শাহেদ রহমানের কাব্য ‘স্মৃতি নও,তুমি নিত্য দীপ্যমান’-এর ভূমিকার পরিবর্তে

শাহেদ রহমানের কাব্য ‘স্মৃতি নও,তুমি নিত্য দীপ্যমান’-এর ভূমিকার পরিবর্তে

শাহেদ রহমানের কাব্য ‘স্মৃতি নও,তুমি নিত্য দীপ্যমান’-এর ভূমিকার পরিবর্তে

ড. মনিরুজ্জামান : পূর্ব-পরিকল্পনা ছাড়াও একটি মহৎ গ্রন্থপাঠের ফল কত শুভ হতে পারে তার প্রমাণ কবি শাহেদ রহমানের আলোচ্য গ্রন্থটি। তবে এই প্রতিক্রিয়ার পেছনে একটি ধারাবাহিক ইতিহাস ও তাৎক্ষণিক প্রেরণার ব্যাপারও আছে। যাঁরা কীটসের ‘ঙহ ভরৎংঃ ষড়ড়শরহম রহঃড় ঈযধঢ়সধহ’ং ঐড়সবৎ’ পড়েছেন, তারা উপলব্ধি করবেন এর সত্যটি কোথায়। বিস্ময়াভূত মানুষ এভাবেই করে থাকেন আরও নানা অদ্ভূত কা-ও প্রচলিত আছে, নাট্যকার মনোজ বসু ঢাকায় বেড়াতে এসে একটি হেকিমি চিকিৎসার বই হাতে পান; সেইটি পড়ে তিনি বুদ্ধদেব বসুর প্রতিদ্বন্দ্বী লেখক হয়ে ওঠেন। কার কাছে কোন প্রেরণা কী ভাবে আসে সেটাই একটা রহস্য। প্রেমের কবি শাহেদ রহমানও বঙ্গবন্ধুর ‘আত্মজীবনী’ পড়ে নিজের নির্মোক খুলে বেরিয়ে এসেছেন; ভিন্ন রূপে তাঁর এই পরিবর্তন লক্ষ্য করে তাই হয়তো বলা যায়, প্রেমিক ও যোদ্ধা মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ মাত্র। নিতান্ত আবেগ ও শ্রদ্ধা এবং দেশভক্তি এই পরিবর্তনের কারণ কিনা বা এটুকুই সব কিনা বিচার্য বিষয়। আমাদের আলোচ্যগ্রন্থের শিরোনাম ‘স্মৃতি নও, তুমি নিত্য দেদীপ্যমান’। এই সৃষ্টির পটভূমিটি প্রথমে লক্ষ্য করা যাক।
‘তিমিরে প্রর্থিত তারার নূপুর’(১৯৮৫) শিরোনামে মাকে উৎসর্গ করা তাঁর প্রথম গ্রন্থ। এই কাব্যের ভাবনা পরে আরও বিস্তার পেয়েছে। কিন্তু কাব্যটি প্রকাশের দুই দশক পরে শাহেদ রহমানের এক ডজন কবিতার বই বেরিয়ে গেলে তিনি তাঁর ‘কাব্য সমগ্র’(২০০৫) প্রকাশ করে বা তাঁর সৃষ্টিক্ষমতার একটি চূড়া আবিষ্কার করেও যখন কবি নামে প্রতিষ্ঠিত দেখতে পেলেন না নিজেকে, তখন শুরু হলো তাঁর দ্বিতীয় পর্বের কাব্য-অভিযান। লেখা হলো তাঁর আরও সপ্তব্যুহ কাব্যের অনেকান্ত আয়ুধমালা। এই সময় তাঁর আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল আফ্রিকা, মধ্যএশিয়া ও চীন বা দক্ষিণ-পূর্বএশিয়ার কাব্য। তখনই পেলেন তিনি জেল থেকে লেখা ‘পলিটিকাল পোয়েট’ বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী (অসমাপ্ত)। আগ্রহ জাগলো তাঁর রাজনীতির কবিতায়। ফিরলো তাঁর পথযাত্রা ; লক্ষ্যের গতিধারাও। প্রথম কাব্যে এবং পরেও তিনি সব সময়ই ছিলেন প্রেমের ও রোমান্টিক পথু। যদিও তার পাশর্^বিষয় হিসাবে সমকাল ও তার সংকটগুলিও ছায়া ফেলেছে কখনও কখনও। আমরা এবার পেলাম নতুন শাহেদ রহমানকে, পেলাম ভিন্ন এক কবি রূপে। পূর্ব কাব্যধারার স্পর্শচ্যূত বাস্তবিক ভিন্ন এক কবিস্রষ্টা হয়ে উঠলেন তিনি। আবদুল মান্নান সৈয়দ থেকে দেশ বিদেশের আরও কেউ কেউ (ড. সুমিতা চক্রবর্তী এবং খালেদা এদিব চৌধুরী, ময়ুখ চৌধুরী, আতাহার খান প্রমুখ) তাঁর পূর্বগামী আবির্ভাবকে স্বাগত জানালেও ভাষায়, কবিধর্মের প্রকাশে ও বিষয়ে এখন তিনি একেবারেই যেন নবীন এক যুবা কবি, কবি যুবরাজ। যদিও এখন তাঁর বয়স মোটেও ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ রাজপুত্রের চেয়ে কম নয়। কবির জন্ম ২৬ আগস্ট ১৯৪৬। আলোচ্য কাব্যটি রচিত হয় ২০২০ সালে। তবে বলে রাখা ভাল কবি তাঁর এই সৃষ্টি সম্পর্কে শ্রদ্ধা প্রকাশ ছাড়া আর কোনও বিষয়েই সচেতন নন। বহু ক্ষেত্রেই কবিদের এই রকম অবস্থাই ঘটে। এসব কারণেই বোধ হয় কুবলাই খানের মত কবিতা স্বপ্নেই সৃষ্টি হয়। শাহেদ রহমানের কাব্যটিও যেন এমনি ্এক দেশপ্রেমের ঘোরেরই এক সৃষ্টি। কারণ বঙ্গবন্ধু এবং দেশের প্রতি ভক্তি-ভালবাসা ছাড়া এখাানে তাঁর আর কোনও চিন্তা কাজ করে নি,- না কাব্যের গঠন বা ধরণ অর্থাৎ রূপ নির্মাণের কোনও বিষয় নিয়ে, না অমিল অক্ষরবৃত্তের সাধারণ টানা রচনা ছাড়া সৃষ্টির অন্য কোনও পদ্ধতি নিয়ে, না আর কোনও চিন্তা যেমন প্রতিপক্ষের কোনও চরিত্রের মুখোমুখি করিয়ে বিপরীত কোনও আদর্শ বা দর্শনের দিক থেকে বক্তব্য সংযোজন দ্বারা একটা দ্বান্দ্বিক কাব্য-দর্শন সৃষ্টির ভাবনা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ইত্যাদি। তবে দেশপ্রেমকে এখানে চরিত্র হিসাবে ভাবলে একটা সত্য লাভ করা যায় যে, দেশপ্রেম যেমন নিজেই একটা মহাশক্তি তেমনি তাকে ধারণ করতেও একটা মহা শক্তির প্রয়োজন হয়। এই বিষয়টিকে কাব্যে প্রকাশ করার চিন্তাটাই অনেক বড় ব্যাপার।
এই কাব্যে তিনি কী করেছেন তার বিচারে আসা যেতে পারে। কাব্যে জীবনী বা জীবনীকাব্য রচনা নতুন কিছু নয়। পৌরাণিক চরিত্র বাদ দিলেও ‘হর্ষচরিত’, ‘বুদ্ধচরিত’, এডুইন আরনল্ডের অনুকরণে ‘জগজ্জ্যোতি’, ‘অমিতাভ’ এসব সৃষ্টিতো আমাদের সাহিত্যে বিখ্যাত হয়েই আছে। স্কট প্রমুখের অনুকরণ বা অনুসরণে কিছু ঐতিহাসিক চরিত্রের (সিরাজুদ্দৌলা, ক্লাইভ প্রভৃতি) জীবনীর কাব্যায়নও ঘটেছে, এ সব কাব্যে ঘটেছে দেশপ্রেমেরও নানা চিত্রায়ন। কিন্তু সে সব কাব্যের পাঠক এখন বিরল। শাহেদ রহমানের কাব্যটি সে দিক থেকেও একটি ব্যতিক্রম সৃষ্টি। এখানে এই দেশানুরাগ কবিতার প্রতিও আকর্ষণ ও আসক্তি সৃষ্টি করে, জীবনের অনুভূতিরও বিস্তার ঘটায়। তাঁর ভাষা যা মূলত গদ্য,অক্ষরবৃত্তিক সিঁড়িভাঙ্গা ছন্দ, তাও এ কাব্যকে করেছে বিষযমুখি, করেছে অনবদ্য।
তবু সৃষ্টি সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয় কবির প্রথম স্থিতি হয় তাঁর ভাষায়। ‘কেউ কেউ কবি’ হন, এর পেছনে থাকে এই কবি-ভাষা গড়ে তোলারই সাধনা। প্রকাশ বা যোগাযোগের শক্তিই তো ভাষা। কবি ও গদ্যকারের ভাষায় (কবিতা ও গদ্যের মধ্যে) পার্থক্য আছে, জানি না এই কথাটা এতই কেন স্বতোঃসিদ্ধ যে, কেউ বিশ^াসই করতে চায় না যখন বলা হয় কালের পার্থক্যটাই আসলে কবিতার পার্থক্য, গদ্যেরও। ভাষা তো কালেরই ছায়া। কালেরই অনুবর্তী। এই জন্য সেকালের পয়ার, মধ্যবর্তী আরবীন্দ্রকালের অক্ষরবৃত্তের মাত্রায় হ্রাস-বৃদ্ধি এবং একজন আধুনিক গদ্যকারের সুমিষ্ট রচনায় কোথায় ভেদ তা বলে দেয়ার আগে বুঝি সহসা চোখেও পড়তে চায় না। এই কারণে প্রায় কবিকেই ছন্দ নিয়ে কথাও শুনতে হয় (‘সোনার তরী’র কবিকেও); শেষে রফায় গিয়ে এই দাঁড়ায় যে আধুনিক কবিতায় ছন্দ থাকে না,-প্রয়োজনই বা কী। কিন্তু বিদ্যাসাগর মশাই তো দেখিয়েই গেছেন ছন্দ গদ্যকেও পরিচিত করে তোলে । জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং শাহেদ রহমানের এই পুনর্সৃষ্টিটি পড়তে গেলে এই সংশয়ের অবসান ঘটে। এ কথাতো অনস্বীকার্য যে, গদ্য পূর্বাপর কোনও নির্দিষ্ট ভাষারূপ নয়। এবং তার আগে ‘জীবন-স্মৃতি’, ‘গল্পগুচ্ছ’ ও ‘লিপিকা’ই কেবল নয়, ‘বীরবলের হালখাতা’ বা ফেমিনিস্টিক গদ্যকার বুদ্ধদেব বসু কিংবা রসজ্ঞ ও যৌক্তিকতার বাঁধনযুক্ত গদ্যকার আনিসুজ্জামান প্রমুখের সৃষ্টিতেও দেখেছি, তার সফলতার কেন্দ্রে রয়েছে গদ্যের এক নিজস্ব বাণীরূপ এবং তার কাব্যগত ও গীতিময়তার ব্যঞ্জনাও। সেখানে গদ্যের বাধা নেই সৌন্দর্যের বা কবিতার অন্দরে প্রবেশের। তার আপন গঠনই তাকে ধরিয়ে দেয় তার গন্তব্য। তাই কবিতার ভাষা আলাদা এই রকম ভাবনার ভিত্তি আসলেই যে কিছুটা দুর্বল তা ভাবাই যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথের চোরা স্বীকারোক্তিও কি খুঁজলে পাওয়া যাবে না তাতে ? আর গদ্য পদ্য দুই-ই তো ভাষা, দুয়ের উদ্দেশ্যও এক;- যোগাযোগ স্থাপন। তার পেছনে থাকে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সূতো। বয়ন বা সূচিশিল্পের মূলে যেমন থাকে মোটা-চিকন কাউন্টের ও জাপানী বা বিদেশী রীলের নানান সূতা এবং তসর, জরি, ডিএমসি, রেশমি বা উলেন ইত্যাদির আবশ্যকীয় নির্বাচন এবং থাকে তার সাথে মেলানো ডিজাইনেরও ধরণ।
আলোচ্য কবি শাহেদ রহমানের সৃষ্টি প্রসঙ্গে কথাটা জরুরী। সম্প্রতিকালের কবিরা কি আধুনিক না তাঁরা ‘সাম্প্রতিক’ নাকি ‘উত্তরাধুনিক’ এই নিয়ে বিতন্ডার তো শেষ নেই। সেই ধারাতেই দেখা য়ায় সেকালের কিছু কিছু কবিতার ঢং আবার ফিরে আসছে, যেমন- লোকসাহিত্যের ‘তেপাটি’, ‘ছড়া’ প্রভৃতি মাধ্যমে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা, ‘শবপোড়ামরাদাহ’-তত্ত্ব অস্বীকার করে হেন, যেন, সম, শুধানো, প্রভৃতি তৌলন-অব্যয় ও ক্রিয়াদির পুনর্ব্যবহার বা পুনরুদ্ধার, সাধু-চলিতের মিশেলসহ উপভাষার ননা মিশ্রণ, বাক্য-এককে অতি বিশেষণ-ক্রিয়া বিশেষণ-অনুসর্গ ও অন্যান্য অনুপদ প্রভৃতি পদগুচ্ছের পুনঃ পুনঃ ও বেহারা আরোপন, ইত্যাদি এখন খুবই সাধারণ। অন্যদিকে গদ্য ও কবিতার সীমানাকে নিরপেক্ষ করে তোলাও এখন একটি নম্র্ বা আদর্শ হয়ে উঠেছে। শাহেদ রহমানের গদ্য বিচার ও অক্ষরবৃত্তেরই এক রূপ ধরে তাতে কোনও নির্দিষ্ট কাব্যভাষার সৃষ্টি ঘটলো কিনা সে দিকে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। সাহিত্যের সংজ্ঞায় ‘কালের দৃষ্টান্ত তার সাহিত্য’ একথা ধরে নিয়েই আমরা দেখবো কবি শাহেদের ‘স্মৃতি নও…’ কাব্যের ভাঙ্গা গদ্য ও ভাঙ্গা-অক্ষরবৃত্ত একই মানদ-ের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর সামান্য উদাহরণ- ‘নির্বাচন অতি কাছে।/ শহীদ সাহেব বললেন এক বিবৃতিতে / ‘মুসলিম লীগ নয়টির বেশি সিট পেলে/ আমি আশ্চর্য হব।’/ তিনশত আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ/ মাত্র নয়টা আসন পেয়েছিল।/কী হিসাব, কী আশ্চর্য ভবিষ্যৎ বাণী!’ (‘মুসলিম লীগ পরাজিত’: পৃ. ৬৮)
অথবা,- ‘হৃদয়ে ধারণ করে সূর্যের সাহস আমি পথ চলি/ ভাবি মনে মনে,/মেঘদের আত্মত্যাগ বৃষ্টি হয়ে মর্ত্যে ঝরে/ জমিনে ফলায় শস্যফুল-/ একথাটি বুকে ধরে ভাবতাম মনে মনে রাতদিন/ একদিন আমারই ত্যাগে/ বাংলায় উড়বে সুনিশ্চিত (‘জোনাকিরা আমাকে পাহাড়া দেয়: তাঁর স্বগতোক্তি’: পৃ. ৮)
কিংবা যেমন- ‘ভাইয়েরা আমার’ যদি শুনি এই সম্ভাষণ একবার/ আমরা সতেরো কোটি নরনারী/হয়ে যাই/ সতেরো কোটি মিসাইল শত-শতবার। (‘বঙ্গবন্ধু’: পৃ. ৯৫)
শব্দনির্বাচনে, ডিকশন রচনে এবং পদান্বয় গঠনে বয়ান-রূপগুলি অবশ্যই নির্ভার, সুতরাং গদ্যেরই আদর্শ বটে। সনাতন ভঙ্গিতে বললে,এর আকাঙ্খা-আসত্তি-যোগ্যতাগুণ বিদ্যমান এবং অর্থমাত্রায়ও ব্যঞ্জনাযুক্ত অর্থাৎ যথাব্যক্ত ও গুণান্বিত।
এ বিষয়ে আর কথা না বাড়িয়ে এখানে এবার বলা যাক এই ‘মিসাইল’ হয়ে যাওয়ার প্রেরণার কথা। শাহেদ রহমানকে অন্য কাব্যে যেমন দেখি যে সেখানে কোনও কোনও মহাজন তাঁর আদর্শস্বরূপ হয়ে তাঁর প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন, যেমন গৌতম বুদ্ধ, খৃস্ট, গান্ধী; তাঁদের স্থানে বসিয়েই তদরূপ ভক্তি ও ভালবাসায় আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকেও তিনি ঠাঁই দিয়েছেন তাঁর অন্তরে, আঁকতে চেয়েছেন ভালবাসার সেই মূর্ত্তিটি তাঁর হৃদয়ের মন্দিরে। তাই মাত্র কিছুকাল আগে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর ‘আত্মকথা’টি পেয়ে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন আরও অন্তর্গত ও নিবিষ্টভাবে নেতাকে নিবিষ্টভাবে জানার। পাঠমুগ্ধ কবি তাকেই করলেন তিনি লক্ষ্য;- মাইকেল যেমন তাঁর আদর্শ করেছিলেন মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-কে। তবে আগেই বলেছি, কোনও পূর্ব-পরিকল্পনা ছিল না এতে কবি শাহেদের। তিনি লিখতে লিখতেই এগিয়ে এসেছেন যে ভাবে এগুনোটা মনের তাগিদ থেকে যথার্থ অনুভব মনে করেছেন তিনি। তবে মূল গ্রন্থেই ছিল সব মাল মশলা এবং এক নীরব মহাকবির সৃষ্টি-বীজ। এই ‘আত্মকথা’ (অসমাপ্ত) পাঠান্তে শাহেদ রহমান যেমন বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেমকে অন্তরের গভীরে উপলব্ধি করে আপ্লুত হন, তেমনি মাতৃভূমির স্বাধীনতা আনয়নে এবং লালসবুজ পতাকার মর্যাদা বৃদ্ধি ও তাকে সমৃদ্ধতর করার ক্ষেত্রে এই মহান নেতার অবদানের মূল্যটি পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম করে এক অপার শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সেই গ্রন্থেরই অনুরাগে-অনুসরণে এই চরিতকাব্য বা জীবনীকাব্যটি বিরচনেও উদ্বুদ্ধ হন তিনি । বনফুলের ‘পাঠকের মৃত্যু’-তত্ত্বে যাই বলুক, এই সৃষ্টিকে আমি বলতে চাই মহাকাব্যোপম রচনা, কেননা এ কাব্যে আস্বর্গ-মর্ত্ত প্রকৃতির বিস্তারের মাঝে এক মহান ব্যক্তিত্বের সত্তার সংরাগ সৃষ্টি বা সন্ধান ও তার মাহাত্ম প্রকাশ যেমন তাঁর লক্ষ্য, তেমনি তাঁর মহাজনী-জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম, মায়া তথা মানবিকতা ও কল্যাণ এবং দেশানুরাগ লক্ষ্য করা ও তার মধ্য দিয়ে এই মহাসত্তার রজো ও সত্ত্বগুণ আবিষ্কার করাও তাঁর অপর লক্ষ্য। কাব্যটি এভাবেই আপনিই মূর্ত হয়েছে প্রয়োজনীয় কাঠামো গ্রহণ করে, সে কথাও নির্দ্বিধায়ই বলা যায়। আকাশ-পাতালের কথাঙ্কুর নিয়ে যেমন দান্তে তাঁর ত্রিপার্বিক ডিভাইন কমেডি লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবন-কথাও তেমনি তাঁর জন্মকথা থেকে মৃত্যুর বর্ণনা পর্যন্ত নানা গুরুত্পূর্ণ ঘটনার (সংক্ষিপ্ত) বিবরণকে ধারণ করে গড়ে উঠেছে একটি ত্রিধারার কাহিনীরূপ এই কাব্যে। এতে যেমন আছে তাঁর আকৈশোর সংগ্রামী জীবনের তেজবহ্নির চিত্র, তেমনি আছে প্রথম যৌবনের গৌরবী সমুত্থান ও পরিশেষে বজ্রঘোষণা ও আপন মহিমার বীরোচিত পরিণাম।
যদিও মহাজীবনের একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা এটি, এত তবু কবির নির্বাচনটি প্রাজ্ঞ। তাই এতে উঠে এসেছে জনকের জীবনাঙ্গিনার কয়েকটি নয়নচারা, কিছু নীল পারিজাত আর রজনীগন্ধা ছাড়াও বঙ্গ-নন্দিত বেল মালতি চাঁপা ও গোলাপকুসুম নিয়ে গাঁথা সেই মহামানবের ‘আত্মজীবনী’র সেই সব অমূল্য অংশ যা নিয়ে গেঁেথছেন কবি তাঁর এই অর্ঘ্যমালা। আপন গ্রাম আর কলকাতার পাকিস্তান-আন্দোলন ও পরে মি. জিন্নাহর বক্তৃতার প্রতিক্রিয়ায় ‘নো-নো’ বলা থেকে শুরু করে ঢাকার যাবতীয় কর্মকা- তথা রোজগার্ডেন-কাগমারি-আগরতলা মামলার ৬দফা ও পরে ১ দফার বাংলা-আন্দোলন পর্যন্ত দুই বিপরীত সংসপ্তক সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রকাশ-ঐশ্বর্য নিয়ে এভাবেই ফুটে উঠেছে তাঁর এ কাব্যের ৬২টি কথন-স্তবকধারা। মাত্র ৫৫ বছরের এই মহাজনের অসামান্য এক হাজার বছরের ইতিহাস-বিরল কীর্ত্তিরাজির বাণীবদ্ধরূপ এই কাব্য;- নিসর্গের আনন্দ-উচ্ছ্রবণে যার আরম্ভ (‘একশ বছর আগে তাঁর জন্মদিনে’) , আকাশ-পাতালে মাতৃ আর্তনাদের অন্ত্যকথাবুননে যার ইতি;- যেন অষ্টাধিক সর্গান্তে লঙ্কার সপ্তদিবানিশি সবিষাদ মহাক্রন্দন! (এই হা-ক্রন্দনের বর্ণনাই যেন গড়েছে এর তৃতীয় অংক বা ক্যানটো; তাই তাকে হয়তো ডিভাইন ট্রাজেডি বলাও যুক্তিযুক্ত হতে পারে।)
তবু বলবো কাব্যটি স্মৃতি ও শ্রদ্ধার । তবে উনিশ শতকীয় ‘বন্ধু-বিয়োগ’ বা রাবীন্দ্রিক ‘স্মরণ’-কাব্যধারার সৃষ্টি নয়, এবং তার নামকরণও হয় নি বিষ্ণুদে’র মত রবীন্দ্রস্মৃতি-প্লাবনে আঁকা ‘কোমল গান্ধার’ –এর মত স্বরগ্রামের তৃতীয় মাত্রার কিছু একটা; বরং হৃদয়ের বিভাসে যেন তা বেজে উঠেছে এক অভিন্ন কিন্তু সম্বৃত সুরের, তানের অপূর্ব নামায়নে। বঙ্গবন্ধুর স্মরণ-সৃষ্টি এই (প্রায়-)মহাকাব্যটির শিরোনাম- ‘স্মৃতি নও, তুমি নিত্য দীপ্যমান’। সর্গে বা অষ্টক-ষষ্টকে বিভক্ত রচনা নয়, নয় বা প্রচলিত অমিত্রপয়ারের টানা ছন্দে কিংবা বিদেশি ওধসনরপ ঢ়বহঃধসবঃবৎ বা কোনও যবৎড়রপ-কাব্যানুগ ছন্দেও নয়,তাঁর এই মহা সৃষ্টির ছান্দস প্রকৃতি, যা তাঁর তাঁর একান্ত নিজস্ব; যেন কোনও ‘পুনশ্চ’-কাব্যের পুনশ্চরণ; এবং তখনই এই কাব্যের বিষয় নির্বাচন ও বিরচন-কৌশল আমাদের বলে দেয় এই কবি আমাদের সৃজন-চত্বরে অখ্যাত হলেও মোটেও বিস্মৃতিযোগ্য নন তিনি । তাঁর এই মহৎসৃজন বাংলা কাব্যজগতে নিশ্চিতই এক নতুন কিন্তু সপ্রতিভ সংযোজন । সর্গহীন ‘মহাকাব্য’ রচয়িতা এই কবিকে কেন মহাকবি বলতে চাই হয়তো তা তর্কের বিষয়। সে বিচার পাঠকের হাতেই থাক। তার এ প্রসঙ্গে বলাই যায় যে একজন সত্যিকারের কবি আজীবন কবিতাকেই খোঁজে তাঁর সাধনার মধ্য দিয়ে। শাহেদ রহমান সেই অন্বেষাতেই ব্যাপ্ত। কারণ এক ‘অন্তর্গত বোধে’ তিনি জেনে নিয়েছেন, কবিতার শক্তি মৃত্যুর অধিক। কবিতা জীবনে আনে প্রলয়, প্রলয়ে জীবন। জীবনের মূল্যবান ভাবনারাশিকে সে রূপ দেয়, গেঁথে তোলে তার অন্তর্গত সৃষ্টিতে। এজন্য বলা হয়, কবিতা জীবনের শুধু কল্পসূত্রই নয়, যাবৎ শ্রেষ্ঠ ভাবনা-বোনার সোনার কাঁটাও; কিংবা- মড়ষফবহ ঃযৎবধফ ড়ভ যঁসধহ ঃযড়ঁমযঃ। প্রত্যেক কবির রচনাপ্রণালীী হয় ভিন্ন, আবার তা ভিন্নতর হয় তার ¯্রষ্টাজীবনের নানা পর্বেও যখন ‘আপনারে সে চায় আপনি করিতে ছেদন;’ অর্থাৎ অতিক্রম’। যেমন সোনারতরী, গীতাঞ্জলি প্রভৃতির পরে বলাকা-পুনশ্চ পর্বে পাই স্বতন্ত্র এক কবিগুরুকে। শাহেদ রহমানের পেছনের কাব্যগুলিতে প্রেমের জ্যোছনায় ধারা¯œান অব্যাহত থাকলেও প্রথম কাব্যটিতেই আত্ম ঘোষণায় বলেছিলেন, কবিতা কেবল নিরেট প্রণয়ের ঘাত-প্রতিঘাতেরই নিঃশেষিত অবয়ব নয়। তাঁর ভাষায়-
‘আমি দ্বিধাগ্রস্ত কোনো কল্পনারসিক নই
অলীক দিগন্তে করে যে শুধুই বিচরণ
বুনে কুয়াশার জাল, চারদিকে একা একা।’ (যদি তুমি / তিমিরে প্রর্থিত তারার নূপুর)

তাঁর কবিসত্তার নব জাগরণে তাই বিস্মিত হতে হয় না। তবে বলেছি, তিনি অভাবিতপূর্ব সৃষ্টির কবিপ্রজন্মেরই অন্যতম প্রতিভূ, যার পংক্তিসৃষ্টি নিরন্তর তাঁকে সৃজনান্তর মহিমা এনে দেয়। এই ক্ষুদ্র সীমায় তাঁর আপাত শেষ তথা আলোচ্য কাব্যের কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথামাত্র এখানে উল্লেখ করে কথাটা বোঝানো যেতে পারে ।-
জাতির জনকের জন্মদিনের বর্ণনা দিয়ে কাব্যের শুরুটা এমন-

‘ মধুমতি নদীতীরে, টুঙ্গিপাড়া গ্রামখানি/ সেদিন কেমন ছিল ? …
*
নদীর গহীন বুকে…/সেদিন কাতলা, রুই, সরপুঁটি, চিংড়ি আত্মহারা কিশোরের মতো/উত্তরে-দক্ষিণে, পূর্বে ও পশ্চিমে
শুরু করেছিল ছুটাছুটি,/জলতরঙ্গের সুর ডেকে এনেছিল প্রাণ…

মাঠের কৃষক, ঘর্মাক্ত শ্রমিক…/ রবিশস্য, সবুজ কচুরি বন
মুহূর্তে দাঁড়িয়ে উঠে বলেছিল/ মেঘ ও সূর্যকে
‘এসো, এসো,/ আমরা সবাই একসুরে বলি
‘তোমাকে স্বাগত খোকা,/ অতন্দ্র সূর্যের বুকে রেখে বুক
সোনার বাংলাকে একদিন তুমি করবে স্বাধীন।’…
তোমরা সবাই আনন্দ করো-/ ‘এসেছে, এসেছে ঐ মহামানব,
আছে তাঁর হাতে তোমাদের মুক্তির সনদ।’
(একশ বছর আগে তাঁর জন্মদিনে: পৃ. ২ ও ৩)

এখানে শিশুর বন্দনা এসেছে অন্যভাবে,- হৃদয়ের উচ্ছ্বাসের স্বতো;প্রকাশ ঢেলে,- প্রকৃতির এক বিভাসিত বিভান্বিত প্রাণ-মন লয়ে ! প্রচলিত সাহিত্যে মহাপুরুষদের জন্ম দেখানো হয় অতিপ্রাকৃত ঘটনার বর্ণনার মধ্য দিয়ে। যাই হোক,এরপর প্রত্যেক কবিতায় ‘খোকা’র পৃথক পৃথক ঘটনার এতিহাসিক নানা বিবরণ ও প্রত্যেক ঘটনান্তে ‘খোকা’র সংশ্লিষ্ট উক্তি। সূত্রগুলি মুখ্যত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকেই উদ্ধৃত। ছন্দটি বলেছি বরাবরই রবীন্দ্র-বর্ণিত ‘সিঁড়িভাঙ্গা ছন্দ’,-অনির্দিষ্ট পর্বে বিভক্ত এবং অবশ্যই অক্ষরবৃত্তের আবশ্যিক অবস্থানভিাত্তক বদ্ধাক্ষরের মাত্রার বৈচিত্র্যে সৃষ্ট। ছন্দের এই নির্বাচন কাব্যকেও বিশিষ্ট করেছে। তবে ঘটনার বর্ণনার মনোটোনকে ভেঙ্গেছে তার কিছু রিলিফ তথা ধুয়া জাতীয় আবেগাত্মক প্রকাশ। পূর্বে উদ্ধৃত ‘বঙ্গবন্ধু’ কবিতাটি তার একটি উদাহরণ। অথবা এই কাব্যের সর্বাবেগ যেখানে কেন্দ্রীভূত সেই ‘কে বলবে বলো’ শিরোনামের অসামান্য সৃষ্টিটি। –

‘সদ্যোজাত শিশুর কপালে/ জননীর চুম্বনের নাম, বলো, কে বলবে বল্ ো।
কৃতিমান সন্তান ফিরছে ঘরে/ এই দৃশ্য দেখে মায়ের দুচোখে/ বৃষ্টির ফোঁঠার মতো/
জমলো চোখের জল- সে জলের নাম, বলো-/ কে বলবে বলো!…’
(পৃ. ৯৩)

গ্রন্থের শেষ কবিতাটি কেবল মাতৃ-হাহাকারই নয়, বাঙালিমাত্রেরই চিরদিনের শোক। যেন মেঘনাদবধ কাব্যের অন্ত্যচরণগুলিরই পুনরুচ্চারণ। কবি শাহেদ রহমান এই কাব্যে জাতির জনক-হননের স্মরণীয় পংক্তিমালা রচনার মধ্য দিয়ে বাঙালিমত্রেরই ধন্যবাদার্হ হলেন।

—————————–
লেখক : ভাষাবিজ্ঞানী, কবি ও গীতিকার

Please follow and like us: