ্গবাজারে আগুন লেগেছে সেই দিন থেকে ছেলেটাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। লেহেঙ্গা পোড়া ছাই এর সাথে হয়তো রিপন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।পৃথকভাবে রিপনের জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। এভাবে কালের নিয়মে রিপন হারিয়ে যায় অজানায়। কেউ হয়তো রিপনকে খুঁজে পাওয়া বৃথা চেষ্টা করে। রিপনের জন্য তার পুরো পরিবার কাঁদছে। সাধারণ মানুষ রিপনের জন্য ব্যাথাতুর হচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়া নিয়মে রিপন পথহারা। রিপন কোনদিন ফিরবে না। স্বপ্নভাঙ্গার বিকট চিৎকারের নাম। আহাজারির প্রতিচ্ছবি রিপন। রিপন কোন কাল্পনিক চরিত্র নয়। কিশোর রিপন আলোর উৎসবের শিখা নয়। রিপন এক কাপড় পোড়া ছাই। ছেলেটা হয়তো দুখের রঙ। স্বপ্ন ভাঙ্গার প্রতিকৃতি। রিপন নামের ছেলেটা হেরে যাওয়া এক মানুষ। রিপনের জন্ম হয়েছে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতায় নিস্পেষিত হবার জন্য। রিপনের আকুতি, আর্তচিৎকার, কান্না সমাজের উচ্চবর্গের নিকট সবিনয়ে উপস্থাপিত হয় না। রিপন সময়ের স্বাক্ষী হয় না। এ জাতীয় মানুষের পরিচয়ে ডাক, ঢোল পিটানোর প্রয়োজন হয় না। রিপন হয়তো কোন কুলীন বংশে জন্মায়নি। রিপনের পৃথিবীতে আসা কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোন বিশেষ সংবাদ নয়। রিপনের মৃত্যুতে ক্ষতিপূরণ মামলি বিষয় হয়তো। রিপন আমাদের ভাই, বন্ধু, স্বজন নয়। রিপনের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। তবে রিপনের অনুপস্থিতিতে আমাদের আবাসস্থল শুন্য হয় না, রিপনের দেহ ত্যাগে আমাদের ঘর ফাঁকা হয় না। তাই রিপন আমাদের চলমান সময়ের সাময়িক উপস্থিতি।
রিপন এক দারিদ্র্যতার নাম। দারিদ্র্যতা অপমানের সামিল। প্রবাদ প্রচলিত আছে দারিদ্র্যতা অভিশাপ। অভিশপ্ত গলিতে কেউ কখনো পা বাড়ায় না। অভিশাপের ছায়া সবাই এড়িয়ে যায়। রিপনের আগমন অযথা অথবা অনাকাঙ্ক্ষিত। রিপন হয়তো অনার্য। সমাজ ব্যবস্থা শুধু আর্য শ্রেণী নিয়ে বাঁচে। রিপনের মামা যখন হন্নে হয়ে হারিয়ে যাওয়া ভাগ্নেকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করছিল কান্নারত কণ্ঠে সে বলেছিল রিপনের মাকে কি জবাব দেবো। জবাবদিহি বিহীন এই বিধি ব্যবস্থায় শোষিত শ্রেণী শুধু জবাবের ফেরি করে বাকি অংশ জবাবদিহি বিহীন এবং আয়েসি নিয়মে পরিচালিত যেন তাদের জন্য জবাব বিধিবহির্ভূত।
রিপন একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে বলেছিল-তার বড় বোন কোলে পিঠে করে তাকে বড় করছে তাই বোনের বিয়েতে ছোট ভাইটির সামান্যতম কিছু করার প্রয়াস ছিল। কৃতঘœ সামাজিক প্রথায় রিপন এক মানবিক গুনাবলীর প্রতিফলন । রিপন আজ শুধুই ছবি। শ্রেণী বিন্যাসের ফলাফলে রিপনের শ্রেণী, আমার শ্রেণী, আমাদের শ্রেণী ভিন্নতর। তাই রিপনের জীবনের নিরাপত্তা জোরদার করা বিশেষ গুরুত্ববহ নয়। রিপন এসেছো, কতশত রিপন আসবে আর কতশত রিপন হারিয়ে গেছে নিরুদ্দেশে তার হিসেব মহাকালের নিয়মে অজানা। তাইতো দিব্য উচ্চারণ-যে জীবন দোয়েলের, ফরিঙের; মানুষের সাথে তার হয় নাকো দেখা……
লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশ