The Daily Ajker Prottasha

অনন্যা সম্মাননা পেলেন যারা

0 0
Read Time:11 Minute, 30 Second

নারী ও শিশু প্রতিবেদন : এক মা একাই লিবিয়া থেকে হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে খুঁজে বের করে এনেছেন। আরেক সংগ্রামী নারী ‘পরচুলা’ বানিয়ে হাজারও নারীর জনপ্রতিনিধি হয়েছেন; কেউবা অর্থনীতি-বিজ্ঞানে অবদান রাখছেন।
সমাজের নানা ক্ষেত্রে এমন অনন্য সব অবদান ও দৃষ্টান্ত স্থাপনের স্বীকৃতি দিতে ১০ কৃতি নারীকে ‘অনন্যা শীর্ষদশ সম্মাননা ২০২১’ দিয়েছে নারীবিষয়ক ম্যাগাজিন পাক্ষিক অনন্যা।
গত শনিবার বিকালে বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে কৃতিমান এসব নারীদের হাতে সম্মাননা তুলে দেন জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পাক্ষিক অনন্যা ও দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেন। অনুষ্ঠানে স্পিকার বলেন, “বিভিন্ন বাধা, চ্যালেঞ্জ ও প্রতিবন্ধকতাকে পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যে অদম্য স্পৃহা সেটা তাদের এই সফলতার মূলে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে।
“বাংলাদেশে নারী শক্তি অনেক দূর এগিয়ে যাবে সেটাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কেননা আমরা তার অনেক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের চারপাশে দেখতে পাচ্ছি।” তাসমিমা হোসেন বলেন, নারীরা নিজের ঘরে নিজের কাজ করে আয় করে তাদের সংসার চালাচ্ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীরা কতটা এগিয়ে এসেছে সেটাই প্রমাণ করে এবং তার জন্য তারা প্রযুক্তির সহায়তা নিচ্ছে।
“এই পর্যন্ত অনন্যা শীর্ষ দশে ২৮০ জন নারীকে সম্মাননা দিয়েছে। তাদের মধ্যে অনেকে আজ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে রয়েছেন।”
১৯৯৩ সাল থেকে ‘অনন্যা শীর্ষ দশ সম্মাননা’ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বছর দেশের ১০ জন আলোকিত নারীকে তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য মনোনীত করা হয়।
অনুষ্ঠানে ‘অনন্যা শীর্ষ ১০ সম্মাননা’ পাওয়া নারীদের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রে কর্মক্ষেত্রে সাফল্য, কাজের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে অবদান এবং তাদের এ অবস্থানে আসার পেছনের সংগ্রাম তুলে ধরা হয়; পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দিয়ে আয়োজন শেষ হয়।
যারা হলেন সেরা অনন্যা:
অর্থনীতিবিদ নাজনীন আহমেদ: ১৯৯০ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এইচএসসিতে এবং ১৯৮৮ সালে যশোর শিক্ষা বোর্ডে এসএসসিতে সম্মিলিত মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করেন নাজনীন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি প্রথমে ‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগে (সিপিডি) যোগ দেন। বর্তমানে তিনি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট হিসেবে কর্মরত।
করপোরেট ব্যক্তিত্ব বিটপী দাশ চৌধুরী: বর্তমানে একটি মাল্টিন্যাশনাল ব্যাংকের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স এবং ব্র্যান্ড অ্যান্ড মার্কেটিংয়ে দায়িত্ব পালন করছেন বিটপী দাশ চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ এবং পরে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ও ফিন্যান্স নিয়ে দেশের বাইরে এমবিএ করেন। তিনি একটি ব্যাংকের মধ্যে নন-ব্যাংকিং কাজ করে থাকেন, যেখানে প্রতিটি দিন আসলে নতুন চ্যালেঞ্জ ও নতুন কর্মপরিকল্পনার।
মঞ্চাভিনেতা ও নির্দেশক ত্রপা মজুমদার: বাংলাদেশের মঞ্চ অভিনয়ের কিংবদন্তি শিল্পী দম্পত্বি ফেরদৌসী মজুমদার ও রামেন্দু মজুমদারের কন্যা ত্রপা মজুমদার সুনাম অর্জন করেছেন মঞ্চ অভিনয়ের পাশাপাশি নির্দেশনাতেও। থিয়েটারের ‘পোহালে শর্বরী’ নাটকটিতে বাবা রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে যৌথ নির্দেশনা দিয়েছেন ত্রপা। এর আগে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন লালন ফকিরের জীবনী- নাটক ‘বারামখানা’-তে। মার্কিন নাট্যকার লি ব্লেসিংয়ের ‘ইনডিপেনডেন্স’ অবলম্বনে ‘মুক্তি’ নাটকটিও নির্দেশনা দিয়েছেন ত্রপা।
অদম্য সাহসী শাহিনুর আক্তার: সন্তানের বিপদে মায়েদের মনে যেন বিস্ময়কর শক্তি সঞ্চারিত হয়। এমনই এক কাহিনীর স্রষ্টা ইয়াকুবের মা শাহিনুর আক্তার। তার ছেলে ইয়াকুব লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ হন। ছেলেকে উদ্ধারের জন্য কুমিল্লার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একা লিবিয়ায় ছুটে যান মা শাহিনুর। বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতায় মাফিয়াদের হাত থেকে ছেলেকে উদ্ধার করে আনেন এ সাহসী নারী।
বিজ্ঞানী সালমা সুলতানা: বাংলাদেশের গবাদি পশু খাতের প্রথম নারী উদ্যোক্তা, পেশাদার ট্রেইনার ও উন্নয়নকর্মী বিজ্ঞানী সালমা সুলতানা। ২০২১ সালে সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে ১০০ এশিয়ান বিজ্ঞানীদের তালিকায় তিনি অষ্টম স্থানে ছিলেন। সালমা বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি প্রাণিস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা প্রশিক্ষণকেন্দ্র মডেল লাইভস্টক অ্যাডভান্সমেন্ট ফাউন্ডেশন গড়ে তুলেছেন।
প্রযুক্তিবিদ রুদমীলা নওশীন: বাংলাদেশের স্কলাসটিকা থেকে ‘এ লেভেল’ শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান জোস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন করেন রুদমীলা নওশীন। পরে ডিজিটাল কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া বিষয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। কাজ করছেন ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবটিকস বিষয়ে।
আলোকচিত্রশিল্পী শাহরিয়ার ফারজানা: চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার মেয়ে শাহরিয়ার ফারজানা আলোকচিত্রে ইতোমধ্যে শতাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার জীবনের দুর্বিষহ সময়ে সবচেয়ে বড় বন্ধু হিসেবে হাজির হয় আলোকচিত্রশিল্প। প্রতি বছরই অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কারের বিরল পালক জমা হচ্ছে তার মুকুটে। ফটোগ্রাফি ছাড়াও শাহরিয়ার ফারজানা গত ৯ বছর ধরে ‘নারীকণ্ঠ’ নামের একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনায় যুক্ত রয়েছেন।
মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক সান্ত¡না রানী রায়: মার্শাল আর্ট কন্যা সান্ত¡না রানী রায় ২০১২ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত পাঁচটি আসরে স্বর্ণ জিতে নিজেকে সেরা প্রমাণ করেন। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ২০তম বিশ্ব তায়কোয়নদো প্রতিযোগিতায় তিনি ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করেন। ২০১৮ থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচটি ঘরোয়া প্রতিযোগিতা ও দুটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পাঁচটি স্বর্ণ এবং একটি করে রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছেন।
নারী উদ্যোক্তা ইছমত আরা: মোছাম্মত ইছমত আরার বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ীর নন্নী ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়ায়। একদিন বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পরচুলা তৈরির কারখানার সন্ধান পান তিনি। সেখানে ভর্তি হয়ে সেই কাজ রপ্ত করেন। তারপর নিজেই পরচুলা বানানোর কাজ শুরু করেন। এখন বিভিন্ন ইউনিয়নের কয়েক হাজার নারী তার মাধ্যমে কাজ করছেন। ইছমত আরার প্রচেষ্টায় গ্রামের শত শত নারীর দারিদ্র্য ঘুচেছে।
প্রথম ফিফা নারী রেফারি জয়া চাকমা: রাঙামাটির মেয়ে জয়া চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় শিশু একাডেমিতে খেলার মাধ্যমে খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করেন। একপর্যায়ে জাতীয় নারী দলে জায়গা পান জয়া। ২০১২ সালে তিনি জাতীয় দল থেকে বাদ পড়েন। রেফারি হিসেবে শুরু করেন নতুন জীবন। ২০১৯ সালে ফিফার রেফারি হওয়ার পরীক্ষায় পাশ করার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন বাংলাদেশের প্রথম ফিফা নারী রেফারি হওয়ার বিরল গৌরব।
আজীবন সম্মাননা: কারুশিল্পী সরত মালা চাকমা: এবছর আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন কারুশিল্পী সরত মালা চাকমা। রাঙ্গামাটির তবলছড়ির মাস্টার কলোনিতে ৯০ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সাত বছর বয়সে তার কারুশিল্পে হাতেখড়ি হয়। সরত মালা সারা জীবনে দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১৬ সালে উইভার্স ফেস্টিভ্যালে তাকে বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। এখন তার একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি কম, তবুও অন্য ভালো চোখটি নিয়েই তিনি সেলাইয়ের কাজ করেন।

Happy
Happy
0 %
Sad
Sad
0 %
Excited
Excited
0 %
Sleepy
Sleepy
0 %
Angry
Angry
0 %
Surprise
Surprise
0 %

Average Rating

5 Star
0%
4 Star
0%
3 Star
0%
2 Star
0%
1 Star
0%

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *