মঙ্গল. জুন ১৮, ২০১৯

লালন ও আরশি নগরের পরশি

লালন ও আরশি নগরের পরশি

Last Updated on

সেজান মাহমুদ : গত ১৭ অক্টোবর ছিল বাংলার এক ক্ষণজন্মা কবি ও দার্শনিক লালন সাঁই-এর মৃত্যুদিন। লালনের জন্মকাল নিয়ে অনেক তর্ক, বিতর্ক হয়েছে, তাঁর জীবৎকাল নিয়েও প্রচুর বাদ-বিসম্বাদ থাকলেও মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া হয় যে তিনি জন্মেছিলেন ১৭৭৪ সালে, আর ১১৭ বছরের সুদীর্ঘ জীবনশেষে মৃত্যুবরণ করেন ১৮৯০ সালে। লালনের ভাব ও দর্শনের প্রভাব নিয়ে বোধকরি কেউ দ্বিমত করবেন না যে এক অনন্য, উদার, বিনীত দর্শন নিয়ে বাংলা গানকে বিশ্বজনীন আবেদন দিয়েছেন লানন। তাঁর দৈন্য গান যেমন জীবের তুচ্ছতা, দীনতা, অজ্ঞতা প্রকাশ বা আতœসমালোচনার মধ্য দিয়ে এক মহাপরাক্রমশালী সত্ত্বার কাছে আতœসমর্পনের পথ বাতলে দেয়, তেমনি সেই পরম অধরা কে বিমূর্ত রূপ থেকে মূর্ত করে আনে মানুষের মধ্যে, মানুষের কল্যাণে। লালনের ভাবদর্শনের প্রভাব যে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে পরবর্তী সকল বাউল কবিকুলের ওপরে পড়েছে তা গবেষণা করে বের করার প্রয়োজন পড়ে না। যেখানে লালনের এই যুগান্তকারী দর্শনের বিশ্বজনীন মূল্যায়ন ও বিস্তার প্রয়োজন সেখানে কুশিক্ষিত মোল্লারা লালনচর্চা কেন্দ্র (লালন একাডেমী), বা আখড়াগুলোকে ধোঁকাবাজ, বেশরিয়তি, বেদাতি আখ্যা দিয়ে ‘বাউল ধ্বংস ফতোয়া’ পুস্তিকা রচনা করে বিলিবন্টন করেছে। বিশিষ্ট বাউল গবেষক ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর আবুল আহসান চৌধুরী জানান ১৯৮৪ সালে লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ফজলুল হক মিয়া লালনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজার প্রাঙ্গণে ইসলামী সভা ও বেশরিয়তি পথ থেকে ফিরে আসতে বাউলদের জন্যে তওবা করার অনুষ্ঠান আয়োজন করে (সূত্র : লালনকে কে বাঁচাবে, মফিদুল হক)। এই ক্ষুদ্র পরিসরের লেখায় লালনের দর্শনের একটি দিককে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট থেকে আলোচনা করার প্রয়াস নেবো। এক্ষেত্রে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান আমার তুলনার মানদ-। এই মানদ- কেন তা নিয়ে সামান্য একটু ভণিতা করে নিই।
ফরাসি বিপ্লবের আগে ও পর থেকে দেকার্ত, ভলতেয়ার, রুশো, কোমত, কোজেভ, সার্ত্র, ব্যুভয়া যেভাবে বিশ্বময় দার্শনিক আধিপত্য নিয়ে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানকে সামনে এনেছিলেন তা কুড়ি ও একুশ শতকের লাকাঁ, বার্থ, আলথুসার, ফুকো, দেরিদা, দেলুজ বা লিওতারদের পক্ষে সম্ভব হয় নি। তার কারণ বহুবিধ। ইউরোপীয় রাজনৈতিক আধিপত্য খর্ব হওয়া বোধকরি তার একটি কারণ। অন্যদিকে দর্শনের ক্ষেত্রেও বহুমাত্রিকতা কোন একক ব্যক্তিত্বের আধিপত্যের পথে বাধা। তারপরও সামগ্রিকভাবে ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান বিশ্বময় নিজস্বতায় জ্বলজ্বলে ও প্রখর। গত ও বর্তমান শতাব্দীর তাত্ত্বিক বা দার্শনিকদের মধ্যে জাক লাকাঁ সবচেয়ে ক্ষেপাটে, স্বতন্ত্র ও অনিবার্য। পেশায় চিকিৎসাবিজ্ঞানী-মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞ হয়ে সাইকোঅ্যানালিসিসের এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছেন; সেই সংগে সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য, দর্শন, মানব-সত্ত্বা ও শিল্প বিশ্লেষণের নতুন ধারা। পৃথিবীতে নানারকমের সাইকোঅ্যানালিসিসের ধারা আছে, যেমন এনালিটিক্যাল, রিলেশনাল, ইন্টারপারসনাল, ও আধুনিক সাইকোআ্যানালিসিস। তিনি যে ধারাটি সৃষ্টি করেছেন তা একেবারেই আলাদা। তাঁর এই ধারা ব্যক্তিসত্ত্বাকে বিভাজিত করে মন বা চেতনার কেন্দ্রবিন্দুকে শুধু খোলাই করে দেয় না; উপরন্তু মানব জীবন, তার ভাষা আর অপূর্ণ ইচ্ছার কুয়াশাচ্ছন্ন ঘেরাটোপকে সামনে এনে হাজির করেন বহুরকমের তাত্ত্বিক অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে।
জাক লাকাঁর জন্ম ১৯১৫, মৃত্যু ১৯৮১ সালে। অর্থাৎ তিনি সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের ব্যাপক প্রভাব দেখেছেন, দেখেছেন মার্কসীয় তাত্ত্বিকদের দাপট ও পলায়নপরতা। সেই সংগে বিশ্বময় ভাষাতাত্ত্বিকদের নতুনতর আন্দোলন যা তাঁর পদ্ধতিতে প্রভাব রেখেছে ব্যাপকভাবে। তাই জাক লাকাঁকে এতো দূর্বোধ্য মনে হয়। জাক লাকাঁকে বুঝতে হলে তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি খোলাসা করা দরকার। এখানে সংক্ষেপে সেটাই চেষ্টা করবো। প্রচলিত বাংলা ভাষায় সাইকোআ্যানালিসিস এর অর্থ মনোসমীক্ষণ, মনোবিকলন, মনোবিশ্লেষণ, ও মতিবিভাজন (আরও থাকতে পারে) আছে। এখানে বলে নেয়া ভালো যে ভাষার বিবর্তন, নতুন ভাষা সৃষ্টি ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তাকে আমলে ধরেই এই আলোচনা করছি। জাক লাকাঁ তার পদ্ধতির ক্ষেত্রে বলেন, ‘সাইকো-আ্যানালিসিসের মাধ্যমে সত্ত্বার যে বিভাজন উন্মোচিত হয় তা আতœতা-মন বা চৈতন্য বা মতির কেন্দ্রবিন্দু, এবং বান্দা বা কর্তার সচেতন স্বীকারোক্তি, তার আচরণ ও সংস্কৃতি এর মধ্য ঘটে থাকে’। এখানে দেখা যায় যে লাকাঁর মতে বিভাজন ঘটছে সত্ত্বার, মন বা ‘মতি’র নয়। তা ছাড়া সাইকোঅ্যানালিসিসকে ‘মতিবিভাজন’ বললে (বিশেষ করে লাকাঁনিয়ান পদ্ধতিতে) তা অসম্পূর্ণ হয়। সেখানে বাদ পড়ে যায় আতœতা, বান্দা বা কর্তা, আচরণ এবং সংস্কৃতি। আমরা যদি এ বিষয়গুলোকে ধারণ করার মতো জুতসই শব্দ না পাই, প্রয়োজনে সাইকোঅ্যানালিসিস-ই বলি, তাতে তো কোন ক্ষতি নেই। ‘সাইকি’ এর বাংলা ‘মতি’ বলার আরেকটা সমস্যা হতে পারে। পরিভাষা তৈরির ক্ষেত্রে আমি কোন জ্ঞান-উপদেশ বয়ান না করে (তা আমার সাধ্যের বাইরে) বলতে চাই যে কতগুলি সাধারণ নিয়ম যেমন মূল শব্দটির মানে, তার প্রয়োগ, নিজ ভাষায় তার মানে ও প্রয়োগ ও সংস্কৃতি বিবেচনায় নেয়া জরুরি মনে করি। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বা আমেরিকান বিশেষজ্ঞগণ মানসিক রোগের যে তালিকা দিয়েছেন তাতে অনেক রোগই আছে যার সংগে ‘মতি’র কোন প্রত্যক্ষ যোগ নেই। তা ছাড়া বাংলা ভাষায় ‘মতি’র ব্যবহার যেমন ‘মতিভ্রষ্ট’, ‘মতি-গতির ঠিক নাই’, ‘মতি-ভ্রম’ ইত্যাদির সঙ্গে নেতিবাচক দ্যোতনা (কনোটেশন) জড়িয়ে আছে যা মানসিক রোগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সামাজিক স্টিগমা আরও বাড়িয়ে দেবে। যেমন, কেউ কি বলবেন একজন প্রতিবন্ধী শিশুকে যে ‘একজন মতিরোগী’ এসেছে? অথচ একজন প্রতিবন্ধী (মতিরোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত) শিশুর চিকিৎসা করেন একজন ‘সাইক্যায়াট্রিস্ট’ (‘মতিরোগ’ বিশেষজ্ঞ?)। তারপরও পরিভাষা নিয়ে এই বিচারের ভার আমি ভাষা-বিজ্ঞানী, ভাষার অর্থশাস্ত্রবিদ, চিকিৎসা বিজ্ঞানী (শুধু চিকিৎসক নন) তাঁদের ওপর ন্যস্ত করে আমার মূল আলোচনায় ফিরে যাচ্ছি।
লাকাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়েই কয়েকপ্রস্থ লেখা যেতে পারে, তবু সংক্ষেপে কতগুলি মৌলিক বিষয় খোলাসা করার চেষ্টা করছি। লাকাঁ তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তি ধার করেছেন ভাষাতত্ত্ব, দর্শন, গণিতশাস্ত্র এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান থেকে। যেমন ফ্রয়েডের আবিস্কার করা অজ্ঞান মন, ইদিপাস কম্পপ্লেক্স, অবদমিত কামনা ইত্যাদি সবই আছে, কিন্তু লাকাঁ তাঁর ব্যাখ্যায় এদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো একেবারে পালটে দিয়েছেন এবং তা দিয়েছেন আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের (স্ট্রাকচারালিজম) মধ্য দিয়ে। লাকাঁ তাঁর ‘মিরর স্টেজ’ বা আয়নার ব্যাখ্যা করেন যা দিয়ে প্রাচীন বিশ্নেষণমূলক তত্ত্বে তাকে বলা হয় ‘ইমাগো’। যেমন একটি শিশু নিজেকে যখন আয়নায় দেখে, সে দেখে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিশেবেÑ যার হাত, পা, মাথা সব আছে। সে নিজেকে তুলনা করতে পারে আরেকজন পরিণত মানুষের সঙ্গে। কিন্তু সে যখন হাঁটতে যায় এবং পারে না, কিম্বা সে বুঝতে পারে তার অসম্পূর্ণতা, তা তাকে পীড়া দেয়, তাড়িত করে এবং সে তখন নিজেকে নিজের থেকে আলাদা করে নেয়। এই আলাদা করার আরেক নাম অ্যালিয়েনেশন । এখানে অবশ্যই বলে নেয়া উচিত যে এই অ্যালিয়েনেশন-এর তাত্ত্বিক ভিত্তি লাকাঁর নয়, তিনি ধার করেছেন মার্ক্স, হেগেল ও কোজেভ-এর দার্শনিক তত্ত্ব থেকে। এই আলাদা করাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তার বেড়ে ওঠার জন্য। একে হয়তো ‘স্ববিচ্ছিন্নতা’ বলা যেতে পারে। এই আলাদা করতে গিয়ে কেউ কেউ খেই হারিয়ে ফেলেÑ কখনও স্বপ্নময়তায়, কিম্বা অলীক কল্পনায়, বা হ্যালুসিনেশনে। এইখানেই বীজ রোপিত হতে পারে কোন কোন মানসিক রোগ বা মেন্টাল ডিসঅর্ডারের। (এখানে যা বললাম তাও খুব সংক্ষেপে বলা, লাকাঁ, এক্রি, পৃষ্ঠা ২-৫, ১৯৪৯)।
এখানে শিশু নিজেকে আয়নায় দেখছে ভাষার সিগনিফায়ার (পদ) এর মতো আর নিজের প্রতিকৃতির অর্থ খোঁজার চেষ্টা করতে থাকে ‘সিগনিফায়েড’ হিসেবে। এখানে শিশুর মনের অবস্থা পোস্ট-স্ট্রাকচারালিজমের সমস্যার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে যে ভাষা আর বাস্তবতা খুব সহজে সমসুরে বাধা থাকে না। লাকাঁ এই ব্যাখ্যার মাল মসলা ধার নিয়েছেন সুইস ভাষাতাত্ত্বিক, স্ট্রাকচারালিজম এর প্রবক্তা ফারদিনাঁ সস্যুর এবং রোমান ইয়াকবসন থেকে। শিশু যখন বড় হতে থাকে তখন সে দুটো জিনিস লক্ষ্য করে, বাবার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে তার যৌন-পার্থক্য (ছেলে বা মেয়ে) এবং বুঝতে শেখে ভাষা, যেমন কান্না তার কাছে একটি সংকেত (সিগনাল), প্রতীক (সাইন) নয়Ñ যা দিয়ে সে জানান দিতে পারে তার প্রয়োজন (ক্ষুধা, অস্বস্তি ইত্যাদি)। যখন সে একটি প্রতীককে বুঝতে পারে তখন এটাও বুঝতে পারে যে একটি প্রতীকের তখনই কোন মানে হয় যখন তা অন্য কোন প্রতীক থেকে আলাদা। কাল্পনিক (ইমাজিনারি), প্রতীকী ব্যঞ্জনা (দ্য সিমবোলিক) এবং ভাষার বাইরে বর্ণনাতীত বা অনির্বচনীয় (দ্য রিয়েল) ও লাঁকার পদ্ধতিতে জায়গা করে নেয়। সাস্যুরের ভাষাবিজ্ঞানে সিগনিফায়ার হলো ‘সাউন্ড’ আর সিগনিফায়েড হলো ‘থট’, বাংলায় হয়তো ‘শব্দ বা শ্রুতি’ ও ‘দৃশ্যকল্প’ বলা যায়। যেমন জীবনানন্দের ‘পাখির নীড়’ (সিগনিফায়ার) বললে সঙ্গে সঙ্গে যে অপেক্ষা ও প্রশান্তির দৃশ্যকল্প (সিগনিফায়েড) ভেসে ওঠে। কিন্তু তাতেও সব বলা হয় না, এই শব্দ ও ভাবের সম্পর্ক চিরকালই বিমূর্ত। ইয়াকবসন বলেন এই শব্দের (সিগনিফায়ার) অন্তর্র্বতী সম্পর্ক হতে পারে রূপক অর্থে (মেটাফোরিক) অথবা স্ব-দ্যোতনায় (মেটোনাইমিক) বা শব্দের সঙ্গে শব্দের সম্পর্ক হিসেবে। অন্য প্রসঙ্গে আমি আগেও অন্যত্র লিখেছি যেমন কবিতায় প্রেমিকার চোখ নিয়ে একজন লিখছেন ‘মুক্তাশুভ্রদর্শনরাজি অপাঙ্গ বিস্তৃত আঁখিকমল’, একজন লিখছেন ‘আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপনাস্ত্রের মতো মারাতœক তোমার চোখ’, বা ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’, এখানে চোখ চোখই থেকে যাচ্ছে, কিন্তু পালটে যাচ্ছে শব্দের কারুকাজ, আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গে পালটে যাচ্ছে দৃশ্যকল্প বা ইমেজ বা ভাবনা যা জাগতিক বস্তুর বাইরে তৈরি করছে অন্য কোন জগৎ। এই শব্দগুলোই সিগনিফায়ার আর দৃশ্যকল্প বা ভাবনা সিগনিফায়েড।
এখানেই ভাষার অনন্য ক্ষমতা কোন কিছুর কাঠামো পালটে দেয়ার। শিশুর বেড়ে-ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হতে থাকে তার ‘অজ্ঞান’ মন । এক সময় যা ছিল শুধু ছবি, একটি বস্তু অথবা ছোট্ট অভিজ্ঞতা যেমন মায়ের স্তন, স্পর্শ, আদর তা একসময় হারিয়ে যায়, হারিয়ে যায় মানে শিশু ভুলে যায়। শুধু রয়ে যায় অস্পষ্ট অভিঘাতের নকশামালা-এই অভিঘাতগুলো এখানে সিগনিফায়ার। ব্যক্তির ‘অজ্ঞান’-এ জমে থাকে এই অভিঘাতগুলোর সম্মিলিত আকাক্সক্ষা যার প্রকৃতি দরজার খিল-আঁটার মতো আলাদা করে রাখে চেতন মনের সতর্কতা থেকে। শিশু জানে এই মায়ের শরীর তার নয়, তাই সে তার কামনাগুলো অবদমিত রাখে। লাকাঁর মতে মানুষ যেন এই কামনার দাস। আর এই কামনা অশেষ, চক্রাকার-যেখানে শেষ সেখানেই তার শুরু। যেমন কামনা না করতে চাওয়া তো আরেকটি কামনা। কি মজার! লাকাঁ বলেন ‘ম্যান’স ডেজায়ার ইজ দ্য ডেজায়ার অব আদার্স’। এই ‘আদার’ তিনি ধার করেছেন দার্শনিক হেগেল ও কোজেভ থেকে, যা ফ্রয়েডও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এর মানে দুইরকম: পর (দ্য আদার পারসন) এবং পরের মতো (আদারনেস)। এমনকি পরের আকাক্সক্ষাও তার আকাক্সক্ষা হতে পারে। এই অবদমিত কামনা বা আকাক্সক্ষাই নির্ধারণ করে দেয় আমরা মানুষ হিসেবে কে কেমন। লাকাঁর মতে এই অজ্ঞান মন যেন ভাষার মতোই শূন্যতায় ভরা। ভাষা যেমন কোন কিছুর অর্থের পার্থক্য খোঁজা আর যা নেই তার অস্তিত্ব খোঁজার এক শেষহীন প্রক্রিয়া, তেমনি মানুষের অজ্ঞান মন ক্রমাগত এই ‘অধরা’, স্পর্শহীনকে খুঁজে বেড়ায়।
এই যে সংক্ষেপে পৃথিবীর একজন অন্যতম, সমকালীন দার্শনিকের তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিলাম, আমি এখানে সেই দার্শনিক লাকাঁর সঙ্গে লালনের ভাব ও দর্শনের অভূতপূর্ব মিল খুঁজে পাই; লালন বলেন,
‘বাড়ির পাশে আরশি নগর / সেথা এক পরশি বসত করে/ আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।’
সেই পরশিই যেন ‘আদার পারসন’ অথবা আমাদের নিজস্ব ‘আদারনেস’। কিন্তু লাকাঁর তত্ত্বজ্ঞানে জটিলতার এখানেই শেষ হয় না। তিনি বলেন মানুষের অজ্ঞান মন যেন এই ভাষার ‘সিগনিফায়ার’-এর মতো অসংখ্য শিকল তৈরি করে যার ‘সিগনিফায়েড’ বেশীরভাগ সময়েই ‘অধরা’ থেকে যায়, কারণ তা সেই শিশুকাল থেকেই অবদমিত। ‘সিগনিফায়েড’গুলো পিছলে লুকিয়ে যায় ‘সিগনিফায়ার’-এর তলে। ভাষার ক্ষেত্রে যেমন আমরা যা বলি কখনই তা কাটায় কাটায় নির্ভুলভাবে বোঝাই না, বা যা আমরা বোঝাই তা কখনও কাটায় কাটায় নির্ভুলভাবে বলি না। এই চাপা-থাকা অনেক কিছুই রয়ে যায় আমাদের অজ্ঞান মনে। কখনও অজ্ঞান মন থেকে আসল অর্থ নিজের অনিচ্ছাতে বের হয়ে আসতে পারে, যাকে বলা হয় ফ্রয়েডের বিখ্যাত ‘সিøপ অফ দ্য টাং’। এভাবে ‘সিগনিফায়ার’গুলোর তলে ‘সিগনিফায়েড’-এর লুকিয়ে যাওয়াকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লাকাঁ পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘ সময় জড়িয়ে থাকা ইউক্লিডিয়ান ধারণা যে একই শূন্যতায় দুটি বস্তু বা ‘পদার্থ’ একসঙ্গে থাকতে পারে না, তাকে একেবারে গুড়িয়ে দেন। বিষয়টি আমি খোলাসা করতে চাই বাংলায় একটি ধাঁধাঁ দিয়ে।
‘হরির ওপরে হরি হরি শোভা পায়, হরিকে দেখিয়া হরি হরিতে লুকায়’ -এর মানে কি? এখানে ‘হরি’ বিষ্ণু বা নারায়ণের এক নাম আবার ‘হরি’ দিয়ে অন্য দুই দেবতা ও বহুবিধ জিনিসকে বোঝাবার রীতি ছিল। যেমন : জল, পদ্মপাতা, ব্যাঙ, সাপ, কোকিল, সিংহ ইত্যাদি। তাহলে এই বাক্যের অর্থ হতে পারে,
‘জলের ওপরে পদ্মপাতায় ব্যাঙ শোভা পায়, সাপকে দেখে ব্যাঙ পানিতে লুকায়।’
এখানে জলের ওপরে পদ্মপাতা তার ওপরে ব্যাঙ ইত্যাদি পদার্থ আলাদা আলাদা অবস্থান করছে। লাকাঁর মতে এবার অর্থগুলো এক করে দিলে কী হয়? ’
‘জলের ওপরে জল, জল শোভা পায় জলকে দেখে জল জলেতে লুকায়।’
লালন যেমন আরও বলেন,
‘গেরাম-বেড়ে অগাধ পানি/ ও তার নাই কিনারা নাই তরণী পারে।
বলবো কি সেই পড়শির কথা/ ও তার হস্ত-পদ-স্কন্ধ-মাথা নাইরে
ও সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর / আবার ক্ষণেক ভাসে নীরে।’
এভাবে একই শূন্যতায় একাধিক পদার্থ থাকতে পারে, যা লাকাঁ ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর বিখ্যাত রেলস্টেশনের জানালা দিয়ে দেখা দুটি ‘বাথরুম’-এর দরজা দিয়ে। একজন দেখছে একই জায়গায় দরজায় লেখা ‘জেন্টলমেন’ অন্যজন দেখছে একই জায়গায় দরজায় লেখা ‘উইমেন’। লাকাঁর পদ্ধতির অনেক কিছুই পরাবাস্তবতার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যা লাকাঁর ক্ষেত্রে দুর্বোধ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। লাকাঁকে বুঝতে হলে তাই মনোবিজ্ঞান, ভাষাবিজ্ঞান, দর্শন, গণিতশাস্ত্র চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে ভালো ধারণা থাকা প্রয়োজন। লাকাঁর সাইকোঅ্যানালিসিস পদ্ধতি শুধু চিকিৎসায় নয়, বরং শিল্প-সাহিত্য বিশ্লেষণে ব্যবহার করা যায়, এখানেই হচ্ছে তাঁর দার্শনিক অভিধা, নান্দনিক ব্যাপ্তি। লাকাঁ আধুনিক জ্ঞানের ভান্ডারে নতুন করে খোরাক জোগান, একই সঙ্গে তৈরি করেন নতুন বিতর্কের। লাকাঁকে আরও পরিপূর্ণভাবে বুঝতে হলে তাঁর সমসাময়িক তাত্ত্বিক যেমন দেরিদা, আলথুসার, ফুকো, ও দেলুজকে আলোচনায় আনা জরুরি। লাকাঁর অনিবার্যতা, তাঁর সঙ্গে সমসাময়িকদের, সম্ভবত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তাত্ত্বিকদের বিরোধ ও সন্ধি নিয়ে একালের ফরাসি তত্ত্বজ্ঞান। আর একালের ফরাসি তত্ত্বজ্ঞানের খোলা দরজায় ঢুকতে হবে লাকাঁর হাত ধরেই। অথচ বাংলা ভাষায় ও বঙ্গদর্শনে এই হাত ধরার সমস্ত আয়োজন রেখে গেছেন লালন সাঁই, যার ভাবদর্শন ও পদ্ধতিকে মূল্যায়নের পরিবর্তে ঝেটিয়ে বিদায় করছি আমরা জাতীয়ভাবে। এ জন্যেই চিৎকার করে বলতে হয়, লালনকে কে বাঁচাবে?

২য় লিড
শামসুর রাহমান (জন্ম: অক্টোবর ২৩, ১৯২৯, মাহুতটুলি, ঢাকাÑ মৃত্যু: আগস্ট ১৭, ২০০৬ )
সামাজিক দায় গ্রহণের কবি শামসুর রাহমান
ফজলুল হক সৈকত
শামসুর রাহমান সময়ের পরিক্রমায় বাংলা কবিতার পরিসরে তৈরি করে নিয়েছেন একটি নিজস্ব ভাষাভঙ্গি। জীবন ও মানুষকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন নিবিড়ভাবে। কবিতাচর্চার প্রথম দিকে প্রেম, প্রকৃতি ও মৃত্যুবোধ দ্বারা প্রবলভাবে আন্দোলিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে রাজনীতি থেকে, গণসংগ্রাম থেকে সংগ্রহ করেছেন কবিতার উপাদান। ক্রমান্বয়ে তার কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে বৈরীসমাজ, ব্যর্থপ্রেম, জড়বাদে অনুরাগ, মৃত্যুর পটভূমিতে জীবনের নশ্বরতা, নৈঃসঙ্গ্যস্পৃহা এবং শূন্যতাবোধ। ভাষা-আন্দোলন এবং পাকিস্তানি সামরিক শাসন তাঁর কাব্যযাত্রার প্রারম্ভকালকে প্রভাবিত করেছিল। সঙ্গে ছিল জীবনানন্দের প্রকৃতিলগ্নতা ও জীবন-উপলব্ধির প্রেরণা আর সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘নির্বাক নীল নির্মম মহাকাশ’। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং মা-মাটি-মানুষ তার কবিতার মূল সুর হয়ে ওঠে।
যিশু রুটিকে মনে করতেন তার চেতনার, উচ্চারণের প্রতীক। শামসুর রাহমানের কবিতায়ও যেন আমরা পাই তেমন স্বাদ। আর তিনি তার প্রথম কবিতার বই প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, (প্রকাশকাল : ১৯৬০)-এর নাম রাখতে চেয়েছিলেন ‘রুপালি স্নান’। সে অভিপ্রায় প্রকাশের অল্পকাল পরে অবশ্য বলেছিলেন বইটির নাম হবে ‘রুটি ও গোলাপ’। ‘রুটি’ শব্দটি সে সময় শামসুর রাহমানের চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছিল। তার সে উপলব্ধির গাঢ়তার প্রকাশ দেখি ‘রুপালি স্নান’ কবিতায় : ‘শুধু দু’টুকরো শুকনো রুটির নিরিবিলি ভোজ/ অথবা প্রখর ধু-ধু পিপাসার আঁজলা ভরানো পানীয়ের খোঁজ/ শান্ত সোনালি আল্পনাময় অপরাহ্নের কাছে এসে রোজ/ চাইনিতো আমি। দৈনন্দিন পৃথিবীর কাছে চাইনি শুধুই/ শুকনো রুটির টক স্বাদ আর তৃষ্ণার জল।…’
সাম্প্রদায়িকতা-স্বৈরাচারবিরোধী নাগরিক-আন্দোলন গড়ার প্রত্যয় আছে তার কবিতায়। আন্দোলনকারী মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, আনন্দ-বেদনাকে তিনি ঘাতকদের জন্য অভিশাপবাণীতে পরিণত করেছেন। মায়ের সম্ভ্রম, নিজের ভাষার, দেশের বহুদিনের লালিত ঐতিহ্য আর অর্জিত ইতিহাসের আলোকসভায় তিনি তৈরি করতে চান সৃজনশীলতার বাতায়ন। প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে উপলব্ধি করেছেন সে অনুভবের যাতনা। মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি, মৌলিক অধিকার আর সহজভাবে চলতে থাকা জীবনে আছড়ে-পড়া অনাকাক্সিক্ষত অভিঘাত ঘা দিয়েছে কবির হৃদয়ে; ‘তোমাকে উপড়ে নিলে, বল তবে, কী থাকে আমার?/ উনিশ শো’ বায়ান্নোর দারুণ রক্তিম পুষ্পাঞ্জলি/ বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।/ সে-ফুলের একটি পাপড়িও ছিন্ন হ’লে আমার সত্তার দিকে/ কত নোংরা হাতের হিংস্রতা ধেয়ে আসে।/ এখন তোমাকে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষ মাস!/ তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,/ বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।’ (বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা)
শামসুর রাহমানের কবিতায় জাতির আত্ম-জিজ্ঞাসার ভাষা নির্মিতি লাভ করেছে। যোগ্যতা অনুযায়ী মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি ছিলেন সোচ্চার। আলোকিত মানবসভ্যতা বিনির্মাণ আর আধুনিকতার প্রলেপে শিল্পচর্চার বিষয়টি লালন করেছেন তিনি। স্বাধীনতার জন্য আকুল অপেক্ষা, প্রজন্মপ্রহর আর অর্থনৈতিক স্থিতি-অস্থিতির কালযাপনের ক্লান্তি শামসুর রাহমান অনুভব করেন ‘শূন্য থালা হাতে’ ‘পথের ধারে’ বসে-থাকা ‘হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী’র উপলব্ধির গাঢ়তায়। কবি বাঙালি জাতির মনন-চেতনকে আঁকছেন এভাবে: ‘তোমার জন্যে,/ সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,/ কেষ্ট দাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,/ মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,/ গাজী গাজী ব’লে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে/ রুস্তম শেখ, ঢাকার রিক্শাওয়ালা, যার ফুসফুস/ এখন পোকার দখলে/ আর রাইফেল কাঁধে বনে-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো/ সেই তেজী তরুণ যার পদভারে/ একটি নতুন পৃথিবী জন্ম হ’তে চলেছে-/ সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।’ (তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা)
প্রকৃতির নির্মলতা-স্বাভাবিকতা, পরিবার ও সমাজের নীতিপ্রীতি-ধর্মযাপন, মায়ের আনন্দ, বোনের খুশী, সাফল্যের পথে বন্ধুর এগিয়ে চলাÑ সবকিছুর ভেতরে লুকিয়ে থাকে ঝিনুকের মোড়কে থাকা মুক্তার মতো সম্ভাবনা। শামসুর রাহমান মায়ের শুকাতে-দেওয়া শাড়ি আর বোনের মেহেদীরাঙা হাতের আহ্বানে দেখেছেন শান্তিনিবিড় মাতৃভূমির ছবি। বাবার প্রার্থনারত হাতের তালুতে ঝুলতে থাকা থোকা থোকা স্বপ্ন বুনতে চেয়েছেন তিনি স্বাধীন দেশের উর্বর মাটিতে। আর ভেবেছেন- ঘরে ঘরে নির্মিত হচ্ছে অফুরন্ত শান্তির সুবাতাস : ‘স্বাধীনতা তুমি/ গৃহিণীর ঘন খোলা কালো চুল,/ হাওয়ায় হাওয়ায় বুনো উদ্দাম।/ স্বাধীনতা তুমি/ খোকার গায়ে রঙিন কোর্তা,/ খুকীর অমন তুলতুলে গালে/ রৌদ্রের খেলা।’ (স্বাধীনতা তুমি)
নিজের ভাবনাবলয়কে অতিক্রম করার পাশাপাশি প্রচুর কবিতায় কেবল নিজেকেই প্রদক্ষিণ করেছেন শামসুর রাহমান; তবে আত্ম-অনুকরণ ও আত্ম-বিবরণে আগ্রহী এ কবিতা-কারিগর বেশ কিছু অসামান্য কবিতা সৃষ্টি করে আমাদের তৃপ্তি দান করেছেন। প্রায় দুই দশক কবিতায় প্রবল প্রতিবাদ-ঝড়-উন্মাদনা জন্ম দেয়ার পর চলার স্রোতে খানিকটা ধীরতায় নেমেছেন তিনি। বিশেষ করে, প্রতিদিন ঘরহীন ঘরে, ইকারুসের আকাশ, মাতাল ঋত্বিক ও উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ পর্বে (প্রথমটি ১৯৭৮, পরের তিনটি কাব্যগ্রন্থ ১৯৮২তে প্রকাশিত) তার এই সৌম্যকান্তি স্বভাব প্রকাশ পায়; যেন তিনি প্রবল বাতাসে বহুকাল নৌকা চালিয়ে মোহনায় কিংবা চরের সামান্য বাধায় বিশ্রাম নিচ্ছেন খানিকটা। তখন, এই আপাত বিশ্রামের কালে কবি মিথ এবং কিংবদন্তি প্রয়োগের দিকে মনোযোগী হলেন। মিথ বা পুরাণের পাশাপাশি তার কবিতার এ পর্বে প্রবেশ করেছে দুঃসময়ে কবির ব্যক্তিগত অস্থিরতা এবং প্রেমনির্ভরতা।
মানুষের মনের অজান্তেই কেমন করে যেন মোহন বাগান কাঁটাবন হয়ে যায়! অতিথিরা কেবল হয়ে পড়ে মৃত অথবা শত্র“! ভাঙা আয়নায় নিজের মুখও পরিষ্কার দেখা যায় না। আস্থা আর নির্ভরতার জায়গা কমছে পৃথিবীজুড়ে। মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মতো ব্যানারে ব্যানারে, কিংবা পোস্টারে, ফেস্টুনে লেখা কথাগুলো বাতাসে মেলাচ্ছে তাদের করুণ-ব্যর্থ সুর। মিথ্যার ডালিতে ভরে উঠছে পৃথিবী; বেঁচে থাকতেও যেন এক ধরনের ঘৃণা ধরেছে সজাগ মানুষের মনে! কেবল বমি বমি লাগেÑ ঘেন্নায়। জীবনানন্দের মতো, চারপাশের অশুভ নৃত্যপরতা দেখতে দেখতে, শামসুর রাহমানও গভীর গভীরতর এক অজানা অসুখে নিমজ্জিত হয়ে পড়ছিলেন। জাতির বিপর্যয়, অনাকাক্সিক্ষত দুঃশাসন, অবরুদ্ধ জীবনের যন্ত্রণা শামসুর রাহমানের বোধ আর দায় গ্রহণের মানসিক শীতল-উর্বর ভূমিতে গড়েছে কবিতাসৃজনের শান্ত পরিসর। তিনি মানুষের কল্যাণ আর সুস্থির অবস্থান ভাবনার কবি; শান্তি আর স্বস্তি নির্মাণের নিবিড় ভাষ্যকার। কবিতাযাত্রায় তার কোনো ক্লান্তি নেই, আছে সুখলাগা-দোললাগা উপলব্ধির আভাস; আর ওই অনুভব কবিতা পাঠকের হৃদয়-দরোজায় পৌঁছে দেয়ার প্রচেষ্টা-শিহরণ।
সময়ের অস্তিত্বচেতনা প্রকাশে কবি শামসুর রাহমান রোমান্টিক কবিগোষ্ঠীর সারিতে হয়তো বিবেচ্য হবেন। আর শব্দ, ভাষা, চিত্রকল্প ও উপমা-রূপকে তিনি অনেক বেশি আবেগঘন। দীর্ঘসূত্রিতা ও বিবরণধর্মিতার দিকে প্রবলভাবে ঝুঁকে না পড়ে তার কবিতায় প্রধান হয়ে দেখা দিয়েছে ইন্দ্রিয়ঘনত্ব ও প্রকরণনিষ্ঠা। শামসুর রাহমান মূলত স্বাধীনতা ও অবাধ প্রকরণের কবি।

জীবনানন্দ দাশ : বোধ-এর সন্ধানে
কাজী নিষাদ
কবি ও কবিতার নাম এলেই বাঙালিদের মাথায় একটা নামই সবার আগে আসে। যাঁর কবিতার অন্তর্গত ছত্রে ছত্রে রয়ে গেছে যে আশ্চর্য বোধের ছোঁয়া, জীবন সম্পর্কে রয়েছে গভীর ধ্যান, যাঁর স্বপ্ন চলাফেরা করত আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের আড়ালে। যে সব স্বপ্ন, যে সব অনাশ্রিত বেদনা আমরা প্রতিনিয়ত ভুলে যাই, ভুলে থাকার চেষ্টা করতে করতে একসময় ছুঁড়ে ফেলে দেই কাক, কুকুরে ঘাঁটা আবর্জনার স্তুপে। সেই আশ্চর্য বেদনা আর অবহেলার রেশ নিয়েই কেটেছে যাঁর সমস্ত জীবন। বাংলার আধুনিক কবিতার পাঁচ পা-বের সেই প্রধান পা-বের নাম জীবনান্দ দাশ। জীবনভর যিনি করে গেছেন ‘বোধ’-এর সন্ধান। আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জানাই অন্তরের অন্তর্গত শ্রদ্ধা। ক্ষমা চাই আমাদের মত মানুষের পক্ষ থেকে, তাঁকে জীবনযুদ্ধে বিনা অস্ত্রে পাঠানোর জন্য।
জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল জেলায়। তাঁর ডাকনাম ছিল মিলু। জন্মসূত্রে তিনি হিন্দু ধর্মের হলেও পরবর্তীতে তিনি ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন করেন। বরিশারে তিনি ব্রাহ্ম সমাজ আন্দোলনে অংশ নেন। কবিতার অঙ্গণে আসা মূলত তাঁর মা কুসুমকুমারী দাশ (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে/ কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে)-এর প্রভাবে। তাঁর পিতা সত্যানন্দ দাশগুপ্তের কম বয়েসে স্কুলে যাবার বিরোধিতার কারণেই তিনি বাল্যকালে তাঁর মা’র কাছে শিক্ষাগ্রহণ করতেন। ৩ ভাইবোনের ভেতরে তিনি ছিলেন সবার বড়। তাঁর এক ভাইয়ের নাম অশোকানন্দ দাশ ও এক বোনের নাম সুচরিতা দাশ।
১৯০৮ সালে তিনি পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেখানে তাঁর বাংলা এবং ইংরেজি জ্ঞান বিস্তৃত হয়। এ ছাড়াও ছবি আঁকার দাকেও তাঁর ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ সালে তিনি ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। এর দু’বছর বাদেই ব্রজমোহন কলেজ থেকে ঐ একই ফলাফল নিয়ে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯১৯ সালে তিনি প্রসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ পাশ করেন। ঐ বছরই তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায়। কবিতাটির নাম ছিল ‘বর্ষা আবাহন’। ১৯২১ সালে কলকাতা বিকিছুদিন আইনশাস্ত্রও পড়াশোনা করেন। তবে পরীক্ষার ঠিক আগে তিনি ব্যাসিলারি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে ১৯২২ সালে আইনশাস্ত্র অধ্যায়ন ছেড়ে দিয়ে কলকাতা সিটি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন।
১৯২৫ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি এর জুনে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ মৃত্যুবরণ করলে তার স্বরণে জীবনানন্দ দাশ ‘দেশবন্ধুর প্রয়ানে’ নামক একটি কবিতা লেখেন যা বঙ্গবাণী পত্রিবায় প্রকাশিত হয়। যেটি পরে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালকে’ স্থান পায়। এই কবিতাটি পড়ে কবি কালিদাশ মন্তব্য করেছিলেন, ‘এ কবিতাটি নিশ্চয়ই কোন প্রতিষ্ঠিত কবির ছদ্মনামে রচনা।’ ধীরে ধীরে তার কাব্যপ্রতিভার রস আস্বাদন করতে শুরু করল কাব্যরসিকেরা। সে সময়ের অত্যন্ত বিখ্যাত পত্রিকাগুলোতে ছাপা হতে লাগল তাঁর কবিতা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, কালি ও কলম, কল্লোল, প্রগতি ইত্যাদি।
১৯২৭ সালে কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয়। তখনই কবি তাঁর উপাধি ‘দাশগুপ্ত’-এর বদলে ‘দাশ’ লেখা শুরু করেন।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের কয়েক মাসের মাথাতেই তিনি সিটি কলেজে তাঁর চাকরিটি হারান। ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে কলেজটিতে ছাত্র অসন্তোষ দেখা দিলে কলেজটির ছাত্রভর্তির হার আশঙ্কাজনকহারে কমে যায়। জীবনানন্দ ছিলেন কলেজটির শিক্ষকদের মধ্যে কনিষ্ঠতম এবং আর্থিক অসুবিধায় পড়ে কলেজ তাঁকেই চাকরিচ্যুত করে। কলকাতার সাহিত্যচক্রেও সে সময় তাঁর কবিতা কঠিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়। সে সময়কার প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক কবি-সাহিত্যিক সজনীকান্ত দাস পত্রিকায় তার রচনার নির্দয় সমালোচনায় প্রবৃত্ত হন। কলকাতায় করার মতন কোনো কাজ ছিল না বিধায় কবি ছোট্ট শহর বাগেরহাটের প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তবে ৩ মাস পরেই তিনি কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় তিনি চরম অর্থনৈতিক দুর্দশায় পড়েছিলেন। জীবনধারণের জন্যে তিনি টিউশানি করতেন এবং সাথে সাথে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির সন্ধান করছিলেন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে তিনি দিল্লির রামযশ কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন।
বরিশালে তার পরিবার তার বিয়ের আয়োজন করছিল এবং ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ৯ই মে তারিখে তিনি লাবণ্য দেবীর সাথে বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ে হয়েছিলো ঢাকায়, ব্রাহ্ম সমাজের রামমোহন লাইব্রেরিতে। বিয়ের পর আর দিল্লিতে ফিরে যান নি তিনি, ফলে সেখানকার চাকরিটি খোয়ান। এরপর প্রায় বছর পাঁচেক সময় জীবনানন্দ কর্মহীন অবস্থায় ছিলেন। মাঝে কিছু দিন ইনশিওরেন্স কোম্পানির এজেন্ট হিসাবে কাজ করেছেন; ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থ ধার করে ব্যবসার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু কোনটাই স্থায়ী হয় নি।
১৯৩৫ সালে তিনি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের ইংরেজি বিভাগে প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। সেই সময়েই কলকাতাতে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সমর সেন একটি নতুন কবিতা পত্রিকা বের করবার তোড়জোড় করছিলেন, যার নাম দেওয়া হয় ‘কবিতা’। পত্রিকাটির ১ম সংখ্যাতেই জীবনানন্দের একটি কবিতা স্থান করে নেয়, যার নাম ছিল ‘মৃত্যুর আগে’। কবিতাটি পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবকে লেখা একটি চিঠিতে মন্তব্য করেন কবিতাটি ‘চিত্ররূপময়’। ‘কবিতা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যাতে তার কিংবদন্তিতুল্য ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এই ১৮ লাইনের কবিতাটি বর্তমানে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কবিতার অন্যতম হিসেবে বিবেচিত।
২য় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এর ফলে দ্বিখ-িত বাংলা হবার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়। দেশবিভাগের কিছু আগেই তিনি বি.এম. কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে কলকাতায় চলে যান। এরপরে তিনি আর এদেশে ফেরেন নি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁকে থাকতে হয়েছে জীবনযুদ্ধে অন্তরীণ।
তিনি কবিতা ছাড়াও প্রচুর গল্প উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু একটাও প্রকাশ করে যাননি কি এক অভিমানে। ব্যক্তিজীবনেও তিনি ছিলেন নিজের কড়া সমালোচক। এজন্যেই তাঁর অনেক কবিতাও তিনি প্রকাশ করেননি। তাঁর রচিত কবিতার সংখ্যা প্রায় ৮০০ হলেও মাত্র ২৬২টি কবিতা প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : ঝরা পালক (১৯২৭); ধূসর পা-ুলিপি (১৯৩৬); বনলতা সেন (১৯৪২, কবিতাভবন সংস্করণ); মহাপৃথিবী (১৯৪৪); সাতটি তারার তিমির (১৯৪৮); বনলতা সেন (১৯৫২, সিগনেট প্রেস সংস্করণ); জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৪); রূপসী বাংলা (১৯৫৭); বেলা অবেলা কালবেলা (১৯৬১); সুদর্শনা (১৯৭৪); আলো পৃথিবী (১৯৮১); মনোবিহঙ্গম; অপ্রকাশিত একান্ন (১৯৯৯)। প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার কথা (১৯৫৫); জীবনানন্দ দাশের প্রবন্ধ সমগ্র (১৯৯০, সম্পাদক : ফয়জুল লতিফ চৌধুরী)। উপন্যাস : মাল্যবান (১৯৭৩); সুতীর্থ (১৯৭৭); চারজন (২০০৪: সম্পাদক : ভূমেন্দ্র গুহ ও ফয়সাল শাহরিয়ার)। গল্পগ্রন্থ : জীবনানন্দ দাশের গল্প (১৯৭২, সম্পাদনা: সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী); জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯, সম্পাদনা: আবদুল মান্নান সৈয়দ)। পত্রসংকলন : জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী (বাংলা ১৩৮৫, সম্পাদক : দীপেনকুমার রায়); জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী (১৯৮৬, সম্পাদকঃ আবদুল মান্নান সৈয়দ)।
১৯৫৪ সালের ১৪ই অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। যদিও তাঁর মৃত্যু নিয়ে অনেক তর্ক বিতর্কে বলা হয়েছে যে তাঁর মৃত্যুর মূল কারণ তাঁর আত্মহত্যাস্পৃহা। এর কারণ ও রয়েছে। গত ১০০ বছরে কোলকাতায় মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র এক। আর সেই একজনই হল জীবনানন্দ দাশ। কঠিন বাস্তবের ঠোকর খেতে থেতে, ভালোবাসাহীন, সাহায্যহীন জীবনে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাই হয়তো তিনি মৃত্যুর কাছে শেষ আশ্রয় চেয়েছিলেন তাঁকে দু’দ- শান্তি দেবার আবেদন জানিয়ে!

Please follow and like us:
2