সোম. ডিসে ৯, ২০১৯

ছোটগল্পের বড় প্রাণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Last Updated on

হোসনে আরা মণি : পিএসসির ভাইভাবোর্ডে একবার আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল আপনার প্রিয় বই কোনটি? উত্তরটা দিতে আমাকে সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ত্ত ভাবতে হয়নি। নির্দ্বিধায় জবাব দিয়েছিলাম, গল্পগুচ্ছ।
পরবর্তী প্রশ্ন : কেন ?
উত্তর : যে বই অগণন সংখ্যকবার পড়ার পরও পুরনো মনে হয় না সেই চিরসবুজ গ্রন্থ তো চিরপ্রিয় হয়েই থাকবে।
জবাবটা কর্তাদের খুশি করতে পেরেছিল কিনা জানি না কিন্তু আমাকে আজও কেউ অনুরূপ প্রশ্ন করলে আমি হয়তো অনুরূপ জবাবই দেবো। আমার মুগ্ধতার ধ্রুবতাকে যদি আমি যৌক্তিকতার নিরিখে বিশ্লেষণ করি অর্থাৎ গল্পগুচ্ছের নির্মোহ সমালোচনা করতে বসি তাহলে আমি সবিনয়ে আবিষ্কার করি যে আমি তাকে ভালোলাগার মোহগ্রস্ততা থেকে নিজেকে কিছুতেই মুক্ত করতে পারছি না। কাজেই বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনা বলতে যা বোঝায় তাই হয়তো আমি এক্ষেত্রে কিছুতেই করে উঠতে পারবো না, শুধু প্রেমময় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রিয়তমেসুর গুণকীর্তন করতে পারি।
গল্পগুচ্ছকে ভালো লাগার কারণগুলোর মধ্যে অবশ্যই অন্যতম এর সরলতা। গুটিকয়েক তত্ত্বনির্ভর গল্প বাদে বাকি গল্পগুলোর অধিকাংশেই অঙ্কিত হয়েছে নিতান্ত সাদামাটা দৈনন্দিন জীবনচিত্র। সমাজের নানা অসঙ্গতি থেকে শুরু করে ব্যক্তি মানুষের জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্নেহ-মমতা, প্রেম-প্রতীতি, আশা-নিরাশা, লোভ-লালসা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, জয়-পরাজয় ইত্যাদি অনির্বচনীয়কে ভাষারূপে চিত্রিত করেছেন যিনি তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
তৎকালীন সমাজ জীবনের বহু নিষ্ঠুর চিত্র যেমন- যৌতুক প্রথা (হৈমন্তী, দেনা-পাওনা, অপরিচিতা), সতীদাহ প্রথা (মহামায়া), সামাজিক কূপম-ুকতা (খাতা, প্রায়শ্চিত্ত), অবিচার-উৎপীড়ন (দিদি, উলুখড়ের বিপদ, বিচারক, মেঘ ও রৌদ্র), জাতপাতের ভেদ, বিধবার আর্তি, বাল্যবিবাহ ইত্যাদি যেমন অঙ্কিত হয়েছে তেমনি চিত্রিত হয়েছে নিখাদ মানবিক প্রেমের কিছু উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এই মানবিক প্রেমের আবার বহু আধার, বহু রূপ, বহুমুখী বিস্তার, মানব-মানবীর লীলাময় প্রেম যেমন তার জাদুকরী লেখনির আঁচড়ে চিরায়ত শাশ্বত চেহারায় উদ্ভাসিত হয়েছে (হৈমন্তী, সমাপ্তি, শাস্তি, মধ্যবর্তিনী, মাল্যদান, বিচারক, নষ্টনীড়, ত্যাগ ইত্যাদি), তেমনি সুনিপুণ দক্ষতায় রচিত হয়েছে পরম স্নেহ-প্রীতি-আবেগের মিশ্রণে গড়ে ওঠা সেসব সম্পর্ক যাকে ভাষার মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করা না গেলেও যার অবস্থান মানব জীবন ও মননে চিরন্তন (পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, ব্যবধান, আপদ, বলাই, মাস্টারমশায়, মেঘ ও রৌদ্র ইত্যাদি)।
অতি সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে কতো অসামান্য গল্প রচনা করা যায় তার ভূরি ভূরি নজির সৃষ্টি করে ছোটগল্পের সংজ্ঞাটাও নির্দিষ্ট করে যিনি একক হাতে বাংলা ছোটগল্পকে সুপ্রতিষ্ঠিত করলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাঁর নির্দেশিত ছোটগল্পের সংজ্ঞা অনুসরণ করে আজো আমরা গল্প রচনার চেষ্টা করি। কিন্তু ভাষার গাঁথুনিতে, বাক্য বিন্যাসে, শব্দচয়নে বর্ণনাশৈলীতে যে নিপুণ শৈল্পিক দক্ষতায় তিনি একটি আপাতদৃষ্টিতে বিশেষত্বহীন ঘটনাকেও উৎকৃষ্ট শিল্পোত্তীর্ণ ও বিশ্ব মানসম্পন্ন গল্পে পরিণত করতে পেরেছেন তা আজও আমাদের মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। তার অতিপ্রাকৃত গল্প ক্ষুধিত পাষাণ, কঙ্কাল, মনিহার তার জাদুকরী শিল্পসত্তার অন্যতম উদাহরণ।
রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ গল্পেই কিছু না কিছু বক্তব্য রয়েছে। নিছক গল্পের জন্যই গল্প সৃষ্টি তিনি খুব কমই করেছেন। কিন্তু সেই তাৎপর্যম-িত গল্পগুলো আমাদের কখনো সরাসরি উপদেশ দিতে আসে না, বরং নিরস বক্তব্য যে শিল্পরসে জারিত হয়ে রসিকের চোখ ও মন উভয়কেই ভিজিয়ে তোলে সেই শিল্পিত সারমর্মটুকুই আমাদের মনে চিরস্থায়ী ছাপ রেখে বেঁচে থাকে।
তৎকালীন সমাজ ও মানবজীবনের চিত্র অঙ্কন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কিছু কিছু চরিত্রকে যে পর্যায়ে উন্নীত করেছেন তা আমাদের এই একবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ মননেও কেবলই একটি আইডিয়া। স্ত্রীর পত্রের মৃণালকে আজও আমরা কেবলই একজন কল্পিত দ্রোহী নারীর দৃষ্টান্তরূপেই বিবেচনা করি। বাস্তবে অমন মানবীয় নারী সত্তার প্রকাশকে আজও আমরা দুঃসহ স্পর্ধা বলেই গণ্য করি এবং আগামী কতো শত বছর পরে বাঙালি সমাজে একজন মৃণাল মানুষ হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মৃণালের স্তরে উন্নীত হবে এবং সমাজ সেটাকে স্বাভাবিক চোখে দেখবে-অর্থাৎ, ভ্রƒকুটি নয়, কিংবা বাহ-বা নয়, বরং এটাকেই মৃণালের করণীয় বলে মনে করবে, তা এখনো একা- ভবিতব্যেরই জ্ঞাত।
শত প্রগতি প্রচেষ্টার পরও নারী যে শেষ পর্যন্ত নারীই থেকে যায় এবং তার নারীদের আবেগ-অনুভূতি প্রেম যে পুরুষের কাছে তার প্রধান দুর্বলতা বলে বিবেচিত হয় এবং সুচতুর পুরুষেরা যুগে যুগে ঐ দুর্বলতাকেই পুঁজি করে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে তারই নমুনা দেখি আমরা প্রগতিসংহার গল্পে। এ গল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, পড়লে মনেই হয় না যে প্রায় একশ বছর আগেকার কোনো গল্প পড়ছি, কলেজ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ফ্রি মিক্সিং ও ইভটিজিংয়ের যে ছবি রবীন্দ্রনাথ এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন তা বর্তমান সময়ের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েই সাধারণ দৃশ্য।
গল্পগুচ্ছের বেশ কটি গল্পে আমরা কয়েকজন দৃঢ়চেতা, উন্নত মন ও মননের অধিকারী নারী চরিত্রের সাক্ষাৎ পাই যারা সমকালীন সময়েও দুর্লভ ও অনতিক্রম্য। অপরিচিতার কল্যাণী, ল্যাবরেটরির সোহিনী, স্ত্রীর পত্রের মৃণাল, পয়লা নম্বর এর অনিলা এদের মধ্যে অন্যতম। কল্যাণী যে কারণে বিবাহের পুনঃপুনঃ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে, সোহিনী যেভাবে পরলোকগত বিজ্ঞানী স্বামীর ল্যাবরেটরিটাকে বুক দিয়ে রক্ষা করেছে, যে কারণে মৃণালের সংসার ত্যাগ, অনিলার নিরুদ্দেশে মিলিয়ে যাওয়াÑ সব যেন এ যুগের অতি আধুনিক নারীর পক্ষেও এক বড় চ্যালেঞ্জ।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় তত্ত্ব ও উপদেশকে অস্বীকার করেছেন। এ কথা ঠিক যে তার কোনো গল্পে তিনি আমাদেরকে সচেতনভাবে কোনো উপদেশ বিলাতে চাননি, তত্ত্ব-তথ্যও তার গল্পগুলোকে ততো ভারী করে তোলেনি; তবুও কয়েকটি গল্পে তাঁর গল্পের যে প্রধান বৈশিষ্ট্য সাবলীলতা ও সুখপাঠময়তা- তা যেন খানিকটা ক্ষুণœই করে। কিন্তু যে গল্পগুলো নির্ভেজাল ছোট প্রাণ; ছোট ব্যথা সংবলিত তা আমাদের মনে এমনভাবে দাগ কেটে বসে যায় যা আমরণ আমাদের মনে প্রোথিত থেকে যায়। আমরা ভুলতে পারি না সেসব গল্পের চরিত্রদের, তাদের ব্যথাগুলোকে। এমনই কিছু গল্প ও তাদের চরিত্র : ‘পোষ্টমাষ্টার’- রতন, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’Ñ রাইচরণ, ‘ছুটি’Ñ ফটিক, ‘দিদি’Ñ ‘শশীকলা, ‘নষ্টনীড়’-চারু, ‘ভূপতি’Ñ অমল, ‘মেঘ ও রৌদ্র’-শশিভূষণ ও গিরিবালা, ‘শাস্তি’-চন্দরা, ‘মাল্যদান’Ñ কুড়ানি, ‘মাস্টারমশায়’Ñ হরলাল, ‘বিচারক’Ñ ক্ষিরোদা, এসব চরিত্রের অধিকাংশই সামাজিক প্রতিষ্ঠা-প্রতিপত্তির বিচারে নিতান্ত দলিত শ্রেণীর মানুষ। ‘নষ্টনীড়’ ব্যতীত উক্ত সবকটি গল্পের প্রধান চরিত্র সামাজিকভাবে বড়ই অসহায় ও নিপীড়িত জীবনের প্রতিনিধি। কিন্তু চরিত্রবলে তারা প্রত্যেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও জীবন্ত।
পোস্টমাস্টার গল্পের রতন যেদিন জানতে পারে যে পোস্টমাস্টার তাকে ছেড়ে, এ স্থান ছেড়ে কলকাতা ফিরে যাচ্ছে সেদিন সে মাত্র একবার তাকে পোস্টমাস্টারের সঙ্গে নিয়ে যাবার প্রস্তাব করেছিল। কিন্তু পোস্টমাস্টার যখন সেটা নিতান্তই হেসে উড়িয়ে দিলো তখনই আমরা তার মধ্যে অভিমানী নারী হৃদয়ের উন্মেষ দেখতে পাই। একই সঙ্গে জেগে ওঠে তার প্রবল আত্মসম্মান বোধ। তাইতো পোস্টমাস্টার যখন তাকে বিদায়বেলায় সান্ত¡নাস্বরূপ কিছু অর্থ সাহায্য করতে চেয়েছে তখন সেটা স্নেহের দান হলেও সে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। অথচ নৌকায় চেপে পোস্টমাস্টার যখন সত্যিই প্রস্থান করলো তখন সে মিথ্যা আশায় পোস্টমাস্টারের পথ চেয়ে পোস্টাপিপস ঘরের আশপাশে ঘুরতে থাকলো। বালিকা রতনের বুদ্ধিহীন হৃদয়ে ধারিত এই যুক্তিহীন প্রেম ও দুরাশা পাঠকের সিক্ত হৃদয়ে উৎসারিত মমত্ব ও বেদনাবোধের ফল্গুধারায় চিরদিন অবগাহিত হতে থাকবে।
চাকর রাইচরণের মালিকের সন্তানের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা পিতা রাইচরণের অপত্য স্নেহের প্রতিবন্ধক হয়। কিন্তু যেকোনো শিশুমাত্রই সরল, সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক। শিশুর স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তজয়ের ক্ষমতাতেই পুত্র ফেলনা পিতা রাইচরণের আড় হয়ে থাকা হৃদয়কে জয় করে। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী রাইচরণ ধরেই নেয় যে এ শিশুটি তারই মনিবপুত্র যে কিনা একদিন তার অসতর্কতায় পদ্মার গর্ভে বিলীন হয়েছিল। রাইচরণ আপন পুত্রকে মনিবজ্ঞানে সম্মান ও ভালোবাসায় উপযুক্তরূপে মানুষ করে তুলতে তার সাধ্যাতীত চেষ্টা করতে থাকে। অথচ ছেলেটি যেদিন জানতে পারে যে সে আসলে রাইচরণের মনিবপুত্র এবং রাইচরণ এতোদিন চুরি করে তাকে নিজের কাছে রেখেছিল তখন কতো করুণা ও অবজ্ঞার চোখেই না সে রাইচরণকে দেখে। রাইচরণের এতো স্নেহ মমতা যতœ-ভালোবাসা, এতো ত্যাগ তিতিক্ষা সব ভুলে সে পিতা-মাতা বলে সদ্য পরিচিত ধনাঢ্য পরিবারের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। নিতান্ত সহজ-সরলভাবে বর্ণিত খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হতভাগ্য রাইচরণের জন্য পাঠকের হৃদয়টা বেদনাতুর হয়ে ওঠে।
মাতৃক্রোড় হতে কিছুটা জোরপূর্বকভাবে বিচ্যুত হয়ে প্রকৃতির স্বাধীন সন্তান ফটিক যখন কলকাতায় পড়াশুনার উদ্দেশে মামাবাড়িতে নীত হয় তখন তার অবস্থা দাঁড়ায় ডাঙায় তোলা মাছের চেয়েও বুঝি সকরুণ, অনভ্যস্ত নতুন পরিবেশে স্নেহ-মমতার লেশমাত্রহীন ছকবাঁধা জীবনে কেবলই বিদ্রƒপ সয়ে বেঁচে থাকতে না পেরে মৃত্যুপথযাত্রী ফটিক যখন তার মায়ের জন্য প্রতীক্ষায় মৃত্যুর সঙ্গেও লড়তে থাকে তখন কী ভীষণ হয়ে ওঠে তার সে আকুতি। অথচ মা যখন সত্যিই আসে তখন তার জীবনের চিরছুটি মিলে যায়। প্রকৃতির স্বাভাবিকতাকে কৃত্রিমতা দিয়ে বাঁধতে গেলে কী ভয়ঙ্কর পরিণতি হয় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘ছুটি’ গল্প যা পাঠে আমাদের চক্ষু শেষ পর্যন্ত বিশুষ্ক থাকতে পারে না। ‘দিদি’ গল্পে শশীকলা তার সন্তানতুল্য পিতৃ-মাতৃহীন ছোটভাইটিকে স্নেহ ও করুণার মিশেলে এতো তীব্রভাবে ভালোবাসে যে তার ন্যায্য স্বার্থ রক্ষার্থে স্বামীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও পিছপা হয় না। কিন্তু নির্মম সমাজব্যবস্থা অন্যায়ের বিরুদ্ধে শশীকলার এ প্রতিবাদকে সমর্থন তো করেই না উল্টো তাকে তার স্বামীর নিগ্রহের মুখেই ঠেলে দেয়। ভাই শিশু নীলমণির জীবন ও ভবিষ্যৎ রক্ষার্থে শশী তাকে এক ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটের হাতে সোপর্দ করে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে দ্বিধাহীনভাবে ফিরে যায় স্বামীর ঘরে। নির্মম পুরুষতন্ত্রের প্রতিহিংসার শিকার শশীকলার করুণ পরিণতি দুর্বলের প্রতি সবলের উৎপীড়ন এবং নারীজনের চিরন্তন অনিরাপত্তা ও অসহায়ত্বের কথাই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
একটি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিময়, মন কেমন করা গল্প ‘মেঘ ও রৌদ্র’ বালিকা গিরিবালার বন্ধু ও শিক্ষক নতুন প্রতিবেশী শশিভূষণ একজন এমবিএল। গিরিবালার সাথে শশিভূষণের সম্পর্ক যতোটা স্নেহের তার নায়েব পিতার সাথে দাঁড়ায় ততোটাই বৈরী। নানা পাকচক্রে শশিকে গ্রাম ছাড়তে হয়, এমনকি পাঁচ বছর জেলও খাটতে হয়। শশিভূষণের এই দুর্ভাগ্যের পেছনে যিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি গিরিবালার পিতা হরকুমার। অথচ জেল থেকে যেদিন মুক্তি মেলে সেদিন যে তাকে সাদরে ঘরে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করে সে সেই গিরিবালা। বিধবা বেশধারী গিরিবালার প্রণাম পেয়ে একটা আশীর্বাদবাণীও শশিভূষণ উচ্চারণ করতে পারে না, একটা কুশলও জিজ্ঞাসা করতে পারে না। কথারা তার কণ্ঠের কাছে দলা পাকিযে থাকে এবং পৃথিবীর সমস্ত আবেগ জমাটবদ্ধ হয়ে তার কণ্ঠনালী এমনকি অশ্রুর উৎসমুখ কঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে কীর্তন শোনা যায় : ‘এসো, এসো, ফিরে এসোৃহে!’ গল্পপাঠ শেষ করার পরও বুঝি জগৎব্যাপী এক অব্যক্ত কষ্ট পাঠকের হৃদয়ের পরে দুর্বহ হয়ে চেপে বসে থাকে।
একটি সূক্ষাতিসূক্ষ্ম অনুভূতিময়, মন কেমন করা গল্প ‘সেভা ও রৌদ্র’, বালিকা গিরিবালার বন্ধু বনাম শিক্ষক নতুন প্রতিবেশী শশিভূষণ একজন এমএবিএল। গিরিবালার সঙ্গে শশিভূষণের সম্পর্ক যতোটা স্নেহের তার নায়েব পিতার সঙ্গে ততোটাই বৈরি। নানা পাকচক্রে শশিভূষণকে গ্রাম ছাড়াতেপুর এমনকি ৫ বছর জেলও খাটতে হয়। শশিভূষণের এই দুর্ভাগ্যের পেছনে যিনি মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি পিরিবালার পিতা হরকুমার। অথচ জেল থেকে যেদিনমুক্তি মেলে সেদিন সে তাকে সাপরে আপন ঘরে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে সে সেই বালিকা গিরিবালা। বিবাহ হয়েছে এবং সে এখন বিধবা বেশধারী গিরিবালাকে প্রণাম পেয়ে একটা আশীর্বাদবাণীও শশিভূষণ উচ্চারণ করতে পারে না। একটা কুশলও জিজ্ঞাসা করতে পারে না। কথারা তার কণ্ঠের কাছে দলা পাকিয়ে থাকে এবং পৃথিবীর সমস্ত আবেগ জমাটবদ্ধ হয়ে তার কণ্ঠনালী এমনকি অশুর উৎসমুখে কঠিন প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে কীর্তন শোনা যায় : এসো, এসো, ফিরে এসোৃহে! গল্পপাঠ শেষ করার পরও বুঝি জগৎব্যাপী এক অব্যক্ত কষ্ট পাঠকের হৃদয়ের পরে দুর্বহ হয়ে চেপে বসে থাকে।
ছিদাম রুই ও দুখিরাম রুইয়ের দুখের সংসারে চন্দরা যেন একটি হুলযুক্ত প্রজাপতি। তার বহু বর্ণিল পাখায় ভর করে সে কেবল উড়ে বেড়াতে চায়, ছুটতে চায় বুঝি তার দৃষ্টিসীমারও বাইরে। এই প্রজাপতির হুলটা তার স্বামীর জন্য বিশেষভাবে বরাদ্দÑ মাঝে মাঝে তার জাকেও একটু ভাগ পেতে হয়। স্বামীকে সে অন্তর্জ্বালায় জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে-তাতিয়ে রাখে মাঝে মাঝে জায়ের সাথেও ঝগড়া করে। কিন্তু এই অতিচঞ্চলা কৌতুকপ্রিয় যুবতী বধূর সব খুনসুটি, রঙ্গময়তা হঠাৎই একটানে থমকে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। সেদিন তার ভাসুরের খুনের দায়ে, স্বামী কর্তৃক অভিযুক্ত হয়ে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ হতে হয়। স্ত্রী হত্যার দায় হতে ভাইকে রক্ষা করতে তাৎক্ষণিকভাবে বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠতে না পেরে হত্যাকারী হিসাবে ছিদাম আপন স্ত্রী চন্দরার নাম করে। এরপর যেন নিয়তি এগিয়ে এসে ছিদামকে চন্দরা থেকে বিমুক্ত করে। অসহায় ছিদাম ও দুখিরাম প্রত্যেকে আদালতে নিজেকে হত্যাকারী বলে ঘোষণা করলেও আদালত তা সত্য বলে মনে করে না কারণ চন্দরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেকেই হত্যাকারী বলে এসেছে। স্বামীর প্রতি প্রবল অভিমান-ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চন্দরা যেন ফাঁসির রজ্জুর দিকেই গলা বাড়িয়ে রাখে। মনে মনে বলে, ‘আমি তোমাকে ছাড়িয়া আমার এই নবযৌবন লইয়া ফাঁসিকাঠকে বরণ করিলামÑ আমার ইহজন্মের শেষবন্ধন তাহার সহিত।’ যে স্বামীরাক্ষস একদিন তাকে এই হত্যার দায় স্বকাঁধে তুলে নিতে অনুরোধ করেছিল তার প্রতি অভিমানের আতিশয্যে ফাঁসির পূর্বে তার সাথে শেষ দেখাটাও করতে রাজি হয় না ‘শাস্তি’র চন্দরা।
অবুঝের প্রেমাভিমান যে কতো তীব্র ও আত্মবিধ্বংসী হতে পারে তারই সরল দৃষ্টান্ত মাল্যদান। কুড়ানী নামের কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটিকে পটল তার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের পেছনে নিতান্তই পরিহাসছলে লেলিয়ে দেয়। স্বভাবতই কৌতুকপ্রিয় পটলের কাছে এ ছিল নিছকই এক আমোদ এবং যতীনের কাছে শুধুই লজ্জামাখা বিরক্তি। কিন্তু কুড়ানীর কাছে কিন্তু ব্যাপারটা তামাশা কিংবা লজ্জার ছিলনা। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে তার নারী হৃদয়ে কখন যে অনুরাগের রঙ এসে লেগেছে সমাজ-সংসার-রীতি-নীতি সম্পর্কে অজ্ঞ, অসচেতন কুড়ানীর তা জানা ছিল না। পটলের এই ছেলেমানুষী অত্যাচারে অতিষ্ঠ যতীন যেদিন পালিয়ে যায় সেদিনই প্রথম কুড়ানী অনুভব করে সেÑ তার জীবন থেকে কী যেন একটা বহুমূল্য কিছু হারিয়ে গেছে। এই আঘাতটা কুড়ানী সহজভাবে কাটিয়ে উঠতে না পেরে চিরন্তন নির্মম ট্র্যাজেডির দিকেই যাত্রা করে। অভিমান ক্ষুব্ধ নারী হৃদয়ের উদাহরণ কুড়ানী যেন সেই বাংলা প্রবাদটিকেই প্রমাণ করে ‘বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না’।
গৃহশিক্ষক হিসেবে সফল হরলালের সখ্য গড়ে ওঠে অসম বয়সী ছাত্র বেন্দুর গোপালের সাথে যে কিনা নব্য ধনীগৃহের অতি আদরের সন্তান। এই আলালের ঘরের দুলালকে হরলাল ভালোবাসলেও উভয়ের অবস্থানগত পার্থক্য একদিন তাদেরকে অনিবার্যভাবেই বিচ্ছিন্ন করে দিল। ছোট্ট বেনু তার মাস্টার ‘মশাইয়’র এর প্রতি প্রবল অনুরাগ প্রকাশ করলেও তাদের মিলনের কোনো সহজ পথ যখন ছিল না তখন একদিন দুই পক্ষেই সমস্ত চুকিয়া গেল, বক্ষের শিরা আকড়াইয়া বেদনা নিশাচর বাদুড়ের মতো আর ঝুলিয়া রহিল না।’ কিন্তু অনেক কাল পরে বেনুর সাথে যখন তার আবার সাক্ষাৎ হলো তখন সেই ছোট্ট বেনু আর এই বেনুতে অনেক তফাৎ। হরলাল বেনুর সাথে পূর্বের মতো মাখামাখি না করলেও তার দেহটা ঠিকই অটুট ছিল। কিন্তু বেনু এই স্নেহের প্রতিদান যে বিশ্বাসঘাতকতার মূল্যে পরিশোধ করলো তার পরিণতিতে হরলালকে জীবনটাই দিতে হলো।
‘বিচারক’ এর ক্ষীরোদা একজন বিগতযৌবনা পতিতা যে কিনা বিভিন্ন পুরষের দ্বারা জীর্ণ বস্ত্রের ন্যায় পরিত্যক্ত হতে হতে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহত্যার উদ্দেশে তিন বছরের শিশুপুত্রকে বুকে করে কূপে ঝাঁপ দেয়। প্রতিবেশীদের দ্বারা অনতিবিলম্বে উদ্ধৃত হলে শিশুটি ততোক্ষণে মৃত এবং ক্ষিরোদা অচেতন। হত্যাপরাধে ক্ষীরোদার ফাঁসির হুকুম হয়। যে জজের বিচারে সেই মোহিতমোহনই যে ক্ষীরোদাকে পতিতাতে পরিণত করেছিল তা মোহতি কিংবা ক্ষীরোদা কেউই জানতে পারে না। উভয়ের চেহারার ব্যাপক পরিবর্তন উভয়কে অপরিচয়ের দূরত্বে রাখলেও বহু বছর পূর্বের সেই প্রাণয়কালে বালিকা হেমশশীকে মধূপ বিনোদচন্দ্র প্রেমের ছলে যে আংটি উপহার দিয়েছিল সেটা ক্ষিরোদার মাথার চুলের মধ্য হতে আবিষ্কৃত হওয়ায় বর্তমান মোহিত মোহন যখন তাকে চিনতে পারলেন ‘তখন তাহার সম্মুখে কলঙ্কিনী পতিতা রমণী একটি ক্ষুদ্র স্বার্ণাঙ্গুরীয়কের উজ্জ্বল প্রভায় স্বর্ণময়ী দেবীপ্রতিমার মতো উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল।’
‘নষ্টনীড়’-এর চারুলতা দেবর অমলের সমবয়সী। স্বামী ভূপতি খবরের কাগজের মালিক ও সম্পাদকÑ কাজেই তার অব্যনর বলতে কিছু নেই। বালিকা স্ত্রী কখন যে যুবতী হয়ে উঠেছে সে বিষয়েও তার কোনো সচেতনতা কাজ করে না। অমলই চারুর খেলার সাথী, অমোদ আহ্লাদের সহচর এবং নানারকম ছেলেমানুষী কর্মকা-ের সহযোগী ও প্রতিযোগী। দিনে দিনে কখন যে অমলের প্রতি চারুর একটা অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছে এবং সে টান যে তার মর্মহুলকে আমূল নাড়া দিয়ে তার গোটা জীবনকে ওলট-পালট করে দিতে পারে সে ধারণা তার নিজেরও ছিল না। কিন্তু নিয়তির পরিহাস এগিয়ে আসে এবং চারু ও অমলের এতোদিনকার ছন্দময় জীবনে ছন্দপতন ঘটে। ভূপতির আর্থিক ও মানসিক বিপর্যয়ের ক্ষণে তার পাশে আত্মিক সহযোগিতা নিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায় অমলÑ পিসতুতো দাদার প্রতি তার অগাধ শ্রদ্ধা, অনেক কৃতজ্ঞতা। দাদার উপকারে লাগবে ভেবে সে বিয়ে করে শ্বশুরের অর্থে ব্যারিস্টারি পড়তে যেতেও রাজি হয়; ঠিক এমনই সময় তার কাছে স্পষ্ট হয় চারুর নারী হৃদয়। চমকিত অমল নিজেকে সামলে নিয়ে নিতান্ত নিস্পৃহভাবে নিজেকে চারুর থেকে গুটিয়ে নেয়, চলে যায় দেশ ছেড়ে বিলেতে। কিন্তু চারু যে কোথাও যেতে পারে না। তাকে আটকে থাকতে হয় অমলের অজস্ত্র স্মৃতিবিজড়িত সেই বাড়িটিতেই এবং বুকের মাঝে তুষের আগুন চেপে রেখে তাকে পালন করে যেতে হয় দৈনন্দিন সাংসারিক দায়িত্ব। ‘অসহ্য কষ্টে ও চাঞ্চল্যে চারু নিজে বিস্মিত।’ কেন তার এমন হলো তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। কিন্তু তার সমস্ত ঘরকন্যা ও কর্তব্যের অন্তঃস্তরের তলদেশে সুড়ঙ্গ খনন করে তার মধ্যে অশ্রুমালাসজ্জিত একটি গোপন শোকমন্দির সে নির্মাণ করে রাখে যার খবর তার স্বামীরও অজ্ঞাত।
স্বামীর প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তি ও যতœ দেখানোর প্রাণান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও একদিন চারু ধরা পড়ে। সেদিন ভূপতি ‘মনে মনে ভাবিতে লাগিল তাহার জন্য চারুর এই যে সকল অশ্রান্ত চেষ্টা, এই যে সমস্ত প্রাণপণ বঞ্চনা, ইহা অপেক্ষা সকরুণ ব্যাপার জগৎসংসারে আর কী আছে। এই সমস্ত বঞ্চনা এতো ছলনাকারীর হেয় ছলনামাত্র নহে; এই ছলনাগুলির জন্য ক্ষতহৃদয়ের ক্ষতযন্ত্রণা চতুর্গুণ বাড়াইয়া অভাগিনীকে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে হৃদপি- হইতে রক্ত নিষ্পেষণ করিয়া বাহির করিতে হইয়াছে।’
চাকির নিয়ে ভূপতি যখন অন্যত্র সরে যেতে চায় তখন চারু এসে চেপে ধরে, ‘আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাও’। ভূপতি থমকে দাঁড়ায়। ‘অমলের বিচ্ছেদ স্মৃতি যে বাড়িকে বেষ্টন করিয়া জ্বলিতেছে, চারু দাবানলগ্রস্থ হরিণীর মতো সে বাড়ি পরিত্যাগ করিয়া পালাইতে চায়’; ভূপতি তা বুঝতে পারে। ‘কিন্তু যে স্ত্রী হৃদয়ের মধ্যে নিয়ত অন্যের ধ্যান করিতেছে বিদেশে গিয়াও তাহাকে ভুলিতে সময় পাইবনা? নির্জন বন্ধুহীন প্রবাসে প্রত্যহ তাহাকে সঙ্গদান করিতে হইবে?ৃ যাহার অন্তরের মধ্যে মৃতভার তাহাকে বক্ষের কাছে ধরিয়া রাখাৃ যে আশ্রয় চূর্ণ হইয়া ভাঙিয়া গিয়াছে তাহার ভাঙা ইট কাঠগুলি ফেলিয়া যাইতে পারিবনা, কাঁধে করিয়া বেড়াইতে হইবে?’
ভূপতির জন্য, চারুর জন্য এবং কিছুটা অমলের জন্যও মন কেমন করা গল্পের নাম ‘নষ্টনীড়’।
রবীন্দ্রনাথ প্রধানত কবি। তাঁর কবিসত্তাই ছড়িয়ে আছে গোটা গল্পগ্রন্থজুড়ে। তাঁর কবিতায় ভাষার গুণে, জাদুকরী বর্ণনা গুন, মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় সাধারণও হয়ে ওঠে আবেশীয় সুন্দর। তাই নিতান্ত সাদামাটা ঘটনাও হয়ে ওঠে হৃদয়স্পর্শী, নিতান্ত অভাজন হয়ে ওঠে পাঠকচিত্ত আকুল করা, পাঠকের ভালোলাগা, ভালোবাসায় অবগাহিত এক কালজয়ী চরিত্র। রবির সমকক্ষ কেবল রবিইÑ তাইতো বাংলা সাহিত্যের আকাশে জাজ্বল্যমান নক্ষত্র তার সবটুকু উজ্জ্বলতা নিয়ে এক শতাব্দী সময় পেরিয়ে দিব্যি সমুজ্জ্বল।

Please follow and like us:
3