রবি. জুলা ২১, ২০১৯

শিশুর কৃমিজনিত সমস্যার সমাধান

শিশুর কৃমিজনিত সমস্যার সমাধান

Last Updated on

স্বাস্থ্য ডেস্ক : সারা পৃথিবীতেই শিশুদের পেটে বিভিন্ন ধরনের কৃমির প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশেরও অধিকাংশ শিশু-কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কৃমির প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন প্রকার কৃমির মধ্যে কেঁচো বা লম্বাকৃমি (এসকারিস লুমব্রিকয়েডস) বক্রকৃমি বা হুক ওয়ার্ম, সুতাকৃমি, ট্রইচুরিস ট্রাইচুরা (টিটি), স্ট্রংগিলয়েড স্টারকোনালিস ও ফিতাকৃমি উল্লেখযোগ্য। কৃমির সংক্রমণ খাবার ও পানির মাধ্যমে হয়ে থাকে। কৃমির ডিম কোনভাবে পেটে ঢুকলে, তা থেকে পেটের মধ্যে কৃমির সৃষ্টি হয়। কৃমি বা হুক ওয়ার্মের লার্ভা (ডিম থেকে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত শিশুকৃমি) পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে এবং ক্ষুদ্রান্ত্রে গিয়ে তার হুক আঁকশি দিয়ে রক্ত চোষে। তাতে কিছুকাল পর রোগীর রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। সুতাকৃমি পায়খানার রাস্তায় এসে কিলবিল করে এবং ডিম ছাড়ে। চুলকানোর সময় এ সমস্ত ডিম হাতের আঙুলে ও নখে লেগে থাকেÑ যা খাবার বা পানির সাথে পেটে ঢুকে কৃমিতে রূপান্তরিত হয়। ফিতাকৃমি অল্প সিদ্ধ বা অর্ধ্বসিদ্ধ গরুর মাংস বা শূকরের মাংস খেলে হতে পারে। এগুলোর দৈর্ঘ্য ৫-২০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এ লম্বাকৃমি বা এসকারিস লুমব্রিকয়েডস-এর প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে একটি সমীক্ষায় গ্রামাঞ্চলের ও শহরের শিশুদের মধ্যে যথাক্রমে ৯২% ও ২৮% ক্ষেত্রে এই কৃমি দেখা গেছে। এই কৃমি পেটে থাকলে রোগীর পেটব্যথা, ক্ষুধামান্দ্য, পেটফাঁপা, অজীর্ণ, বমি, এমনকি ক্ষুদ্রান্ত্রকে বন্ধ করে দেয়া, অন্ত্রনালীকে ছিদ্র করা, পিত্তনালীতে ঢুকে তা বন্ধ করে দিয়ে জন্ডিসের সৃষ্টি করার মতো মারাত্মক অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।
কৃমি সম্পর্কে ভয়ঙ্কর কিছু তথ্য
কৃমির ব্যাপারটিকে অনেকেই সহজভাবে দেখি। প্রকৃতপক্ষে কৃমি তা নয়। কৃমি শরীরের মারাত্মক ক্ষতি করে থাকে। এসকারিস লুমব্রিকয়েডস বা লম্বাকৃমি এবং বক্রকৃমি বা হুক ওয়ার্ম ক্ষুদ্রান্ত্র পাকস্থলী পেরিয়ে উপরের দিকে খাদ্যনালীর মুখ পর্যন্ত চলে আসে। সেখান থেকে তা শ্বাসনালীতে ঢুকে পড়ে এবং ফুসফুসে চলে যায়। কৃমি ফুসফুসে চলে গেলে ইনফেকশন হয়ে তা মারাত্মক অবস্থা ধারণ করে। বক্রকৃমি বা হুক ওয়ার্ম শরীর থেকে রক্ত চুষে খায়। এসব কৃমি মানুষের রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে। ক্ষুদ্রান্ত্রই হচ্ছে এদের আবাসস্থল। একেকটা বক্রকৃমি প্রায় ৩/৪ বছর বাঁচে। একটি হুক ওয়ার্ম বা বক্রকৃমি প্রতিদিন প্রায় ০.২ মি.লি. রক্ত খায়। এভাবে ১২টি কৃমি একসঙ্গে রক্ত খেলে শরীরে রক্তের পরিমাণ শতকরা ১ ভাগ কমে যায়। এসব বক্রকৃমি পায়ের তালু ফুটা করে শরীরে প্রবেশ করে। পায়ের তালু ফুটা করার করণে পায়ের তালুর ত্বকে ইনফেকশন দেখা দেয় এবং পায়ের তালুতে ছোট ছোট গর্তের সৃষ্টি হয়।
কৃমি সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা
অনেকের ধারণা পেটে ২-১ টা কৃমি থাকা ভালো। এ ধারণাটি মোটেই ঠিক নয়। কৃমি শরীরের কোনো উপকার করে না বরং ক্ষতিই করে। কৃমি হজমে সাহায্য করে বলে মনে করেন অনেকে। এটিও একটি ভ্রান্ত ধারণা। কৃমি হজমে সাহায্য না করে উল্টো বদ-হজম, অজীর্ণ, ক্ষুধামান্দ্য ও পেটের পীড়ার সৃষ্টি করে। মিষ্টি খেলে কৃমি হয় এমন কথাও বলেন কেউ কেউ। মিষ্টি খাওয়ার সঙ্গে কৃমি হওয়ার ব্যাপারটি কোনোভাবেই যুক্ত নয়। নোংরা, ময়লা পরিবেশ, স্যাঁতসেঁতে মাটি হচ্ছে কৃমির জন্য আরামপ্রদ আবাসস্থলথ যেখানে কৃমির ডিম ও বাচ্চা থাকে। সেসব নোংরা স্থানে চলাফেরা করলে কৃমি পায়ের তালু ভেদ করে শরীরে ঢুকে পড়ে। এ ছাড়া নোংরা স্থানের মাটি ও ময়লা হাত দিয়ে স্পর্শ করলে অসবাধানতা ও অপরিচ্ছন্নতার সুযোগে তা নখ দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়তে পারে। এ ছাড়া নোংরা পানিতেও কৃমির ডিম বা বাচ্চা থাকতে পারে। দূষিত পানি পান করার কারণেও কৃমি শরীরে ঢুকে পড়ে।
কৃমির চিকিৎসা
কৃমির চিকিৎসা দেয়ার আগে শিশুর কৃমি হয়েছে কিনা সে ব্যাপারটি নিশ্চিত হতে হবে। এ জন্য পায়খানা পরীক্ষা করার দরকার রয়েছে। পায়খানা বা স্টুলের রুটিন পরীক্ষায় এটি ধরা পড়ে। যে কোনো কৃমির ক্ষেত্রে যে ওষুধটি সধারণভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে তা হচ্ছে যে মেবেনডাজল। এ ওষুধের উল্লেখযোগ্য বাজারজাত নাম হচ্ছে আরমক্স/মেবেন। বয়স্কদের বেলায় মেবেন/আরমক্স ট্যাবলেট ১০০ মি.গ্রা. ১টা করে দিনে ২ বার মোট ৩ দিনে খেতে হবে। শিশুদের বেলায় আরমক্স/মেবেন সিরাপ-চা-চমচের ১ চামচ করে দিনে ২ বার মোট ৩ দিন খেতে দেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া কৃমির জন্য ওষুধ এলবেনডাজল, বাজারে এটি অলবেন নামে পাওয়া যায়। বয়স্ক ও শিশু উভয়ের বেলায় ২টি অলবেন রাতে শোবার সময় খাইয়ে দেয়া যেতে পারে। ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের বেলায় ১টি অলবেন ট্যাবলেট খাওয়ালেই চলবে।
নিম্নলিখিত উপায়ে কৃমি প্রতিরোধ কর্মসূচি নেয়া যেতে পারেÑ
১. জন্মের পর প্রথম পাঁচ মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাওয়ানো। এ সময়ে অন্য কোন খাবার বা পানীয়ের প্রয়োজন নেই।
২. ৫ মাস বয়স হলে মায়ের দুধের পাশাপাশি পরিবারের অন্য খাবারাদি স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি করে খেতে দেয়া। খাবার তৈরির পূর্বে এবং খাবার দেয়ার পরে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। খাবার ভালো করে সিদ্ধ করে পরিষ্কার পাত্রে রাখতে হবে।
৩. পরিষ্কার ও নিরাপদ পানির ব্যবহার খাবার ধোয়া, মোছা, রান্না ইত্যাদি কাজে ব্যবহার ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে কখনওই দূষিত পানি ব্যবহার করা যাবে না।
৪. পরিবারের প্রত্যেক সদস্যকে মল ত্যাগের পর, খাবার তৈরি ও পরিবেশনের আগে ও খাবার গ্রহণের আগে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে।
৫. সেনিটারি ল্যাট্রিনের ব্যবহার এবং স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পয়ঃনিষ্কাশন পদ্ধতি গড়ে তুলতে হবে।
৬. ব্যক্তিগত পর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৭. খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।

Please follow and like us:
2