শনি. সেপ্টে ২১, ২০১৯

সড়কে কেন মৃত্যু-বিভীষিকা

সড়কে কেন মৃত্যু-বিভীষিকা

Last Updated on

বিশেষ সংবাদদাতা : গতকাল রোববার সারাদেশে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদ শেষে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে যতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে, ফেরার পথে দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি-সবই বেশি।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করেন, এমন বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাড়ি যাওয়ার সময় একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ পথে নামে। আর যানবাহনের চাপে মহাসড়কগুলোতে স্বাভাবিক গতিতে গাড়ি চলতে পারে না। কিন্তু ফেরার পথে এই চিত্র থাকে না।
ঈদ শেষে ফেরার তাড়া বেশি থাকে মূলত চাকরিজীবী বা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের পরীক্ষা থাকে বেশি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তারা বাড়তি দু-একটা দিন বাড়তি সময় নিয়ে থাকেন। ফলে ফিরতি পথে যানজট থাকে না খুব একটা। আর বাড়ি যাওয়ার পথের তুলনায় ফিরতি পথে গাড়ির গতি থাকে মাত্রাতিরিক্ত। আর গতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নানা ঘোষণা থাকলেও এর বাস্তবায়ন হয়নি।
ঈদ শেষে ফিরতি পথে সড়কে সিংহভাগ প্রাণহানিই ঘটেছে বাসের সঙ্গে উল্টো পথ থেকে আসা বাস বা অন্যান্য যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষে। একাধিক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গাড়িচাপা পড়েছে বড় গাড়িতে আর ছোট গাড়ির সিংহভাগ যাত্রীই প্রাণ হারিয়েছেন সেগুলো দুমড়ে মুচড়ে যাওয়ায়। এতে বোঝা যায়, গাড়িগুলোর গতি ছিল মাত্রাতিরিক্ত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বাসগুলা ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষ আহতও হয়েছে। ঈদযাত্রায় পথে পথে যানজট ঠেকাতে পুলিশের অবস্থানের কারণে যানবাহনগুলো তুলনামূলক শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে চলাচল করে। মহাসড়কে অযান্ত্রিক বা তিন চাকার ধীরগতির গাড়ি সেভাবে উঠতে পারে না। কিন্তু ফেরার পথে এই নজরদারি থাকে না। একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে ধীরগতির বা অযান্ত্রিক গাড়ি হুট করে মূল সড়কে উঠে আসে। কিন্তু তাদের ঠেকানোর লোক থাকে না।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ শামসুল হক একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘ঈদের পরে ফাঁকা রাস্তায় ছোট ধীর গতির অবৈধ যানগুলো হঠাৎ মহাসড়কে ঢুকে গিয়ে দুর্ঘটনার ঘটায়। একে তো যানবাহনের ফিটনেস নেই পাশাপাশি পর্যাপ্ত দক্ষ চালকও নেই। ফলে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের কারণেও দুর্ঘটনাগুলো ঘটে।’
গত বছরের চেয়ে কমলেও এবারও ঈদের ছুটি শেষে নগরে ফেরার পথে এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। বেশিরভাগ দুর্ঘটনাই ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। আর ওভারটেকিং করতে গিয়ে বহু সংখ্যক বাসের খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। একাধিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানো মানুষরা ছিলেন ছোট গাড়িতে।
আবার ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে ট্রেন, লঞ্চ বা লোকাল বাসগুলোতে যেভাবে উপচে পড়া ভিড় থাকে, ফেরার পথে সে রকম চিত্র থাকে না। যাত্রীরা ফিরতি পথে বসে আসতেই বেশি পছন্দ করেন। ফলে একই পরিমাণ যাত্রীকে নিয়ে আসতে বেশি গাড়ির প্রয়োজন হয়। আর এ জন্য বাসগুলো বাড়তি ট্রিপ দেওয়ার চেষ্টা করে, সর্বোচ্চ গতিতে চলে সেগুলো।
স্বাভাবিক সময়ে যেসব গাড়ি একবার ট্রিপ নিয়ে যায়, ঈদের সময় সেগুলো একাধিক ট্রিপ দিয়েছে। কিন্তু চালক সেই একজনই। আর স্টিয়ারিং হাতে ক্লান্ত চালকরা সংকটকালীন সময়ে গাড়ি সামলাতে পারেন না সেভাবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট-(এ আরআই)-এর সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুর নেওয়াজ বলেছেন, ‘গাড়িগুলো অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে মাত্রাতিরিক্ত গতিতে চালায়। ভারী যানবাহন চালনের সংখ্যা কম থাকায় তাদেরকে অনেক বেশি সময় চালাতে হয়। এটা একটা বড় সমস্যা। কয়েক সেকেন্ডের অবসাদ বা ক্লান্তি বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়।’
‘আবার এই সময়ে শহরে চলা প্রাইভেট গাড়িও দূর পাল্লায় ট্রিপ নিতে যায়। বাসের ক্ষেত্রেও স্বল্প দূরত্বে চলা গাড়িগুলো দীর্ঘ পথের যাত্রী টানতে যায়। চালকরা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যার কথা জানে না। এর সবই দুর্ঘটনার কারণ।’
পরিবহন বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অধ্যাপক শামসুল হক। তিনি বলেন, ‘টানা পাঁচ ঘণ্টা চালানোর পর চালক বদল করার কথা নিয়মে থাকলেও এদেশে একই চালক রাত-দিন টানা গাড়ি চালাতে থাকে। ফলে ঈদ পরবর্তী সময়ে অবসাদগ্রস্ত চালক গাড়ি চালাতে গেলে দুর্ঘটনা হবেই।’
যানবাহনের দ্রুটিও রয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো টায়ারের কারণে গাড়িগুলো যথা সময়ে ব্রেক কষতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে। বৃষ্টির মধ্যে এই সমস্যা বেশি হয়। বুয়েটের এআরআই এর আরেক শিক্ষক শাহনেওয়াজ হাসানাথ-ই-রাব্বি বলেন, ‘আমরা দেখেছি প্রায় ৮০ ভাগের উপরের গাড়ির টায়ার ভালো মানের নয়। ফলে বৃষ্টিতে ব্রেক করার সময় খাজকাটা টায়ার রাস্তাটাকে যেভাবে আটকে ধরতে পারে, মানহীন টায়ার সেটা পারে না। ফলে বৃষ্টিভেজা রাস্তায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। এ ছাড়াও বৃষ্টি পড়ার কারণে দূরে ভালোভাবে দেখা না যাওয়াও একটা কারণ।’
সংকেতবাতি নষ্ট থাকে বেশিরভাগ গাড়ির। ফলে তারা সামনে বা পেছন দিক থেকে আসা গাড়িগুলোকে সংকেত দিতে পারে না। এটাও দুর্ঘটনার একটি কারণ। ঈদের তিন দিনের ছুটির পর এবার একটি কার্যদিবস পর জাতীয় শোক দিবস এবং দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। আর ঈদের তিন দিনের ছুটির সঙ্গে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি এবং মাঝে একটি কার্যদিবসের পর আবার তিন তিন ছুটি থাকায় মানুষের ফেরার তাড়া ছিল কম। আজ রোববার থেকে পুরোদমে নগর প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। আর শুক্রবার থেকে ফেরার গতি বেড়েছে।
ফেরার স্রোতে যখন কম ছিল, প্রাণঘাতি দুর্ঘটনাগুলো তখন ঘটেছে বেশি। গত বুধবার সড়কে প্রাণ গেছে অন্তত ২৫ জনের। এর পরের তিন দিনেও নিহত হয়েছে আরো ৪০ জনের বেশি। গতকাল রোববারও গেছে অন্তত ১৮ জনের প্রাণ। অথচ ঈদযাত্রায় কোটি কোটি মানুষের নগর ছেড়ে বাড়ির পথে যাত্রায় এত পরিমাণ প্রাণহানি হয়নি। তাহলে ফিরতি যাত্রা কেন বিষাদের হচ্ছে?
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের শিক্ষক শাহনেওয়াজ হাসানাথ-ই-রাব্বি বলেন, ‘দুঘর্টনার সঙ্গে যানজটের একটা সম্পর্ক রয়েছে। কারণ যানজট বেশি থাকলে যানবাহন ধীরে চলে। ফলে দুর্ঘটনা কম হওয়ায় সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু ঈদের পর যানজটমুক্ত ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত গতিতে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বেশি হয়।’
‘এ ছাড়া ঈদের আগে উৎসবের আমেজে সবাই সতর্ক থাকে। পাশাপাশি সব সংস্থার বিশেষ নজড়দারি থাকে যা ঈদ শেষে থাকে না। কিছুটা অবহেলা থাকে কর্তৃপক্ষের। কখনো কখনো চার লেনের যানবাহন দুই লেনে ঢুকলে সেখানে গতির তারতম্যের কারণেও অনেক সময় দুর্ঘটনা হয়।’ দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে চাইলে কী করতে হবে?- অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, প্রশাসনকে সারা বছর সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘উন্নত বিশ্বে পালাক্রমে চালকেরা গাড়ি চালাচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ বাসে উঠে যায়। এভাবে প্রতিটি বিষয় যেমন গাড়ির ফিটনেস, চালকদের বেতনকাঠামো, সব ধরনের সংস্থার নিয়মিত নজড়দারির কারণে দুঘর্টনা কমে এসেছে। কিন্তু আমাদের দেশে মৌসুমি কিছু আয়োজন করে হঠাৎ করে সচেতনতা তৈরি করা হয়। তখনই সবাই চিন্তাভাবনা করে। এর পরেই সব আগের বিশৃঙ্খলায় ফিরে যায়। কারণ আমরা নিয়মগুলো সবই দিকনির্দেশনার মধ্যেই রেখে দেই।’

Please follow and like us:
2