শৃঙ্খলমুক্ত জীবনের কারিগর সুফিয়া কামাল

শৃঙ্খলমুক্ত জীবনের কারিগর সুফিয়া কামাল

বেগম সুফিয়া কামাল। একটি নাম। একটি ইতিহাস। প্রথিতযশা কবি, লেখিকা এবং নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন মানবতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এক আপোষহীন নারী। তার কণ্ঠ অন্যায়, দুর্নীতি এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে সদা সোচ্চার ছিল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি রাজনীতিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। একজন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে হয়েও শৃঙ্খল ভেঙেছেন তিনি। নারীদের এনেছেন মুক্ত আলোর সন্ধানে। তিনি বলেছেন :

‘তোমার আকাশে দাও মোর মুক্ত বিচরণ-ভূমি,
শিখাও আমারে গান। গাহিব, শুনিবে শুধু তুমি।
মুক্তপক্ষ-বিহগী তোমার বক্ষেতে বাঁধি নীড়
যাপিবে সকল ক্ষণ স্থির হয়ে, চঞ্চল অধীর।’
(কবিতা-আমার নিশীথ)

শোষিত মানুষের সংগ্রামকে তিনি নিজে উপলদ্ধি করেছেন। লড়েছেন অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে। সুফিয়া কামালের কবিতায় তারই চিত্র উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন :

‘এ বাংলার বুকে আজি ফের
তেমনি হত্যার লীলা চলে,
সন্তানের রক্তধারা বাংলা আর সবুজ অঞ্চলে
মুছাইতে পারেনাকো, বয়ে চলে নদী স্রোতধারে
নদী হতে সাগরে সাগরে।
সেই স্রোতধার
নিখিল মানবজনে দেয় উপহার।’
(একত্রিশে চৈত্র, ১৩৭৭)

শুধু কী তাই? দেশের অবহেলিত, নির্যাতিত, শোষিত নারী সমাজের জন্য অন্তরায় অনেক। তাই প্রয়োজন হয় দীর্ঘ সংগ্রামের। তিনি বলেছেন :

‘এ বিপুল বিশ্বারণ্যে লুমুম্বার শোণিত প্রবাহ
ছড়াইল দীপ্তময় পাবক প্রদাহ
জাগরণ! মানবাধিকারবোধ জ্বালা
শহীদের কণ্ঠে বাজে শোণিতাক্ত অপরাজিতার নীলমালা।
আফ্রিকার রাত্রি শেষ। দিগন্তে প্রদীপ্ত সূর্যকর।
অগ্নিবাহু মেলে দিয়ে উদ্ভাসিয়া তুলিছে প্রহর।’
(লুমুম্বার আফ্রিকা)

আবার সুফিয়া কামাল এই সংগ্রামের বাইরেও নারীদের জন্য চিন্তা করেছেন। খুঁজেছেন নারী জীবনের পরিণতি। এমন কী, প্রকৃতির অকৃপণ সম্পদের প্রকাশ দেখে যখন তিনি মুগ্ধ হন, তখন তাঁর চোখে ভাসে দুটি সত্তার মিলনের স্বপ্ন। তিনি বলেন :

‘সাঙ্গ হলে সব কর্ম, কোলাহল হলে অবসান,
দীপ-নাহি-স্বালা গৃহে এমনি সন্ধ্যায় যেন তোমার আহ্বান
গোধূলি লিখতে আসে। নিঃশব্দ নীরব গানে গানে,
পূরবীর সুরে সুরে অনুভবি তার প্রাণে প্রাণে।
মুক্তি লভে বন্দী আত্মা-সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে।
নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক পুষ্প-বিকাশের প্রয়োজন।’
(সাঁঝের মায়ায় ]

কবি সুফিয়া কামাল দেশকে ভালোবেসেছেন গভীরভাবে। দেশের প্রতি ছিল তাঁর মমত্ববোধ। রচিত কবিতায় সেই ভালোবাসা উঠে এসেছে বারবার। কিবতায় তিনি বলেছেন :

‘অনেক কথার গুঞ্জন শুনি
অনেক গানের সুর
সবচেয়ে ভালো লাগে যে আমার
‘মাগো’ ডাক সুমধুর।’
(জন্মেছি এই দেশে)

এভাবে তাঁর লেখায় পথ দেখেছেন নারীরা। তাঁর দেখানো পথে আলো ছড়িয়েছে দেশ থেকে সীমানার বাইরে। তাঁর আলোয় আলোকিত হয়েছে দেশ। উপমহাদেশের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী কবীর সুমন নিজের গানে কবি সুফিয়া কামালকে স্মরণ করে গেয়ে ওঠেন :

‘ওই তো লক্ষ ছেলেমেয়ে
নাতিনাতনি দামাল
সবুজ দ্বীপের মতো মাঝখানে
সুফিয়া কামাল।’

২.
সুফিয়া কামালের কবিতায় জীবনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবের সমাজ জিজ্ঞাসা প্রবল হয়েছে। কর্তব্যবোধের তাড়না তিনি অনুভব করেছেন। পর্দানশিন পরিবারের মেয়ে সন্তান হওয়ার কারণে বাল্যকালে তিনি মুক্তাঙ্গনের কোনো বিদ্যাপীঠে গমন করার সুযোগ পাননি। ঘরের মধ্যেই আরবির পাশাপাশি শিখতে শুরু করেন বাংলাভাষা। আর তখন থেকেই শুরু হয়েছিল কবিতা লেখা ও পড়ার ঝোঁক। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘এমনি কোনো বর্ষণমুখর দিনে মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘হেনা’ পড়ছিলাম বানান করে। প্রেম, বিরহ, মিলন এসবের মানে কি তখন বুঝি? তবু যে কী ভালো, কী ব্যথা লেগেছিল তা প্রকাশের ভাষা কি আজ আর আছে? গদ্য লেখার সেই নেশা। এরপর প্রবাসী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা পড়তে পড়তে অদ্ভুত এক মোহগ্রস্ত ভাব এসে মনকে যে কোন অজানা রাজ্যে নিয়ে যেতো। এরপর দেখতাম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন লিখছেন, বেগম সারা তাইফুর। কবিতা লিখছেন বেগম মোতাহেরা বানু। মনে হলো ওরা লিখছেন আমিও কি লিখতে পারি না? শুরু হলো লেখা লেখা খেলা। কী গোপনে, কত কুণ্ঠায়, ভীষণ লজ্জার সেই হিজিবিজি লেখা ছড়া গল্প। কিন্তু কোনোটাই কি মনের মতো হয়! কেউ জানবে, কেউ দেখে ফেলবে বলে ভয়ে ভাবনায় সে লেখা কত লুকিয়ে রেখে আবার দেখে দেখে নিজেই শরমে সংকুচিত হয়ে উঠি।’


সুফিয়া কামাল ১৬টি সংগঠনের সভানেত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯২৫ সালে অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সময় গান্ধীজি বরিশাল এলে নিজে চরকায় সুতা কেটে গান্ধীজির হাতে তুলে দেন। তিনি ইন্ডিয়ান উইমেন্স ফেডারেশনে প্রথম মুসলিম মহিলা সদস্য মনোনীত হন। বেগম রোকেয়া প্রতিষ্ঠিত আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে তিনি কাজ করেন। ১৯৪৬ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় কলকাতায় লেডি ব্রেবোন কলেজে আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা করেন। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় ঢাকায় মহিলাদের সংগঠিত করে মিছিলের আয়োজন ও নেতৃত্বসহ সামগ্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৪ সালে ওয়ারী মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠা এবং এর প্রথম সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে তাঁর নেতৃত্বে ঢাকায় ‘বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত স্মৃতি কমিটি’ গঠন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নিবাসের নাম ‘রোকেয়া হল’ করার প্রস্তাব পেশ করেন। ১৯৭০ সালে মহিলা পরিষদ গঠন এবং সভানেত্রীর দায়িত্ব শুরু করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ঢাকা শহরেই অবরুদ্ধ থেকে মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করেন। আর এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন কবি ও নেত্রী।


বেগম সুফিয়া কামালের জন্ম বরিশাল জেলার শায়েস্তাবাদে নানার বাড়িতে ১৯১১ সালের ২০ জুন। পৈতৃক নিবাস ছিল ত্রিপুরা জেলার শিলাউর গ্রমে। মাত্র সাত বছর বয়সে ১৯১৮ সালে কবির বিয়ে হয় সৈয়দ নেহাল হোসেনের সঙ্গে। ১৯৩২ সালে নেহাল হোসেন মারা যায়। এরপর তিনি কলকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। পাশাপাশি চলে তার সাহিত্যচর্চা। ১৯৩৯ সালে সুফিয়া কামাল পুনরায় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কামালউদ্দীন খানের সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি ‘সুফিয়া কামাল’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। শুরু হয় নতুন জীবন। বরিশালের মাতৃমঙ্গল সেবাদানের কাজ দিয়ে সুফিয়া কামালের সমাজসেবামূলক কর্মজীবনের শুরু। তার প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ সাঁঝের মায়া (১৯৩৮), একাত্তরের ডায়েরী, মোর যাদুদের সমাধি পরে, একালে আমাদের কাল, মায়া কাজল (১৯৫১), কেয়ার কাঁটা (১৯৩৭) ইত্যাদি। ২০০২ সালে বাংলা একডেমি সুফিয়া কামাল রচনাসমগ্র প্রকাশ করে।
অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন তিনি। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক জাতীয় পুরস্কার ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি বাংলা একডেমি পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), উইমেনস ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস ক্রেস্ট (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) লাভ করেন।
বিংশ শতাব্দীর বাংলার নারী জাগরণ এবং বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের বিচিত্র ইতিহাসের সঙ্গে কবি সুফিয়া কামালের নাম নিবিড়ভাবে জড়িত। সময়ের দাবিতে ব্যক্তিগত জীবনের মতো তিনি স্বপ্ন দেখতেন সবুজ পৃথিবীর। ৮৯ বছর বয়সে ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ তার মৃত্যুদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা।


ব্যতিক্রমী সাহিত্যসেবী তিতাশ চৌধুরী
ড. সাঈদ-উর রহমান
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশ ও পরিপুষ্টি সাধনে ইউরোপীয় সাহিত্য বিশেষ করে ইংরেজি সাহিত্যের অবদান অনেক। আধুনিকতার ভাবগঙ্গাকে যারা বাংলা সাহিত্যে প্রবাহিত করেছিলেন, তাদের অনেকেই ইংরেজি সাহিত্যকে ভালোভাবে জানতেন। বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ও জীবনানন্দ দাশের নাম সবারই জানা। সমালোচনার ক্ষেত্রে শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সুবোঁধ সেনগুপ্ত, মুনীর চৌধুরীর দান অনেক। একালের সবচেয়ে খ্যাতিমান সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও তাদের গোত্রভুক্ত।
সামাজিক বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীদের থেকে তেমন আশা করা ঠিক হবে না। মাঝে মাঝে কারও নাম বিদ্যুৎচমকের মতো বেরিয়ে আসে। লক্ষ্মী ও সরস্বতীর বিবাদ চিরন্তন। যিনি লক্ষ্মীকে ভজনা করেন, সরস্বতী তাকে কৃপা করেন নাÑ বিপরীতটাও সত্য। তবে একেবারে যে কারও দেখা পাওয়া যাবে না তেমন নয়। গত শতাব্দীর তৃতীয় দশকে বাংলার মুসলমান সমাজে অচলায়তন ভাঙতে যারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাদের একজন ছিলেন অর্থনীতির, দ্বিতীয়জন ছিলেন কমাসের্র ছাত্র। প্রথমজন কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন ভাবযোগী, অপরজন সৈয়দ আবুল হুসেন ছিলেন কর্মযোগী। বিরুদ্ধ পরিবেশের চাপে আবুল হুসেন ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় চলে যান, কিন্তু শিখার আগুন নেভেনি। আনন্দের বিষয় যে, আমাদের কালেও সে ধরনের একজন লেখক-বুদ্ধিজীবী আছেন। তিনি আবু তাহের ভূঁইয়াÑকমাসের্র অধ্যাপক, শেষ পর্যন্ত ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ।
আবু তাহের ভূঁইয়া স্কুল-কলেজে পড়াকালে কবিতা লিখতেন, কলেজ ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছিল। ইন্টারমিডিয়েটের পড়া শেষ করে ঢাকাতে এসেছিলেন ইংরেজি সাহিত্য পড়তে, কিন্তু ঘটনাচক্রে ভর্তি হলেন বাণিজ্যে (পরে আলোচিত)।
তিতাশ চৌধুরীর জীবনের অনেক কিছু জানি, কিন্তু যথার্থভাবে জানি না। তাঁর নামকরণ রহস্য এবং সাহিত্য সাধনার বীজ কখন তাঁর মনে রোপিত হয়েছিল ইত্যাদি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার তিতাস নদী বাংলা সাহিত্যে বিখ্যাত হয়ে আছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের জন্য। তিতাস নিয়ে কবিতা লিখেছেন সানাউল হক, নানাভাবে সেটি স্থান পেয়েছে আল মাহমুদের লেখায়। আমাদের লেখকও তিতাসকে ভোলেননি। তিনি লিখেছেন, ‘শৈশব-কৈশোরের অনেক সময় ডিঙি নৌকা বেয়ে নদ-নদীর ওপারে বিল-হাওড়ে শাপলা-শালুক কুড়াতে গিয়েছি। কখনও মাছ ধরতে গিয়েছি, আবার কখনও গরু চরাতে গিয়েছি, আবার কখনও সাঁতার কেটে নদীর এপার-ওপার করেছি, কখনও লাই খেলেছি সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে। আজ সবই স্মৃতিÑঝলমলে স্মৃতি, শৈশব-কৈশোরের এই স্মৃতি আমাকে নীরবে-নিভৃতে ডাকে, তখন আমি আমার ভেতর নদীকে দেখতে পাই।’
২০১০ সালের বাংলা একাডেমির বইমেলায় প্রকাশিত ‘আপন গোপন ভুবন’ বইয়ের ফ্ল্যাপে তাঁর রচিত বইগুলোর নাম পাওয়া যায়। তদনুযায়ী কবিতা, গবেষণা, ফোকলোর শিশুতোষ, অনুবাদ, স্মৃতিকথা ও ইতিহাসমূলক বই মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা ৩৫টির মতো। অন্য ভুবন বইয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার রয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ২০১০ সালের বইমেলায় তাঁর তিনটি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছেÑ‘রবীন্দ্রনাথের রস ও হাস্যরস, রবীন্দ্রনাথের পুনশ্চ, চলো যাই রবিঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি’। প্রকাশের পথে রয়েছে ২টি ছড়ার বই, ঊষা সাময়িকপত্রে জীবন ও সমাজ এবং ‘অন্যরকম রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল’বিষয়ক একটি প্রবন্ধের বই। সাক্ষাৎকারের শুরুতে তাঁর উল্লেখযোগ্য বইগুলোর নাম দেয়া আছে : দুঃস্বপ্নের রাজকুমারী (কবিতা), তুমি সুখেই আছ নন্দিনী (ঐ), জসীমউদ্দীন : কবিতা, পদ্য ও স্মৃতি, অন্য বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথ, মোতাহার হোসেন চৌধুরী : জীবন ও সাহিত্য এবং নিষিদ্ধ নজরুল ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, কুমিল্লায় নজরুল, স্মৃতি প্রেম ও পরিণয়, কুমিল্লা জেলার লোকসাহিত্য, দরবেশ ও দরগার কথা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস, দেখা অদেখার স্মৃতি, ষাট গম্বুজের আযান ধ্বনি। তালিকা নিঃসন্দেহে বড় করা যায়Ñ‘ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জনক মেজর আবদুল গণি : জীবন ও কর্ম’ কেন বাদ গেল বোঝা গেল না।
অবাক হতে হয়, তিতাশ চৌধুরীর কৌতূহলের ব্যাপকতা দেখে। যিনি কবিতা লেখেন, তিনি আবার পেশাদার ইতিহাসবিদের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর ইতিহাসের রুচিও কত বিচিত্র! তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস অনুসন্ধান করেন, তিনি একই সঙ্গে বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস রচনায় মুন্সিয়ানার স্বাক্ষর রাখেন। পেশাদার ঐতিহাসিকরা ঈর্ষান্বিত হবেন তার তথ্য সংগ্রহ, তথ্য বিশ্লেষণ ও ঐতিহাসিক ঘটনার মূল্যায়ন দেখে। আরও একটি কথা, তিনি পরের মুখে ঝাল খান না, মূল উৎস থেকে তথ্য আহরণে তাঁর আনন্দ।
মৌলিক তথ্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ, অন্য এক ক্ষেত্রে নতুন পথ নির্দেশ করেছে। সাহিত্য সেবকের প্রখর নজর থাকে সাহিত্য-সমালোচনার দিকে। কবিতা বুঝতে হলে প্রথমে কবিকে জানা দরকার। পেশা বা নেশা থেকে কবির মনোজগতের খবরাখবর জানা যায়, তাঁর চেয়ে আরও অন্তরঙ্গভাবে জানা যায় কবির ব্যক্তিগত চিঠি বিশ্লেষণ করলে। নিজের অজ্ঞাতে তিনি একটি বড় কাজ করে যাচ্ছেন। চিঠির গুরুত্ব তিনি জানেন, তিনি লেখক-শিল্পীদের কাছে চিঠি লেখেন, যতœ সহকারে উত্তরটি সংরক্ষণ করেন। কবির মনের রুদ্ধগৃহে প্রবেশের বড় চাবি সেইসব ব্যক্তিগত চিঠি। তাঁর কাছে লেখা কবি জসীমউদ্দীনের অনেক চিঠি তাঁর সংগ্রহে আছে। ৬ নং চিঠিটি তুলে দেয়া হলো।
১ জুন, ১৯৭৫
প্রিয় তিতাশ,
লেবু গাছ ও পত্রের জন্য শত শত ধন্যবাদ। বর্তমানে বাতের ব্যথায় আমি হাসপাতালে আছি। সামান্য সামান্য সাহিত্যকর্ম করি।
তুমি জানতে চেয়েছ আমি কেন জাতীয় কবি হতে চাইনি। কথাটা পরিষ্কার করে বলি। মুজিব আমাকে দু-তিনবার বলেছিল, ‘বড় ভাই’ আমি তোমাকে জাতীয় কবি করবো।’ উত্তরে আমি বলেছিলাম-‘তুমি আমাকে বড় ভাই ডাকো-এটাই আমার বড় পুরস্কার। জাতীয় কবি করে আমাকে দূরে সরিয়ে দিও না।’ এরপর নানা রাজনৈতিক ঝামেলায় মুজিবকে ব্যস্ত থাকতে হয়। কথাটা ওখানেই শেষ হয়। অবশ্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পত্রযোগে আমাকে জাতীয় কবি করার জন্য কোনো প্রস্তাব আসেনি। অনেক আহ্লালপ্রীতি ও ভালোবাসা অন্তে-ইতি, তোমাদের কবি দাদু।
শুরুতেই একটি খটকার উল্লেখ করেছিলাম-জীবনের প্রস্তুতি অংশটি ব্যয় করেছিলেন লক্ষ্মীর সেবায়, কিন্তু অবশিষ্ট সময়টি উৎসর্গ করেছেন সরস্বতীর জন্য। সেটা কেমন করে সম্ভব হলো? মনে হয় তার একটি উত্তর খাড়া করা যেতে পারে। আবাল্য তার সখ্য ও আগ্রহ ছিল কবিতার প্রতিÑ নবম-দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালেই কবিতা ছাপা হয়েছিল স্বাধীনতা দিবসের স্মরণিকায়, স্কুলেই কবিতা রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলেন। তারপরেও কবিতা লিখেছেন। মুদ্রিত হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকা, সাময়িকীতে। ইন্টারমিডেয়েট পরীক্ষায় ইংরেজি ও বাংলায় ভালো নম্বর পেয়েছিলেন। ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স পড়বেন, কিন্তু বিধি বাম। তার এক শিক্ষক তপন ভট্টাচার্য, কমার্স পড়তে বলতে গেলে বাঁধ্য করলেন। তার নিজের ভাষা, ‘আমার ইচ্ছা ছিল কমার্স না পড়ার এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও মাস্টার্স করা কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমার একজন কমাসের্র শিক্ষক তপন ভট্টাচার্য আমাকে সরাসরি ইংরেজি পড়তে বারণ করলেন। বললেন, তোমাকে কমার্সেই পড়তে হবে। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার, একদিন তিনি আমাকে তার ঢাকার বাড়িতে দেখা করতে বললেন। আমি সেখানে গেলাম। দেখি, তিনি কাপড়-চোপড় পরে রেডি হয়ে আছেন। আমি পৌঁছতেই আমাকে নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওয়ানা হলেন। আমি অবাক হয়ে গেলাম। তিনি সরাসরি আমাকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমার্স বিভাগে হাজির হন এবং আমাকে দিয়ে একটি ভর্তি ফরমও পূরণ করালেন। কমার্সেও আমার মার্ক খারাপ ছিল না। তাই অন্যান্য ছাত্রের মতো আমাকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হয়নি। একেই বলে কপালের লিখন। এলেন ইংরেজি সাহিত্য পড়তে। বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করলেন বাণিজ্য নিয়ে।
জীবনের প্রথম প্রেম ভোলা যায় না। তিতাশ চৌধুরীও ভোলেননি। পুরনো জীবনকে বোঁধহয় একেবারে ভুলে যেতে চাইলেন। বাপ-মায়ের দেয়া নাম পর্যন্ত ঝেড়ে ফেলে দিলেন। দিলেন আবু তাহের ভূঁইয়া, হয়ে গেলেন তিতাশ চৌধুরী। নতুন নামেই একালের লেখকেরা তাকে জানে, মানে ও গনে। এই প্রবণতা কিন্তু নতুন নয়। বাংলা সাহিত্যের প্রথম যুগের যে দুই তিন জন কবিকে আমরা জানি তারা সবাই ছদ্মনামে আছেন। আধুনিক কালেও এর অনেক নজির আছে।
সাহিত্যে মানুষ তার অন্তরকে মেলে ধরে, তিতাশ চৌধুরীও ধরেছেন। অবাক ব্যাপার, কোনো লেখাতেই তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতিকে আনেননি। এমনকি সম্ভব যে তাঁর চিন্তা চেতনার মধ্যে সেগুলো ছাপ ফেলেনি? কিন্তু জীবন সংসার এমনই যে, সেগুলোকে বাদ দেয়া যায় না। কবি, বুদ্ধিজীবী ও অধ্যাপককেও বাজারে যেতে হয়। আবু তাহের ভূঁইয়া বাল্যকাল থেকেই বাজারে যেতেন। ২০০৮ সালে বাজার থেকে ফিরে এসে মনে পড়ল ৪০ বছর আগের বাজার দর। ১৯৬৭ সালে একভরি সোনার দাম ছিল ৬০ টাকা, ২০০৮ সালে হলো ২৫ হাজার টাকা, ২০১০ সালে বোঁধহয় ৩৯ হাজার টাকা। সেকালে এক সের খাসির মাংসের দাম ছিল দুই টাকা, বর্তমানে ৩০০ টাকা, গোমাংস দেড় টাকা থেকে উন্নীত হয়েছে ২০০ টাকায়। সে সময় এক মণ চালের দর ছিল ২০-২৫ টাকা। বর্তমান বাজারে এক কেজি চাল কিনতে হয় ৪৫-৫৫ টাকায়। একটি আফসোস করে লেখা শেষ করি। তিতাশ চৌধুরীর সৃষ্ট সাহিত্য ভুবনে প্রবেশ করলে মন ভরে যায়। কত বিচিত্র বিষয় দিয়ে সে ভুবন তিনি সাজিয়েছেন। কিন্তু কোনো বিষয়েরই গভিড়ে তিনি প্রবেশ করেননি। কবি জসীমউদ্দীন বিষয়ক লেখাগুলো একাধিক বইয়ে না রেখে একটি খ-ে লেখা রাখলে ভালো হতো। তিনি যদি দু’একটি ক্ষেত্র পছন্দ করে তাতে মনোনিবেশ করতেন তাহলে বিষয়ের অনেক গভিড়ে তিনি যেতে পারতেন।’জসীমউদ্দীন ও অন্যান্য প্রবন্ধ’ পুস্তকটির বিষয়গুলো দুই ভাগে বিন্যস্ত জসীমউদ্দীন অংশটি প্রথম এবং তাতে জসীমউদ্দীনকে নিয়ে ১১টি প্রবন্ধ রয়েছে। দ্বিতীয় অংশের নাম অন্যান্য। প্রথম প্রবন্ধটি মহামনীষী শীলভদ্র, শেষেরটি মামুন সিদ্দিকীর ‘কুমিল্লার ভাষা আন্দোলন’। সবখানে আছে অতীশ, কায়কোবাদ, সুকান্ত, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, আবদুল গণি হাজারী, ফররুখ আহমদ, মঈনুদ্দীন আবদার রশীদ, মিন্নত আলী, আবু ইসহাক, খান সারওয়ার মুরশিদ, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, জুলফিকার নিউটন, মাহবুব উল আলম, শহীদ আখন্দ আবু তাহের মজুমদার, সৈয়দ হায়দার, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল প্রমুখ নিয়ে দু’এক পাতার মতামত। তাঁদের অনেকের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যায়। এমনকি ছোটখাটো বইও রচনা করা যায়। কিন্তু তিনি করেননি, মেধা ও প্রয়োজন দুই-ই ছিল।

গল্প
স্নিগ্ধার টেলিফোন
মাহতাব হোসেন
কানে টেলিফোনের রিসিভার লাগিয়ে তব্দা খেয়ে গেলাম। কলকাতা থেকে ফোন করেছে স্নিগ্ধা। আমার মোবাইলফোন নম্বর ওর কাছে থাকার কথা না। তাই বলে অফিসের টেলিফোনে? অবশ্য বুদ্ধি থাকলে সবই হয়। স্নিগ্ধা, আহা! কত রোমাঞ্চ!
একদিন বৃষ্টি হলো, প্রচ- বৃষ্টি। ঝড়ে স্টেশন রোডের কিছু পুরনো গাছ উপড়ে যাওয়ার পর প্রচ- বৃষ্টি। হাঁটু জল জমে যাওয়া বৃষ্টি। ঝড়-বৃষ্টিতে কলেজে আটকে যাওয়ায় স্নিগ্ধাকে আনতে সৈকতের ওপর দায়িত্ব পড়ে। প্রেমিকের দায়িত্ব নয়, প্রতিবেশির দায়িত্ব, সহপাঠীর দায়িত্ব। একই কলেজ যদিও, কিন্তু সৈকত সেদিন কলেজে যায়নি। স্নিগ্ধার আম্মু সৈকতের ওপর বেশ নির্ভর করত। পারলে সিন্ধুকের চাবিও সৈকতের হাতে তুলে দেয়। স্নিগ্ধার মায়ের একটা আদেশ পালনের জন্য আমার মতো অজস্র সৈন্য প্রস্তুত, কিন্তু আমাদের নিরাশ হতে হয়। সেদিন কেমন বৃষ্টি হয়েছিল সেটা আমার চেয়ে ভালো মনে রেখেছে সৈকত। আমার মনে রাখার কোনো কারণ নেই। তবুও আমার বৃষ্টির দিনগুলোর কথা কেমন করে যেন মনে গেঁথে যায়। হোক না তা ২০০৫ সালের কোনো বৃষ্টি।
সৈকতের স্বীকারোক্তিতে আমি অবাক হই না। সেদিনের কথা আমারও খুব মনে আছে। স্টেশন এলাকায় কোনো একটা কাজে গিয়েছিলাম। সেটা সেদিনকার দ্বিতীয়বারের মতো ভেজা আমার। সৈকত ভ্যান থেকে স্নিগ্ধাকে নিয়ে নামছে। আমার সামনে দিয়ে ও চলে গেল, আমাকে খেয়াল করল না। আজ জানলাম, সেদিন ঠিকই খেয়াল করেছিল সৈকত। আসলে, স্নিগ্ধার প্রেমে সবাই পড়তে পারে। সৈকতের জন্য আমারও কষ্ট হয়।
ঢাকায় চলে আসার পর, মেডিনোভার সামনের লেকের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে চা খাওয়ার সময় স্নিগ্ধার প্রতি ভালোবাসার কথাটা সৈকত বলেছিল। সহজ স্বীকারোক্তি।
‘দোস্ত, আমি প্রেমে পড়ে গেছি।’
‘তাই নাকি, ভালো তো… কার?’
‘স্নিগ্ধার।’
‘স্নিগ্ধা!’
বৃষ্টির ফোঁটা চায়ের কাপে জমা হচ্ছে। অনেক আগেই ভিজে গেছি। সামনের লেকের জলে বৃষ্টির মিশে যাওয়া দেখতে দাঁড়িয়েছি। বৃষ্টিসন্ধ্যা বিকেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করিÑ
‘স্নিগ্ধার দেখা পেলি কোথায়?’
‘স্নিগ্ধাকে যেদিন আমি কলেজ থেকে নিয়ে এসেছিলাম। মনে আছে তোর? সেদিন রিক্সা ভ্যানের পেছনে বসে পুরো রাস্তা ও আমার হাত ধরে এসেছে। নিজে ভিজেছে। আমাকেও ভিজিয়েছে। সেদিন আমি প্রথম মেয়েদের মুখের দিকে তাকাই, স্নিগ্ধার বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পা, চিবুক, টোলবেয়ে নেমে আসা জল… এসবই আমাকে ভিজিয়েছে। আমার মনে বৃষ্টি জমে গিয়েছিল আমি বুঝিনি। এইরকম বর্ষার দিন আমাকে অস্থির করে দেয়।’
সৈকতকে বলি, ‘স্নিগ্ধার কথা বলে লাভ কী? সে তো দেশে নেই। শুনলাম তুইও নাকি দেশের বাইরে চলে যাবি?’
‘ভালোবাসা বুঝি ফেলে দিতে হয়? বুকের মাঝে বহন করে নিয়ে যাওয়া যাবে না? এয়ারপোর্ট কাস্টমসে আটকাবে নাকি?’Ñ ওর কথায় হেসে ফেলি।
ইন্টারমিডিয়েট লাইফটা অদ্ভুতভাবে কেটেছে। কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন, ঘোরের মধ্যে। স্নিগ্ধার মুখ দেখার জন্য বিকেলটা ওদের বাড়ির সামনের রাস্তায় কাটত। একদিন বিকেলে স্নিগ্ধার মা বাসায় ডেকে নিয়ে গেল। আমার বুকের ভেতর কাঁপন। এত কাছ থেকে স্নিগ্ধাকে দেখব। বুকটা উত্তেজনায় ফেটে যাচ্ছে। যে ঘরে এনে বসালো, সেখানে স্নিগ্ধার বইখাতা সাজানো, ওয়ালে পেইন্টিং। যে সোফায় বসেছি তার কুশনে চমৎকার নকশা। আলমিরা ভরতি বই। উফ কী দারুণ! আমি জানি না, আমাকে কেন ডেকে আনা হয়েছে। একটু পরেই স্নিগ্ধা রুমে ঢুকে জিজ্ঞেস করেÑ
‘তুমি তো লাইব্রেরির সদস্য, তাই না?’
উপজেলার মোটামুটি বড় ইয়াংস্টার গণকেন্দ্র পাঠাগার। আমি সেটার সদস্য। শুধু আমি না, আরো বেশ কয়েকজন বন্ধুকেও সদস্য বানিয়েছি। প্রায় প্রতিদিনই লাইব্রেরিতে যাই। পড়ি, সাথে বই নিয়ে আসি।
‘জ্বি হ্যাঁ, হ্যাঁ।’
‘আমার নেরুদার একটা কবিতার বই লাগবে, পাবলো নেরুদার। এনে দিতে পারবে?’
‘অবশ্যই পারব’…
‘আমাদের একটা আবৃত্তি ফাংশন আছে। আর তোমাদের কেমিস্ট্রি সাজেশনটাও দরকার আমার। দিতে পারবে?’

আমি ডিগ্রি কলেজে পড়ি। ও ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আলাদা কলেজ। এরপর কয়েকবার ওদের বাসায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই খাবারের মেনু চেঞ্জ হয়ে যেত। স্নিগ্ধার মা যে কী অমায়িক মানুষ, বুঝেছিলাম সেই ক’দিনের অল্প সময়ে। আমি সাজেশন ফটোকপি করে আমার নিজেরটা দিয়ে এসেছি। নেরুদার ‘রেসিডেন্স অন আর্থ’ নতুন কপি কিনে দিয়ে এসেছিলাম। তারপর থেকে ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যখনই স্নিগ্ধা দেখত, আমাকে জানালা দিয়ে ডেকে বলত, ‘এই সমুদ্র, লাইব্রেরিতে বইটা ফেরত দেবে না? অনেকদিন হয়ে গেল তো!’ আমি ব্যস্ততার ভান করে বলতাম, ‘আজ লাইব্রেরিতে যাচ্ছি না স্নিগ্ধা। যেদিন যাব সেদিন নিয়ে যাব।’
মেয়েটা এত বোকা কেন? ও কি একদমই বোঝেনি ওটা লাইব্রেরির বই না। লাইব্রেরির বই হলে তো সিল মারা থাকত। অবশ্য তখন বয়সই বা আর কত আমাদের?
সৈকতের স্বীকারোক্তিতে আমি অবাক হই না। সেদিনের কথা আমারও খুব মনে আছে। স্টেশন এলাকায় কোনো একটা কাজে গিয়েছিলাম। সেটা সেদিনকার দ্বিতীয়বারের মতো ভেজা আমার। সৈকত ভ্যান থেকে স্নিগ্ধাকে নিয়ে নামছে। আমার সামনে দিয়ে ও চলে গেল, আমাকে খেয়াল করল না। আজ জানলাম, সেদিন ঠিকই খেয়াল করেছিল সৈকত। আসলে, স্নিগ্ধার প্রেমে সবাই পড়তে পারে। সৈকতের জন্য আমারও কষ্ট হয়। তাকে প্রবোধ দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।
তারপর তো আমরা ঢাকায় চলে এলাম। সেও কয়েক বছর হয়ে গেছে। মেডিনোভার সামনের রেলিংয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা নামে। দুইবন্ধু পা ঝুলিয়ে আড্ডা দিই, এই তো রুটিন। খুব কাছের দুয়েকজন ছাড়া কারো সাথেই যোগাযোগ নেই। স্নিগ্ধার কথাও আমরা বেমালুম ভুলে গেছিলাম। ভোলা হয় না যদিও সবটুকু। তারপর সৈকতও ব্যস্ত হয়ে ওঠে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে। একমাত্র ওর সাথেই সুঁতোর টানটা লেগে ছিল। চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে।
কানাডার ওয়াটারলু ইউনিভার্সিটিতে একটা স্কলারশিপ পেয়েছে সৈকত। আমিও আমার পত্রিকার চাকরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেছি। বাড়ি যাওয়াও কমে গেছে। বাড়ির কথাটা উঠলে মায়ের পরেই স্নিগ্ধার ছবি ভেসে ওঠে। অথচ স্নিগ্ধা আমার কেউ ছিল না, কখনো না। ছেলেমেয়ে নামের যে বন্ধুত্বটুকু হয়, হয়ত সেটুকুই, তাও অল্প সময়ের জন্য ছিল আমাদের মধ্যে, কিংবা ছিল না। ও ছিল পুরোটাই সৈকতের অথবা সৈকতই ছিল স্নিগ্ধার। সবই ভুলে গেছি। খবর পেয়েছিলাম, স্নিগ্ধারা ভারত চলে গেছে। অবশ্য আরো আগেই স্নিগ্ধাদের ভারত চলে যাওয়ার কথা ছিল। ‘এনিমি প্রপার্টিজ’ নিয়ে ঝামেলা। শেষখবর পেয়েছিলাম ও যাদবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।
এই যে সাতমসজিদ রোড, মেডিনোভার সামনের উন্মুক্ত লেক, এখানে মাঝে মাঝে না বসলে হয়ত এইসব পিছুটান কখনোই সজাগ হতো না।
‘আচ্ছা সৈকত, স্নিগ্ধাকে কি একদমই ভুলে যাবি, নাকি বুকে ধারণ করে রাখবি?’
সৈকত আমার কথা না শোনার ভান করে, গভীর করে পলপলে পাতলা প্লাস্টিকের চায়ের কাপে চুমুক দেয়। এত পাতলা তরল এত গভীর করে চুমুক দেওয়ার কিছু নেই। তারপরেও সে দেয়। উত্তরীয় বাতাসে আমার বড় হয়ে যাওয়া চুল এলোমেলো হতে থাকে। এই যে ভর সন্ধ্যা, এই যে বন্ধুত্ব। দূরের মসজিদের মিনারের চূড়ার আলো। সব মিলিয়ে এই সন্ধ্যা খুব মায়া ছড়িয়েছে। শেষ অধ্যায় হয়ত এখানেই ছিল। জানা ছিল। সৈকত আমার দিকে ঘুরে তাকায়Ñ
‘আচ্ছা সমুদ্র, একটা কথা বলবি, আমি বেশ কয়েকবার বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি। ভাবতে চাই নি, তারপরেও আমার মাথায় চলে এসেছে। যতবারই ভেবেছি মনে হয়েছে এটা একটা নিষিদ্ধ চিন্তা, অবশ্য ততবারই আরো বেশি করে মাথায় জেঁকে বসেছে।’
‘বল।’
‘আচ্ছা, তোর কি স্নিগ্ধার প্রতি দুর্বলতা ছিল, বিন্দুমাত্র হলেও? আমাকে ভুল বুঝিস না। বল।’
আমি জানি সৈকত আমার কত কাছের, কত ভালো বন্ধু। আমি নিশ্চিত নই, তবে আমার ধারণা, স্নিগ্ধার সঙ্গে নিজেই ইচ্ছে-দূরত্ব তৈরি করেছিল ও। এবং সেটা আমার জন্য, তাও অনুমান করতে পারি। দুজনের কাছে একটা বইয়ের একটা পাতা, না পড়ে পরের পাতায় চলে যাওয়ার মতোই কাজ করেছে সৈকত। আমি সৈকতকে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারব না। আমাকে এড়িয়ে যেতে হবে। মাথা কাজ করে না। আমাদের বামপাশের টেবিলে নতুন এক জুটি এসেছে। পুতুল পুতুল চেহারার মেয়েটা কী যেন অনুরোধ করছে ছেলেটার কাছে। হয়ত ফুচকা খেতে দেবে না ছেলেটা। কয়েক সেকেন্ডে পরেই মেয়েটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে যায়। চিৎকার করে বয়কে ডাকে। সন্ধ্যার স্নিগ্ধতার মতোই সুন্দর দৃশ্য। প্রেমিকজুটি জিভে শব্দ করে টক মেখে ফুচকা খাচ্ছে। চোখেমুখে হাসির ঝিলিক।
মনে পড়ে স্নিগ্ধার সাথে আমার কবে শেষ দেখা হয়েছিল। স্টেশনেই দাঁড়িয়েছিলাম। সৈকতের সাথে নেমে হেঁটে আসছিল। আমি তাদের না দেখার ভান করে একটু পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সৈকত আমাকে ধরে ফেলে। দুজনেরই কলেজ ড্রেস। স্নিগ্ধার নাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কলেজে ওদের বিদায় অনুষ্ঠানের প্রোগ্রাম ছিল। আমাদের গরীব কলেজে এসব অনুষ্ঠান হয় না।
সৈকত চলে গেছে কানাডায়। সেও বছরখানেক আগের কথা। আর হঠাৎ করেই স্নিগ্ধার ফোন। স্নিগ্ধা টানা ৩৫ মিনিট কথা বলে ফোন রাখে। আমার নামে-ছাপা একটা খবর পড়ে সে বুঝতে পারে, আমি পত্রিকায় কাজ করি। তাই অফিসের টেলিফোনেই ডায়াল করে বসে। আমাকে খুঁজে পাওয়া কত সহজ, বুঝলাম। খুঁজে পাওয়ায় স্নিগ্ধার সে কী উচ্ছ্বাস! আমার ফোন নম্বর তো নিয়েইছে, ফেসবুকে আমার একাউন্ট নাই কারণেও তার রাগ আর ধরে না! স্নিগ্ধা দেশে আসছে। বাংলাদেশের কোনো একটা কোম্পানিতে প্রকৌশলী হিসেবে জয়েন করবে। স্নিগ্ধা সৈকতের কথা একবারও জিজ্ঞেস করে নি। স্বার্থপরের মতো আমিও সৈকতের প্রসঙ্গ তুললাম না। ফোনটা রাখার পর থেকেই বিষয়টা বুকের ভেতর খচখচ করছে। মনে হচ্ছে বড় ধরনের অন্যায় করে ফেলেছি।
আচ্ছা স্নিগ্ধা আগে দেশে আসুক। তারপর স্নিগ্ধাকে বলব ও যেন সৈকতকেই বিয়ে করে। তারপর সৈকতের সঙ্গে কানাডায় থাকবে। আচ্ছা, স্নিগ্ধার বিয়ে হয়ে যায় নি তো? আমি কানে রিসিভার লাগিয়ে তব্দা খেয়ে বসে থাকি।

ছোটগল্প
ঊর্মিমালা
মুম রহমান
কুদরত মাছটার দিকে তাকালো। মাছটাও কুদরতের দিকে তাকালো। অন্তত গল্পের শুরুতে তেমনটাই মনে হচ্ছে। কুদরত আর মাছ একে অপরকে দেখছে। মাছটার নাম- তেলাপিয়া। না, কথাটা ঠিক হলো না। তেলাপিয়া তো প্রজাতির নাম। কোটি কোটি তেলাপিয়া আছে। সবাই তেলাপিয়া। অতএব আমাদের এই নির্দিষ্ট তেলাপিয়া মাছটার একটা নাম দেয়া যাক। গল্পের খাতিরেই আপাতত মাছটার নাম দেয়া যাক- ঊর্মিমালা। তেলাপিয়া নদী বা সমুদ্রে থাকে না। শান্ত পুকুরে হয়। ইদানিং চাষের জন্যে বানানো জলাশয়েও হয়। কাজেই ঊর্মি বা ঢেউ সেখানে নেই। কিন্তু এই তেলাপিয়া মাছটার শরীরে ঢেউয়ের ছটা আছে। তাছাড়া, জানা মতে, মাছের নামকরণে আকিকা কিংবা রেজিস্ট্রি টাইপ কিছু লাগে না। কাজেই এই তেলাপিয়া মাছটাকে ‘ঊর্মিমালা’ বলে ডাকা যাক। বিশ্বাস করুন, শুনতে ভালো লাগবে তাতে।
কুদরত প্রাণ ভরে দেখছে ঊর্মিমালাকে, মন ভরে দেখছে। যতোই দেখছে ততোই সে ঊর্মিমালার প্রেমে পড়ে যাচ্ছে।
ঊর্মিমালাকে দেখেই কেমন জিভে পানি এসে যায়। সে একদম যাকে বলে পরিপক্ক একটা মাছ। এমন মাছ তার ভাঁজে ভাঁজে স্বাদ জমিয়ে রাখে। তার তেলতেলে কালচে প্রশস্ত শরীর সমীহ জাগায়। কুদরত আলতো করে, মোলায়েম করে, ঊর্মিমালার শরীরে হাত বোলায়।
ও জনে ঊর্মিমালা ঠিক এক কেজি দুইশ গ্রাম। সাধারণ তেলাপিয়ার চেয়ে চার-পাঁচগুণ আকারে বড়। মাছ না হয়ে মানুষ হলে, ঊর্মিমালাকে ‘মুটকি’ বলা যেতো। কিন্তু মাছের বিবেচনায় এইটাই সবচেয়ে উপযুক্ত আকার। এরচেয়ে বড় হলে মাছটা মোলায়েম থাকতো না, আবার ছোট হলে তেলতেলা হতো না। মাছ, পৃথিবীর পরিস্কারতম প্রাণ, জলের তলায় থাকে সে। মাছের গায়ে হাত বোলালে সাঁতারের একটা অনুভব কুদরতের হাতে লেগে যায়। আবার মাছটাকেও অনুভব করা যায়। স্পর্শ এমন এক অনুভূতি যার আমেজ ও স্মৃতি শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, লেগে থাকে। কুদরত একাগ্রচিত্তে আবার ঊর্মিমালার শরীরে হাত বুলিয়ে নেয়।
কুদরত পরাণ ভরে ঊর্মিমালাকে দেখতে থাকে। ঊর্মিমালাও কুদরতকে দেখতে থাকে। কিন্তু হায় ইতোমধ্যেই ঊর্মিমালা মৃত। তাকে কেনা হয়েছিলো জীবিত। প্রবল শক্তিতে সে তখনও লাফ-ঝাপ করছিলো। সে মাছ সমাজের সুদক্ষ এক্রোব্যাট, কিংবা কে জানে- নর্তকী। কিন্তু ঊর্মিমালা দীর্ঘক্ষণ ডাঙায় থাকায় আপাতত মৃত। তবু তার চোখ খোলা। ঊর্মিমালার খোলা চোখ তাকিয়ে আছে কুদরতের দিকে। যেহেতু সে মৃত তাই সে হয়তো কুদরতকে দেখছে না। কিংবা কে জানে হয়তো দেখতে পাচ্ছে। মৃত্যু যে সব দেখা বন্ধ করে দেয় তা নিয়ে আমরা নিশ্চিত নই। আমাদের কুদরত এমন বিশ্বাস করে যে, ঊর্মিমালা তাকে দেখছে। সে আরেকবার সবিনয়ে ঊর্মিমালার শরীরে মমতার হাত বুলায়।
কুদরত একটা চা-চামচ হাতে তুলে নেয়, মাছের আঁশগুলো তুলতে থাকে। রয়ে যাওয়া দুয়েকটা জিদ্দি আশকে সে আবার আঙুলে খুঁটে খুঁটে তুলতে থাকে। আশ ছাড়ানো একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কাজটা করতে হয়, ধীরে আর সাবধানে। একটি আঁশ রয়ে গেলেও চলবে না। আঁশ তোলার পর ঊর্মিমালাকে কেমন নগ্ন মনে হয়। কুদরত ছবি আঁকতে জানলে মাছটার এক্ষুণি একটা তৈলচিত্র আঁকতো, ‘স্টাডি অফ আ ন্যুড ফিশ’। মাছের আশ আর মুরগির পালক ছড়ানোর পর কুদরত তাদের দিকে তাকাতে অস্বস্তি অনুভব করে। নেহায়েতই ন্যাংটা মেয়ে মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে যায়।
নগ্ন ঊর্মিমালাকে অবিরাম ট্যাপের জলধারায় গোসল করায় কুদরত। যেন এটাই তার জীবনের শেষ গোসল। শেষ কৃত্যানুষ্ঠানের মতো রান্নাঘরে এক ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়। কারণ ইতোমধ্যেই কুদরত দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে দেয়। এটা কুদরতের নিজস্ব রিচ্যুয়াল। দিনে বা রাতে যখনই সে মাছ বা মুরগি রাঁধে তখনই সে চারপাশে মোমবাতি জ্বালায়। মাছ মুরগির ক্ষেত্রেই তার এই বিশেষ ব্যবস্থা। কেন এই ব্যবস্থা তা সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা নেই।
যাই হোক, আঁশ ছাড়ানো এবং প্রবল ধোয়াধুয়ির ফলেই কালচে ঊর্মিমালাকে এখন বেশ ফর্সা দেখায়। আর কে না জানে, এই ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি’র দেশে ফর্সা হওয়া একটা পুঁজি। সেই সব ফেমিনিস্ট কথা না-বলে, সরল করে বলা যায় যে, ঊর্মিমালাকে এখন বিয়ের কনে মনে হচ্ছে।
এই মনে হওয়াটা কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্য হতে বাধ্য। কেননা আরেকটু পরেই ঊর্মিমালার সারা শরীরে খুব ভালো করে হলুদ মাখানো হবে। সাথে আদা, লেবুর রস আরো কতো কি! যাকে বলে একেবারে স্পা, মেনিকিউর, পেডিকিউর আরো কী কী যেন…। ঊর্মিমালার গায়ে হলুদের উৎসব উপলক্ষে গান-বাজনার দরকার। কুদরত তার মোবাইলে নুসরাত ফতেহ আলী সাহেবের ‘দামাদম মাস কালান্দার’ কাওয়ালিটা ছাড়ে। ইউটিউবে পুরো ভিডিওটা ১৬ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের। ধরে নেয়া যাক, ১৭ মিনিটের। ঊর্মিমালাকে রেডি করতে কুদরতের সময় লাগবে অবশ্য ১২ মিনিট। বাকী পাঁচ মিনিট বাড়তি সময় হাতে রাখতে হয়। হাতে সময় রাখা ভালো।
কুদরত ঊর্মিমালার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে থাকে। একবার মৃদু করে বলে, স্যরি বেবি। তারপর বড় ছুড়িটা দিয়ে ঊর্মিমালার পেটটা চিরে ফেলে। নাড়ি-ভূড়ি ফেলে দেয়। কানকো পরিষ্কার করে। আবার মিনিট তিনেক ঊর্মিমালাকে ধোয়, ট্যাপের অবিরাম ধারায় ধোয়, যেন ঝরনার জলে স্নান করছে ঊর্মিমালা। এবার ঊর্মিমালার গায়ে ছুড়ি দিয়ে তিনটা তিনটা ছয়টা আচড় কাটে দু’পাশে। এই উল্কিগুলো শুধু শুধু করা নয়। এতে করে মাছের শরীরে যেমন মশলাগুলো ঢুকবে, তেমনি একঘেঁয়ে সমতল শরীরে তিনটা গভীর রেখা দেখা যাবে। এই রেখা, এই ভাঁজের নন্দনতাত্ত্বিক প্রয়োজন আছে।
এবার শুরু হবে আসল কাজ। মশলা মাখানো। মশলা খুবই সামান্য। কিন্তু কে না জানে, সামান্যতেই ঘটে যায় অসামান্য কিছু। দুই চিমটি হলুদ, বড় একটা কলম্বো লেবুর রস, সামান্য আদা-রসুন বাটা আর যথাবিহিত পরিমাণ মতো লবণ- এই হলো ঊর্মিমালাকে সাজানোর উপকরণ। কুদরত প্রথমেই লেবুর রস ঢেলে দেয় ঊর্মিমালার বুকে, পেটে, পিঠে। তারপর তার গায়ে আদা-রসুন বাটার হাল্কা প্রলেপ দেয়। উল্কির মতো ছয়টা গভীর চিরে ফেলা স্থানে ছোট ছোট আদার কুঁচি সাজিয়ে দেয় কুদরত। সবশেষে বরযাত্রীর গায়ে গাদাফুলের পাপড়ির মতো লবণ ছিটায় সে।
মাছ, আদা, রসুন, হলুদ, লেবু- সব কিছুর ঘ্রাণ কুদরতের মনে একটা পুরনো স্মৃতির ঝাপটা এনে দেয়। লীনা, হ্যাঁ, লীনাই হবে সম্ভবত, তার গায়েও এমন ভরাট মাছের ঘ্রাণ পেয়েছিলো সে, সাথে কিছু আদা-লেবুর ঝাঁজ। বিশেষ মুহূর্তে মনে হলো, কিছুটা নুন হলুদও মাখানো ছিলো লীনার শরীরে। কথাটা লীনাকে বলতেই সে ক্ষেপে গেলো। যেন শরীরে মাছ, আদা, লেবু, নুন, হলুদের ঘ্রাণ থাকা খুবই নোংরা ব্যাপার। মেয়েরা জীবন ভর মাছ রাঁধে, কোটে-বাছে, কিন্তু মাছের মাহাত্ম্য বোঝে না!
যাক, মশলা মাখানোর জটিল রসায়নটি শেষ হলো। কেননা, এই রসায়নের কোন কিতাবি পরিমাপ নেই। ঠিক কতটুকু হলুদ, কতটুকু আদা, কতটুকু লেবুর রস, কতটুকু লবণ কোথায় কিভাবে মেশাতে হবে সেখানেই ওস্তাদি। এই ওস্তাদির পর বলা যায় ঊর্মিমালা অনেকটা তৈরি।
একটা গভীর ট্রেতে ঊর্মিমালাকে শুইয়ে দেয় কুদরত। শুয়ে থাকা ঊর্মিমালার শরীরে তুলি দিয়ে অলিভ ওয়েল মেখে দেয় কুদরত। এবার ট্রের চারপাশে আঙুলের আকারে গাজর, আলু, বরবটি কেটে দেয়। ফাঁকে ফাঁকে টুকটুকে লাল চেরি টমেটো দুফাঁক করে বসিয়ে দেয়। সবশেষে এলোপাথারি করে কয়েকটা গাঢ় সবুজ কাঁচামরিচ আর একমুঠো কঁচি সবুজ ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দেয় কুদরত। লাল গাজর, টমেটো আর সবুজ বরবটি, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা মিলেমিশে বেশ একটা লাল সবুজের কম্পোজিশন তৈরি করে। এই আর্টওয়ার্কটাকে এখন কিছুক্ষণ ফ্রিজে রাখতে হবে মাঝারি তাপমাত্রায়। অবশ্যই ঢেকে রাখতে হবে। এতে করে মশলা আর ভেষজ আর সবজির নির্যাসগুলো ঊর্মিমালার সঙ্গে মিশে যাবে ধীরে ধীরে। বেকড ফিশের সবচেয়ে বড় কারিগরি হলো কোথাও তাড়াহুড়া করা যাবে না। আদতে, তাড়াহুড়া সকল ক্ষেত্রেই পরিত্যাজ্য মনে করে কুদরত। সে ট্রে ফ্রিজে ঢুকিয়ে দেয়। তিনঘণ্টা ঊর্মিমালার দেহটা ফ্রিজে শুয়ে থাকবে।
ঊর্মিমালাকে ফ্রিজে রেখে ফতেহ আলি সাহেবের গানটার গলা টিপে দেয় কুদরত। এখন আর এই গানটার দরকার নেই তার। নিজের গা থেকে এপ্রোন খুলে ফেলে। তিনঘণ্টা সময় আছে তার হাতে। যথেষ্ট সময়। এবার নিজেকে সাজানোর পালা। শেভ করা, শাওয়ার নেয়া, এবং ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে ঘণ্টাখানেক ঘুমানো- এই তার কাজ। এই তিনঘণ্টায় মাছটা ম্যারিনেট হবে আর কুদরত নিজেকে তৈরি করে নেবে।

২.
ল্যাকমে আইকনিক কাজল দুই রকম আছে। একটা ২২ ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে আরেকটা ১০ ঘণ্টা। মিথিয়া ১০ ঘণ্টারটা কেনে। ২২ ঘণ্টা দীর্ঘস্থায়ী কাজল কেবল সিনেমার নায়িকাদের কাজে লাগতে পারে। সিনেমায় সব কিছুই বেশি বেশি লাগে। মিথিয়ার জন্যে ১০ ঘণ্টা সময়ই অনেক। ল্যাকমের আইকনিক কাজলে ‘আইকনিক’ বানানটা খুব মজার। বড় বড় কোম্পানিগুলো নামকরণেও কতো সেয়ানা! একবাক্যে দওপড়হরপ’ না লিখে, তারা লিখেছে দঊুব পড় হরপ’। এইসব ছোটখাটো ডিটেইল দেখতে তার খুবই ভালো লাগে।
নিজের দু’চোখে পরম মমতায় সাজায় মিথিয়া। কাজল দেয়ার সময় হাত হতে হবে সার্জনের মতো পাথর-স্থির, একটু কাঁপলে চলবে না, লাইন আঁকাবাঁকা হলে চলবে না। শুধু হাত নয়, মনও হবে স্থির, অচঞ্চল। চোখের আকৃতিটাকে নিখুঁত আর গভীর করে তুলে ধরে কাজল। আহ, চোখ এক আশ্চর্য অঙ্গ। কে যেন বলেছিলো, বোধহয়, মওলানা রুমি, তোমার দুটি চোখ কতোই না ছোট, কিন্তু এই ছোট্ট চোখদ্বয় দিয়েই তুমি বিশাল জগত দেখো। কথাটা বেশ মনে ধরেছিলো মিথিয়ার। কথাটা বলেছিলো ফিরোজ। ফিরোজ আদর করার সময় খুব মজার মজার কথা বলতো। ফিরোজই একমাত্র পুরুষ যে তার পুরো শরীর ছুঁয়েছে। ও বলতো- তোমার শরীরের এক ইঞ্চি জায়গাও আমি স্পর্শহীন রাখবো না।
আলাদা করে মিথিয়ার চোখ, নাক, জিভ আর কান পছন্দ করতো ফিরোজ। নাক, কান, জিভ আর চোখে চুমু খেতো ও। বিশেষ করে কানের মধ্যে যখন জিভ বুলাতো…। ফিরোজ বলতো- শোনো খুকি, কান দিয়ে তুমি শোনো, আর জিভ দিয়ে আমি বলি… কানের মধ্যে জিভ… এ হলো সঙ্গমের আসলি রস।
কতো রস যে জানতো লোকটা। এই রসের লোকটা মরলো ধুম করে। কথা নেই, বার্তা নেই, সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেলো। পড়েই মরে গেলো!
না, এখন স্মৃতিচারণের সময় নয়। মিথিয়াকে বেরুতে হবে। সে কুদরতকে কথা দিয়েছে ২ ঘণ্টা থাকবে তার ওখানে। একসাথে লাঞ্চ করবে। কুদরত অবশ্য ডিনারের আহ্বান করেছিলো। আহ্বান করলেই সাড়া দিতে হবে এমন কোন কথা নেই। বুদ্ধিমান সে-ই যে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে সব কিছু। অন্যপক্ষকে সুযোগ দেয়া যায়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণটা রাখতে হয় নিজের হাতেই। চোখের কোণায় খোঁচা লেগে যায়। এটা অন্যমনস্কতার ফল। কেন অন্যমনস্ক হচ্ছে মিথিয়া। কুদরতের মতো দু’চারজনের সঙ্গে লাঞ্চ, ডিনার করা তার জন্য কোন ব্যাপারই না। সে চাইলে বরং এদেরকেই খেয়ে ফেলতে পারে- কাঁচা, একদম কাঁচা।
আয়নায় চোখ দুটো দেখে নিজেকেই আদর করতে ইচ্ছা করে মিথিয়ার। চোখটাকে সাজানোর পর মিথিয়া মন দেয় ঠোঁটে। ছেলেরা সাধারণত মেয়েদের তিনদিকে তাকায়, চোখে, ঠোঁটে, বুকে। অতি চালু মাল হলে তাকায় পাছায়। কুদরতের জন্য আপাতত মিথিয়া চোখ আর ঠোঁটেই মনোযোগ দেয়। বাকী দুটোর দিকে আলাদা করে নজর দেয়ার কিছু নেই। ফাজিল পুরুষগুলোর দৃষ্টি থেকে মিথিয়া ইতোমধ্যেই জেনে গেছে, তার ওই সম্পদগুলো বেশ ভালোই।
ঠোঁটের জন্যে মিথিয়ার পছন্দ হলো ম্যাট লিপস্টিক। ম্যাট লিপস্টিকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো ক্যাটক্যাট করে না, রংটা আলাদা জেল্লা দেয় না। মিথিয়ার বিবেচনায় আলগা জেল্লা সে ঠোঁটেই হোক, বা অন্য কোনোখানে; আদতে অসভ্যতা। কিন্তু ম্যাট লিপস্টিকের সমস্যা হলো এগুলো একটু খরখরা টাইপ। এর সমাধান হলো একসঙ্গে ম্যাট আর মোয়েস্ট একটা লিপস্টিক। ২০১৪-তে কান ফিল্ম ফেস্টিভালে ঐশ্বরিয়া রায় পরেছিলো ল’অরিয়েল প্যারিসের মোয়েস্ট অ্যান্ড ম্যাট লিপস্টিক। সেই থেকে মিথিয়ার পছন্দ এটা। দাম একটু বেশি, কিন্তু নিশ্চয়ই তার ঠোঁটের চেয়ে দামী নয়। এই লিপস্টিকটার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটা ঠোঁট শুকনাও রাখে না, আবার ভেজাও রাখে না। অনেকটা প্রাকৃতিক রং দেয়। ঠোঁটের উপর হাল্কা পরশের মতো ল’অরিয়েল রয়ে যায় ৬ ঘণ্টা। এর আগে মিথিয়া ঠোঁটে লাগাতো ববি ব্রাউনের ক্রিম ম্যাট লিপস্টিক। এই লিপস্টিকগুলো ছিলো কিসপ্রুফ। মানে হালকা-পাতলা চুমাচুমিতে এই লিপস্টিক যায় না। তবে এর দাম ল’অরিয়েলের চেয়েও বেশি। আর মিথিয়া আজকাল এটা ব্যবহার করে না। অন্তত কুদরতের মতো লোকের জন্য তো করেই না।
কাজল আর লিপস্টিকেই নিজের সব তৎপরতা ব্যবহার করে ফেলে মিথিয়া। পোশাকে আর তেমন মন দেয় না। পোশাক, সে কেবল আবরণ, খসে পড়ে, অথবা ঢেকে রাখে। আবরণটা আরামদায়ক হলেই চলে। হু, রংটা বিষয়। অন্য মেয়েদের মতো মিথিয়া কখনোই ম্যাচিং ম্যাচিং খেলে না। তার খেলাটা হলো কনট্রাস্টের। বৈপরীত্য। যেমন এখন সে পরেছে সাদা স্কার্ট আর কালো টপস। খাঁটি বৈপরীত্য। কালোর সঙ্গে সাদার চেয়ে হলুদ আরো বেশি কনট্রাস্ট করে। কিন্তু সেটা একটু কড়া। কালো জিন্সের সঙ্গে হলুদ টি শার্ট হলে মিথিয়াকে খুব লোভনীয় দেখায়। কিন্তু সাদা-কালোয় একটা সমীহ আছে। ঘড়ি আর জুতাটা লাল পরে সে। সাদা-কালো-লাল মন্দ নয় ব্যাপারটা। কাজল আর লিপস্টিকের সঙ্গেই যেন পোশাকটার একটা চোরাগুপ্তা মিল রেখে ঘর থেকে বের হয় মিথিয়া।

৩.
তেলাপিয়াকে গরিবের মাছ মনে করা হয়। দাম কম বলেই হয়তো। ব্যাপক হারে চাষ হওয়ায় তেলাপিয়ার কৌমার্য কমে গেছে। শিং, মাগুর, পাবদাও চাষ হয়, তবে তাদের খানদানি ভাবটা এখনও তেমন কমেনি, যতোটা তেলাপিয়ার কমেছে। তেলাপিয়া মাছ, সত্যি অর্থে, এ দেশের মানুষ খেতেই শেখেনি। বেগুন-টেগুন দিয়ে ঝোল বানিয়ে এই মাছটার ইজ্জত মেরে দিয়েছে বাঙালি। বাঙালি জানেই না, তেলাপিয়া পৃথিবীর সেরা একটা মাছ, স্বাদের দিক থেকে। তবে তাকে ঝোলে-ঝালে গুলিয়ে ফেললে হবে না। মাছের আদি স্বাদ রাখতে হবে, কম মশলায়, ধীরে ধীরে তেলাপিয়া মাছ তৈরি করলে, জিভে দিয়ে মনে হবে, এ মাছ স্বর্গের দান। তেলাপিয়া মাছ সবচেয়ে ভালো জমে ব্যাকড করলে। যথেষ্ট সব নিয়ে ম্যারিনেট করে, তারপর ধীরে ধীরে ব্যাকড করতে হয় এ মাছ। ওভেন না থাকলে চুলাতেও করা যায়। একটা বড় কোনো পাত্রে পানি দিতে হবে, সেই পানির উপর আরেকটা ছোট পাত্রে মাছটাকে শুইয়ে দিতে হবে। তারপর ফুটন্ত পানির আঁচে সিদ্ধ হবে তেলাপিয়া। না, মোটেও পানির ছোঁয়া মাছের গায়ে লাগানো যাবে না। যে পানিতে মাছের বাস সেই পানি থেকে দূরে রেখে তাকে রান্না করলে স্বাদ সম্পর্কে ধারণাই পাল্টে যাবে। বেকড করতে না-পারলে ভাজিও ভালো। আস্ত তেলাপিয়া ফ্রাইও কম না! কিন্তু তেলাপিয়া, তেলাপিয়া করে কেন ঊর্মিমালাকে অসম্মান করছি। আমাদের কুদরত আজ ঊর্মিমালাকে উৎসর্গ করবে মিথিয়ার জন্যে। মিথিয়া মেয়েটার অনেক অহঙ্কার। অহঙ্কারটা একটু ভাঙতে পারলে মিথিয়া হয়ে উঠবে আরো সুন্দর। অহঙ্কারের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে, বিনয়েরও সৌন্দর্য আছে- আসলে সব কিছুরই সৌন্দর্য আছে। তবে পরিমাণটা বুঝতে হবে। সৌন্দর্য হলো, লবণের মতো, কম-বেশি হলে পুরোটাই মাটি। কুদরত মিথিয়ার জন্যই ঊর্মিমালাকে সাজিয়েছে। মিথিয়া দেখুক, শিখুক, সৌন্দর্যের চূড়ান্ত রূপ হলো নিবেদন।
নিবেদন অবশ্য মিথিয়াও করে, নিজেকে। কিন্তু সেই নিবেদনে অহঙ্কার আছে, প্রয়োজন আছে, আছে কিছুটা উগ্রতাও। সেইটুকুই ভালো লাগেনি কুদরতের। আদতে কুদরত যে হোটেলের শেফ সেটি থ্রি স্টার। সেখানেই মিথিয়ার নিয়মিত যাতায়াত। নানা পদের লোকের সঙ্গে সে ডিনার করে, মদ্যপান করে, শেষে হোটেলের বিছানায় গড়াগড়ি খায়। এই রকম গড়াগড়ি খাওয়া অনেক মেয়েকেই চাকরির সুবাদে দেখেছে কুদরত, দেখতে হয়। কিন্তু কোনদিন পাত্তা দেয়নি। কিন্তু মিথিয়া একদিন তাকে ডেকে পাঠায়। প্রায় এককেজির রেড স্নাইপারটার দিকে কড়া লাল নখগুলো তুলে বলে- কী রেঁধেছেন এসব, আপনিই কি সেফ! কুদরত যথেষ্ট পেশাদার বলেই সেদিনের ঘটনা বেশিদূর এগোয়নি। সে বিনীত স্বরে বলেছিলো, দুঃখিত ম্যাডাম, আমি এটা বদলে দিচ্ছি।
দ্বিতীয়বারের রেড স্নাইপারটা খেয়ে মিথিয়া বলেছিলো- হু, এটা ভালো হয়েছে, দেখলেন তো, মন দিলে ভালো করা যায়।
জ্বি ম্যাডাম- এর বেশি আর কথা বলেনি কুদরত। কুদরত বুঝেছিল সেদিনই, মিথিয়ার জিভটা চড়া স্বাদের। সে লবণ বেশি খায়।
তারপর প্রায়শই দেখা হয়েছে। এক ফাঁকে কুদরত তাকে বলে বসে- আমার খুব ইচ্ছা একদিন আপনাকে খাওয়াই।
– সে তো খাওয়ানই।
– না, এভাবে নয়।
– তো, কীভাবে?
– আমার বাসায়।
– তাই?
– জ্বি। শুধু আপনার জন্যই রাঁধবো আমি।
– হঠাৎ?
– এমনি। আপনি কিছু মনে করলে বাদ দিন।
– না। ঠিকাছে।
– তাহলে আগামী বৃহস্পতিবার, ডিনার।
– শুরুতেই ডিনার? নাহ, লাঞ্চ। লাঞ্চ ভালো লাগলে, ডিনারও।
– ওকে ডান।
– কী খাওয়াবেন বললেন না? ম্যানু কই।
– আমার উপর আস্থা রাখুন।
মিথিয়া আস্থা রেখেছে। এই তো ঘণ্টা বেজে ওঠলো। এই তো দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মিথিয়া। ঊর্মিমালার মতোই অপূর্ব লাগছে তাকে। সহজ, সরল, সুন্দর।

৪.
– আসুন। অসংখ্য ধন্যবাদ। আসার জন্য।
– এতা ফর্মাল হচ্ছেন কেন? বাহ, আপনার ঘরটা তো খুব গোছানো!
– চলুন, সরাসরি ডাইনিং টেবিলে।
ডাইনিং টেবিলটাকেও যথেষ্ট আদর দিয়ে সাজিয়েছে কুদরত। মেইন কোর্স ঊর্মিমালা। সঙ্গে আছে স্যুপ, ব্রাউন ব্রেড, সালাদ, বাটার ফ্রাইড ভেজিটেবল আর মোহিতো। টেবিলে রূপার মোমদানিতে সোনালী মোমবাতি গলে গলে পড়ছে। একপাশে পিতলের ফুলদানিতে বেগুনি আর গোলাপি রঙের কার্নেশন।
– ক্যান্ডেল লাইট ডিনার দেখেছি, ক্যান্ডেললাইট লাঞ্চ তো দেখিনি?
– আজ দেখুন।
– টেবিলটা ভালো সাজিয়েছেন। এগুলো কী ফুল?
– কার্নেশন।
– ঘ্রাণ নেই?
– সব ফুলের ঘ্রাণ থাকে না। কিছু কিছু ফুল সৃষ্টিকর্তা এমন রঙিলা করেন যে তাদের ঘ্রাণ লাগে না। যেমন, শিমুল।
– ফিলোসফার!
– ইনডিড। রান্না তো জগতের সবচেয়ে বড় ফিলোসফি।
– তাই!
– আর্ট ও সায়েন্সও বলতে পারেন।
– বুঝিয়ে বলুন তো।
– মানুষের ইন্দ্রিয় কয়টা?
– পাঁচটা। কারো কারো ছয়টা থাকে বলে শুনেছি।
– এখন বলুন, আপনি কখন আপনার পাঁচ ইন্দ্রিয় একসাথে ব্যবহার করেন?
– পরীক্ষা দিতে হবে?
– না। নিন, স্যুপটা নিন। পামকিন স্যুপ। মিষ্টি কুমড়ার স্যুপ। সাথে প্রণ দিয়েছি। একটু টক মিষ্টি ঝাল। স্যুপ খেতে খেতে কথা বলি।
– হুম, বেশ টেস্টি। মানে, অন্য রকম। মিষ্টি কুমড়া যে স্যুপ হয় সেটাই জানতাম না। কই, বলুন আপনার রান্নার দর্শন, কলা, ছলার কথা।
– উদাহরণ দিয়ে বলি। ধরুন আজকের মেইন কোর্স, আমি এর নাম দিয়েছি ঊর্মিমালা।
– উর্মিমালা? মাছের নাম!
– না, জাতে ও তেলাপিয়া।
– তেলাপিয়া মাছ আমার ভালো লাগে না। স্যরি।
– আজ লাগবে। গ্যারান্টি। ও এখন আর তেলাপিয়া মাছ নেই। ওকে আমি ঊর্মিমালা বানিয়েছি। ওকে আমি নিজে কেটেছি, বেছেছি, ধুয়েছি। মানে আমার স্পর্শ লেগে আছে ওর গায়ে। তারপর এই যে টমেটো, বরবটি ইত্যাদি দিয়ে সাজিয়েছি, তারমানে, আমার দর্শনেন্দ্রিয় বোধ কাজে লাগিয়েছি ওর ক্ষেত্রে। এরপর লেবু, আদা- এইসব হলো ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের কাজ। বেকড করার ফাঁকে একটু সুরুয়া জিভে নিয়েছি, মানে স্বাদেন্দ্রিয়ও কাজে লাগিয়েছি। আর এই যে সাইড সি হিসেবে দেখছেন ফ্রাইড ভেজিটেবল, ওরা খুব মুচমুচে। বাটার ফ্রাইড। মুখে দিলেই কানে, এমনকি মগজেও বাজবে কুড়মুড়ে সুর। তাহলে কী দাঁড়ালো, ছোঁয়া, দেখা, শোকা, চাখা, শোনা- একদম পাঁচ ইন্দ্রিয়ের ব্যাপার। এখন বলুন, রান্নার মতো আর কোন কাজে পাঁচ ইন্দ্রিয় এতো গভীর করে ব্যবহার করা যায়?
– সেক্সে।
কথাটা সত্য। কিন্তু সত্য কথাটা এতো সরাসরি আর কড়াকড়ি করে না-বললেও বোধহয় হতো। কুদরত একটু লজ্জাই পায়। মিথিয়া খাওয়ায় মনোযোগ দেয়ায় কুদরতের লজ্জাটা দেখতে পায় না।

৫.
কুদরতের প্রতি অবিচার করে না মিথিয়া। কুদরত যেমন পাঁচ ইন্দ্রিয় দিয়ে একান্তভাবে রান্না করেছে মিথিয়াও তেমনি পাঁচ ইন্দ্রিয় ভরে খেয়ে নেয়। রান্না, খাওয়া- এইসব দৈনিক ব্যাপার আজ মিথিয়ার কাছে অন্য রকম মনে হয়। একেকটা খাবারের মধ্যে সে একেক রকম স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ পায়। খেতে খেতে সে স্যুপের সঙ্গীত, সবজির সুর উপভোগ করে। ঢেড়শের মতো আঙুলগুলো দিয়ে ঊর্মিমালাকে চেটেপুটে খায় মিথিয়া। কুদরত দেখে আর দেখে। ঊর্মিমালা আর মিথিয়াকে যুগপৎ তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখে।
– সব ঠিক ঠাক, ম্যাডাম?
– একদম। পাঁচ ইন্দ্রিয় ছুঁয়ে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ে পৌঁছে গেছি।
– জয় হোক, সব ইন্দ্রিয়ের।
– হতেই হবে।
লাঞ্চ করতে এলেও মিথিয়া লাঞ্চের পরেও যায় না। তার মনে হয়, ডিনারটাও মন্দ হবে না। তারচেয়েও বড় কথা, কুদরত একটা ডিনার তার কাছে পেতেই পারে। আরও বেশি করে মনে হয়, পাঁচ ইন্দ্রিয়ের এক রকম ব্যবহার নয়, একদিনে দু’রকম ব্যবহারই হওয়া উচিত। অতএব, খাওয়ার পর একটু শোয়া আবশ্যকীয় হয়ে পড়ে।
মিথিয়া ডাইনিং পার হয়ে সোজা কুদরতের বেডরুমে চলে যায়।

অণুগল্প
কমলেশ রায়

সুপ্ত শব্দ
আকাশে ঘন কালো মেঘ। চারপাশে আঁধার নেমে এসেছে। সন্ধ্যা নামার আগেই রাত জেঁকে বসতে চাচ্ছে। ঝড় এলো বলে। পাহাড়ি এই এলাকায় ঘরবাড়িও বেশ ফাঁকায় ফাঁকায়। রাতে হিম ঠান্ডা পড়ে। সন্ন্যাসী মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। নিরাপদ একটা আশ্রয় খোঁজা দরকার।
বাঁকটা পার হতেই চোখে পড়ল একটা বাড়ি। সন্ন্যাসী দ্রুত পা চালালেন। বাড়িটা থেকে হালকা ঢালু হয়ে নেমে এসেছে রাস্তা। বাইরে থেকে বোঝা যায় না বাড়িটা এত সুন্দর। গোছানো, চমৎকার নকশার। তিনি দরজায় কড়া নাড়লেন। বাইরে ততক্ষণে ঝড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা শুষ্ক মাটিতে পড়ছে সশব্দে।
দরজা খুললেন এক নারী। দীর্ঘাঙ্গী। বয়স মধ্যভাগ পেরিয়েছে। ধারালো চেহারা। চোখ দুটো গভীর, কাজলপরা। আগতের পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার ভালো করে দেখে নিলেন নারী। তবে তিনি মুখে কোনো কথা বললেন না। চোখ নাচিয়ে মুখে এমন একটা ভাব ফুটিয়ে তুললেন যাতে স্পষ্ট বোঝা গেল প্রশ্নটা : কী চান ?
একটু আশ্রয়। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কোথায় যাব মা। সন্ন্যাসী বললেন বটে, তবে একটা সন্দেহও তার ভেতরে কাজ করল। ভদ্রমহিলা বাংলা বোঝেন তো? দেখে তো অবাঙালিই মনে হচ্ছে।
কাম। দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘাঙ্গী নারী বললেন।
সন্ন্যাসী ভেতরে ঢুকলেন। তারপর কিছুটা আপন মনেই বললেন, ‘এই ভাব অনেক দিন আগেই মন থেকে চলে গেছে মা।’
জবাবে কিছুই বললেন না নারী। শুধু সন্ন্যাসীর মুখটা গভীর দৃষ্টিতে একবার দেখলেন তিনি।
দুই.
বিদ্যুৎ চলে গেছে। বৈদ্যুতিক লণ্ঠন জ্বলছে। সন্ন্যাসীর আহার পর্ব প্রায় শেষের দিকে। অন্নপূর্ণা নারী প্রতিটি পদ খুব যতœ করে তুলে দিয়েছেন পাতে। তিনি নিজেও নিরামিষ খান। তাই সন্ন্যাসীর জন্য বাড়তি রান্নার প্রয়োজন হয়নি।
সন্ন্যাসীর হাত ধোয়া শেষ হলে একটি পরিষ্কার তোয়ালে এগিয়ে দিলেন গৃহকর্ত্রী। অতিথির হাত-মুখ মোছা শেষ হওয়ার পর তিনি খুব বিনীত ভাবে বললেন, একটা কথা বলার ছিল।
নির্দ্বিধায় বলো মা। সন্ন্যাসী আপ্লুত গলায় বললেন।
আমি খুব ভালো বাংলা জানি না, তবে ভালোই বুঝতে পারি। আপনিও নিশ্চয়ই ইংরেজি কিছুটা হলেও জানেন ও বোঝেন। ইংরেজিতে ‘কাম’ শব্দটার অর্থ আসুন বা এসো। আপনি তখন বলেছেন, কামভাব অনেক দিন আগেই আপনার মন থেকে চলে গেছে। হয়ত গেছে। কিন্তু মস্তিষ্কের ভেতরে রয়ে গেছে। আমার তো মনে হয় মস্তিষ্কের গভীরে কোথাও সুপ্ত অবস্থায় রয়ে গেছে শব্দটা। নইলে আপনার মুখ থেকে এমন কথা বের হতো না। আমি একজন নর্তকী। পুরুষদের খুব ভালো করেই চিনি। মুখে কিছু না বললেও শুধু চোখ-মুখ দেখে বলে দিতে পারি একজন পুরুষের মাথার মধ্যে কী ঘুরপাক খাচ্ছে। দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী গলায় কথাগুলো বললেন আশ্রয়দাত্রী।
এরপর সন্ন্যাসীর মাথা নিচু করে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। বাইরে প্রবল ঝড়বৃষ্টি। না হলে তিনি এখান থেকে দৌড়ে পালাতেন। লজ্জায় আর চোখ তুলতে পারলেন না তিনি। গ্লানিতে ভরা অবসন্ন গলায় সন্ন্যাসী বললেন, অসতর্ক এক মুহূর্তে মুখ থেকে শব্দটা বেরিয়ে গেছে মা। মাথার ভেতরের এই সুপ্ত শব্দটা বের করে দেওয়ার বাকি সাধনাটুকু আমি অবশ্যই করব। তুমি নিশ্চিত থাকো মা।
শিবু, সাধুবাবার শোবার ঘর তৈরি হলো? নারীটি গলা চড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
হ্যাঁ মা, তৈরি। বয়োবৃদ্ধ গৃহকর্মী শিবু লণ্ঠন হাতে কাশতে কাশতে এগিয়ে এলো।
যান, বিশ্রাম নিন। সন্ন্যাসীকে আন্তরিক গলায় বললেন ঋজু এক নারী।

শামুক
হেলাল হাফিজ

‘অদ্ভুত, অদ্ভুত’ বলে
সমস্বরে চিৎকার করে উঠলেন লোক।
আমি নগরের জ্যেষ্ঠ শামুক
একবার একটু নড়েই নতুন ভঙ্গিতে ঠিক গুটিয়ে গেলাম,
জলের দ্রাঘিমাজুড়ে
যে-রমক গুটানো ছিলাম,
ছিমছাম একা একা ভেতরে ছিলাম,
মানুষের কাছে এসে
নতুন মুদ্রায় আমি নির্জন হলাম,
মিলনের নামে যেন আলাদা হলাম,
একাই ছিলাম আমি পুনরায় একলা হলাম

অণুকবিতা
অনুবাদ : মুম রহমান

আমার সারাটি জীবন
রেজিনা ডেরিভা

আমার সারাটি জীবন
আমি অন্বেষণ করেছি
একজন দেবদূতের।
আর সে এলো
এটা বলতেই
‘আমি কোন দেবদূত নই!’

আজ আমি আবার যাবো
ভেলিমির খেলবনিকোভ

আজ আমি আবার চলে যাবো
জীবনের কাছে, দর কষাকষির কাছে, বাজারের মাঝে,
আর আমার গানের সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবো
বাজার প্রবাহের সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধে যেতে।

আদম
এডোনিস

আদম আমার কাছে ফিসফিস করে বললো
একটা দীর্ঘশ্বাস গিলে ফেলে,
নীরবতা এবং ঘ্যানঘ্যানানি সহÑ
‘আমি পৃথিবীর প্রথম পিতা নই।
আমি কখনো স্বর্গ দেখিনি।
আমাকে ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যাও।’

ওহ, আমার প্রেম
নিজার কাবানি

ওহ, আমার প্রেম
তুমি যদি আমার পাগলামির স্তরে পৌঁছতে
তুমি হয়তো ছুঁড়ে ফেলতে তোমার সব অলঙ্কার
বেঁচে দিতে সব চুড়ি,
আর ঘুমিয়ে পড়তে আমারই চোখে।

পাঁড় মাতাল
কু উন

আমি কখনোই একটা একক সত্তা ছিলাম না।
ষাট লক্ষ ট্রিলিয়ন কোষ!
আমি সমবেতভাবে বাঁচছি।
আমি আঁকাবাঁকা টলছি একা,
ষাট লক্ষ ট্রিলিয়ন কোষ, সবাই পাঁড় মাতাল।

পৃথিবীর দীর্ঘতম ভালোবাসার কবিতা
নিয়ি ওসোনডারে

হ্যাঁ…

১(টি
ই ই কামিংস

১(টি
পা
তা

রে
যা
চ্ছে)

লাইনেই

ক্লান্ত ঘোড়া
বব ডিলান

সূর্যের মাঝে সকল ক্লান্ত ঘোড়া
আমি কী করে চলবো তাদের ছাড়া?
হুম।

প্রত্যেকের কাছ থেকে এক পৃথিবী শিখি
এলেন গিন্সবার্গ

আমি প্রত্যেকের কাছ থেকে এক পৃথিবী শিখি
যাদের ভালোবেসেছি আমি
কতো পৃথিবী তাদের মধ্যে
এক জ্যোতিষ্কম-ল।

একটি লোক মহাবিশ্বকে বললো
স্টিফেন ক্রেন

একটি লোক মহাবিশ্বকে বললো
‘জনাব, আমি আছি!’
‘যাহোক’, উত্তর দিলো মহাবিশ্ব,
‘এই ঘটনা আমার মধ্যে সৃষ্টি করে না
কোনো ধরনের দায়িত্ব বোধের।’

স্বর্গ
ল্যাঙ্গস্টন হিউজ

স্বর্গ
হলো সেই জায়গা
সুখ যেখানে
সর্বত্রই।

তরমুজেরা
চার্লস সিমিক

সবুজ বুদ্ধেরা
ফলের সারিতে।
আমরা হাসিগুলো খাই
আর বীজগুলো থু করে ফেলে দেই।

মাছ
সেল সিলভারস্টাইন

ছোট মাছ খায় পিচ্চি মাছেদের,
বড় মাছ খায় ছোট মাছেদেরÑ
তাই শুধু বড় মাছেরাই হয় মোটা।
তুমি কি এমন মানুষ দেখেছো একটা?

Please follow and like us:
0