শীতকালে শরীরে যেসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটে

স্বাস্থ্য ডেস্ক: শীতকালে শুষ্ক ও ফাঁটা ঠোঁট সাধারণ ঘটনা, কিন্তু আপনি কি বরফ অন্ধত্ব ও শীতকালীন বলিরেখা সম্পর্কে জানেন? শীতকালে আমাদের শরীরে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে যা আপনাকে বিস্মিত করবে। শীতের মাসগুলোতে শরীরে ঘটে এমন কিছু অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন।
জিহ্বা ওভারটাইম কাজ করে
যখন শুষ্ক বাতাস ও শীতল তাপমাত্রা ঠোঁটকে শুষ্ক করে, তখন আপনার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানোর প্রবণতা বেড়ে যায়- এটি একটি সহজাত অভ্যাস। কিন্তু জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালে ঠোঁট আর্দ্র থাকে না। প্রথমত, লালা দ্রুত শুকায়, যা আপনাকে আরো বেশি করে ঠোঁট ভেজাতে প্ররোচিত করে। দ্বিতীয়ত, লালাতে এনজাইম থাকে যা উবে যায় না এবং ত্বকে লেগে থাকে- এই ধরনের এনজাইম আপনার ঠোঁটের জন্য ভালো নয়। পেডিয়াট্রিক ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েটস অব র‌্যানডলফের ডেন্টিস্ট অ্যারন ম্যানেলা বলেন, ‘কিছু পরিস্থিতিতে আমি অল্প বয়স্ক ছেলেমেয়েদের তাদের নিজেদের ঠোঁট চ্যাপস্টিকের ব্যবহার ব্যতীত এত বেশি জিভ নিয়ে ভেজাতে দেখেছি যে যা প্রকৃতপক্ষে ইনফেকশনে রূপ নিয়েছে।’
দাঁত ব্যথা করে
যাদের সেনসিটিভ দাঁত থাকে তাদের ঠা-া পানীয় পানে দাঁত ব্যথা করে। কিন্তু শীতকালীন ঠা-া বাতাস দ্বারাও মুখের সেনসিটিভিটি উদ্দীপিত হতে পারে, বিশেষ করে যদি আপনার দাঁতে হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার, ফিলিংয়ের মতো হার্ডওয়্যারের ক্ষয়, ক্রাউন বা ব্রিজ, দৃশ্যমান দাঁতের গোড়া অথবা পেরিওডোন্টাল রোগের মতো মাড়ির রোগ থাকে। ডা. ম্যানেলা বলেন, ‘ঠা-া বাতাস আপনার দাঁত বা মাড়ির অধিক ক্ষতি না করলেও এটি অধিক লক্ষণীয় ও অস্বস্তিদায়ক হতে পারে।’ প্রকৃত কারণ জানতে ও সমাধান পেতে ডেন্টিস্টের কাছে ভিজিট করুন।
রক্ত শর্করা বেড়ে যায়
পার্ক অ্যাভিনিউ এন্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনের এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডেনিস গেজ বলেন, ‘যেসব রোগীদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের অত্যধিক ঠা-া আবহাওয়ায় বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিৎ।’ অত্যধিক গরম অথবা ঠা-া আবহাওয়া আপনার শরীরকে করটিসলের মতো স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ করতে উৎসাহিত করে, যা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে অবদান রাখতে পারে। ডা. গেজ বলেন, ‘ডায়াবেটিকদের ধীরে ধীরে ঠা-া ও গরম আবহাওয়ার সঙ্গে অভিযোজন করতে হবে এবং তাদের অত্যধিক আবহাওয়া অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ থাকা উচিৎ নয় ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য অধিক ঘনঘন শর্করা চেক করে দেখতে হবে।’
চর্বি বেড়ে যায়
আমাদের সকলেরই প্রচুর সাদা চর্বি রয়েছে, কিন্তু অন্য এক ধরনের চর্বিও রয়েছে- বাদামী চর্বি- এই চর্বি বেশি সক্রিয়, এটি ক্যালরি পোড়ায় এবং আপনাকে ঠা-ার সময় উষ্ণ থাকতে সাহায্য করে। ল্যাবফাইন্ডার ডটকমের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রবার্ট সেগাল বলেন, ‘শীতকালে বাদামী চর্বির মাত্রা বেড়ে যেতে পারে, এটি সম্ভবত আপনাকে উষ্ণ রাখার জন্য প্রকৃতির একটি বিল্ট-ইন বৈশিষ্ট্য।’ আপনি ঠা-া তাপমাত্রায় ব্যায়াম করে বাদামী চর্বিকে অধিক সক্রিয় করতে পারেন। মেলাটোনিনের মাত্রা উচ্চ রেখে এবং রাতে নীল আলো এক্সপোজার পরিহার করে বাদামী চর্বি বাড়াতে পারেন। অন্য একটি উপায় হচ্ছে, খোসাসহ আপেল খাওয়া- আপেলের খোসার আরসোলিক অ্যাসিড বাদামী চর্বি বৃদ্ধি করে।
অধিক ক্যালরি পুড়ে
আপনি হয়তো শুনে থাকবেন যে শীতকালে ব্যায়াম করলে অধিক ক্যালরি পুড়ে- হ্যাঁ এটি সত্য। শীতকালে শারীরিক তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য আপনার শরীরকে কঠিনতর কাজ করতে হয়। যখন আপনার শরীর কঠিনতর কাজ করে, আপনি বর্ধিত বিপাকের উপকারিতা পান। কিন্তু অত্যধিক উত্তেজিত হবেন না: যদি ব্যায়াম করার সময় আপনি সত্যিই না ঘামেন, তাহলে আপনার কোমরের খুব একটা পরিবর্তন হবে না, বলেন ডা. সেগাল। সারকথা হচ্ছে, শীতই আপনার অধিক ক্যালরি পোড়ায় না, কিন্তু এই সময়ের অতিরিক্ত প্রচেষ্টাতেই আপনার ক্যালরি পুড়ে।
শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে পড়ে
প্রত্যেকেই গ্রীষ্মকালে প্রচুর তরল পান করার কথা স্মরণ করতে পারে, কিন্তু শীতের মাসগুলোতেও পর্যাপ্ত পানি পান করা সমানভাবে (অথবা এমনকি বেশি) গুরুত্বপূর্ণ। ডা. সেগাল বলেন, ‘শীতকালে লোকজন সঠিকভাবে রিহাইড্রেটেড হতে ব্যর্থ হয়, কারণ তারা সাধারণত গ্রীষ্মের মাসগুলোর মতো তৃষ্ণা অনুভব করে না। শীতের মাসগুলোতে ডিহাইড্রেশন হওয়ার প্রবণতা বেশি, কারণ শরীরে তৃষ্ণা প্রতিক্রিয়া হ্রাস পায়। শীতকালে ঘামও দ্রুত উবে যায়, যা আমাদের ভুল ভাবায় যে আমরা ডিহাইড্রেটেড অথবা তৃষ্ণার্ত নই।’
বরফ অন্ধত্ব হতে পারে
ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মির জন্য শীত ও গ্রীষ্মের সূর্য সমানভাবে দায়ী, কিন্তু লোকজন ভুলে যায় যে বরফে সূর্যের প্রতিবিম্ব চোখের জন্য খুব ক্ষতিকর হতে পারে। অপথ্যালমিক কনসালট্যান্টস অব লং আইল্যান্ডের লেজার, ক্যাটার‌্যাক্ট, কর্নিয়া অ্যান্ড রিফ্রেক্টিভ সার্জন মার্টা ম্যাককিগ বলেন, ‘এটি ক্যানসার ও ছানির ঝুঁকি বাড়ানো ছাড়াও ‘স্নো ব্লাইন্ডনেস’ বা বরফ অন্ধত্ব (সানবার্ন অব দ্য কর্নিয়াও বলে) নামক যন্ত্রণাদায়ক দশা সৃষ্টি করতে পারে।’ যখন আপনি গাড়ি চালাবেন অথবা তুষারমানব বানাবেন, ইউভি-ব্লকিং সানগ্লাস পরতে ভুলে যাবেন না।
মাইগ্রেনের প্রবণতা বেড়ে যায়
শীতকালে ঘরে বসে থাকার মানে হচ্ছে, আপনি শরীরে ভিটামিন ডি উৎপন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সূর্যালোক পাচ্ছেন না। যাদের মাইগ্রেন আছে তাদের জন্য ভিটামিন ডি’র ঘাটতি মাইগ্রেনের একটি ট্রিগার হতে পারে। ডা. সেগাল বলেন, শীতের শুষ্কাবস্থা ডিহাইড্রেশন সৃষ্টি করে এবং এটি মাইগ্রেনের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। মাইগ্রেন বেশি হওয়ার অন্য একটি বিষয় হচ্ছে- ঘর থেকে বাইরে যাওয়া অথবা বাইরের ঠা-া পরিবেশ থেকে ঘরে আসার ফলে তাপমাত্রার অত্যধিক পরিবর্তন।
মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়
স্মরণ করুন যে গ্রীষ্মকালে পানিতে ঝাঁপ দেওয়া, সাঁতার কাটা কিংবা খেলাধুলা করা কত সহজ। এর একটি কারণ হচ্ছে, আপনার শরীর গ্রীষ্মে কাজের সঙ্গে দ্রুত অ্যাডজাস্ট হতে পারে- কারণ, আপনার মাংসপেশী আক্ষরিক অর্থে উষ্ণতর। শীতকালে মাংসপেশী ঠা-া ও শক্ত হয়ে যায়, যার ফলে যে কাজটি গ্রীষ্মে সহজে করা যায় তা শীতকালে সম্পন্ন করা তুলনামূলক কঠিন হয়। ব্যালেন্স কাইরোপ্র্যাকটিক অ্যান্ড রিহ্যাবের কাইরোপ্র্যাক্টর ড্যানিয়েল পোজার্নস্কাই বলেন, ‘যদি আপনি শীতকালে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া সক্রিয় হন এবং আপনার মাংসপেশীতে টান লাগে, তাহলে হ্রাসকৃত রক্তপ্রবাহ ও সংবহনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মাংসপেশী সেরে ওঠতে দীর্ঘসময় লাগবে।’
আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বেড়ে যায়
ঠা-া আবহাওয়ায় হাতে আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বেড়ে যায়, কিন্তু শীতের ঠা-া তাপমাত্রা আসলে আপনার আর্থ্রাইটিসের ব্যথা বৃদ্ধি করে না। ডা. পোজার্নস্কাই বলেন, ‘বিশ্বাস করুন কিংবা নাই করুন, শীতে ঠা-ার কারণে রোগীরা বর্ধিত আর্থ্রাইটিক অনুভূতি অনুভব করে না, তাদের এই অনুভূতির কারণ হচ্ছে বায়ুচাপের পরিবর্তন। বায়ুম-লীয় চাপের পরিবর্তন কিছু আর্থ্রাইটিস রোগীদের অবস্থা আরো খারাপ করে। সেই সময় উষ্ণ গ্লাভস ব্যথা উপশম করে না, কিন্তু ধীরে ধীরে গতি বা চলাফেরা বাড়ানো সহায়ক হতে পারে।’
বাইরে অবস্থান বিপজ্জনক হতে পারে
ঠা-া আবহাওয়ায় বাইরে বসে ক্রিকেট কিংবা ফুটবল ম্যাচ দেখা যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে। ডা. পোজার্নস্কাই বলেন, ‘ঠা-ার সময় মাংসপেশী বেশি দ্রুত তাপ হারায়, যা তাদের সারা শরীরে সংকোচন ও টাইট অবস্থা সৃষ্টি করে। এটি তাদের চলাফেরা ও গতির রেঞ্জও সীমিত করে ফেলে এবং স্নায়ুতে অধিক সহজে খোঁচা খাওয়ার অনুভূতি দিতে পারে।’ বসা থেকে ওঠুন এবং আশপাশে হাঁটুন- এটি আপনার মাংসপেশী শিথিল ও উষ্ণ রাখতে সাহায্য করবে।
শীতকালীন বলিরেখা হতে পারে
শীতকালীন বলিরেখার জন্য আপনি শীতকে সম্পূর্ণরূপে দোষারোপ করতে পারবেন না, কিন্তু আপনি এর জন্য শীতের মৌসুমে পরিবেশ ও জীবনধারার পরিবর্তনকে দায়ী করতে পারেন, বলেন ক্ল্যারিও সেন্টারস ফর অ্যাসথেটিক সার্জারির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল ট্যানটিলো। তিনি যোগ করেন, ‘আর্দ্রতা কমে যাওয়া, সংবহন হ্রাস পাওয়া, কোষ রিনিউয়াল কমে যাওয়া, শুষ্ক বায়ুর সংস্পর্শে আসা, বর্ধিত সূর্য এক্েেসাজার, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এবং সক্রিয়তার মাত্রা হ্রাস পাওয়ার কারণে এই সমস্যা হয়ে থাকে।’ বাইরে বের হলে তাপমাত্রার পরিবর্তন বিবেচনা করুন। ডা. ট্যানটিলো বলেন, ‘হ্রাসকৃত কোষ রিনিউয়াল ও ত্বকের সংবহন আমাদের ত্বকের উজ্জ্বলতা হ্রাস করে।’ উপরে উল্লেখিত ঘটনাগুলোর সমন্বয়ে আপনার বলিরেখা, শুষ্ক ত্বক ও ত্বকে দাগ হবে।
চোখের পৃষ্ঠ শুকিয়ে যায়
অকিউলার সারফেস বা চোখের পৃষ্ঠ টিয়ার ফিল্মের একটি পাতলা স্তর দ্বারা আবৃত থাকে। একটি সুস্থ অকিউলার সারফেস আমাদেরকে স্বচ্ছ দৃষ্টি ও স্বস্তি দেয় এবং ইনফেকশন থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। কিন্তু এই স্তরটি পরিবেশের পরিবর্তনের (যেমন- শুষ্ক বাতাস) প্রতি অত্যধিক সেনসিটিভ। ঘরের ভেতরে ফার্নেস অথবা ফায়ারপ্লেস বায়ুকে শুকিয়ে ফেলে এবং বাইরের বায়ু এক্সপোজার হতে পারে যন্ত্রণাদায়ক শুষ্ক চোখের কারণ। ডা. ম্যাককিগ বলেন, ‘হিউমিডিফাইয়ার, আর্টিফিশিয়াল টিয়ার এবং ইউভি-ব্লকিং শেড ব্যবহার করে আপনি এই স্তরকে রক্ষা করতে পারেন এবং চোখকে অধিক আরামদায়ক অবস্থায় রাখতে পারেন।’
অ্যাজমা আরো খারাপ হয়
শীতকালে কোল্ড অথবা ফ্লু ভাইরাস অধিক কমন এবং অ্যাজমাকে আরো খারাপ করতে পারে। বাইরের ঠা-া ও শুষ্ক বায়ু ইরিট্যান্ট হিসেবে কাজ করে এবং অ্যাজমাকে আরো খারাপ করে। ডাস্ট মাইট ও অন্যান্য ইনডোর অ্যালার্জেন (যেমন- মোল্ড ও অ্যানিমল ড্যান্ডার) হচ্ছে অ্যাজমার বড় ট্রিগার, বলেন অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা নেটওয়ার্কের অ্যালার্জিস্ট/ইমিউনোলজিস্ট ডা. পারভি পারিখ।
আপনার নাক আপনাকে অসুস্থ করতে পারে
ইয়েল ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণা সাজেস্ট করছে যে, ঠা-া তাপমাত্রায় কমন কোল্ড বা সাধারণ ঠা-ার ভাইরাস খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এই গবেষণা আরো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আপনি উষ্ণ তাপমাত্রার তুলনায় ঠা-া তাপমাত্রায় বেশি অসুস্থ হতে পারেন।

Please follow and like us:
0