বুধ. ফেব্রু ২০, ২০১৯

শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ ও বেড়ে ওঠায় কিছু নির্দেশনা

শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ ও বেড়ে ওঠায় কিছু নির্দেশনা

Last Updated on

শিশুস্বর্গ ডেস্ক : বাইরে গিয়ে খেলাধুলা : কম্পিউটার গেমসের যুগে, শিশুদের চোখ খারাপ হওয়ার সংখ্যা বাড়ছে; হচ্ছে স্থূল। এসব থেকে রক্ষা পেতে শিশুদের বাইরে খেলাধুলা করা প্রয়োজন। এই যুগের বাবা-মা ভাবতে পারেন শিশুকে ঘরোয়া খেলাধুলা ও শারীরিক কসরতের রুটিনে বাঁধলে হয়ত তারা সুস্থ থাকবে। তবে গবেষণা বলছে অন্য কথা, শিশুর জন্য চাই আরও বেশি কিছু।
যুক্তরাষ্ট্রের রাইস ইউনিভার্সিটির লরা কাবিরি ও তার গবেষক দলের মতে, এখানে বিবেচনার বিষয় হল- এই গোছানো রুটিনে কতটুকু শারীরিক পরিশ্রম রয়েছে? শিশুকে যত বেশি সম্ভব অনিয়ন্ত্রিত শারীরিক পরিশ্রমের সংস্পর্শে আনতে হবে প্রতিদিন, বাবা-মায়ের প্রতি এই উপদেশ দিয়েছেন গবেষকরা। কাবিরি বলেন, ‘আপনার শিশু যদি খেলতে খেলতে হাঁপিয়ে ওঠে, দরদর করে ঘামতে থাকে, তবেই বুঝতে হবে তার পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম হয়েছে। তাই প্রতিদিনের রুটিনে শিশু যত বেশি অনিয়ন্ত্রিত পরিশ্রম করবে ততই মঙ্গল। আপনার শিশুদের ঘরের বাইরে ছোটাছুটি করতে দিন, পাড়াতো শিশুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ করে দিয়ে উৎসাহ দিন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিকভাবে প্রতিটি শিশুর প্রতিদিন কমপক্ষে এক ঘণ্টা ‘অ্যারোবিক’ ধাঁচের পরিশ্রম চাই। তবে অন্যান্য গবেষণা বলে, যেসব শিশু সাধারণ খেলাধুলা করে তাদের মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মৃদু থেকে ভারী শারীরিক পরিশ্রম হয়।
জার্নাল অফ ফাংশনাল মরফোলজি অ্যান্ড কিনিজিওলজি’তে প্রকাশিত হওয়া গবেষণাটির জন্য ১০০টি ‘হোম-স্কুল্ড’ থেকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সি শিশুর তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা করেন গবেষকরা।
কর্মচঞ্চল রাখার উপায় : হয় মোবাইলে গেমস, নয়ত কার্টুন, নয়ত টেলিভিশন- বাসার ছোট্ট সদস্যের জীবনটা এই ডিজিটাল জগতেই আটকে আছে। তাই নড়াচড়া কম। ফলাফল ওজন বৃদ্ধি, চোখের চশমা আর আলসেমি। সমাধান একটাই, তা হল শারীরিক কসরত। আর শিশুকে শারীরিকভাবে কর্মচঞ্চল রাখতে কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতেই পারে। স্প্যানিশের ইউনিভার্সিটি অফ গ্রানাডা’র এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটের প্রতিবেদনে জানানো হয়, শারীরিক পরিশ্রম শিশুদের মস্তিষ্কের ধূসর অংশ বাড়ায় যা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কর্মদক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। গবেষকদের মতে, শারীরিক সুস্থতা বিশেষ করে, হৃদপি-ের সুস্থতা, গতি তৎপরতা ও পেশির সুস্থতা মস্তিষ্কের ধূসর অংশের উপর নির্ভর করে।
‘দা জার্নাল অব নিউরোইমেজ’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, শিশুর শিক্ষণ, কার্যকারিতা ও পড়াশুনার দক্ষতা মস্তিষ্কের ধূসর অংশের বৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। তাই শিশুকে ঘরে বসিয়ে নয়, বরং বড় করতে চাইলে শারীরিকভাবে সচল রাখাই শ্রেয়। আর এর জন্য উপায়ও রয়েছে। শিশুকে খেলাধূলায় উৎসাহিত করুন: ক্রিকেট, ফুটবল, সাঁতার, টেনিস অথবা কাবাডি যে কোনো খেলাতে শিশুকে উৎসাহিত করুন। খেলাধূলা শিশুকে ব্যস্ত ও কর্মক্ষম রাখে। তারা যখন খেলতে যায় তখন অনেক নতুন বন্ধুর সঙ্গে পরিচিত হয় এবং একে অপরের কাছে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।
খেলাধূলা শিশুদের অনেক কিছু শিখতে সাহায্য করে যা পরবর্তীতে জীবনে অনেক কাজে লাগে যেমন- দলের কোনো জটিল সদস্যের সঙ্গে কাজ করা, অনেক চাপের মধ্যে কাজ করা, সে কি চায় তা মুখ ফুটে বলা এবং ধৈর্য ধরা ইত্যাদি।
নাচ: শারীরিক কসরতের সবচেয়ে মজার মাধ্যম হচ্ছে নৃত্য। এমনকি ব্যায়ামাগারে যেতে না চাইলেও বড়দের ক্ষেত্রেও নাচ হতে পারে ব্যায়ামে আগ্রহ বাড়ানোর অন্যতম মাধ্যম।
নাচের অঙ্গভঙ্গীর ফলে শারীরিক যে ভারসাম্যের সৃষ্টি হয় তা শিশুর স্মৃতিশক্তি, তেজ এবং সহিষ্ণুতা বাড়ায়। আর এক ঘণ্টার নাচ ভালো পরিমাণে ক্যালোরি পোড়ায়।
‘স্ক্রিন’য়ে সময় কম দেওয়া: স্কুল থেকে ফিরে শিশুকে টেলিভিশনের রিমোট, ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকতে দেবেন না। তারা যত বেশি সময় স্ক্রিনের মধ্যে আটকে থাকবে তত কম সময় পাবে বাইরে খেলার জন্য। শিশুর গ্যাজেট ব্যবহারের সময় নির্ধারণ করে দিন। তবে মনে রাখবেন কোনো কিছুর পুরস্কার স্বরূপ শিশুকে স্ক্রিন ব্যবহার করতে দেবেন না। স্ক্রিনের সামনে বসে আপনি বা আপনার শিশু খাওয়া দাওয়া করবেন না।
হাঁটতে বের হন: কাছালাছি কোথাও যেতে হলে শিশুকে নিয়ে হেঁটে যান। নিয়মিত হাঁটা খুব ভালো ব্যায়াম। সাধারণ গতিতে হাঁটা ১৫০ থেকে ২০০ ক্যালরি খরচ করতে সাহায্য করে। ফলে শিশুও নিজেকে স্বাধীন ও স্বতঃস্ফুর্ত অনুভব করবে এবং আপনাদের মধ্যে খুব ভালো সময়ও কাটবে।
নিজেই হন ‘রোল মডেল’: শিশু তার মায়ের কাছ থেকে শেখে। আপনি যদি একটি ব্যস্ত জীবনযাপন করেন তাহলে আপনার শিশুও সেটা শিখবে। অবসর সময় মোবাইল ফোনে ব্যয় না করে শিশুর সঙ্গে সময় কাটান। সম্ভব হলে, সন্তানের সঙ্গে বল, দড়ি-লাফ খেলুন অথবা আশপাশে বেড়াতে যান। সন্তান যখন আপনাকে ব্যস্ত দেখবে তখন সেও ‘ফিট’ থাকার জন্য চেষ্টা করবে।
শিশুকে ব্যস্ত রাখার কৌশল : নতুন কিছু শিখতে এবং ইতিবাচক ও নতুন ভাবে চিন্তা করতে শিশুদের সাহায্য করে প্রযুক্তি। পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে।
এজন্য সহায়ক কার্যকলাপ যেমন: বাগান তৈরি করায় তদারকি করতে পারেন বাবা-মা। বাগান করা নিছক খেলা নয়, বরং রপ্ত করা যায় নিত্য নতুন কৌশল, গড়ে ওঠে আতœ-নির্ভরশীলতা এবং দায়িত্ববোধ।
শিশুদের বিকাশে সহায়ক এবং বিকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করে এমন কয়েকটি কাজ সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন ভারতীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কাশিশ এ সাব্রিয়া এবং হেমন্ত মিত্তাল।
* শিশুর ভিডিও গেইম খেলা, টেলিভিশন ও সিনেমা দেখা, ইন্টারনেট ব্যবহার ইত্যাদির উপর তদারকি করতে হবে। শিশুকে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দেওয়ার আগে সব ধরনের আপত্তিকর সাইটে যাওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে।
* ভিডিও গেইম, টেলিভিশন কিংবা সিনেমা থেকে শিশু কী শিক্ষা গ্রহণ করছে সেদিকে নজর দিতে হবে। জেরা করে নয়, তাদের সঙ্গে কথা বলে কৌশলে এই বিষয়গুলো জানতে হবে।
* শিশুকে নিত্যনতুন কাজের সঙ্গে জড়ানোর সুযোগ করে দিতে হবে। এই কাজগুলো শিক্ষামূলক এবং মজাদার হওয়া জরুরি। যেমন, বাগান করা নিয়ে অসংখ্য গেইম আছে, সেগুলো খেলার উৎসাহ দিতে পারেন।
* শিশুকে বাইরের জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। ঘরের নিরাপদ পরিবেশে বদ্ধ না রেখে প্রাকৃতিক পরিবেশে তাদের বেড়াতে নিয়ে যান। এতে ইন্টারনেট জগতের বাইরের বাস্তব জগতের প্রতি তাদের আগ্রহ তৈরি হবে।
* পরিচ্ছন্নতার নামে শিশুকে মাটির স্পর্শ থেকে দূরে রাখা উচিত নয়। বিশেষ শারীরিক অসুস্থতা না থাকলে কালেভদ্রে শিশুকে গ্যাজেটস ফেলে কাদামাটির নিয়ে খেলতে উৎসাহ দিন।
* শিশুর সঙ্গে বোঝাপড়া করার কৌশল রপ্ত করতে হবে। আপনার সন্তান যখন বাজারে নতুন আসা ট্যাব কিংবা মোবাইল ফোনের বায়না ধরবে তখন তার সঙ্গে জুড়ে দিন মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করা কিংবা গ্রামের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসার শর্ত।
* বৈদ্যুতিক গ্যাজেটসগুলো যাতে শিশু শোবার ঘরে ব্যবহার করতে না পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
* টেলিভিশন, সিনেমা, কম্পিউটার, মোবাইল ইত্যাদির লাগামহীন ব্যবহার রোধ করতে হবে। সময় বেঁধে দিতে হবে এবং তা শক্ত হাতে মেনে চলতে হবে, শিশুর জেদ কিংবা কান্নাকাটির কাছে হেরে যাওয়া চলবে না।

Please follow and like us:
0