মঙ্গল. জানু ১৫, ২০১৯

শিশুর জন্য চাই সুন্দর পৃথিবী

শিশুর জন্য চাই সুন্দর পৃথিবী

Last Updated on

কাঞ্চনা চক্রবর্তী : একটি শিশু জন্মের সময় সে তার আগমন বার্তাটি কান্নার মাধ্যমে এই পৃথিবীকে জানায়। শিশুটি কাঁদলেও আর সকলেই তার আগমন বার্তাটিকে আনন্দের মাধ্যমে বরণ করে নেয়। শিশুর কান্নাটিই তার প্রথম চাহিদা। এটিই মানবজীবনের আনন্দের প্রথম বারতা। জন্মের পর থেকে কৈশোর বা বয়ঃসন্ধিকালের পূর্বের সময়টাকে শৈশব বলে। পিয়াজেট থিওরি অব অবিট্যাটিভ ডেভেলপমেন্ট অনুসারে শৈশব কালের দুটি পর্ব রয়েছে। একটি হল প্রাক কর্মক্ষম পর্ব এবং অপরটি হল কর্মক্ষম পর্ব। ডেভেলপমেন্টাল সাইকোলজি অনুসারে, শৈশবকালকে হাঁটা, শিক্ষার সময়, খেলার সময়, বিদ্যালয়ে যাওয়ার সময় এবং বয়ঃসন্ধিকাল সময়ে ভাগ করা হয়েছে।
একটি মানুষের জীবনে এই শৈশবই জীবনের মূল ভিত রচনা করে। পরিবার, মা-বাবা, দাদু-দিদা, ঠাকুরমা-ঠাকুরদাদা সবার সাথে থেকেই সে তার জীবনের পথে এগিয়ে চলে। এ যেন এক আনন্দযাত্রা। এই সময়টিকে তাই মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অলোকিত সময় হয়ে ধরে রাখা যায়। কিন্তু আজ আমাদের সমাজে এমন আনন্দময় শৈশব কয়টি শিশু খুঁজে পায়। বিশ্বায়নের ছুটে চলা সময়ে শিশুদের দিকে তাকানোর সময়ই বা পায় কয়জন অভিভাবক। সমাজ বা রাষ্ট্রটি তাকে দিতে পারছে আনন্দময় একটি শৈশব? না, পারছে না। তাই আজ শিশু মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত হয়ে সে অপরিপূর্ণ মানুষ হয়ে উঠে। দেখা যাক তার অপার আনন্দময় জীবন কিভাবে নিরানন্দে গ্রাস করে-
ক. শিশুশ্রম যেন নতুন রূপে দাসপ্রথা : দাসপ্রথার বিলুপ্তি কাগজে কলমে হলেও তা আজও এই সভ্য সমাজে বলবৎ আছে। পরোক্ষভাবে তা আমরা নিজেরাই নিজেদের স্বার্থে টিকিয়ে রেখেছি। আমাদের বাসা বাড়িতে, অফিস, দোকানপাট আর কলকারখানায় চলছে শিশুশ্রমের মত অমানবিক কাজ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যে বলা হয়েছে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রগুলোকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সবধরনের শিশুশ্রম নির্মূল করতে হবে। আমাদের দেশে জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০১৩ এর তথ্য মতে, প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রায় ১৩ লাখ শিশু। বর্তমানে দরিদ্রতার কষাঘাতের কারণে প্রায় সবক্ষেত্রেই শিশু শ্রমিকদের দেখা যায়। শ্রমানুযায়ী কাজে নিয়োগের সর্বনিম্ন বয়স হলো ১৪ বছর তবে ১২–১৪ বছরের শিশু হালকা শ্রমে নিয়োজিত হতে পারবে, যদি এতে তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে উঠা বাধাগ্রস্ত না হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য এই হালকা শ্রমের সঠিক সংজ্ঞা বা কাজে যোগদানের শর্তগুলো অনির্দিষ্টই রয়ে গেছে। বর্তমান সরকার ৩৮টি খাতকে শিশুশ্রমের ঝুঁকিতে রেখেছেন। ১৮ বছরের নিচে কেউ চাইলে এসব কাজে শিশুদের যুক্ত করতে পারবে না। কিন্তু এই আইনকে দৃশ্যত প্রতিনিয়ত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে। বাংলাদেশে ঝালাই তথা ওয়েল্ডিং, সড়ক ও পরিবহন, যন্ত্রাংশ নির্মাণ কারখানা, তামাক কারখানা, ব্যাটারি ইত্যাদি ঝুঁকিপূর্ণ খাতে শিশুদের নিয়োজিত থাকার ব্যাপারে জাতিসংঘ এর শিশু অধিকার কমিটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আইন প্রয়োগের শিথিলতাও বিচারহীনতার সংস্কৃতি শ্রমজীবী শিশুদের ঝুঁকিতে ফেলেছে। কর্মক্ষেত্রে তাদের কঠিন ও দীর্ঘকালীন শ্রম একটি সাধারণ ঘটনা। শিশু গৃহকর্মীরা সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিতে আছে। উদয়াস্ত তাদের কঠিন শ্রম দিতে হয়। আসলে তাদের কষ্টের কথা দেখার বা শোনার মত কোন পর্যবেক্ষক নেই।
মূলত শিশুশ্রম দারিদ্র্যর ফল। আমাদের দেশে নিম্নবিত্ত পরিবারে অনেক শিশুই পরিবারের ভার বহন করে থাকে। শিশুর যে মৌলিক চাহিদা তা থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা এমনভাবে বঞ্চিত থাকে যে তাদের আর শৈশব বলে কিছুই থাকে না। শৈশব এর যে আনন্দ তা অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যায়। শিশুশ্রম নিরসনের জন্য সবার আগে দরকার নাগরিক সচেতনতাবোধ। এছাড়াও কিছু জরুরি পদক্ষেপে নেওয়া যেতে পারে-
১. দরিদ্র পরিবারগুলিতে আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন, ২. শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। ৩. শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত না করা, ৪. দরিদ্র পরিবারের অভিভাবক গণকে শিশুশ্রমের কুফল সম্পর্কে অবহিত করা। ৫. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদেরকে কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া। ৬. অধিক জনসংখ্যার কুফল সম্পর্কে অবহিত করা। ৭. শিশু শ্রমের কুফল সম্পর্কে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি জনমত তৈরি করা। ৮. উপযুক্ত কাজের মঞ্জুরি নির্ধারণ করা, ৯. সর্বোপরি প্রশাসনের সহায়তায় শিশুদের নিরাপত্তার জন্য প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় সাপ্তাহিক, পাক্ষিকও মাসিক প্রতিবেদন তৈরি করা এবং সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক জনমত ও প্রতিকারের ব্যবস্থা করা। মূলত: গৃহকর্মসহ সবখাতে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে।
খ. আনন্দময় শিক্ষা : আনন্দময় শৈশবের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আনন্দময় শিক্ষা। আমাদের শিশুরা আজ এক আনন্দহীন শিক্ষা গ্রহণ করছে।
বিদ্যালয় হবে তার জন্য একটি আনন্দ আশ্রম
যেখানে প্রবেশের সাথে সাথে শিশুদের মন প্রাণ এক স্বর্গীয় আনন্দে ভরে উঠবে। তার বিদ্যালয় এমনই হবে যেখানে সে খেলাধুলার মাধ্যমে প্রকৃতি থেকে নিজে নিজে জ্ঞান লাভ করবে। লেখাপড়ার বিষয়টি শিশুর কাছে সহজ এবং আকর্ষণীয় হবে। এজন্য অবশ্য কিছু কিছু খেলার উপকরণ থাকবে আর তাকে নিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির কাছে। শিশুরা হেসে খেলে লেখাপড়া শিখবে আমাদের চট্টগ্রাম শহরে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কবি শ্রদ্ধেয় আবুল মোমেন ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শ্রদ্ধেয় শীলা মোমেন দ্বারা পরিচালিত ফুলকি এমনই এক আনন্দ আশ্রম। যা বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। ফুলকি দীর্ঘদিন যাবত এই সাধনায় নিয়োজিত। শিশুর হৃদয়াবেগ ও ইচ্ছাশক্তি প্রবল ও নির্মল। তার ভিতরে থাকা শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে হবে। ফুলকি দীর্ঘদিন যাবত এই সাধনায় নিয়োজিত। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে শিশুমনের ঐশ্বরিক শক্তিকে জাগিয়ে তোলা তো দূরের কথা বরং সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা নামক ব্যবসার জাঁতাকলে ফেলে তাদের শৈশবকে পিসে ফেলছি। তৈরি করছি এক প্রাণহীন রোবট। সে সবই করতে পারে শুধু মানুষ হয়ে তার মধ্যে থাকে না কোন মানবিকবোধ।
প্রথমে আসা যাক পরিবারের কথা। সন্তান জন্মের আগে থেকেই তাকে কোন নামিদামি স্কুলে পাঠাবে তার পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়। শিশুটির মুখে বোল ফোটার আগেই তাকে স্কুলে নিয়ে ছোটাছুটি শুরু হয়। আবার পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর সোনার হরিণটি তার পেতেই হবে। নতুবা তার জীবন বৃথা। সেই সূর্যোদয় থেকে অস্ত পর্যন্ত শিশুটি শুধু নিরানন্দময় লেখাপড়া করে। তার মনের ইচ্ছা আর চাহিদার কোন দামই নেই। ফলশ্রুতিতে শুধু মানুষের মত মানুষ না হয়ে যন্ত্রমানব হয়। তবুও সকলে খুশি। সঠিক শিক্ষানীতি থাকলে চলবে না। সেটির প্রয়োগ ঘটাতে হবে। স্কুলের পড়া স্কুলেই শেষ করতে হবে। সম্মানিত শিক্ষকরাই সঠিক দায়িত্ব পালন করবেন। একটি শিশুর উপর কিছুই চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। তার পছন্দ অবশ্যই গুরুত্ব পাবে। শিশুটির কিসে আগ্রহ সেটি বুঝে নিতে হবে। জিপিএ বা কোন ভাল গ্রেড পেলেই তাকে নিয়ে উল্লাস করার কিছুই নেই। কেননা একটি ছাত্র লেখাপড়ায় হয়তঃ তেমন ভাল নয় কিন্তু সেই শিশুটি শিল্প, সংস্কৃতিতে অবশ্যই অন্য বিষয়ে পারদর্শী। সেই বিষয়টিতে তাকে দক্ষ করে তুলতে হবে। আনন্দহীন শিক্ষা অন্ধকারের পথ চলারই মত। প্রাক প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন শিশুদের জীবনে আলোকের ঝর্ণাধারা বইয়ে দিতে পারে সেইদিকে খেয়াল রাখতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্বে নিয়োজিত নীতি নির্ধারণ করাই এই ব্যাপারে অবশ্যই কড়া নজর রাখবেন। মাধ্যমিকে পাসের হারটি যেন দেশের মাপকাঠি হতে পারে না। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সংগঠনের মাধ্যমে তাদেরকে আনন্দময় শিক্ষায় শিক্ষিত করে রাখতে হবে। পথ শিশুরা দিন শেষে একবেলা খাবার আর কোনো রকমে বেঁচে থাকার ভাবনায় বিদ্যালয় কিংবা পড়াশোনার কথা মাথায় আসে না কারো। কেউ কেউ প্রথমে প্রাথমিক শিক্ষাটুকু পেলেও তা আত্মস্থ করতে পারে না বা ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগানোর সুযোগ কিছুই পায় না। ফলে এ শিক্ষা তাদের কাছে অর্থহীন। তাই তাদেরকে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। শিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা থাকলে তারা নিজে থেকে আনন্দযজ্ঞে এসে অংশগ্রহণ করবে।
গ. শিশুর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন : ২০০৮-১০ সালে হঠাৎ করে শিশু নির্যাতন বেড়ে গেছে আজ যা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রথমত: বিদ্যালয়ে শিশুর নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেক মা বাবাই মনে করেন, শিশুর লেখাপড়ার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শাস্তির প্রয়োজন আছে। কেউ কেউ মনে করে এতে শিশুকে ভাল হতে সাহায্য করে। আসলে শিশুরা পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ শাস্তির শিকার হয়। শ্রেণিতে চিৎকার চেঁচামেচির জন্য শিক্ষকরা দু’একজনকে এমনভাবে সবার সামনে শাস্তি দেন, যেন অন্যরা ভয় পায়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদের কোন সুফল আসে না। কোন কোন ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব দেখা যায়। এন্ডিং লিগ্যালইজড ভায়োলেন্স এগেইনস্ট চিলড্রেন গ্লোবাল প্রোগ্রেস রিপোর্ট মতে, সারা বিশ্বে ২ থেকে ১৪ বয়সী প্রায় ১০০ কোটি শিশু তাদের বাড়িতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ টু এন্ড অল করপোরাল পানিশমেন্ট অভ চিলড্রেন ১৫০টি গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, শাস্তি প্রত্যক্ষভাবে শিশুর মানসিকতাকে বিপর্যস্ত করে। তাদের শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ও এর বড় ধরনের নেতিবাচক ভূমিকা আছে। শাস্তি শিশুমনের মধ্যে আগ্রাসী মনোভাব তৈরি করে। শিশু যাদের সবচেয়ে বিশ্বাস করে তাদের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ নিতে পারে না। এর ফলে শিশু বয়সে যারা শাস্তির শিকার হয় বড় হলে তারা মনে করে আপনজনদের ও ঘনিষ্ঠজনদের প্রতি সহিংস আচরণ করা যায়। শাস্তি বন্ধে আইন প্রণয়ন করতে হবে। শাস্তি থেকে সুরক্ষা পাওয়া শিশুদের মৌলিক অধিকার। তাই বিদ্যালয়গুলোতে এমনকি প্রত্যেক পরিবারে সপ্তাহে ও মাসে শিশুদের নিয়ে মতবিনিময় ও পরামর্শমূলক বৈঠক ও অনুষ্ঠান করা যেতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে গুরুত্বের সাথে আনন্দময় স্কুলের কথা ভাবতে হবে।
শিশুর প্রথম আদর্শ তার মা বাবা এর পরেই শিক্ষক। এদের আচরণ শিশুমনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। আমরা নিজেরা শিশুদের সঙ্গে যা করছি সেটাই মূল বিষয়। আসলে নির্যাতন বন্ধের জন্য সামাজিক ও মানসিক সচেতনতা আর সবাইকে এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।
ঘ. স্বাস্থ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তা : আমাদের দেশে শিশুমৃত্যুর হার বেশ ভয়ানক। বেঁচে থাকার জন্য দুবেলা দুমুঠো অন্নই শিশুদের মুখে জোটে না। তাদের মৌলিক চাহিদার জন্য অন্নই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। আবার যদিও বা কোনোভাবে খাবার জুটে তাও ক্ষতিকর। সঠিক পুষ্টির অভাব এদেশের শিশুর জন্য একটি ভয়ানক সত্য। নিরাপদ শৈশব এখন একমাত্র দাবি। ১৯৮৯ সালে গৃহীত জাতিসংঘ এর ‘শিশু অধিকার সনদ’ এর আলোকে ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ‘শিশু নীতি’ ঘোষিত হয়েছে। এই নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো- জন্মের পর স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শারীরিক নিরাপত্তার অধিকার নিয়ে শিশুর বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা। সবচেয়ে ভয়ানক ঘটনা মেয়াদোত্তীর্ণ শিশু খাদ্য বিক্রি। এটি একটি নীরব ঘাতক। আমরা জানি শিশু খাদ্য হিসেবে মায়ের দুধই আদর্শ খাদ্য। মায়ের দুধে শিশুর জন্য অত্যন্ত জরুরি এবং উপকারী সকল উপাদান রয়েছে। কিন্তু বাজারে মায়ের দুধের বিকল্প হিসেবে তা নিয়ে জাতীয়ভাবে চিন্তা করতে হবে। মাতৃদুগ্ধ বিকল্প, শিশু খাদ্য, ব্যাপকভাবে প্রস্তুতকৃত শিশুর বাড়তি খাদ্য ও তা ব্যবহারের সরঞ্জামাদি আইনটি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সবার মধ্যে মায়ের দুধের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। খাদ্য নিরাপত্তার ধারণা সম্পর্কে ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিসংস্থা বলেছেন ‘খাদ্য নিরাপত্তা সব মানুষের সারা জীবনের মৌলিক খাদ্য প্রাপ্তির ভৌত এবং অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা বোঝায়।’ ১৯৯৬ সালে বিশ্ব খাদ্য সম্মেলনের সুপারিশে বলা হয়েছিল, খাদ্য নিরাপত্তা এমন একটি বিষয়, যেখানে জনগণ সব সসময় ভৌত, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পর্যাপ্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যে প্রবেশের অধিকার লাভ করে। তাদের সুস্বাস্থ্য ও কর্মতৎপর জীবনের জন্য একটি শিশুকে শৈশব এ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারলে সুস্থ জীবন পাবে। উন্নত ও নিরাপদ জীবনের মানদ-ই হচ্ছে নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্য। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্স অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) জাতীয় মান প্রণয়ন ও মানের সনদ প্রদানকারী সংস্থা। এই সংস্থাকে এই ব্যাপারে সঠিক আইন ও সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চায়ন করতে হবে।
প্রশাসনিক পরিকাঠামো সংস্কার করে শিশুদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে হবে, তারা কোনোভাবে কোনও অন্যায়ের শিকার না হয় তার জন্য সামাজকেও দৃষ্টিভঙ্গি বদল করতে হবে। শিশুর মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে পারিবারিক পরিবেশের উন্নয়ন করা প্রয়োজন। প্রতিটি পরিবারই হোক নিরাপদ ও আনন্দ আশ্রম। প্রতিবন্ধী শিশুসহ অন্যান্য শিশুদের কষ্টকর অবস্থা থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে হবে। শিশুদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা এসকল বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। শিশুদের সুন্দর ও আনন্দময় আগামীর জন্য চাই সুস্থ ও সচেতন ও অনাবিল আনন্দময় শৈশব। নিরাপদ জীবন ব্যবস্থাই গড়ে তুলবে সমৃদ্ধ জাতি ও উন্নত দেশ।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, জীববিজ্ঞান বিভাগ, নিজামপুর কলেজ

Please follow and like us:
2