শুক্র. সেপ্টে ২০, ২০১৯

সন্তানহীন দম্পতি ও সামাজিক দায়ভার

সন্তানহীন দম্পতি ও সামাজিক দায়ভার

Last Updated on

স্বাস্থ্য ডেস্ক : কেস স্টাডি-১ : চেম্বারে বসে আছি। এক ভদ্রলোক ঢুকলেন, আমার পুরনো রোগী। উস্কোখুস্কো চুল, শার্ট অর্ধৈক ইন করা আর অর্ধেক বের হয়ে আছে। তার স্ত্রীর বয়স ৩৯ বছর, দীর্ঘ ৯ বছর অপেক্ষার পর এতদিনে একটি নতুন প্রাণের জন্ম হতে যাচ্ছে তার গর্ভে সেই বারতা পেয়েছেন। আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্ট নিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন। সন্তানের মা-বাবা না হবার মাসিক যন্ত্রণায় তারা দুজনেই অনেক বিধ্বস্ত। যদিও না হবার পিছনে কারণ ছিল না কোন। ভদ্রলোক তো গত দুই মাস ধরে চাকরিও ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ, এই মানসিক নিপীড়ন তার কর্মজীবনের মনোযোগ নষ্ট করে দিচ্ছে। বহু বছর সন্তানের মুখ দেখেননি, এখন বহু কাক্সিক্ষত এই সুখবরে দুইজনেই হতবিহ্বল।
কেস স্টাডিও-২ : তরুণ আইটি বিশেষজ্ঞ সুমিত। মূলতঃ এই তরুণ ছেলেটির শুক্রাণুর রিপোর্ট কিছু সমস্যা থাকার জন্য সন্তানের মুখ দেখতে দেরি হচ্ছে। এর মাঝে আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবী চিকিৎসার সহায়তা নিয়েছে একবার, সেখানে ব্যর্থ। সামাজিক যন্ত্রণার দায়ভার এড়ানোর জন্য কিছুদিন পর পর চাকরি আর বাসার ঠিকানা পরিবর্তন করে। নতুন সহকর্মী আর নতুন প্রতিবেশিরা মুখ খোলবার আগেই আবার জায়গার পরিবর্তন।
কেস স্টাডি-৩ : চিকিৎসক শর্মি পলিসিস্টিক ওভারী সমস্যায় ভুগছে। এদের মাসে মাসে মাসিক হয়না, ডিম্বাণু পরিপক্ক হতে কিছু সমস্যা হয় কিনতু বাচ্চা হবার সম্ভাবনা অনেক অনেকদিন পর্যন্ত ভালো থাকে। চিকিৎসা চলছে আমার কাছেই। এর মাঝে একদিন ছলছল চাখ নিয়ে আমার কাছে হাজির। কারণ, ওর কাজিনের বাচ্চাকে (কাজিন নিজেও একজন চিকিৎসক) আদর করে কোলে নিতে গিয়েছিল, সেই কাজিন একটানে বাচ্চাকে সরিয়ে নিয়ে গেছে অমঙ্গলের আশংকায়।
এই প্রতিটি ঘটনাই সহিত্য, হয়তো সামান্য একটু পরিবর্তন আনা হয়েছে সময়ের প্রয়োজনে। আমরা যদি চোখ বন্ধ করে এই ঘটনাগুলোর কোনটাতে নিজেকে কল্পনা করি, তাহলে আরও ভালভাবে নিঃসন্তান দম্পত্তিদের কষ্ট বুঝতে পারবো।
সন্তান প্রতিটা মানুষের একটা অসম্ভব ভালবাসা ও আবেগের বস্তু। এখন একটা ছেলে ও মেয়ে উভয়েই পড়শোনা শেষ করে একটা চাকরি শুরু করে ও তারপর বিয়ের কথা ভাবে। বিয়ের সাথে সাথেই অনেকেই নতুন অতিথির কথা মাথায় আনেনা, ১/২ বছর পার করে নিজেদের বন্ধন ঠিক করার জন্য। এভাবে ২৮-৩০ বছর বয়স হয়ে যায় একটি চাকুরিজীবী মেয়েল প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে দিতে। আবার অনেকেই প্লানিং করার সাথে সাথেই সেই কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন। যত বেশি দেরি হয়, তত বেশি মানসিক চাপের মাঝে পড়ে যায়। উভয় দিকের বাবা-মা উশখুশ করতে থাকে। নিজেদের ভাইবোন, বন্ধু, সহকর্মী… সবাই মুখ খোলা শুরু করে। কেউ কেউ টিপ্পনী কাটে, ‘আর কত ক্যারিয়ার গুছাবে? এইবার বাচ্চা নাও, নিচ্ছ না কেন? কার সমস্যা?’
এই ডাক্তার ভালো, ঐ ডাক্তার আরও ভালো, হোমিওপ্যাথি ভালো নাকি এলোপ্যাথি ভালো, পানিপড়া ভালো নাকি মন্ত্রপড়া ভালো… এত এত ভালো আর এত এত পরামর্মের মাঝে পড়ে এইসব দম্পত্তিরা দিশেহারা হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় হতাশা ও টানাপোড়েনের গল্প। দম্পতিরা নিজেরই একসময় অসামাজিক হয়ে যায় কিংবা আশেপাশের মানুষই সামাজিকভাবে বয়কট করে। গায়ে হলুদ, বিয়ে, বাচ্চার জন্মদিন কোন অনুষ্ঠানেই ডাক পড়ে না অমঙ্গলের আশংকায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষের চেয়ে নারী সামাজিক বিড়ম্বনার শিখার বেশি হয়, হোক না সে শহরে কিংবা গ্রামের মেয়ে। যদিও সস্তান না হবার দায় স্বামী ও স্ত্রী উভয়েরই সমান সমান। তবে একটা বিষয় আশংকাজনকভাবে বেড়ে গেছে, সেটা হলো, মেয়েদের ডিম্বাশয় বা ওভারীতে ডিম্বাণুর পরিমাণ কমে যাওয়া। আমাদের পরিবেশ বা খাদ্যদূষণ কিংবা নির্দিষ্ট কোন কারণ দায়ী আছে কিনা এটার জন্য তা নিয়ে অবশ্যই ভাবনা ও গবেষণার সময় চলে এসেছে এখন।
আবার স্ট্রেস ও হতাশা ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর স্বাভাবিকভাবে তৈরি হওয়াতে বাধা প্রদান করে আবার স্বামী স্ত্রীর স্বাভাবিক সম্পর্কেরও অবনতি করে। শুধুমাত্র এই ইস্যু নিয়ে অশান্তি ও দ্বন্দ্ব হতে হবে এক পর্যায়ে ভালবাসার সম্পর্কেও ফাটল ধরে, শুরু হয় ডিভোর্সের মামলা আর আইন বিশারদদের দ্বারস্থ হবার মত ঘটনা।
নতুন বছরের শুরুতে আমরা সবাই যেন সচেতন হই এই বিষয়ে। সব সময় ভাবতে হবে, যারা নিঃসন্তান, তাদের মানসিক যাতনার চেয়ে অন্য কারো যাতনা কিংবা কষ্ট বেশি হতে পারেনা। আমরা কাউকে আঘাত করা বা হেয় করে কথা বলার আগে সেই অবস্থানে যেন নিজেকে কল্পনা করে নেই। তাহলে আমাদের আচরণের পরিবর্তন আসবে। ২০১৯ সাল আমাদের সবার ভালো কাটুক। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থেকেই কোয়ালিটি সম্পন্ন জীবন-যাপন করা সম্ভব। আমরা সবাই পরস্পরের পাশে বন্ধুর মত দাঁড়াই, নিঃসন্তান দম্পতিদের সামাজিকভাবে বয়কট নয় বরং মমতা ও ভালবাসার হাত বাড়াই ওদের প্রতি।
Ñডা. শাহীনা বেগম শান্তা, কনসালটেন্ট, অবস গাইনী বিভাগ, বি আর বি হাসপাতাল

Please follow and like us:
2