Published On: বুধবার ০৬ জুন, ২০১৮

শিশুদের ইন্টারনেট আসক্তির প্রতিকার-প্রতিরোধ

শিশুস্বর্গ প্রতিবেদন : স্বচ্ছ ক্লাস সেভেনে পড়ে। স্কুল থেকে ফিরে মায়ের স্মার্টফোনটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সে। খেতে খেতেও খেলতে থাকে গেম। বিরতিহীন। বাইরের কোনো খেলার দিকে তার মন নেই। পড়ালেখা নামমাত্র। স্কুলে যায় ঠিকই, কিন্তু ইদানীং তার ফল খারাপ হচ্ছে। বাসায় যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ মা বা বাবার মুঠোফোন আঁকড়ে থাকে। নানা ধরনের গেম খেলে। বেড়াতে যেতে চায় না। বাসায় কোনো অতিথি বেড়াতে এলে সে তাদের সময় দেয় না। জোর করে মুঠোফোন সরিয়ে রাখলে বা গেম খেলতে বাধা দিলে কান্নাকাটি করে; চিৎকার করে জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে।
মুঠোফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ কম্পিউটার নিয়ে অতি ব্যস্ত হয়ে থাকছে শিশু-কিশোর, তরুণদের একাংশ। প্রযুক্তি বা ইন্টারনেটের প্রতি সন্তানের আসক্তি বাবা-মায়ের চিন্তার কারণ। কেউ মুঠোফোন বা ল্যাপটপে গেম খেলে, কেউ নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে গিয়ে উত্তেজক ছবি বা ভিডিও দেখে। আবার কেউ সফটওয়্যার ও অ্যাপ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, কেউ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে বন্ধুর সঙ্গে চ্যাট করে।
আমার ছেলে এই বয়সেই মোবাইল ফোন-ল্যাপটপের সব কারিকুরি জানে, আমরা কিছুই পারি না’Íএই বলে বাবা-মায়েরা অন্যদের কাছে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলতে থাকেন। ভাবেন, ‘আহ্ আমার সন্তান কত স্মার্ট’। কিন্তু দিন শেষে এই প্রযুক্তি-আসক্ত সন্তানটি স্মার্ট হওয়ার বদলে ব্যর্থ হয়।
ইন্টারনেট আসক্তি জন্মায় যেভাবে
১। সন্তানকে শান্ত রাখতে মুঠোফোনসহ নানা যন্ত্রপাতি তাদের হাতে তুলে দেন ব্যস্ত বাবা-মায়েরা। এ থেকে সন্তানের মধ্যে প্রযুক্তি উপভোগ করার অভ্যাস জন্মায়।
২। অনেক সময় নিরাপত্তাহীনতার অজুহাতে সন্তানকে সব সময় ঘরে বন্দী রাখতে চান। নিজের চোখের সামনে দেখতে চান। সে ক্ষেত্রে তাদের হাতে মুঠোফোন-ল্যাপটপ তুলে দিয়ে আপাত স্বস্তি অনুভব করেন, যা শিশু-কিশোরদের যন্ত্রের প্রতি আসক্ত করে ফেলে।
৩। বাবা-মা নিজেরাও সারা দিন ইন্টারনেট নির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মগ্ন থাকেন। সন্তানেরা এতে উৎসাহিত হয়।
৪। কখনো কখনো কিছু বিজ্ঞাপনের ভাষা ও উপাদান শিশুদের প্রযুক্তি বা গেমের প্রতি আসক্ত করে তুলতে পারে।
নীচের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে ধরে নিতে পারেন যে আপনার সন্তান ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে।
১। অনলাইনে বসলে সময়ের জ্ঞান থাকে না। ২। নেটে বসার জন্যে ঘুম বিসর্জন দেয়। ৩। অনলাইনে থাকাকালীন সময়ে কোন কাজ করতে বললে ক্ষেপে যায়। ৪। নেটে বসতে না দিলে ক্ষিপ্ত হয়। ৫। হোমওয়ার্কের বদলে নেটে বসাকে গুরুত্ব দেয়। ৬। বন্ধু-বান্ধব, এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ৭। বাড়তি সময় নেটে কাটানোর ব্যাপারে মিথ্যে বলে। ৮। নতুন নতুন অনলাইন বন্ধু তৈরি হয়। ৯। পুরোনো শখগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ১০। দিনে অনেক বার ই-মেইল চেক করে।
অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিসর্ডার) নামক মানসিক রোগের সৃষ্টি করে। এই রোগে আক্রান্ত শিশু নির্দিষ্ট কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ প্রদান করতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল এন্ড প্রিভেনশান-এর মতে চার থেকে সতেরো বছর বয়েসী অন্তত ৬০ লক্ষ শিশু-কিশোর বর্তমানে এডিএইচডি-তে আক্রান্ত। আক্রান্ত শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়, মিথ্যে কথা বলে, এবং সবার সাথে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হয়। এছাড়া স্কুলের রেজাল্ট দিনদিন খারাপ হতে থাকে।
ক্ষতিকর প্রভাব :
১। শিশুকেআত্মকেন্দ্রিক, অসহনশীল ও অসামাজিক করে।
২। শিশুরবুদ্ধির বিকাশে বাধা দিয়ে সৃষ্টিশীলতা নষ্ট করে দেয়।
৩। শিশুর শারীরিক খেলাধুলার সময় কেড়ে নেয়। এতে শিশুরা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪। শিশু শারীরিক পরিশ্রম কমিয়ে দেয়।এতে শিশুর অস্বাভাবিক ওজন বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৫। পারিবারিক সদস্যদের মধ্যে বন্ধন কমিয়ে দেয়।
৬। সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেয়।
৭। শিশুর স্বাভাবিক আচার-ব্যবহারের ওপর প্রভাব ফেলে।
৮। শিশুর মাথাব্যথা, চোখব্যথা, চোখ দিয়ে পানি পড়াসহ চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে।
৯। শিশুর ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, স্ট্রোকসহ নানাজটিলতা বাড়ায়।
১০। সামাজিক দক্ষতা কমে যায়। দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয় এবং কোনো বিষয়ে কার্যকরী সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ধীরে ধীরে সমাজ-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
১১। জীবনের গুণগত মান কমে যায়। পড়ালেখাসহ সব কাজের গতি ও মান নিচে নামতে থাকে। হতাশা বা বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারে; ঘটাতে পারে আত্মহত্যা।
১২। অন্যদের সঙ্গে আচরণ সুষম হয় না, খিটখিটে মেজাজ আর অস্থিরতা দেখা দেয়, সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়।
১৩। সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া বা সাইবার জগতের অপরাধে জড়িয়ে আইনি ঝামেলায় পড়ে যেতে পারে।
কীভাবে এই আসক্তি থেকে শিশুকে ফিরিয়ে আনা যায়? বাবা-মার সাথে দূরত্বের কারণে সন্তান ইন্টারনেটের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়তে পারে। তাই তাকে সময় দিতে হবে। নৈতিক শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাকে নীতিবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে ওয়েব দুনিয়ার অশুভ দিকগুলো থেকে সে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে। এছাড়া অভিভাবকদের কিছু টেকি জ্ঞান প্রয়োগ করার প্রয়োজনীয়তাও আছে।
গ্যাজেট আর ইন্টারনেট ব্যবহার করতে দিলে তার একটি সময়সীমা বেঁধে দিন। সন্তানের সঙ্গে চুক্তিতে আসুন, যাতে নিয়মগুলো পালন করে। সময় মেনে চলতে উৎসাহিত করুন। নবজাতক-১৮ মাস বয়সী শিশুঃ একেবারেই স্ক্রিনের সামনে থাকা যাবে না। ১৯-২৪ মাস বয়সী শিশুঃ বাবা মা অথবা পরিচর্যাকারীর তত্ত্বাবধানে স্বল্প সময়ের জন্য সময় কাটানো যাবে।
প্রিস্কুলারঃ দৈনিক সর্বোচ্চ ১ ঘন্টা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান দেখা যাবে তাও অভিভাবক বা পরিচর্যাকারির সাথে, যাতে তাকে   বুঝিয়ে দেয়া হয়, সে আসলে কি দেখছে। ৫-১৮ বছরের শিশুঃ অভিভাবকদের অবশ্যই বাচ্চার জন্য সময় বেঁধে দিতে হবে যে সে কতক্ষণ সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি,ভিডিও গেম,ইন্টারনেটে  সময় কাটাবে। মনোবিজ্ঞানী মুহিত কামাল বলেন, শিশুদের ফেসবুকের আসক্তি কমাতে সবচেয়ে বেশি প্রযোজন পরিবারের সহযোগিতা। প্রতিটি অভিভাবককে তার সন্তানদের সময় দিতে হবে। আপনি যতই ব্যস্ত থাকুন সন্তানদের জন্য হাতে সময় রাখুন। তিনি বলেন, তাকে পত্রিকা পড়ানো, বই পড়ানো, ঐতিহাসিক স্থান ঘুরে দেখানো, টিভিতে খবর দেখানো, গল্প করা, মোবাইল শিশুদের নাগালের বাইরে রাখা, এক কথায় সন্তানদের বন্ধু হোন। দেখবেন সহজেই কাটবে শিশুদের ফেসবুকের নেশা। এছাড়া তিনি স্কুলের শিক্ষকদের ভূমিকার কথাও বলেছেন। বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী মুহিত কামাল কামালের পরামর্শ থেকে নিচে অভিভাবকদের জন্য কিছু পরামর্শ তুলে ধরা হলো
১. শিশুদের সময় দিন : শিশুদের ফেসবুকের আসক্তি কমাতে অভিভাবকেরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সন্তানকে অবশ্যই সময় দিতে হবে। সন্তান কখন কি করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে চলছে সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন তাকে বাইরে বেড়াতে নিয়ে যান। শিশুকে গুণগত সময় দিন। মা-বাবা নিজেরাও যতি প্রযুক্তির প্রতি আসক্ত থাকেন, তবে সবার আগে নিজের আসক্তি দূর করুন।
২. স্কুলে সচেতনতামূলক কর্মশালা : ফেসবুকের আসক্তি কমাতে স্কুলে স্কুলে সচেতনতা-প্রচার শুরু করলে এখনকার তরুণ প্রজন্মকে ওই কু-প্রভাব থেকে রক্ষা করা যাবে। স্কুলগুলোতে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। কর্মশালায় ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ার কুফল নিয়ে আলোচনা, পাঠচক্র করা যেতে পারে।
৩. খেলাধুলা : মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেটের কুফল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা বা পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন বিকেলে পড়া শেষে তাকে খেলাধুলার সময় দিতে হবে।
৪. শিশুদের বন্ধু হোন : শিশুদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। সব কিছু খোলামেলা আলোচনা করুন। তাহলে অনেক সমস্যাই সমাধান হয়ে যাবে।
৫. শিশুদের বই উপহার দিন : শিশুদের জন্মদিন কিংবা বিশেষ দিনে শিশুদের বই উপহার দিন। তাকে আস্তে আস্তে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বই পড়লে এক তো জ্ঞান বাড়বে অন্যদিকে ফেসবুকের আসক্তি কমবে।
৬. নাগালের বাইরে রাখুন মোবাইল : সম্ভব হলে শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন মোবাইল। শিশুদের হাতে মোবাইল না দেয়া গেলেই ভাল।
টিনেজারদের বেলায় : আপনার সন্তান প্রযুক্তিতে অতি দক্ষÍএই ভেবে আত্মতৃপ্তি পাবেন না। তার বয়স প্রযুক্তির উপযোগী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। ১৮ বছরের নিচের সন্তানের ইন্টারনেটের যাবতীয় পাসওয়ার্ড জানুন। তবে লুকিয়ে নয়, তাকে জানিয়েই তার নিরাপত্তার জন্য পাসওয়ার্ডটি আপনার জানা দরকার; এটি বুঝিয়ে বলুন। বাসার ডেস্কটপ কম্পিউটারটি প্রকাশ্য স্থানে (কমন এরিয়া) রাখুন। শিশু যাতে আপনার সামনে মুঠোফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি ব্যবহার করে, সেদিকে গুরুত্ব দিন। নিরাপত্তামূলক অনেক সফটওয়্যার আছে। সেগুলো ব্যবহার করুন, যাতে আপনার বাসার সংযোগ থেকে কোনো নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা না যায়। এ বিষয়ে আপনার ইন্টারনেট সংযোগদাতা বা প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে পারেন।

Videos