ঐ দুটি হাত

ঐ দুটি হাত

Last Updated on

সুশোভন চেšধুরী : বোরখার ভেতর থেকে বের হয়ে আসা হাতটা দেখে চমকে উঠলো সৃজন। একটু আগে মহিলাকে খেয়াল করেছিল। তার পেছনে লাইনে দাঁড়িয়েছিল মুরগীর দোকানের সামনে। সৃজন একবার বলেছিল, আপা আপনি এগিয়ে যান আমি পরে নিতে পারব। মহিলা কিছু বলেনি। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন যেখানে ছিলেন সেখানে। সৃজন আর অনুরোধ করেনি। অচেনা মহিলা, কিনা কী মনে করেন! সৃজন ভাবছিল মুরগী কিনবে কিনা? হুট করে দাম বেড়ে যাওয়াতে হিসেব করেই বাজার করতে হয় আজকাল। পকেটে যা আছে তাতে মোটামুটি চালিয়ে নেওয়া যাবে মাসটা কিন্তু সামনের মাসে কী হবে সেটাই দুশ্চিন্তা। দাম চুকিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামতেই মহিলা হাত পাতলেন সৃজনের সামনে। সৃজন হকচকিয়ে গেল। ও আশাই করেনি মোটামুটি ভালো মানের বোরখা পরিহিত এই মহিলা হাত পাততে পারেন! হাতের যেটুকু অংশ দৃষ্টিগোচর হলো তাতে আরো ঘাবড়ে গিয়ে স্বগত উক্তির মতো বললো, আপনি! মহিলা খুব আস্তে নিচু স্বরে বললেন, খুব বেশি প্রয়োজন-প্লিজ। হাত বলছে না সেটা ভিক্ষার হাত, কণ্ঠস্বর বলছে না এটা এই পেশার উপযুক্ত। পেশাদারদের বলার ও হাত পাতার ভঙ্গির নমুনা আলাদা। মুরগীর দাম চুকিয়ে যা আছে সৃজন সবটাই দিয়ে দিল সম্মোহিতের মতো। খুব বেশি নেই, হয়তো তাতে মহিলার চাহিদার কিছুই পূরণ হবে না। মহিলা হাতটা মাথার কাছে ঠেকিয়ে কুর্নিশ করার মতো কিছু একটা করে ধীর পায়ে চলে যেতে লাগলেন। সৃজন থমকে দাঁড়িয়ে তার চলে যাওয়া দেখতে লাগলো। সোজা রাস্তায় যেতে যেতে মাহিলা অদৃশ্য হয়ে গেলেন। সৃজনের মাথায় ঘুরছে হাজারো চিন্তা। কী হতে পারে এটা? নিরবে দুর্ভিক্ষ কি তবে নেমে এলো? এই হাত কিছুতেই ভিক্ষার হাত নয়, খেটে খাওয়া হাতও নয়, নিতান্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত কোন হাত। কণ্ঠস্বর যেটুকু শুনেছে তাতে যেন কান্না গেলা একটা সুর ছিল!
সৃজনের মনে খুব অনুশোচনা হলো। মানিব্যাগের গোপন ভাঁজে দুটো পাঁচশ টাকার নোট সব সময়ই যতেœ রাখে সে। জরুরি সময়ের সাহস হিসাবে খুব কাজ দেয়। সৃজনের আফসোস হচ্ছে ওখান থেকে ঐ মহিলাকে একটা নোট সে দিলেও পারতো। তাতে মহিলার প্রয়োজন হয়তো কিছুটা হলেও মিটতো। যা দিয়েছে সেটাতো ভিক্ষা হয়ে গেল, সাহায্য করাতো হলো না। মহিলা ‘খুব প্রয়োজন-প্লিজ’ বলে সাহায্য চেয়েছিল।
সৃজন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পা চালালো মহিলার গমন পথে। কিন্তু না, কোথাও নেই মহিলাটি। মুদির দোকান, সবজির দোকান, ওষুধের দোকান খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও তার কোন হদিস পাওয়া গেল না। সৃজনের হঠাৎ মনে হলো কোন প্রতারক তাকে ঠকিয়ে গেলনাতো? আজকাল দেশে প্রতারক স¤্রাট স¤্রাজ্ঞীদের নানাবিধ কেচ্ছা-কাহিনি দেদার বিকোচ্ছে। সংবাদ মাধ্যমগুলো রসিয়ে কষিয়ে নানান রঙে ঢঙে এই খবর প্রতিদিন ফেরি করে চলেছে। খুব হাসি পায়,প্রতারনার এই কেচ্ছা যেন দেশে নূতন! অথচ প্রতিটি উপজেলায়, গ্রামে, পাড়ায় কত কত প্রতারক দিব্যি শিনা টান করে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার খবর কে রাখে? ধর্মালয়ে জুতো চোর ধরা পড়লে ধর্মিকেরা তাকে পিটিয়ে ছাতু করে। কিন্তু ধর্মালয়গুলোর জৌলুশ বৃদ্ধি যাদের অনুদানে ঘটে তাদের আয়ের উৎস ধার্মিকরা দেখেও দেখে না বরং সাড়ম্বরে সংবর্ধনা পায়।
দূরে একটা মানব জটলা দেখে সে দিকে চললো সৃজন। কেন যেন মনে হলো ঐ মহিলাকে নিয়ে কোন সমস্যা হলোনাতো? কেন এমন মনে হলো? মহিলা তার কে? আগেতো কখনো দেখেনি! কিন্তু চরিপাশে এত লোক থাকতে মহিলাও কেন তার কাছে সহায্য চাইলো? হতে পারে সে মহিলাকে ভদ্রতা করে মুরগী কেনার লাইনে এগিয়ে আসতে জায়গা ছেড়ে দিতে চেয়েছিল, তাই? আসলে সৃজন মাথা থেকে ঐ মধ্যবিত্ত হাত পাতার দৃশ্যটা মুছে ফেলতে পারছে না।
পাবলিক মজা পেলে সুখ দুঃখ বুঝে না, ভিড় করে তামাশা দেখে। ছোটখাটো চোর, প্রতারক ধরতে পারলে তো কথাই নেই। সবাই তখন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে যায়। কেউ কেউ বাদি-বিবাদির হয়ে ওকালতি করতেও ছাড়ে না। জটলার কাছে এসে দেখে এক সুবেশী ভদ্রলোক এক রিক্সাওয়ালার সাথে হম্বিতম্বি করছে।
-জানিস আমি কে? শালার পুত চিটিংবাজীর জায়গা পাস না! চেরাগী পাহাড় থেকে মাছুয়া ঝর্ণা আসতে চল্লিশ টাকা ভাড়া? মগের মুল্লুক পাইছস? বাটপার!
রিক্সাওয়ালা বললÑ ‘স্যার অপনি উঠছেন হেমসেন লেইনের মুখ থেকে’।
উৎসাহী পাবলিকের একজন ওকালতি করলো ভদ্রলোকের পক্ষেÑ ‘ঐ মিয়া হেমসেন লেইন আর চেরাগীর পাহাড় কি সাত মাইল দূর? ইনসাফ কইরা ভাড়া চাইবা মিয়া। তোমাদের জন্যেই দেশটা বাটপারে ভরে গেল!
রিক্সাওয়ালা বিনয়ের সাথে বললোÑ ‘জী স্যার, উনি আন্দরকিল্লা এসে রিক্সা থামিয়ে আশি টাকার মাক্স একশ পঞ্চাশ টাকায় নিলেন, তাতে অসুবিধা হলো না, আর আমার বেলায় স্যার ঐ মাক্স তো আমাকেও কিনতে হবে, দশ টাকার মাস্ক বিশ টাকায়।
অবস্থা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে ভদ্রলোক গজগজ করতে করতে সরে পড়লেন। এইবার রিক্সাওয়ালার পক্ষের উকিলরা সরব। সাবাশ বেটা! খাঁটি কথা কইছস, সাহেবের মুখে ঝামা ঘইসা দিছস, সাবাশ! বিনাটিকেটে এমন সিনেমা হরহামেশাই দেখা হয় রাস্তাঘাটে।
সৃজন পায়ে পায়ে বাসার পথ ধরলো। রাস্তায় এখন নূতন নূতন হকার চোখে পড়ে। কেউ কেউ মৌসুমী ফল, কেউবা দুধ, সবজি আবার কেউ কেউ কোভিড আতঙ্ক লাঘবের সুরক্ষা সামগ্রী নিয়ে ভ্যানগাড়ি বা ফুটপাতে পশরা সাজিয়ে বসেছে। তাদের অনেকেই যে প্রফেশনাল নয় তা দেখলেই বুঝা যায়। জীবনকে ফুটপাতে টেনে আনা যে শখে নয়, তা মুখগুলোর দিকে না তাকিয়েও বলে দেয়া যায়। যে মানুষটিকে টিফিন ক্যারিয়ার কাঁধে পান চিবুতে চিবুতে খালি রিক্সা বা সিএনজির অপেক্ষায় দেখা যেতো সকালে, তাকেও আজ মাথায় টুপি আর মুখ মাক্সে ঢেকে হাঁক দিতে দেখলো, নেন স্যার হাঁড়িভাঙ্গা, আ¤্রপালি, খুব ভালো হবে স্যার, সরাসরি বাগান থেকে চলে এসছে স্যার। পাশের বাসার ভদ্রলোক একটা বড় অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে রিক্সা থেকে নামলেন। সৃজনকে দেখে খুব সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললেনÑ ‘কিনে রাখলাম ভাই, বলাতো যায় না কখন কার লাগে! লাগলে জানাবেন।
সেলফোন বাজছে, স্ক্রিনে সুইটহার্ট দেখে বুঝলো বউ নূতন কিছু আনতে অর্ডার করবে, তাই ধরলো না। পকেট বারন্ত, বউকে পরে হেনতেন একটা কিছু বুঝিয়ে দেবে। সিঁড়ির ধাপগুলো কেন যেন উঁচু উঁচু লাগছে আজ। সৃজন নিজের কথা ভাবছে। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি ওর। লক্কর ঝক্কর লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে কতৃপক্ষ বেতন দিচ্ছে থার্টি পার্সেন্ট কেটে রেখে। দিচ্ছে তো! সেটাই হাজার শোকর। কোম্পানির কাছে যাদের চাহিদা আছে তারা এখনো টিকে আছে। কোটি কোটি টাকা লাভের ব্যবসা এ কয়মাসে এমন ফকির মহম্মদ হয়ে যাওয়ার কোন যুক্তি খুঁজে পায় না সে। তবুও মুখে দরদ মাখিয়ে বসকে সাহস যুগিয়ে বলে এসেছে, প্রয়োজনে না খেয়ে থাকবো তবুও কোম্পানি বাঁচাতে শেষপর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো স্যার। সকাল বিকাল যতœ করে পানি না ঢাললে চাকরি নামক বট গাছটা বাঁচানো দায়। বস তো এমনই পোষ্য চায়।
মোটামুটি ভালো মাইনের চাকরি বলে ভেতরে ভেতরে একটা ফুটানির ভাব ছিলো। মাসে দু’একবার বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে দামি রেস্তোরায় রেস্ত খসানো, বৎসরান্তে শর্ট বা লং ট্যুর, এসব মধ্যবিত্তের অভিজাত অভিলাষ। অভিলাষ ওকেও ছুঁয়েছে কম বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত ছিল বউকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে আনাতে। বায়িং হাউজে মেয়েদের চাকরি নিয়ে বন্ধু বান্ধবরা বিশ্রী ইঙ্গিত করতো। শুধু কি তাই? আজ মনকে প্রশ্ন করে সৃজন, সেও কি স্বামীত্ব নামক সুপিরিটি কমপ্লেক্সে ভুগতো না? সংসার গোছানো, ছেলেমেয়ে মানুষ করা, আরো কত অজুহাত, যুক্তি দিয়ে তবেই মানানো গেছে উর্মিকে! কিন্তু এখন দেশে করোনা আসার পর নিজেকে মোস্ট ব্যাকডেটেড, আনস্মার্ট, উজবুক বলে মনে হচ্ছে। উর্মি অবশ্য ভেঙ্গে পড়ার মেয়ে নয়। সে সাহস দিয়ে বলে, ভয় পেওনা, লেখাপড়া তো ধান দিয়ে শিখিনি, আর ছেলেমেয়েরাও খুঁটে খেতে শিখেছে। তেমন দেখলে আমিও নেমে পড়বো যুদ্ধে। যুদ্ধ! সত্যিই তো, জীবনটা তো সত্যিই একটা যুদ্ধ! প্রতিনিয়ত লড়াই চলছেই। রাতে বিছানায় বউকে আদর করতে করতে সৃজন বলে- ‘সত্যিই তুমি ঝাঁসির রানি, আমার লক্ষ্মীবাই।’
বাজারটা নামিয়ে রাখতে রাখতে ছেলে জিজ্ঞাসা করলো, বাবা কঁককঁক এনেছ? ছেলেটা চিকেনের পাগল। থলেতে উঁকি দিয়ে মুরগী দেখে তিড়িংবিড়িং লাফাতে লাগলো। চিৎকার করে বোনকে ডেকে বললো, আপুনি, অপুনি দেখে যা, আজ চিকেন ফ্রাই হবে! চুপিচুপি উর্মিকে সৃজন বললো, ওদের জন্য লেগ পিস ফ্রাই করো। বাকিটা একটু বুঝে শুনে উর্মি ম্লান হেসে বললোÑ ‘জানি জনাব, তোমার সংসার ক্যামনে চলে তা আমার চেয়ে আর কে ভালো বুঝে? ‘হুঁ এ সংসারের হালতো তোমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমি বাদশা’- মনে মনে ভাবে সৃজন।
দুপুরে খেতে বসেছে সৃজন পরিবার। খেতে বসলে টিভি ছেড়ে দেয়া অনেক দিনের অভ্যাস। হয় কোন সংগীতানুষ্ঠান, নয়তো কোন নাটক সিনেমা চলতে থাকে। দেখুক বা না-দেখুক টিভির শব্দটা খাবারগুলোকে উপাদেয় করে হয়তো, তাই এই অভ্যেস। মাঝে মাঝে সৃজন রিমোর্ট টিপে খবরের চ্যানেল খোঁজে। বউ-মেয়ে ক্ষেপায়। ‘কী দেখ ঐ সব! হয় করোনা, নয় করোনা নিয়ে তামাসা, সরকারি দলের টাকঢুম টাকঢুম, বিরোধী দলের অকর্মণ্য বিষোদগার, প্রতারকের রঙিন জীবনালেখ্য আর শেষ পাতে দই মিষ্টির মতো খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক সংবাদ। তার চেয়ে রেসলিং দেখ খাবার হজম হবে ভালো।’ সৃজন হাসে, মনে মনে বলেÑ ‘কার কিসে যে সুখ তা কি কেউ বলতে পারে!’
এখন স্থানীয় সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে। পাঠিকা মুখে গাম্ভীর্য টেনে বলে চলেছেন এক করুন কাহিনী। করোনায় ব্যবসা মন্দার কারণে চাকরি হারিয়ে এক যুবক হতাশ হয়ে ট্রাকের নিচে আত্মহত্যা করেছে। সচিত্র প্রতিবেদন দেখানো হচ্ছে মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে। ট্রলির উপর সাদা চাদরে ঢাকা একটা লাশের পাশে বোরখা পড়া এক মহিলা দুহাতে বুক চাপড়ে বিলাপ করছে। ‘তুমি এমন করলে কেন? আমাকে একটু সময় দিলে না কেন? আমার উপর কি তোমার কোন বিশ^াসই ছিল না! দুজনে মিলে তো বাঁচার চেষ্টা করতে পারতাম। আর কটা দিন ধৈর্য ধরতে পারলে না কেন? এখন আমি কার কাছে যাবো? কাকে নিয়ে বাঁচবো? বিলাপের দৃশ্য ক্রমে ফেইড আউট হয়ে যাচ্ছে স্ক্রিন থেকে। সংবাদ পাঠিকা সহাস্যে ফিরে আসছেন কোভিডের ভেকসিন আবিষ্কারের সাফল্যের খবর নিয়ে। দুঃখগুলো এভাবেই ফেইড আউট হয়ে যায় সাফল্যের রঙিন ক্যানভাসের আড়ালে।
মাংসের বাটিটা ছেলেমেয়েদের দিকে ঠেলে দিয়ে সৃজন উঠে গেল খাবার টেবিল থেকে। আজ তার জিহ্বায় মাংসের স্বাদ তেতো লাগবে, গলা দিয়ে হয়তো নামবেই না পাকস্থলিতে। সাদা কাপড়ে ঢাকা লাশটার পাশে, বোরখা থেকে বের হয়ে আসা একটি হাত সৃজনের খুব চেনা চেনা লাগছিল! কোথায় যেন দেখেছে ঐ দুটি হাতের অন্তত একটি হাত!
————————————–
লেখক : নাট্যকার, কবি ও গল্পকার।

Please follow and like us:
3
20
fb-share-icon20
Live Updates COVID-19 CASES