হেফাজতি ভাইরাস এবং মামুনুলে বিশ্বাস

মামুনুলে বিশ্বাস

আনিস আলমগীর : ডেটিং ঠিক করার আগে মামুনুল হককে ফোনে মহিলাটি প্রশ্ন করছেন, ‘ফুর্তিতে আছেন মনে হইতাছে? এতো ঝামেলার মধ্যে এতো রস আহে কোত্থেকে?’ ঝামেলা যে ছিল সেটা দেশবাসীও দেখেছে। নরেন্দ্র মোদির ঢাকা আগমনের বিরোধিতা করে টানা আন্দোলন করেছেন হেফাজত নেতা মামুনুল হকরা। ২৬ মার্চ থেকে টানা তিনদিন দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছেন, কমপক্ষে ১৪ জন সমর্থকের প্রাণ ঝরিয়েছেন এবং সর্বশেষ ২ এপ্রিল এই হত্যার প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররমে জুমা শেষের সমাবেশে গরম বক্তৃতা দিয়ে পরদিন তিনি প্রেমিকাকে নিয়ে সোনারগাঁও-এর এক রিসোর্টে অভিসারে গিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী এই ঘটনার উদাহরণ টেনে ৪ এপ্রিল ২০২০ সংসদে হেফাজত নেতা মামুনুল হক সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন, ‘জ্বালাও-পোড়াও করে তিনি বিনোদন করতে গেলেন একটি রিসোর্টে, একজন সুন্দরী মহিলা নিয়ে।’ তার ভাষায়, শনিবার মামুনুল হক ‘অপবিত্র কাজ করে সোনারগাঁও এর রিসোর্টে’ ধরা পড়েছেন।
ব্যক্তিগতভাবে দুটি প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের সম্মত-সম্পর্ক নিয়ে আমার কোনও মাথা ব্যথা নেই, যদি না এদের সংশ্লিষ্ট কেউ সেটা নিয়ে অভিযোগ তুলেন। কিন্তু মামুনুল হকের ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হয় কারণ তিনি অতি সাধারণ মানুষ না, একজন ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা। ইসলামি আন্দোলনের নেতা। তার অপকর্ম ধর্মের গায়ে লাগে, লাগে ওই ধর্মে বিশ্বাসী লক্ষ কোটি মানুষের গায়েও। আল্লাহ আছে কী নেই সেটা নিয়ে যখন ভোট করা যায় না, তখন ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে ধর্মও চলে না। মামুনুল হকরা সেটা বুঝে- না বুঝে ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করতে গিয়ে ধর্মকে কলুষিত করছেন দীর্ঘদিন থেকে। তাদের চরিত্র দিয়ে ধর্মের গায়ে দুশ্চরিত্রের কলংক লাগাচ্ছেন।
মাত্র পড়া শেষ করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তানি এক লেখিকার উপন্যাস (ঙভ গধৎঃুৎং ধহফ গধৎরমড়ষফং নু অয়ঁরষধ ওংসধরষ)। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলি এবং ৬০ এর দশকের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এখানকার মানুষের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর নিপীড়নমূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাস নির্ভর এই উপন্যাসে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসগুলো একতরফা কিন্তু এই বইটি ইতিহাসকে উল্টোচোখে দেখতেও শেখায়। উপন্যাসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার সঙ্গে আরেকটি বেদনার দিক ছিল এইদেশে বাস করা উর্দুভাষী মানুষগুলোর পরিণতির দিকটি। ১৯৪৭ সালে তারা ভারত থেকে এখানে এসেছে, এই দেশকে নিজের দেশ মনে করে।
দেশভাগের পর তারা এই অধিকারটুকু পায়নি, তাদের মতামত নেওয়া হয়নি যে, যারা বাংলাদেশে থাকতে চায় তারা এখানে থাকতে পারবে কিনা? কারণ এই দেশটিতো তাদেরও ছিল। গড়ে তাদেরকে আমরা বিহারি বানিয়ে বাসস্থানহীন করেছি, পাকিস্তানি সেনাদের বাঙালি হত্যার প্রতিশোধ নিতে উর্দুভাষী নিরিহ লোকদেরও হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতন করেছি। হোক সেটা পরিমাণে কম। উর্দুভাষীরা সবাই ধোয়া তুলসিপাতা ছিল তা নয়, সেনাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের অনেকেও বাঙালি নিধন করেছে নয় মাসজুড়ে। আর তাদেরকে ভুল পথে পরিচালনা করার জন্য দায়ী ছিল তথাকথিত ইসলামি নেতারা, বিশেষ করে গোলাম আযমসহ জামায়াতে ইসলামী দলটির নেতারা। তারাই সৃষ্টি করেছে আলবদর, আলশামস নামের জল্লাদ বাহিনী। এমনকি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৭২-এর ফেব্রুয়ারি মাসে জামাতিরা মিরপুরের উর্দুভাষীদের এলাকায় উর্দুভাষীদের নিয়ে অস্ত্র, পাকিস্তানি পতাকা উচিয়ে পাকিস্তানের নামে স্লোগান দিয়েছে।
পরিণতিতে সব উর্দুভাষীরা হয়ে গেছে গৃহচ্যুত বিহারি, সবাই হয়ে গেছে পাকিস্তানি দালাল। এই দেশকে ভালোবেসে অনেকে এই মাটিতে থাকতে চাইলেও উর্দু তাদের মাতৃভাষা এই অপরাধে ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশ। যারা যেতে পারেনি, দখলদারদের কাছ থেকে বাড়ি ফেরত পায়নি, তাদের স্থান হয়েছে রিফিউজি ক্যাম্পে। এখনও কয়েক লক্ষ উর্দুভাষী বিহারি নামেই ক্যাম্পে জীবনযাপন করছে, যদিও তাদের সবাই বিহার থেকে আসেনি। আর বাংলা মাতৃভাষা বলে একই দোষে অভিযুক্ত হয়েও জামাতিরা রয়ে গেছে এই দেশে। কেউ তাদেরকে দেশছাড়া করার কথা বলেনি।

হেফাজতিরা অতি সম্প্রতি টানা তিনদিন যা করেছে এবং করোনার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য অপসারণ আন্দোলন, নরেন্দ্র মোদির সফরের বিরোধিতা বা তারও আগে সংগঠনটির জন্মের গোড়ার দিকে ৫ মে ২০১৩ ঢাকার মতিঝিলে যে তা-ব চালিয়েছে- সব কিছুতে মাদ্রাসার ছাত্রদের হাতিয়ার করে মামুনুলরা যা করছেন, তাতে আমার মনে হয়েছে তারা ১৯৭১ সালের সেই জামাতিদের প্রতিনিধি, যারা নিরীহ উর্দুভাষীদের উসকানি দিয়ে বিপদে ফেলে পালিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই মানুষকে ধর্মের নামে ধোঁকা দেওয়া, মিথ্যা ফতোয়া জারি, হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ ছড়ানোই ছিল এদের কাজ। মানুষের বিপদে এরা কখনই থাকে না, বরং অনুসারীদের বিপদে ফেলে এরা পালায় এবং বিনোদন করতে রিসোর্টে যায়।
মামুনুল হক লাশ নিয়ে রাজনীতি করেছেন কিন্তু মৃতদের স্বজনকে সমবেদনা জানাতে তাদের বাড়ি যাননি। জানি না কেন তারা সমবেদনা জানাতে যাননি সেইসব তরুণদের পরিবারের সদস্যদের, যাদের তারা অকারণে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন, তাদের দিয়ে মানুষের বাড়ি পুড়িয়েছেন, গাড়ি পুড়িয়েছেন, সরকারের সম্পত্তি পুড়িয়েছেন, ধ্বংস করেছেন নানা স্থাপনা, আক্রমণ করেছেন থানা। এমনকি স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তির দিনে জাতির জনকের প্রতিকৃতিতে খুনতি-কুড়াল দিয়ে আঘাত করে তার মুর‌্যাল নষ্ট করছেন। বাংলাদেশের ৫০ বছর পূর্তির স্বাধীনতা দিবসে, একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে হায়নাদের প্রতিনিধিত্ব করার দায়িত্ব নিয়েছেন মামুনুল হকরা?
পুরো রাষ্ট্র আজ করোনাভাইরাসের সঙ্গে হেফাজতি ভাইরাসেও যে আক্রান্ত, সেটা আবার বুঝা গেলো মামুনুল হকের রিসোর্ট অভিসারের পর। যারা এটা বিশ্বাস করতে পারছে না যে মামুনুল হক এমন কাজ করতে পারেন তারাই ‘হেফাজতি ভাইরাসে’ আক্রান্ত। একের পর এক টেলিফোন ফাঁসে মামুনুল ফেঁসে গেলেও, সব কিছু পরিষ্কার হলেও, তিনি ভুল করতে পারেন এটা বিশ্বাস করতে পারছে না তার অনুসারীরা। ধর্মের ওপর অন্ধ বিশ্বাস রাখা যায়, ধর্ম নিয়ে যুক্তি-তর্ক চলে না, ধর্ম বিশ্বাস এমনই। কিন্তু ধর্মের সঙ্গে ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতাদের উপরও অন্ধ বিশ্বাস স্থাপনই হচ্ছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া।
হেফাজতি ভাইরাসে আক্রান্ত মামুনুল হকের অনুসারীদের মুর্খতা তাদেরকে এমন পর্যায়ে নামিয়েছে যে মামুনুল নিজে ফাঁস হওয়া টেলিফোন নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার সাহস না পেলেও তারা করছে। মামুনুলের স্ত্রী, পরিবারের সদস্যরা তার দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্ক না জানলেও এরা জেনেছে। কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর পুলিশে দেওয়া বয়ান নিয়ে তার মা-বাবা, সন্তানের সন্দেহ না থাকলেও এদের কাছে মনে হচ্ছে এটা সরকারের চাল। সন্তানের সঙ্গে মায়ের সংলাপ, সন্তানের ভিডিও ম্যাসেজ এদের মনে হয় এডিট করা।
ভাইরাসে আক্রান্তরা বুঝতে পারছে না যে, মামুনুল হক একজন মিথ্যাবাদী এটা জাতির কাছে তিনি নিজেই প্রমাণ দিয়েছেন। ওই মহিলা যে তার স্ত্রী তা নিয়ে প্রমাণিক দলিল না থাকলেও, দুনিয়ার কেউ না জানলেও, ধরে নিলাম তারা বিয়ে করেছেন। কিন্তু মামুনুল হক সমবেত লোকজনের কাছে, হোটেলের রেজিস্ট্রি খাতায় মহিলাটির নাম তার আসল স্ত্রীর নাম বলেছেন, স্ত্রীকে এই ঘটনায় মিথ্যা বলার পরামর্শ দিয়েছেন- সেখানে কি তাকে একজন ধর্মীয় নেতা হিসেবে গণ্য করা যায়? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো যথার্থই প্রশ্ন তুলেছেন- ‘যারা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করে, এ রকম মিথ্যা কথা তারা বলতে পারে? অসত্য কথা বলতে পারে? যারা মিথ্যা বলতে পারে, তারা কী ধর্ম পালন করবে? মানুষকে কী ধর্ম শেখাবে?’
প্রশ্ন হচ্ছে করোনাভাইরাসের টিকা চলমান আছে, হেফাজতি ভাইরাস তাড়ানোর টিকা সরকার কবে শুরু করবে?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

 

 

 

Please follow and like us: