রবি. ডিসে ৮, ২০১৯

সাগর-রুনি হত্যা: ৬৭ বার সময় প্রার্থনা

সাগর-রুনি হত্যা: ৬৭ বার সময় প্রার্থনা

Last Updated on

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে ৬৭ বার সময় চেয়েছে তদন্ত সংস্থা। সর্বশেষ ৫ আগস্ট। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারে তাঁরা তাঁদের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন। পরদিন ভোরে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রথমে মামলাটির তদন্ত করেন শেরেবাংলা নগর থানার একজন কর্মকর্তা। ১৬ ফেব্রুয়ারি মামলার তদন্তভার পড়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. রবিউল আলমের ওপর। দুই মাস পর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্ত দেওয়া হয় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে (র‌্যাব)। আসামিদের মধ্যে দুজন বাড়ির দারোয়ান পলাশ রুদ্র পাল ও কথিত বন্ধু তানভীর রহমান জামিনে আছেন। অন্য ছয় আসামি মিন্টু ওরফে বারগিরা মিন্টু, বকুল মিয়া, কামরুল হাসান অরুণ, রফিকুল ইসলাম, এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবির ও আবু সাঈদ কারাগারে আটক। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেপ্তার করা হবে। কিন্তু সাড়ে সাত বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্তকাজ শেষ না হওয়া দুঃখজনক।
থেমে আছে ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত
নারায়ণগঞ্জের তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী নিহত হয় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ৬ মার্চ রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের পুরান কোর্ট এলাকা থেকে অপহরণ করা হয় ইংরেজি মাধ্যমের মেধাবী এই শিক্ষার্থীকে। দুই দিন পর ত্বকীর লাশ ভেসে ওঠে শহরের চারারগোপ এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খালে। ঘটনার দিনই ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে তিনি আটজনের নাম উল্লেখ করে পুলিশ সুপারের কাছে অবহিত পত্র দেন। এরপর মামলাটির তদন্তভার দেওয়া হয় ডিবি পুলিশকে। পরে উচ্চ আদালত মামলাটি তদন্ত করতে র‌্যাবকে নির্দেশ দেন। র‌্যাব ত্বকী হত্যায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাঁরা সবাই এখন জামিনে আছেন। দুই আসামি সুলতান শওকত ভ্রমর ও ইউসুফ হোসেন লিটন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছিলেন,সাবেক সাংসদ নাসিম ওসমানের পুত্র আজমিরি ওসমানের টর্চার সেলে ত্বকীকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে নিশ্চল হয়ে আছে তদন্ত। ত্বকীর বাবা মনে করেন, হত্যার সঙ্গে ওসমান পরিবার জড়িত বলেই মামলার তদন্ত ও বিচার হচ্ছে না।
আলোচিত সময়ে আরও বেশ কিছু হত্যার ঘটনা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় হয়েছিল। কোনো কোনোটির বিচারও হয়েছে। তবে বেশির ভাগই বিচারের বাইরে থেকে গেছে। ২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর সিদ্দিক খুন হন এফ রহমান হলে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের গোলাগুলিতে। কিন্তু আদালতের রায়ে কেউ শাস্তি পাননি। সে সময়ে প্রথম আলোয় লিখেছিলাম, ‘আবু বকরকে কেউ খুন করেনি।’ এ রকম আদালতের চোখে খুনিকে না পাওয়ার বহু ঘটনা আছে। বিশেষ করে যেসব খুনের ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত, সেসব ঘটনায় খুনি শনাক্ত হয় না, কেউ শাস্তি পায় না। বিচারহীনতা সমাজে অপরাধ প্রবণতা যেমন বাড়ায়, তেমনি অপরাধীরা হয়ে ওঠে বেপরোয়া।
এর বিপরীতে কেউ কেউ নারায়ণগঞ্জের সাত খুন ও পুরান ঢাকার দরজিকর্মী বিশ্বজিৎ দাস হত্যা, সিলেটে রাজন হত্যা, খুলনায় রকিব হত্যার বিচারের কথা বলবেন। কিন্তু বিচারের দু-একটি নজির তো আইনের শাসনের প্রতিফলন নয়। আইনের শাসন চাইলে প্রতিটি খুনের, প্রতিটি অপরাধের বিচার হতে হবে। অপরাধীদের শাস্তি পেতে হবে। সেটাই হতে পারে অপরাধ দমনের কার্যকর উপায়। শুধু বক্তৃতা দিলে ন্যায়বিচার কায়েম হয় না।
সামনে ঈদুল আজহা। সারা দেশের মানুষ ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে চাইবে। কিন্তু যে মা-বাবা সন্তানকে হারিয়েছেন, যেসব পরিবারের কোনো
সদস্য নিখোঁজ আছেন, চোখের জলেই তাঁদের ঈদের দিনটি কাটবে।
রাষ্ট্র হত্যা-ধর্ষণ বন্ধ করতে পারছে না, বিচার তো করতে পারে।
সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

Please follow and like us:
3