সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন?

রেজানুর রহমান : ‘ক্ষমা’ এই শব্দটি এখন বেশ আলোচিত। বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার বাংলাদেশের গর্ব সাকিব আল হাসানের প্রকাশ্যে ‘ক্ষমা’ চাওয়ার ঘটনায় ‘ক্ষমা’ শব্দটি বেশ জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। সাকিব কেন ‘ক্ষমা’ চাইলেন? তাও আবার প্রকাশ্যে। সাকিব কি মারাত্মক কোনও অন্যায় বা অপরাধ করেছেন? যার জন্য তাকে প্রকাশ্য ক্ষমা চাইতে হলো? এয়ারপোর্টে একজন ভক্ত তার সাথে সেলফি তোলার জন্য অনিয়ন্ত্রিত আচরণ করায় সাকিব তার সাথে দুর্ব্যবহার করেছেন। ভক্তকে ধাক্কা দেওয়ায় ভক্তের হাতের মোবাইল মাটিতে পড়ে ভেঙে যায়। এজন্য সাকিব আল হাসানকে দোষারোপ করা হচ্ছে। হ্যাঁ, সাকিব কাজটা ঠিক করেননি। একথা তো সত্য, দেশ-বিদেশের অগণিত ভক্তের কারণেই সাকিব আল হাসান আজকের তারকা খ্যাতি পেয়েছেন। এজন্য তার খেলোয়াড়ি যোগ্যতাকেও ক্রেডিট দিতে হবে। সাকিব ভালো ক্রিকেট খেলেন বলেই না তাকে তার ভক্তরা মাথায় তুলে রাখে। পাশাপাশি একথাও ভাবা জরুরি, ভক্তরা ভালোবাসেন বলেই সাকিব আজকের সাকিব হয়েছেন। কাজেই ভক্তদের অনিয়ন্ত্রিত ভালোবাসাও মাঝে মাঝে সহ্য করতে হয়। পাশাপাশি ভক্তদেরও বোঝা উচিত সময়কাল বলে একটা কথা আছে। যাকে ভালোবাসি সে যেন নিরাপদে থাকে, সে যেন ভালো থাকে এটা নিশ্চিত করাও জরুরি। করোনার এই দুঃসময়ে যেখানে বারবার সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হচ্ছে সেখানে ভক্তদেরও উচিত আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা। প্রিয় তারকাকে দেখা মাত্রই তার সাথে সেলফি তোলার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এক্ষেত্রে এয়ারপোর্টে অতি উৎসাহী ভক্তই ভুলটা করেছে। তবু উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন সাকিব আল হাসান। ভক্তের সাথে অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন। এজন্য সাকিব আল হাসান ধন্যবাদ পেতে পারেন।
কিন্তু বিস্ময়ের ঘোরটা যেন কাটছেই না। বিস্ময়টা হলো সাকিবের ক্ষমা চাওয়ার দ্বিতীয় কারণটাকে ঘিরে। কলকাতায় একটি পূজাম-পে পূজা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন সাকিব আল হাসান। এই নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। একজন মুসলমান হয়ে সাকিব আল হাসান কেন পূজা অনুষ্ঠান উদ্বোধন করলেন? সাকিব এটা ঠিক করেননি, ইত্যাদি নানান অভিযোগ তুলে সাকিবের প্রতি প্রাণনাশের হুমকিও প্রদান করা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সাকিব আল হাসান প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, কলকাতায় কোনও পূজা উদ্বোধন অনুষ্ঠানের অতিথি তিনি ছিলেন না। ঘটনাক্রমে একটি পূজাম-পে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালাতে হয়েছে তাকে। এজন্য তিনি দেশবাসী বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইবোনদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন। প্রশ্নটা এখানেই থেকে যায়। ধরা যাক সাকিব আল হাসান পূজা উদ্বোধনের জন্যই ওই পূজাম-পে গিয়েছিলেন। এজন্য তাকে কি অপরাধীর কাতারে দাঁড় করানো যায়? একজন মুসলমান কি অন্য ধর্মের অনুসারীদের কোনও অনুষ্ঠানে যেতে পারবেন না? আমাদের দেশে যখন মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজা অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে যান তখন তো প্রতিবাদ ওঠে না। সাকিব আল হাসানের বেলায় কেন উঠলো? সাথে সাথে তিনিই বা কেন প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন তা বোধগম্য নয়। আমি একজন মুসলিম। এটা আমার গর্ব। আমার অহংকার। তবে অন্য ধর্মকেও আমি ছোট করে দেখতে চাই না। বরং আমি আমার মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে অন্য ধর্মের মানুষজনকে কীভাবে নিজের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে পারি সেই চেষ্টাই সবার করা উচিত।
অসম্মান, অবজ্ঞা করে নয়। ভালোবাসা দিয়েই এই পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারি। আমরা তা না করে রীতিমত অসম্মান, অশ্রদ্ধা অশালীন, অশোভন চর্চা শুরু করেছি।
আবারও দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলি, আমি একজন মুসলিম এটা আমার গর্ব, আমার অহংকার। তাই বলে অন্য ধর্মকে ছোট করে দেখার শিক্ষা আমি পাইনি। পবিত্র ঈদ উৎসব আমার জন্য জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দ। তাই বলে পূজা উৎসবকে আমি ছোট করে দেখতে চাই না। ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ এই বিশ্বাসকে লালন করলে ক্ষতিটা কোথায়? প্রসঙ্গক্রমে একটি বিষয়ের অবতারণা করতে চাই। তার আগে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এটি আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস। মাঝে মাঝে দেখি বিশি’জনদের অনেকের কথা ও লেখায় হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীদের নিয়ে কোটেশন থাকলে অর্থাৎ তাদের লেখায় বেদ উপনিষদের নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ থাকলে অনেকে বাহবা দেন। মন্তব্য করেন লেখাটি ভালো হয়েছে। কিন্তু কোনও লেখায় আমাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কোরআনের উদ্ধৃতি থাকলেই সুশীল সমাজ বলে খ্যাত অনেকেই একটু যেন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আমি এই মনোভাব মোটেই সমর্থন করি না। পাশাপাশি এটাও সমর্থন করি না অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাসকে অশ্রদ্ধা করা।
আবারও সাকিব আল হাসানের কথায় আসি। একটি পূজাম-পে উপস্থিত থাকার জন্য তিনি দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। এটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। ক্ষমা তিনি চাইতেই পারেন। কিন্তু তার ক্ষমা চাওয়ার ঘটনায় আমরা আসলে কী বার্তা পেলাম?
সাকিব আল হাসান একজন সাধারণ মানুষ হলে এত কথা বলার প্রয়োজন হতো না। কিন্তু সাকিব বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট তারকা। দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশের অসংখ্য তরুণ তাকে আইডল ভাবে। সাকিব এই যে ক্ষমা চাইলেন এর থেকে তারা কি শিক্ষা নেবে বলে মনে হয়?
লেখাটি শেষ করার আগে একটি অনুরোধ করতে চাই। সাকিবের ক্ষমা চাওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধ স্বাধীনতা থাকায় যে যেভাবে পারছে সাকিব আল হাসানকে ঘিরে মন্তব্য করছে। কারও কারও মন্তব্য এতটাই আপত্তিকর, অশোভন যে তা প্রকাশ করতেও সংকোচ হচ্ছে। যারা এই ধরনের মন্তব্য করছেন তাদের প্রতি বিনীত জিজ্ঞাসা– আপনারা কি বুঝে-শুনে মন্তব্য করছেন? বিশ্বখ্যাত ক্রিকেট তারকা একজন সাকিব আল হাসান একদিনে তৈরি হয়নি। এজন্য সময় লেগেছে। সাকিবের সবকিছুই সবার পছন্দ হবে এমনটা ভাবাও ঠিক নয়। তবু সাকিব বা সাকিবের মতো তারকার সম্পর্কে মন্তব্য করতে যাওয়ার আগে আমাদের একটু ভাবা উচিত-কাকে বলছি, কার জন্য বলছি? একথা আমার, আমাদের বলাটা ঠিক কিনা?
একটি গল্পের মাধ্যমে লেখাটি শেষ করতে চাই। বহু বছর আগের কথা। মে নবাব সিরাজউদ্দৌলা নাটকে অভিনয় করছেন। অভিনেতা, অভিনেত্রীরা তুখোড় অভিনয় করে চলেছেন। মীর জাফরের ভূমিকায় অভিনয়কারী অভিনেতা মে এলেই দর্শক যেন নড়েচড়ে বসে! নাটক শেষে মীরজাফরের ভূমিকায় অভিনয়কারী অভিনেতা দর্শকদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাথে সাথে দর্শক সারি থেকে তার ওপর বৃষ্টির মতো স্যান্ডেল আর জুতা নিক্ষেপ শুরু হলো। মীরজাফরের ভূমিকায় অভিনয়কারী অভিনেতা মোটেই ভয় ফেলেন না। বিব্রতও হলেন না। তিনি এক একটি জুতা আর সেন্ডেল তুলে নিয়ে কপালে ঠেকাতে থাকলেন। দর্শক যারপরনাই অভিভূত!
প্রিয় পাঠক, এটি একটি শিক্ষুীয় গল্প!
লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

Please follow and like us: