সিঙ্গাপুর প্রবাসীর ফেইসবুক ‘সংবাদ সেবা’

সিঙ্গাপুর প্রবাসীর ফেইসবুক ‘সংবাদ সেবা’

প্রযুক্তি ডেস্ক : সিঙ্গাপুরে কোনো বাংলাদেশি শ্রমিককে যদি প্রশ্ন করা হয়, মহামারীর এই সময়ে তারা খবরাখবর কোথায় পান, অনেকেই এক বাক্যে বলবেন একটি ফেইসবুক পেইজের কথা, যেটা চালান ওমর ফারুক শিপন নামের ৩২ বছর বয়সী এক প্রবাসী যুবক। সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব নিয়ে প্রতিদিন যে হালনাগাদ তথ্য দিচ্ছে, ইংরেজি পত্রিকায় যেসব জরুরি খবর আসছে, সেগুলো বাংলায় অনুবাদ করে শেয়ার করা হয় ‘সিঙ্গাপুরে আমরা প্রবাসী বাংলাদেশী’ নামে ফেইসবুক পেইজটিতে। আর নিউজ শেয়ার করতে করতেই সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যম স্ট্রেইটস টাইমসের খবরের শিরোনাম হয়েছেন চাঁদপুরের ছেলে ওমর ফারুক শিপন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ডিগ্রিধারী শিপন ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুরে কাটিয়ে দিয়েছেন ১০ বছর। কয়েক বছর আগে, নিছক ‘মজা’ করতেই ফেইসবুকে ওই পেইজ চালু করেন তিনি। কিছুদিনের মধ্যে এর অনুসারীর সংখ্যা দুই হাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গেলে পেইজ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন শিপন। সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশিদের ‘সুখ, দুখ, আনন্দ, বেদনার’ কথা প্রকাশ করা এই পেইজের ফলোয়ার এখন ৫২ হাজারের বেশি। স্ট্রেইটস টাইমসকে শিপন বলেছেন, মহামারী শুরু হওয়ার পর তার পেইজের ফলোয়ার অনেক দ্রুত বেড়েছে। আর ফেইসবুকের ডেটা বলছে, গত কয়েক মাসে এই পেইজের ৬০টির মত পোস্ট ২০ লাখ ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছেছে। ফেইসবুক পোস্টের লেখা পড়ে যাদের বুঝতে সমস্যা হতে পারে, তাদের জন্য বাংলায় সংক্ষিপ্ত বর্ণনা জুড়ে দিয়ে কখনও কখন স্বল্প দৈর্ঘ্যের ভিডিও পোস্ট করেন শিপন। তিনি বলেন, “যখন আমি অনুবাদ করি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য দিয়ে আমি পুরো বিষয়টার সারসংক্ষেপ তুলে ধরি। সেটা পড়তে খুব একটা সময় লাগে না।” স্ট্রেইটস টাইমস লিখেছে, প্রতিদিন চাকরি শেষে ফেইসবুকে এই পেইজ চালানো খুব সহজ বিষয় নয়। মেরিন সেক্টরে সিনিয়র সেইফটি কো-অর্ডিনেটর পদে থাকা শিপনকে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা এই পেইজে সময় দিতে হয়। এর মধ্যে তাকে হয়ত কোনো খবর বা তথ্যের অনুবাদ করতে হয়। অনেকের মন্তব্যের উত্তরও তিনি দেন। ওই ফেইসবুক পেইজে একটি মোবাইল নম্বর ও ইমেইল ঠিকানাও দেওয়া আছে, যাতে পাঠকরা প্রশ্ন ও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন। শিপন স্ট্রেইটস টাইমসকে বলেছেন, প্রতিদিন জনা পঞ্চাশেক পাঠকের মন্তব্যের উত্তর দিতে হয় তাকে। এই পাঠকরা নানা ধরনের প্রশ্ন করেন; পরামর্শও চান। তাদের কেউ হোস্টেলের দুরবস্থার কথা বলেন। কোভিড-১৯ পজিটিভ হলে কী করণীয়, তাও জানতে চান অনেকে।
স্পষ্ট ধারণা থাকলে শিপন নিজেই সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বা প্রবাসীদের বিভিন্ন গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগের উপায় বলে দেন। ভাইরাসের কারণে মানুষের চলাচলে বিধিনিষেধের এই সময়ে সিঙ্গাপুর প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের তিনি সহায়তা করছেন ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে। বাংলাদেশি তরুণ ফজলে এলাহী রুবেল সিঙ্গাপুরে আছেন ১১ বছর ধরে। ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্স থেকে আসা শ্রমিকদের নিয়ে ২০১৮ সাল থেকে প্রতি বছর একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন রুবেল। এ বছরও অনুষ্ঠানটি হচ্ছে, তবে অনলাইনে। একটি নির্মাণ প্রকল্পের সেইফটি কো-অর্ডিনেটর পদে থাকা রুবেল বলেন, তার ‘বস’ খানিকটা ছাড় দেন বলেই ওই আয়োজন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এ বছর জুমে সেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে তার। অনুষ্ঠানটি ফেইসবুকেও দেখা যাবে। দলীয় ও একক গান, নাচ, কবিতাসহ ১৫টি আয়োজন নিয়ে দেড় ঘণ্টার এই অনুষ্ঠান আগামী ২১ জুন সম্প্রচার করা হবে। এবারের অনুষ্ঠানের শিরোনামে দেওয়া হয়েছে ‘দ্য ব্রিজ’। কারণ প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি এবারই প্রথম সিঙ্গাপুরের শিল্পীরাও অংশ নেবেন। রুবেল জানান, প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে গড়ে তোলা প্ল্যাটফর্ম উইমবির (ওয়েলকাম ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড) সঙ্গে মিলে বার্ষিক এই আয়োজন করছেন তিনি। সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় স্থানীয়দের অভিবাসীবিরোধী মনোভাব পরিচিতি পেয়েছে ‘নট ইন মাই ব্যাকইয়ার্ড’ বা সংক্ষেপে ‘নিমবি’ হিসেবে। তার জবাব দিতেই গড়ে উঠেছিল প্রবাসীদের প্ল্যাটফর্ম উইমবি। এই উইমবিকে সঙ্গে নিয়ে রুবেল অনলাইনে লাইভ আলোচনা অনুষ্ঠানও করছেন, যেখানে প্রবাসী শ্রমিকরা তাদের থাকার জায়গা ও বেতনের সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিলতার কথা তুলে ধরতে পারেন। প্রবাসীদের বিভিন্ন হোস্টেলে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে খাবার ও জরুরি জিনিসপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করেন রুবেল। অনলাইনে আলোচনা অনুষ্ঠান করার বিষয়ে স্ট্রেইটস টাইমসকে তিনি বলেন, “যখন সিঙ্গাপুরের কেউ এসব নিয়ে বলেন, শ্রমিকরা হয়ত তা বিশ্বাস করতে পারেন না। তাই আমরা নিজেরাই কথা বলি? আমরা আমাদের সত্যটা বলতে পারি।” এসব কাজের জন্য আর্থিক কোনো লাভ শিপন অথবা রুবেলের হয় না। তারা দুজনই মনে করেন, সতীর্থদের সহায়তা করতে পারাই তাদের জন্য বড় অর্জন। শিপন বলছেন, সঙ্কটের এই সময়ে তথ্যের সত্যাসত্য যাচাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মহামারীর শুরুর দিকে তিনি দেখেন, তারই কোনো কোনো সতীর্থ একটি বার্তা ছড়িয়ে দিচ্ছে যেখানে দাবি করা হচ্ছে, বাংলাদেশিরা মারা যাচ্ছে এবং সরকার সেটা লুকাচ্ছে। ওই গুজব খ-াতে এরপর শিপন একটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেই সঙ্গে সহকর্মীদের এমন গুজব ও ‘ফেইক নিউজ’ না ছড়াতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, “সঠিক তথ্য জানা এখানে সব কর্মীর জন্যই দরকার।” রুবেলের একটাই লক্ষ্য, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রবাসীদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া ও সচেতনতার সেতুবন্ধন গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “সিঙ্গাপুরবাসীরা যখন প্রবাসীদের মেধার দিকগুলো দেখবে, আর এ বছর তো তারা একসঙ্গেই পারফর্ম করবে, তখন তারা বুঝতে পারবে, প্রবাসীরা শুধুই শ্রমিক না। এটা আমাদের দূরত্ব ঘোঁচাতে সহায়ক হবে।”

Please follow and like us: