লিতভিনেনকোর পরিণতি খাসোগির!

লিতভিনেনকোর পরিণতি খাসোগির!

প্রত্যাশা ডেস্ক : সৌদি সাংবাদিক জামাল খাসোগির নামের আগে ‘নিখোঁজ’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। হত্যার অভিযোগ বলারও প্রয়োজন নেই। কারণ যে পক্ষের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছিল, সেই পক্ষ ভিন্ন সংস্করণে খাসোগির মৃত্যুর খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
এখন থেকে খাসোগি আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত। নানা ধানাই–পানাই শেষে সৌদি আরব স্বীকার করেছে, তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেট ভবনের ভেতরেই খাসোগির মৃত্যু হয়েছে। তবে তাদের দাবি, অন্যরা যেমনটি বলছে মূল ঘটনাটি ঠিক তা নয়। এতে কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না, ‘হাতাহাতির একপর্যায়ে’ খাসোগির মৃত্যু হয়েছে।
খাসোগি হত্যার ঘটনা এ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা বললে ভুল বলা হবে না। এই হত্যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ ফর্মুলার রূপ, বন্ধু না থাকলে স্বার্থ যায়—তাই মান রাখি না কুল রাখি এমন উভয়সংকটের চিত্র এনে হাজির করেছে। কেন খাসোগিকে হত্যার প্রয়োজন হলো, এ নিয়েও হয়েছে চুলচেরা বিশে¬ষণ।
একসময়ের সৌদি রাজপরিবারের সঙ্গে সখ্য থাকা ব্যক্তি কেন রোষানলে পড়লেন?
সৌদির শত্রু মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। তিনি রাজপরিবারের অনেক গোপন খবর জানতেন, তাই দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যাওয়ার পর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরিয়ে আনা যখন সম্ভব হচ্ছিল না, তখন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। বলা হচ্ছে, যুবরাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে পড়ায় তাঁকে হত্যা করতে হলো।
এই খাসোগিই এমন হত্যার প্রথম শিকার নন। খাসোগির মতো বিশ্বব্যাপী আলোড়ন না তুললেও শাসকদের নিরাপত্তা হুমকি হয়ে পড়ায় দেশ ছেড়ে গিয়েও বাঁচতে পারেননি অনেকে। তাঁদের রাষ্ট্রীয় ছত্রচ্ছায়ায় হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের একজন ৪৩ বছর বয়সী আলেকসান্দর লিতভিনেনকো। রাশিয়ার সাবেক চর। ২০০৬ সালের নভেম্বরে চায়ের সঙ্গে অতি তেজস্ক্রিয় বিষাক্ত পদার্থ পোলোনিয়াম-২১০ মিশিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। খাসোগির ঘটনায় তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। লিতভিনেনকোর ঘটনায় টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার মধ্যে। বলা হয়ে থাকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই হত্যা অনুমোদন করেছিলেন।
আলেকসান্দর লিতভিনেনকো ১৯৮৮ সালে রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবিতে যোগ দেন। কেজিবি ১৯৯০ সালে ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিসে (এফএসবি) পরিণত হলে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে পদোন্নতি পান। তবে ক্রেমলিনের (রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন) কড়া সমালোচক হয়ে ওঠায় তাঁকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ব্রিটেনে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
লিতভিনেনকো রাশিয়ার মাফিয়া চক্রের সঙ্গে স্পেনের সম্পৃক্ততার তদন্ত করছিলেন। এ লক্ষ্যে সাবেক এজেন্ট আন্দ্রেই লুগোভয়ের সঙ্গে তিনি স্পেনে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। লুগোভয় তাঁর হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তি।
২০০৬ সালের ১ নভেম্বর লন্ডনের কেন্দ্রস্থলের হোটেলে রাশিয়ার আরেক সাবেক চর দিমিত্রি কভতুন ও লুগোভয়ের সঙ্গে চা পান করছিলেন লিতভিনেনকো। ওই সময় লিতভিনেনকো হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সারা রাত বমি করেন। তিন দিন পর তাঁকে উত্তর লন্ডনের বার্নেট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। সেখানে ১১ নভেম্বর বিবিসির রাশিয়া সার্ভিসের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ‘ভয়াবহ বিষ প্রয়োগ করা’ হয়েছে এবং তাঁর অবস্থা ভালো নয়।
ওই সাক্ষাৎকারে পুতিন শাসনের ঘোরবিরোধী লিতভিনেনকো বলেন, তিনি এর আগের মাসে মস্কোতে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে রাশিয়ার সাংবাদিক আনা পলিতকোভস্কায়া খুনের ঘটনা তদন্ত করছিলেন। শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে ১৭ নভেম্বর তাঁকে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এর ছয় দিন পর স্ত্রী, বাবা আর ছেলের উপস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর স্ত্রী এ ঘটনার জন্য পুতিনকে দায়ী করেন। তবে এ ঘটনায় কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করে রাশিয়া।
১৯৯৮ সালে রাশিয়ার টাইকুন বরিস বেরেজোভস্কি হত্যা পরিকল্পনা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন লিতভিনেনকো। তিনি নয় মাস বন্দী ছিলেন। পরে ২০১৩ সালে ওই ব্যবসায়ীকে তাঁর বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি ‘বে¬ায়িং আপ রাশিয়া: টেরর ফ্রম উইদিন’ নামে একটি বই লেখেন। বইয়ে মস্কোর অ্যাপার্টমেন্টে ব¬কসহ ১৯৯৯ সালে দুটি শহরে বোমা হামলার ঘটনায় এফএসবি এজেন্টদের জড়িত থাকার তথ্য জানান তিনি। অথচ ওই বোমা হামলার জন্য চেচেন স্বাধীনতা আন্দোলনকারীদের দোষারোপ করা হয়েছিল। চেচনিয়ায় দ্বিতীয়বার আক্রমণের পরিকল্পনা হিসেবে রাশিয়া ওই হামলা চালায়। লিতভিনেনকো ২০০০ সালে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে যান। মৃত্যুর বছর ২০০৬ সালে তাঁকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।
মাত্র গত বছর এশিয়াতেই ঘটল এমন এক হত্যার ঘটনা। গত বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সৎভাই কিম জং-নামকে বিষাক্ত রাসায়নিক (ভিএক্স নার্ভ এজেন্ট) প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া অভিযোগ করে, প্রতিবেশী দেশ উত্তর কোরিয়ার সরকারই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এই রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিতে সোচ্চার হয় যুক্তরাষ্ট্র। যদিও দুই কোরিয়ার সম্পর্কে এখন আর সেই বৈরিতা নেই। দুই দেশের শীর্ষ দুই নেতা একে অন্যের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সম্পর্কের সুবাতাস বইয়ে দেওয়া শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রও এখন আর তত উচ্চবাচ্য করে না এ নিয়ে। এর কয়েক বছর আগে আরেক ঘটনায় গলা তুলেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যা পরে আইনেও রূপ নেয়। সেই ঘটনার বলি হয় এক রুশ আইনজীবী সের্গেই মাগনিতস্কি। ক্রেমলিনের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের বড় অঙ্কের প্রায় ২৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার বেশি) কর প্রতারণার ঘটনাটি তদন্তে মার্কিন বিনিয়োগকারী উইলিয়াম ব্রোডার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মাগনিতস্কিকে। রাশিয়া কর্তৃপক্ষ ২০০৮ সালে মাগনিতস্কিকে গ্রেপ্তার করে। মাগনিতস্কিকে পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় প্রচণ্ড মারধর করা হয়। মুক্তি দেওয়ার কয়েক দিন আগে ২০০৯ সালে কারাগারে তাঁর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মাগনিতস্কি দায়বদ্ধতা আইন করে যুক্তরাষ্ট্র। আইনটিতে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা স্বাক্ষর করেন। মাগনিতস্কি আইনের মাধ্যমে ১৮ জন রুশ কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালে আইনটিতে সরকারকে বিশ্বের যেকোনো স্থানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তির সম্পদ বাজেয়াপ্ত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা মার্কিন ভিসা নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। খাসোগিকে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর এবার ২২ জন মার্কিন সিনেটর এক চিঠিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে এই মাগনিতস্কি আইন প্রয়োগের আহ্বান জানান। তবে শত্রু–মিত্র হিসাব করে পা ফেলা যুক্তরাষ্ট্র এবার সুর নরম করেই কথা বলছে। জামাতা জারেদ কুশনারের সুবাদে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদের সঙ্গে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক এখন। বন্ধুত্বে সবকিছুই ছাড় দেওয়া যায়! তাই সৌদির মতো এত বড় অস্ত্র–বাজার ‘বিচারের নামে’ হাতছাড়া করতে চান না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র বিক্রি না করলে সৌদি চলে যাবে রাশিয়া, চীনের দিকে। কেন তবে বিচার বিচার বলে পকেট ফাঁকা করা! আর তাই তো খাসোগির মৃত্যু নিয়ে সৌদির লেজেগোবরে মার্কা প্রতিবেদন দেখে চটজলদি প্রতিক্রিয়া এল তাঁর কাছ থেকেই। শীর্ষ কর্মকর্তাদের বহিষ্কার করা ও ১৮ জন সৌদি নাগরিককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দেশটির প্রশংসা করেছেন ট্রাম্প। তবে খাসোগির মৃত্যুর ঘটনায় ‘গভীর সমবেদনা’ জানাতে ভুল করেননি।
হত্যার দায়মুক্তির বিশ্বে ‘খাসোগি ফর্মুলা’ কোথায়, কখন আবার প্রয়োগ হবে কে জানে!

Please follow and like us:
0