মঙ্গল. জুন ২৫, ২০১৯

লক্ষ্য অর্জনে চাই সহশিক্ষা কার্যক্রম

লক্ষ্য অর্জনে চাই সহশিক্ষা কার্যক্রম

Last Updated on

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সহশিক্ষাকার্যক্রমের গুরুত্ব কাগজে কলমে থাকলেও অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এর বাস্তবায়ন বা কার্যক্রম সেভাবে নেই। অথচ মুষ্টিমেয় যেসকল প্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রম বাস্তবেই আছে, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থিরা দেশ বিদেশে ছড়াচ্ছে সাফল্যের দ্যুতি। এককথায় বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারি তারা। তাই যারা স্বপ্ন দেখেন নিজেকে ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়ার, তাদেরকে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে সেই তথ্যটিই দিতে চাই জীবনে যারা সফল, তাদের এমন এজনকেও সম্ভবত পাওয়া যাবেনা- যারা সহশিক্ষায় অন্তরভূক্ত ছিলেননা। শুধু থাকাই নয়। এক্ষেত্রেও তারা ছিলেন সফল। নিজের সাথেসাথে নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তথা পরিবারকেও তারা গর্বিত করেছে আপন আলোয় তথা প্রতিভায়। নজরুল ইসলাম

উন্নত বিশ্বে শিক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সমাজ-সভ্যতায় এগিয়ে থাকা দেশগুলোয় সহ-শিক্ষাকে শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে মনে করা হয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর চর্চাও সেভাবে অব্যাহত আছে। সহ-শিক্ষা ছাড়া শিক্ষা সমপূর্ণ হয় না। সহ-শিক্ষা পাঠক্রমিক কার্য বলতে সাধারণভাবে পুঁথিগত বিষয়ের বাইরে জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়াসমূহকে বোঝায়। এই প্রক্রিয়া শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশের সাথে সাথে সামগ্রিক জীবন ও সৃজনশীলতার বিকাশে পূর্ণ সহযোগিতা করে। সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলীর প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ ধরনের কার্যাবলী শ্রেণীকক্ষের পঠন পাঠনের একঘেঁয়েমী ও অবসন্নতা দূর করে এবং সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করে। এছাড়া ছাত্রছাত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটায় ও তাদেরকে মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে। এর মাধ্যমে তরুণ ছেলেমেয়েরা বাস্তব জীবনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে পরিচিত হয় এবং সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জাগিয়ে তোলে। সর্বোপরি সহ-পাঠক্রমিক কার্যাবলীর মাধ্যমে শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত হয়, ভবিষ্যত বৃত্তি নির্বাচনে সহায়ক হয়।
অন্যদিকে তথ্য প্রযুক্তি দুনিয়ায় শিশুকিশোররা মোবাইল, কম্পিউটার সর্বোপরি ইন্টারনেট গেমিং এ যেভাবে আশক্ত হয়ে পড়ছে, তা থেকে উত্তরণের প্রধান উপায় তথা মাধ্যম এই সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম। সহশিক্ষা মূল্যবোধ তৈরিতে ভূমিকা রাখায় তারা প্রযুক্তির কুপ্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। বিশেষকরে খেলাধুলায় অভ্যস্ত হয়ে গেলে, মজা পেলে মোবাইল, কম্পিউটার খুব একটা প্রভাবিত করতে পারেনা বা সেই সময়ও তারা পায়না। আজকাল অনেক পরিবার তার তরুণ, এমনকি শিশু সন্তানেরও কামরা বন্ধ করে রাত জেগে কম্পিউটার নিয়ে কাটিয়ে দেয়ার সমস্যায় জর্জরিত। যা ক্রমান্বয়ে মহমারির আকার ধারণ করছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ ঐ একটিই ছোট বেলা থেকেই পরিবারের এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের উচিত সন্তানদেরকে একাডেমীক শিক্ষার পাশাপাশি বেশি করে সহশিক্ষা কার্যক্রম তথা খেলাধুলায় যুক্ত করা। এ ব্যাপারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রিড়া শিক্ষকের জোড়ালো ভূমিকা রয়েছে। অধিকাংশ ক্রিড়া শিক্ষক সাধারণতঃ আগ্রহী ছেলে-মেয়েদেরকেই এসব ব্যাপারে প্রাধান্য দেন। কিন্তু যেসব বাচ্চারা খেলাধুলা বা সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে আগ্রহী বা পারদর্শি নয়, তারা কোন ক্রিড়াবিদ বা শিল্পি না হলেও সহশিক্ষাকার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে মূল্যবোধের শিক্ষা, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি ও অন্তরমূখি হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়ার যে ন্যূনতম অধিকার বা সুযোগ, সেটা থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করার অধিকারতো আমাদের নেই। এ ব্যাপারে অভিভাবক এবং প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ উভয়কেই তৎপর হতে হতে হবে। বিশেষকরে তাদেরকে শুধু সর্বোচ্চ ফলাফল তথা পুঁথিগত বিদ্যা নিয়ে বেতিব্যাস্ত হলে চলবেনা। স্মরণ রাখতে হবে যে, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি সহশিক্ষায়ও নিয়মিত হতে হবে এবং সময় দিতে হবে। বিশেষকরে সহশিক্ষাই যে মেধাভিত্তিক শিক্ষা এবং সন্তানদের আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করে, সেটা বিশ্বাস ও ধারণ করে সেভাবেই এগুতে হবে।
একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বিক প্রয়াস থাকবে মেধাভিত্তিক শিক্ষাচর্চাকে কেন্দ্র করে। এজন্য মূল পাঠ্যের বিশ্লেষণধর্মী অনুশীলন ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত চর্চায় রাখতে হবে। একই সাথে অপেক্ষাকৃত দূর্বল শিক্ষার্থিদের বিশেষ ব্যবস্থায় সামনের সারিতে নিয়ে এসে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে সকলকে সমান তালে এগিয়ে নিতে হবে। বিশেষ করে পড়াশুনাটা যেমনি হতে হবে মানবিক মূল্যবোধ তৈরির লক্ষ্যে, তেমনি এটিকে নিতে হবে একটি নান্দনিক আতœস্থ করনের ব্যাপার হিসেবে।
একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রয়াস থাকবে শিক্ষার্থিদের মেধাবিকাশে ভূমিকা রাখা। এই পর্যায়ে প্রথমেই গুরুত্ব দিতে হবে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমে বেশিবেশি উদ্বুদ্ধ করার ব্যাপারে। এ ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। যেমন, ক্যাম্পাসটি হবে সবুজ শ্যামল, খেলার জন্য থাকবে সবুজ মাঠ, প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্রিড়া শিক্ষক, খেলার প্রয়োজনীয় উপকরণসহ নিয়মিত বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন ও এর প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকবে, চলবে অনুশীলন তথা চর্চা। একই সাথে নিয়মিত বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হবে, সাহিত্য চর্চা ও এর প্রতিযোগিতার জন্য সাহিত্য পত্রিকা ও দেয়ালীকা প্রকাশসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে শিক্ষার্থিদের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। এসব আয়োজনের মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে ক্রিড়াবিদ, সঙ্গীত, নৃত্য শিল্পী, উপস্থাপক এমনকি নেতা রাজনীতিকসহ বহু কিছু। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে, একজন বিতার্কিক, উপস্থাপক কিংবা অন্য বিদ্যায় পারদর্শীগণ অপেক্ষাকৃত আতœবিশ্বাসী তথা সাহসী হওয়ার কারনে তারা পরীক্ষার হল থেকে শুরু করে জীবনের অন্য যেকোন পরীক্ষায় সাধারনদের চেয়ে তুলনামূলক কম জানাশুনা বা পড়াশুনা করেও এগিয়ে থাকে। বিশেষ করে এসব সহশিক্ষা চর্চা ও খেলাধুলা মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে এসব সংশ্লিষ্টতায় মন প্রফুল্ল থাকে এবং কাজের স্পৃহা তৈরীসহ দেহ মন সুস্থ থাকে, যা জীবনে সাফল্যের প্রধান নিয়ামক।

Please follow and like us:
0