শনি. সেপ্টে ২১, ২০১৯

সমন্বয়হীনতায় আটকে ডাকসুর চাকা

সমন্বয়হীনতায় আটকে ডাকসুর চাকা

Last Updated on

নিজস্ব প্রতিবেদক : আশা মেটাতে পারেননি নির্বাচিতরা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, দুই পক্ষের সমন্বয়হীনতার কারণে এগোচ্ছে না কোনো কাজ, ‘লোক দেখানো’ কিছু কার্যক্রমের মধ্যেই সীমিত ডাকসুর কার্যক্রম। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোরও হয়নি বাস্তবায়ন। সমন্বয়হীনতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে ভিপি নুরুল হক নুর এবং ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিতদের কথায়ও। তবে দুই পক্ষই এজন্য পরস্পরকে দুষছে। বার্তাসংস্থা বিডিনিউজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এসব তথ্য।
২৮ বছর পর গত ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। কারচুপির অভিযোগের মধ্যে ২৫ পদের ২৩টি ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে এবং অন্য দু’টিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দুজন নির্বাচিত হন। সহসভাপতি (ভিপি) পদে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের নেতা নুরুল হক নুরের পাশাপাশি সমাজসেবা সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন আখতার হোসেন। ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে গোলাম রব্বানী ও এজিএস সাদ্দাম হোসাইনসহ ২৩ জন নির্বাচিত হন। ২৩ মার্চ দায়িত্বগ্রহণ করে এক বছর মেয়াদী নতুন ডাকসু। সেই হিসাবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই তাদের মেয়াদের অর্ধেক পূর্ণ হচ্ছে। ডাকসুর প্রায় ছয় মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়ন করতে গিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ সমন্বয়হীনতার কথাই আগে বলেন। তিনি বলেন, ‘দেখা যায়, ২৩ জন ডাকসুর ব্যানারে একটি কর্মসূচি পালন করছে, কিন্তু ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক সেখানে নাই। আবার অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গেও ডাকসুর কোনো আলাপ-আলোচনা নাই। ছাত্রলীগ ছাত্রলীগের মতো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে ডাকসুর নামে।’ ডাকসুর পক্ষ থেকে ‘শিক্ষার্থীবান্ধব’ কর্মসূচি না থাকা প্রসঙ্গে ফয়েজ বলেন, ‘কয়েকটি বিভাগের উন্নয়ন ফি কমানোর এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার কিছু উদ্যোগ আমরা দেখছি। এর বাইরে হলে গেস্টরুমে নির্যাতন বন্ধ, সিট সঙ্কটের সমাধান, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, পরিবহন সঙ্কট এবং সান্ধ্যকালীন মাস্টার্স বন্ধের মতো প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থাকলেও কোনো উদ্যোগ নেই।’ ইশতেহার কাগজকলমে : ছাত্রলীগ ও কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী দুই প্যানেলেরই নির্বাচনী ইশতেহারে সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, পরিবহন সঙ্কট নিরসন, ক্যান্টিনে খাবারের মান বৃদ্ধি, সাত কলেজের অধিভূক্তি বাতিল, ক্যাম্পাসে বাইরের যান চলাচল বন্ধের প্রতিশ্রুতি ছিল।
কিন্তু এসব বিষয়ে ডাকসুর পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের চোখে ধরা পড়েনি । পাঁচ মাস পর এসে ক্যাম্পাসে অ্যাপভিত্তিক বাইসাইকেল সেবার সাইনবোর্ড টানানো হলেও এখনও চালু হয়নি। খাবারের মান বাড়াতে কেন্দ্রীয় এবং হল সংসদগুলোর উদ্যোগহীনতার বিপরীতে বিজয় একাত্তর হলসহ দুয়েকটি হলের ক্যান্টিন থেকে ছাত্র সংসদ নেতাদের চাঁদাবাজির ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। ভিপি নূরের ইশতেহারে আবাসিক হলে প্রথম বর্ষ থেকে বৈধ শিক্ষার্থীদের সিট বরাদ্দ এবং গেস্ট রুম নির্যাতন বন্ধের প্রতিশ্রুতি থাকলেও ছাত্রলীগের ইশতেহারে তা ছিল না। কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রে হল প্রশাসন এখনও পুতুলের ভূমিকায়। সরকার সমর্থক সংগঠন ছাত্রলীগ সিট বণ্টন করছে আগের মতোই। হলগুলোর অতিথি কক্ষে শিক্ষার্থীদের ডেকে নিয়ে নানা রকম নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, সেটা আগের মতোই আছে, সেই ছাত্রলীগ নেতারা এখন হল ছাত্র সংসদের নেতা হিসেবে একই কাজ করছেন। এর মধ্যে নির্বাচনের সময় আশ্বাস দিয়েও সমস্যা ‘মোকাবেলা করতে না পারার’ কথা বলে সম্প্রতি সিট ছেড়ে গণরুমে গিয়ে উঠেছেন ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে নির্বাচিত ডাকসুর সদস্য তানভির হাসান সৈকত। বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডাকসুর দায়িত্ব নিয়েও ছাত্র প্রতিনিধিরা ‘কাজের কাজ’ কিছু করতে পারেননি বলে হতাশ শিক্ষার্থীদের অনেকই।
ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের পূর্বে সকলেরই প্রত্যাশা ছিল ডাকসু ক্যাম্পাসের বড় সমস্যাগুলো যেমন- গণরুম-গেস্টরুম সমস্যা, ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু পরিবহন ব্যবস্থা ইত্যাদির সমাধান করবে। অথচ এখন ডাকসু এমন কাজগুলো করছে যেগুলো বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের মনঃপূত না।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন পূর্ববর্তী ইশতেহার এবং পরবর্তীতে তা বাস্তবায়নে নির্বাচিতদের অবহেলা আমাদের হতাশার অন্যতম কারণ। ২/১ জন সম্পাদক ব্যতীত আর কাউকেই শিক্ষার্থীদেরকে দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়নে আগ্রহী বলে মনে হয় না।’ তবে অতটা হতাশ নন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নেতারা তাদের নির্বাচনকালীন যে এজেন্ডাগুলো ছিল সেগুলো পুরোপুরি পুরণ করতে পারেনি, কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের অভিযোগ জানানোর জন্য ডাকসুকে একটা প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করতে পারছে, যা আগে ছিল না।
‘এর ফলে আমরা দেখেছি, বিভিন্ন বিভাগের আভ্যন্তরীণ কোন সমস্যা, বিভাগের উন্নয়ন ফি কমানোসহ বিভিন্ন সমস্যার কথা শিক্ষার্থীরা ডাকসুকে জানাতে পারছে এবং ডাকসুর অনেক নেতা শিক্ষার্থীদের এই অভিযোগগুলো গ্রহণ করছেন।’ তবে ডাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসাইন দাবি করছেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অনেক কাজ করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। কিছু বিভাগ ও হলের উন্নয়ন ফি প্রত্যাহার, দুই ছাত্রী হলসহ বিভিন্ন রুটে পরিবহন বৃদ্ধি, লাইব্রেরি খোলার সময়সীমা দুই ঘণ্টা বাড়ানো এবং হল সংসদগুলোকে কার্যকর করে সাংস্কৃতিক কর্মকা- পালনকে সাফল্য হিসাবে দেখান তিনি। গণরুম সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ না নেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সঙ্কট তীব্র। গণরুম সঙ্কট মোকাবেলার জন্য নতুন হল নির্মাণের লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি আমরা।’
নতুন হল নির্মাণ ছাড়া গণরুম সমস্যার সমাধান সেভাবে সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এর বাইরে হল প্রশাসন ও হলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সিট বন্টনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কাজ করা হচ্ছে ডাকসুর পক্ষ থেকে।’ তবে ভিপি নুর স্বীকার করেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি তারা। তবে এজন্য ছাত্রলীগকে দুষছেন তিনি।
পাল্টাপাল্টি দোষারোপ : ছাত্রলীগ ও প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন ভিপি নূর। তিনি বলেন, ‘ডাকসু হওয়ার আগে শিক্ষার্থীদের যে প্রত্যাশা ছিল, অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি হবে। সকল ছাত্র সংগঠনগুলোর সহঅবস্থান তৈরি হবে। সেটা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষাঙ্গনগুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে বা এই ধারায় হয়ত চলবে।
‘সেই কারণেই ক্ষমতাসীন দলের যে ছাত্রসংগঠন এই পরিবেশটা তৈরি হতে দিচ্ছে না। তারা ডাকসুকে সক্রিয় করতে দিচ্ছে না। এবং তাদেরকে সহযোগিতা করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।’ তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচনের আগে ছাত্রলীগসহ প্রায় সকল ছাত্রসংগঠনই বলেছিল গেস্টরুম, গণরুম বন্ধ করবে, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের হলে থাকার ব্যবস্থা করবে এবং অছাত্র, বহিরাগতদের হল থেকে বিতারণ করবে। কিন্তু ছাত্রলীগের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে তা হচ্ছে না।’ নিজের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে নুর বলেন, ‘যেহেতু ডাকসুতে ২৩ জন তারা (ছাত্রলীগ সমর্থিত) এবং প্রশাসনও তাদের হাতে। তাই ইচ্ছে থাকলেও ওইভাবে কোন কাজ করতে পারছি না। ব্যক্তিগতভাবে ভিসি স্যারের কাছে আমি নিজেও শিক্ষার্থীদের এইসকল বিষয় নিয়ে একাধিকবার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তিনি বলতে গেলে ছাত্রলীগের সুরেই কথা বলেছেন।’ এ পর্যন্ত উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের উপস্থিতিতে তিনটি সভা হলেও এখনও ডাকসুর সব সদস্যদের নিয়ে কোনো সভা হয়নি উল্লেখ করে নুর বলেন, ‘ডাকসুর গঠনতন্ত্রে বলা আছে, যে কোনো প্রোগ্রামের বিষয়ে ডাকসুর হোল বডির মিটিংয়ে বিভিন্ন মতামত-পরামর্শ নিয়েই করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে গঠনতন্ত্রের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না।’
ডাকসু এজিএস সাদ্দাম হোসেন ডাকসু এজিএস সাদ্দাম হোসেন ভিপি নুরের অভিযোগের পাল্টায় ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের কর্মকা-ের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নাই। ভিপি পদকে ব্যবহার করে নিজের প্লাটফর্ম শিক্ষার্থী অধিকার মঞ্চের সাংগঠনিক ভিত গড়তে সচেষ্ট আছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান তার কাজের মধ্যে নাই, বাইরের অনেক কাজ ব্যস্ত তিনি।’ ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সংগঠনের কর্মীরাও নুরের মাধ্যমে ক্যাম্পাসে ‘সক্রিয় হওয়ার চেষ্টায়’ আছে বলে অভিযোগ ডাকসু এজিএসের। ভিপি নুরের অভিযোগের বিষয়ে ডাকসুর সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘একেক জনের একেকটা কথা থাকতে পারে। তবে ডাকসুর সম্পাদকসহ সবার কার্যক্রম আলাদা করে বলা আছে। তারা সেভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বহুবিধ কর্মসূচিতে এখন সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়।’ ডাকসুর পক্ষ থেকে যেসব ’অভিনব’ কার্যক্রম চলছে, সেটাকে আশাব্যাঞ্জক হিসাবে অভিহিত করেন উপাচার্য। তিনি বলেন, ’প্রায় তিন দশক পর কার্যক্রম শুরু করে আমরা যতটুকু আশা করেছিলাম, তার চেয়ে আশাব্যাঞ্জক কাজ এখন হচ্ছে।’

Please follow and like us:
2