শ্রেয়া ও কাকের ছানা

শ্রেয়া ও কাকের ছানা

Last Updated on

লিটন কুমার চৌধুরী : কয়েকমাস হল শ্রাবণীরা বাসা বদল করেছে। পুরোনো বাসা থেকে এটা বেশ বড়। তিনটে বেডরুম, একটা ড্রয়িং, কিচেন, ড্রাইনিং, দুটো বাথরুম। সামনে বেলকনিও আছে। পুরানো আমলের ঘর হওয়ায় রুমগুলোও বেশ বড়। বিল্ডিংয়ের সামনে চিলেকোটায় একটুকরো উঠোন। শ্রাবণী খুব খুশি। কারণ তার দুবছরের ছোট বোনকে নিয়ে খেলতে পারবে উঠোনে। তাতে আম, কাঠাল, পেয়ারা, নারিকেলের বাগান। তাদের বাসা চারতলা বিল্ডিং এর তিনতলায়। আম, কাঠালের দিনে গাছ ফুলে ফলে ভরপুর থাকে।
গাছের ডালগুলো বাসার কার্নিসে লকলক করে। গাছে কাকেরা বাসা বেঁধেছে খুব সযতনে।
আজানের ধ্বনির সাথে সাথে কাকগুলো খুব কর্কশভাবে ডেকে ওঠে। শ্রাবণীর কাছে এটা খুব বিরক্তিকর। সকালবেলা একটু আরাম করে ঘুমাবে, তা না তার উপর কাকের বিভৎস চিৎকার। এই একটা বিষয় ছাড়া শ্রাবণীর কাছে বেশ ভালই লাগে নতুন বাসাটি। আর একটা বিষয় তার কাছে ইদানিং ভাল লাগছে, তবে কতদিন এরকম থাকবে, জানে না সে। সেটা হল মা ঘর গোছানোর কাজে ব্যস্ত থাকায় লেখাপড়া করতে হচ্ছে না। তা বোধহয় কয়েকদিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তারপর শুরু হবে মায়ের পড়ার জন্য তাড়া। তবে এসময়টা যে খুব আরামে যাচ্ছে তার জন্য মনে মনে বাবাকে থ্যাংকস্ জানাতে হয়। যদি কয়েকমাস পর পর বাবা বাসা পাল্টানোর ব্যবস্থা নিতেন তাহলে পড়ার ঝামেলাটি চুকে যেত। কেন যে বাবা এটা করেন না?
ছোট বোনটির নাম রাখা হয়েছে শ্রেয়া। শ্রাবণীর সাথে আদ্যাক্ষর মিল রেখে শ্রেয়া রেখেছে মেজকাকু। সে একটু একটু হাঁটতে শিখেছে। কোমরে বাধা ঝুমঝুমির শব্দে সে পুরো বাসাটা মাতিয়ে তোলে।
আজ এটা ছুঁড়লে তো কাল ওটা ছুঁড়বে। এতে শ্রাবণীর কাজ বেড়ে গেলেও শ্রাবণী খুব খুশি। একেকবার নানা অজুহাতে নিচে নামবে। আর ইদানীং শ্রেয়া কেমন জানি বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। কারো জন্য যেন অপেক্ষা করে। সেটা বড়দেরও নজর এড়ায়নি। এতটুকুন মেয়ে সে বাইরের দিকে ফেল ফেল করে থাকিয়ে থাকে।
কেউ কিছুই বুঝতে পারছে না। সে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যে সবসময় বেলকনির নিদিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায় । শ্রাবণী দেখল যে, শ্রেয়া যখন দাঁড়ায় তখন আম গাছে একটা কাকের ছানাও একটা ডালে বসে থাকে। সবেমাত্র পাখা গজিয়েছে, একটু একটু হাঁটতে চেষ্টা করে, তবে উড়তে পারে না। আর শ্রেয়া যখন চলে যায় তখন কাকটাও আর ওখানে থাকে না। কেমন যেন ওদের মধ্যে একটা সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে । সেটা খুঁজতে থাকে শ্রাবণী।
এই কয়েকদিনে মা সংসারটাকে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছে। নতুন বাসা, নতুন পরিবেশ সবগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে হবে। এক ফ্লাটের অপর প্রান্তের আন্টিদের সাথে ভাবও হয়েছে মোটামুটিভাবে। বিকেল হলে খোশমেজাজে গল্পে মেতে ওঠেন। শ্রাবণীর কিন্তু ভালোই লাগে। মা-আন্টিরা গল্প করেন আর এই ফাঁকে সে এক দৌঁড়ে নিচ থেকে ঘুরে আসে। নিচের বাসার বড়ুয়া আন্টিদের ছেলেমেয়েদের সাথে এখনও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি। যদিওবা তারা প্রায়ই তার সমবয়সী বা একটু বড়ই হবে। আর প্রতিদিনের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে শ্রেয়া আর তা কাকবন্ধুর সাথে দেখা করা।
আজ শ্রাবণী খেয়াল করলো, শ্রেয়া আর কাকের ছানাটি শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর দু’জনে মাথা নাড়িয়ে কি যেন বলাবলি করছে। শ্রাবণী তো জানে, কেউ কথা বলতে জানে না। তারপরও তাদের মধ্যে এমন কি কথা হচ্ছে বুঝতেই পারে না । কি আর করা তাকিয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় নেই। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় কিছুদিন দেখা যাক্ কি হয়? বাড়ীর বড়দের এই বিষয়টা কাউকে জানায় না সে। পরেরদিন ও একইভাবে তাকিয়ে থাকে শ্রেয়া। যথারীতি কাকের ছানাটিও আসে। শ্রেয়া বাসার ভেতরে ঢুকে গেলে কাকের ছানাটিও আসে পাশে ডালপালায় নড়ে চড়ে বসে । এটি শ্রাবণীর কাছে অদ্ভুত মনে হয়। মানুষ আর কাকের ছানার মধ্যে কিভাবে বন্ধুত্ব হয় ।
এভাবে তাদের চলতে থাকে দিনের পর দিন। বাসার অন্যদেরকে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে কেউ সেটা খেয়াল করছে না, কিন্তু শ্রাবণীর তো প্রচ- অবসর।
কয়েকদিন পর শুক্রবারে জোড়ে বৃষ্টি শুরু হল,সাথে দমকা হাওয়া। গাছের ডাল ভেঙ্গে যাচ্ছে। সাথে সাথে আমগাছের মধ্যে থাকা পাখির বাসাগুলো পড়ে যায় মাটিতে। তা দেখে শ্রাবণীর সাথে শ্রেয়া বেলকনিতে আসল। সে গাছের ডালে কাকের বাসা দেখতে না পেয়ে কান্না শুরু করে দিল। তাদের বাবা বাসায় ছিল। সবাই মনে করেছে বৃষ্টি আর ঝড়ের তান্ডবে ভয় পেয়ে শ্রেয়া কান্না করছে। তার বাবা তাকে কোলে করে বাসার ভেতরে নিয়ে গিয়ে নানা রকম খেলনা, প্রিয় চকলেট সবগুলো দিয়ে কান্না বন্ধ করতে চাইল। সে শুধু বাইরের বেলকনিতে আসতে চাচ্ছে। তার ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে তাকে বেলকনিতে নিয়ে আসা হল, সে শুধু তিনতলা থেকে নিচের দিকে তাকাতে চেষ্টা করছে। অন্যদিকে কাকের ছানাটিও অনবরত কা কা চিৎকার করে যাচ্ছে। শ্রেয়া বারবার কাকের ছানাটির দিকে তাকিয়ে কি যেন বলতে চাচ্ছে।
তাদের মা-বাবার সকল চেষ্টা বৃথা হল। কোনভাবেই শ্রেয়ার কান্না বন্ধ হচ্ছে না। মেজকাকুর চাকুরি আজকে বন্ধ। সবাই শ্রেয়ার কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করছে। কি মনে করে মেজকাকু একটা ছাতা নিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে কাকের ছানাটির কাছে গেলেন । এরপর ছানাটিকে হাতে নিয়ে বাসায় নিয়ে আসার পর শ্রেয়ার কান্না বন্ধ হল। সবাই অবাক! এমনও হয়, একটা কাকের ছানার জন্য শ্রেয়ার কি দরদ? শ্রাবণী চিন্তা করছে,কাকের ছানাটির বাসা ভেঙ্গে পড়ে গেছে বলে শ্রেয়া কান্না করছে। অথচ এই বড় বড় মানুষগুলোর কোন হুঁশ নেই।

Please follow and like us:
3
20
fb-share-icon20
Live Updates COVID-19 CASES