শুক্র. সেপ্টে ২০, ২০১৯

উঁই

উঁই

Last Updated on

অমিতাভ পাল : আজ কয়েকদিন ধরেই ঘরে সন্ধ্যার বাতি জ্বালাবার পর কোত্থেকে যেন কতগুলি উঁইপোকা উড়ে আসছে আমার বিছানায়। যেন বিছানাটা একটা অগ্নিকু-, তার দীর্ঘ শিখাগুলি যেন উজ্জ্বল হলুদ আর উইগুলি যেন তাতেই আকৃষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। নরম স্বচ্ছ চারটি পাখায় ভর করে, ঠিক সাবলীল নয় বরং স্বতফুর্ত ও তড়িৎ একটা উড্ডয়নের পরে আমার বিছানায় তাদের এই অবতরণ। তবে কবে প্রথম তারা এসেছিলÑ সেটা বুঝিনি কিন্তু যখন একদিন গেঞ্জির ভিতরে সুরসুরি লাগাতে চমকে উঠেছিÑ তখনি দেখলাম লাল নরম একটা পোকা আমার পেটের উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে। হয়তো গেঞ্জির সঙ্গে ঘষায় সে তার নরম ক্ষণস্থায়ী পাখাগুলিকে হারিয়ে ফেলেছিল তাই বুঝিনি ওটা কী পোকা। ফলে পেটের উপর থেকে এটাকে সরাতে গিয়ে আঙুলগুলি হয়কো একটু কঠোরই হয়েছিল আর সেই কঠোরতায় সে গলে পিষে মিশে গেল আমার আঙুলের চামড়ায়। ব্যাপারটা ওইখানেই হয়তো শেষ হয়ে যেতো যদি না আঙুলে লেগে থাকা পোকার রস মুছতে যেতাম বিছানার চাদরে। আর মুছতে গিয়েই দেখলাম বেশ কয়েকটা পাখাওয়ালা উঁই ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা বিছানায়। সাথেসাথেই কিছুক্ষণ আগে নিহত হওয়া পোকাটাকে চিনে ফেললাম।
সেই থেকে প্রতিসন্ধ্যায় আমার বিছানায় পোকাগুলি আসে। তারা ঘুরে ফিরে বেড়ায় চাদরে বালিশেÑ আমার শরীরের প্রকাশ্য কিংবা গোপন স্থানে আর আমি সরকারি সেনাবাহিনীর মতো এইসব গেরিলাদের হত্যা করি।
কিন্তু কিছুদিন পরে উঁইয়ের প্রাবল্য আমার হত্যা করার ক্ষমতাকে যেন হাস্যকর করে তুললো। এখন আর শুধু সন্ধ্যা কিংবা রাতে না বরং দিনেও তাদের দেখতে পাই এবং এখন তারা আরো সাহসীÑ আরো গোপন। ফলে আমাকে ভাবতে হলো তাদের ঘাঁটির কথা এবং সেটাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্যও এখন আমার প্রস্তুতি দরকার। কিন্তু কোথায় পাবো তাদের সেই ঘাঁটি!
সেইদিন থেকে শুরু হলো আমার উইয়ের ঘাঁটি অনুসন্ধানের অভিযান। প্রথমেই মনে হলো উঁইয়ের জন্মস্থান হিসাবে পরিচিত জায়গাগুলিতে খুঁজিÑ কিন্তু খোঁজ করতে গিয়ে বুঝলাম এইসব পরিচিত জায়গার মাত্র কয়েকটাকেই আমি চিনি ফলে খোঁজাটা ঠিক চিরুনি অভিযানের মতো হবে না বোধহয়। তাপরও ফেলে ছড়িয়ে যে কয়টা জায়গাকে মনে হলো উইএর জন্য উর্বরÑ তাদের ঘাঁটলাম। কিন্তু কিছুই মিললো না।
তারপর শুরু করলাম গোয়েন্দা লেলিয়ে দিতে। হাটে বাজারে গ্রামে গঞ্জে বাসস্ট্যান্ডে এয়ারপোর্টে জাহাজঘাটায় সর্বত্র ছড়িয়ে দিলাম আমার নজর চরদের। সেই সাথে গেরিলা খুঁজতে সরকারি বাহিনী যেমন স্থানীয় জনতার সাহায্য নেয়Ñ সেইভাবে দুই-একটা উঁইকেও নিয়োগ করলাম তাদের স্বজাতি অনুসন্ধানের কাজে। অর্থাৎ ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে লক্ষ্য করতে থাকলাম বিছানার উইগুলি কোথায় ফিরে যায়। দুই-একটা বেঈমানকে খুঁজে পাওয়া মাত্রই আমার কাজ হাসিল করে ফেলতে পারবো। তখন আমার আঙুলগুলি পুলিশি বুটের চেয়েও নির্মম হয়ে উঠবে। এদের যন্ত্রণা আমি আর সহ্য করতে পারছি না।
কিন্তু এতকিছুর পরও ঘাঁটি আবিস্কারে ব্যর্থ হলাম। আমার সরকারি বন্দীশালা যেন গেরিলার অভাবে উপাসী। আমার ফায়ারিং স্কোয়াডের বন্দুকে মরিচা ধরছে। গুলির নিয়তি মিস ফায়ারিং। আর আমি এক ব্যর্থ রাষ্ট্রপ্রধানের মতো কেবলই ক্ষেপে যাচ্ছি মন্ত্রীপরিষদের ওপর, মন্ত্রীপরিষদ আমলাদের মাথা কাটতে চাইছে, আমলারা চাকরি যাওয়ার ভয় দেখাচ্ছে সামরিক বাহিনীকে, সামরিক বাহিনী গোয়েন্দাদের ওপর নাখোশ আর গোয়েন্দারা অতীষ্ট করে তুলছে জনসাধারণের জীবন। অথচ উঁইয়ের চলাফেরায় কোনো কমতি নেই। বরং ছোট ছোট দলে তারা ঘোরাফেরা করছেÑ যেন কলম্বাসের আবিস্কারের পরে ভাগ্যান্বেষী জড়ো হচ্ছে আমেরিকার মাটিতে। আমার জারি করা ১৪৪ ধারাকে তারা পাত্তাই দিচ্ছে না। গণআন্দোলন এইভাবে চললে কিছুদিনের মধ্যেই যে আমাকে রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়তে হবেÑ আমিই এখন এই ব্যাপারটাকে সন্দেহ করতে পারছি না। হে উঁইদলের ঘাঁটি, হে কমরেড আবদুল হকÑ তোমরা আমাকে করুণা করো। আমাকে জানাও তোমাদের দাবি।
সপ্তাহখানেক যখন পার হয়ে গেলÑ আমার অবস্থা হলো উঁইয়ের ভিতরে পড়ে থাকা একটা কাঠের টুকরার মতো। প্রবলভাবে তারা ছেঁকে ধরেছে আমাকে। এমনকি আমার ঘুমের মধ্যেও তারা আমার স্বপ্নগুলিকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আর সেই একটানা ভোজনের শব্দে আমার কান ওষ্ঠাগত। যেন একটা ঘরের ভিতরে বসে আমি শুনছি একটা হাতুড়ির সেই ঘরেরই দেয়াল ভাঙ্গার গান। এখন আর ঘাঁটি কোনো ব্যাপার না বরং কোথায় তাদের ঘাঁটি নেইÑ সেটাই বিবেচ্য। এখন আমি মরার মতো শুয়ে শুয়ে দেখি উঁইয়ের দাপটÑ কবরে শোয়ানো আমার হাড়গুলির জন্য রাখা আগাম ছবির মতো। পৃথিবীতে এই প্রথম এমন একটি জেলখানার অভিজ্ঞতা আমার হচ্ছেÑ যেখানে একা এক কয়েদির জন্য রাখা হয়েছে লক্ষ্য লক্ষ্য প্রহরী।
এখন আমি বুঝতে পারছি ১৭-র বিপ্লবের সময় জারের মনের অবস্থা কেমন ছিল। বুঝতে পারছি মার্কেসের মনের ব্যথা, এরশাদের যন্ত্রণা। আমার এই বিছানাটা, এই ছোট্ট ঘরটা যেন নিকারাগুয়া। অরণ্যের আদিম অন্ধকার তার সাম্যবাদী চেতনায় গিলে খাচ্ছে আমার ঝাড়লণ্ঠনের আলো। আমার প্রাসাদ যেন ভূমিহীনদের ব্যারাক, নাচঘর বিপ্লবীদের মন্ত্রণাগৃহ আর আমার শোবার ঘরটা যেন কৃষক রমণীর স্বেদে ঘামে অশ্লীল। কোথায় তুমি আমেরিকা, উইনস্টন চার্চিলÑ কোথায় প্রাসাদবন্ধু হিটলার? তোমাদের রোমেলকে একবার আমার কাছে পাঠাও। পাঠাও মরুশৃগালের ধুর্ততাকে। শুধু একবার আমাকে তুলে ধরো তোমাদের মিত্রতার শক্তিতে। তারপর নাহয় ফেলে দিও। তখন আমি সমস্ত ঘৃণা আর হিংস্রতা নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী পাথরটার মতো পড়ে যাবো আমার বিছানায়। পিষ্ট করে ফেলবো ওই বজ্জাত উঁইগুলিকেÑ আমার দশ আঙুল যাদের হত্যা করতে করতে ক্লান্ত।
প্রভুরাÑ আমাকে শক্তি দাও, সাহস দাও।

দুই.
শেষপর্যন্ত ঠিক করলাম বিছানাটাতেই আগুন ধরিয়ে দেব। সিডনির বনের মতো দাউদাউ দাবানল। তখন দেখি এই ঘৃণ্য নরকের কীটগুলি কিভাবে বাঁচে। একমাত্র বিবর্তন ছাড়া আর কেউ ওদের রক্ষা করতে পারবে না। আর সেই বিবর্তন হলো বিপ্লবের প্রতি ঘৃণা। বড়জোর ওরা নিজের ছেলের নাম বিপ্লব রাখতে পারেÑ কিন্তু এর বেশি এক পাও এগোনো চলবে না। তখন হয়তো আমি ওদের ক্ষমা করতে পারবোÑ জল ঢেলে নিভিয়ে দেব আগুন। ঈশ্বরবিশ্বাসীর নিরুপদ্রব শান্ত জীবন এভাবেই ওরা ফিরে পেতে পারে। নইলেÑ নূহের অগ্নিপ্লাবন তো আছেই।
আগুনের ব্যাপারটা মাথায় আসতেই শুরু করলাম কেরোসিন সংগ্রহের কাজ। এতদিন ধরে এই সভ্যতাকে যে জুগিয়ে আসছে আলোÑ খুঁজতে গিয়ে দেখলাম সে বিরল। গ্যাস আর ইলেক্ট্রিসিটি কবে যে তাকে হটিয়ে দিয়েছে আমাদের শহর থেকেÑ কেউ জানে না। পুরাতন ভৃত্য হারিয়ে গেছে পুরানো সভ্যতার গর্ভে। এখন ঠিকা ঝি অথবা নিজেরই কাজে হাত লাগানো ছাড়া আর উপায় নেই। অবশ্য পেট্রোল আছে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতো। তাকে নিয়োজিত করলে আগুনের হৃদযন্ত্র দুর্বল হওয়ার সুযোগ পাবে না বরং তারুণ্যে সে চাকমা রূপসীদের মতো হলুদ হয়ে উঠবে। মেয়েদের মোহে কোন পতঙ্গ ধ্বংস হয় না!
পেট্রোল সংগ্রহ করলাম। ছিটিয়ে দিলাম বিছানার সারা শরীরে। তারপর তাতে গ্রেনেডের মতো ছুড়ে দিলাম একটা ম্যাচের কাঠি। এখন আমি কোনোকিছুকেই আর পরোয়া করি না। ভয় পাই না পঙ্গপালকেও। এই যে আগুন জ্বলছেÑ দাউ দাউ দাবানলÑ এটাতো আমাকেও পুড়ছে। আমার ঘুমের সুখ, বিশ্রামের ব্যাপ্তি সব পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, তবু আমি নির্বিকার। সচেতন রোগীরা নিজের দেহে অস্ত্রোপচারকে এভাবেই সহ্য করে।
স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি পট পট করে পুড়ছে কীটগুলি। মহাশ্মশানের মহাশবের মতো। দারুণ আনন্দে রোমাঞ্চিত আমার সারা শরীর। মুক্তির খোলা জানালা দিয়ে আমার আকাক্সক্ষা যেন বেরিয়ে যাচ্ছে একটা বাদুরের মতো। বড় হচ্ছে পাখাÑ তারা যেন সারা আকাশ ভরা।
অবশেষে শেষ হলো অগ্নিকা-। একটা কালো মৃতদেহ এখন পড়ে আছে আমার ঘরে আর তার লাখ লাখ মৃত সন্তান। ডিনার টেবিলে যেন চাইনিজ ডিস। প্রোটিন। নিশ্চিন্ততা তো আসলে তাইইÑ এক অমোঘ আমিষ। নিশ্চয়ই এখন আমার স্বাস্থ্য ভালো হবে। হাসিতে ফুটে উঠবে নতুন টিউবলাইটের ঝলক। আমার প্রাসাদ এখন আবার আমার। নাচঘর নর্তকীর। শোবার ঘর যৌনতার তাপে নরম তন্দুর। সুখী ঘুম। ব্যাপ্ত বিশ্রাম।
ঠিক এটাই আমি চেয়েছিলাম। অবশ্য এখন একটা ছোট কাজ করতে হবে। বিছানাসমেত একটা নতুন খাট কেনা আর ঘরটাকে চুনের রঙে রাঙানো। তাহলেই সব শেষ।

তিন.
এখন আমি আমার নতুন বিছানায় শুয়ে আছি। শান্ত, নিরুদ্বিগ্ন এক সম্রাট, যার রাজ্যে কোনো অসন্তোষ নেই। বাতাস বইছে মৃদুমন্দ গতিতে, রোদে বসন্তের তাপ। আর এই বিছানাটা যেন আমার সুয়োরানীÑ আমার ভালোবাসার ধন। আমার আঙুলগুলিতে উঁই হত্যার কোনো ক্লান্তি নেই আর। এখন তারা এক উত্তপ্ত মধুর যৌনতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে এক পবিত্রতম স্পর্শে। এখন তাদের শরীরে কোনো ঘিনঘিনে রস লেগে নেই। এখন তারা এক্সিকিউটিভ। এখন উঁইদের মনে হচ্ছে ছোটবেলার পক্সের স্মৃতির মতো সুদুর। ছেঁড়া ছেঁড়া দুই-একটা ঘটনা হয়তো আছেÑ কিন্তু কোনো ব্যাথা নেই, জ্বর নেই, গুটি নেই। চামড়া পরিস্কার।
ঠিক তখনি একটা উঁই দেখা দিল আমার শরীরে। প্রথমে বিড়বিড় করে উঠলো বুকের চামড়া। আর আমি অভ্যাসবশত চুলকাতে গিয়ে যেই টের পেলাম কী জানি একটা থেতলে গেলÑ মূহূর্তে উঠে বসলাম। দেখলাম একসারি উঁই লাইন বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছে বুকের লোমের ফাঁকফোকড় দিয়ে। আর একটা সর্বশেষ উঁই এইমাত্র বেরিয়ে এলো বুকের বাঁ দিকের একটা লাল দগদগে ফাটল থেকে।

Please follow and like us:
2