লকডাউনে নানা কষ্ট, ভোগান্তি

কষ্ট, ভোগান্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধের চেষ্টায় সাত দিনের ‘লকডাউনের’ দ্বিতীয় দিনেও রাজধানীতে ‘ঢিলেঢালা ভাব’ চলেছে। তবে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় যথারীতি ভোগান্তি পোহাচ্ছে কর্মজীবী মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে রামপুরা, মালিবাগ, কাকরাইল ঘুরে সড়কে আগের দিনের চেয়ে বেশি যানবাহন চলাচল চোখে পড়েছে। কোনো কোনো সড়কে ট্রাফিক সিগন্যালে দেখা গেছে যানবাহনের লম্বা লাইন। কাকরাইলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এনামুল করীম বলেন, “গতকালও মালিবাগ থেকে হেঁটে কাকরাইলের অফিসে এসেছি। আজকে এই অবস্থা। মনে হয়েছে, গতকালের তুলনায় রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। রিকশা তো দেদারসে চলছে।”
মৌচাক, মগবাজার, এলিফ্যান্ট রোডের শপিং-মলগুলো বন্ধ থাকলেও অলি-গলির দোকান-পাট খোলা রয়েছে। শান্তিনগর বাজার, মালিবাগ বাজার, রামপুরায় কাঁচাবাজার খোলা আছে। তবে তেমন একটা স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। বাজারের আশ-পাশে খোলা রয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো। সড়কে যানবাহন থাকলেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অফিসমুখী মানুষজনকে দুর্ভোগ পোহাতেই হচ্ছে। মতিঝিলে বেসরকারি অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, “একদিকে গণপরিবহন বন্ধ আবার সরকারি-বেসরকারি অফিসেও খোলা। যানবাহন নেই বলে আমাদের কষ্টের সীমা নেই। রিকশায় অফিসে আসা-যাওয়া করতে বেশি ভাড়া এখন গুণতে হচ্ছে।
“রামপুরায় থাকি, এতো দূর থেকে তো আর পায়ে হেঁটে আসা যায় না। সেজন্য আমাকে বেশি ভাড়া গুণতে হচ্ছে অফিসে যেতে।”
রাজধানীর ফুটপাতে কর্মজীবী শ্রমিকরাও বসে আছেন কাজের প্রত্যাশায়, মিলছে না। বিশেষ করে নির্মাণশ্রমিক বা ‘যোগালি’রা চরম বিপাকে পড়েছে। সকাল ১০টার দিকে শান্তিনগরের দেখা গেল ১০-১৫ জন শ্রমিক বসে আছেন। ময়মনসিংহের হেমায়েত উল্লাহ বলেন, “ভাই লকডাউনের কারণে আমরা কাজ পাচ্ছি না। কীভাবে চলব জানি না, বহুত কষ্টে আছি।”
কাদের নামে আরেক শ্রমিক বললেন, গতকালও তিনি কাজের জন্য দুপুর পর্যন্ত বসেছিলেন, কাজ পাননি। কোভিড-১৯ বিস্তার রোধকল্পে সোমবার ৫ এপ্রিল ভোর ৬টা থেকে ১১ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত সারাদেশে গণপরিবহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি শপিং মল, দোকান-পাট, হোটেল-রেস্তারাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
করোনায় নয়, না খাইয়াই মারা যামু : করোনাভাইরাসের ভয়ের চাইতে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশি বিপাকে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন বুটিকস শ্রমিকরা। বিধি-নিষেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে না এলে না খেয়ে মারা যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তারা। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের টোকিং স্কয়ারের সামনে ‘বাংলাদেশ বুটিকস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশন’ এর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে শ্রমিকরা এ কথা বলেন। শ্রমিকরা জানান, বুটিকস প্রতিষ্ঠানগুলোতে তৈরি পোশাক সারাদেশের বিপণিবিতানগুলোতে বিক্রি হয়। বিপণিবিতান বন্ধ থাকলে বুটিকস শ্রমিকরাও বেকার হয়ে পড়েন। গতবছর রমজানে লকডাউনের কারণে এ খাতটি বিশাল ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের হাজার হাজার বুটিকস শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের দিকে তাকিয়ে চলমান অবস্থা ও লকডাউনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অ্যাসোসিয়েশনটির একজন সদস্য আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি লকডাউন তুলে নিক। মার্কেট খুলে দিক। দোকান মালিকরা দোকান খুলুক। তাদের দিয়ে আমরা, আমাদের দিয়ে তারা। দোকান মালিকরা ব্যবসা করতে পারলে আমরা টাকা পাব। কর্মচারীদের চালাতে পারব, আমরা চলত পারব। নইলে করোনায় মারা যামু কি, এমনিই না খাইয়া মারা যামু।’
গতবছরের ক্ষতি এখনো পুষিয়ে উঠতে পারেননি দাবি করে তিনি বলেন, ‘গতবছর লকডাউনের জন্য আমাদের ব্যবসা হয়নি। আমরা বছরে একটা মাস সিজন পাই। এই রমজান মাসেই আমাদের ব্যবসা হয়। একটা মাসের জন্য আমাদের অনেক আয়োজন থাকে। লোন করে রাখছি। এখন আমরা ব্যবসার মুখ দেখব। সেই সময় লকডাউন। এখন আমরা যাব কোথায়? কারখানা ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন কোথা থেকে দেব? আমরা চলব কিভাবে?’ বাংলাদেশ বুটিকস ম্যানুফেকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন দেড় শতাধিক প্রতিষ্ঠানে ১০ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন। যাদের সবাই এ মুহূর্তে বেকার হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। সকালে টোকিও স্কয়ারের সামনে মানবন্ধন শুরু হলেও বেলা ১২টায় আন্দোলনকারীরা মিছিল বের করেন। মিছিলটি রিং রোড হয়ে শ্যামলি পৌঁছায়। সেখানে মিরপুর রোড বন্ধ করে অবস্থান নেয়ার চেষ্টা করেন বুটিকস শ্রমিকরা। তবে পুলিশি বাধায় তারা সেখানে অবস্থান করতে পারেননি। সেখান থেকে পুরনায় মিছিল নিয়ে রিং রোড শম্পা মার্কেট এলাকায় এসে বুটিকস শ্রমিকদের কর্মসূচি শেষ হয়।
সড়কে স্বেচ্ছাচারিতা, বালাই নেই স্বাস্থ্যবিধির : রাজধানীতে গণপরিবহন বন্ধ। তবুও সড়কে গাড়ির চাপ ছিল চোখে পরার মতো। গতদিনের তুলনায় রাজধানীর সড়কগুলোতে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ ছিল তীব্র। ফলে অনেক সড়কের মোড়ে দেখা দেয় যানজট। আর ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ছিলেন গাড়ির জট নিয়ন্ত্রণের ভূমিকায়। সড়কে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে প্রাইভেটকার, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও রিকশা।
গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, ফার্মগেট, কারওয়ানবাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরকারের বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও অবাধে চলছে ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, অ্যাপেচালিত মোটরসাইকেল ও রিকশা। যদিও সরকারের নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী অ্যাপে চালিত মোটরসাইকেল বন্ধ রাখা হয়েছে তবুও রাস্তা থেকে ডেকে যাত্রী তুলছেন এসব বাইকাররা।
গণপরিবহন না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা গণপরিবহনের ভূমিকা পালন করছে। একাধিক যাত্রী পরিবহন করা হচ্ছে এসব বাহনে। স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে ৪ থেকে ৫ জন যাত্রী তুলে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছুটছেনে সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। ফলে নিজস্ব পরিবহন ও অটোরিকশার কারণে অতিরিক্ত যানজট দেখা গেছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত কুড়িল বিশ্বরোড থেকে লা মেরিয়ান এলাকায় প্রচ- যানজট দেখা যায়। আবদুল জব্বার নামে এক জন জানান, বেলা ১১টায় তিনি কুড়িল বিশ্বরোড থেকে অটোরিকশায় ওঠেন। কিন্তু নতুন বাজার পৌছতে তার বেলা ১টা বেজে যায়। সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রীদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, আমরা পরিস্থিতির শিকার। আমাদের তো অফিসে যেতে হবে। এদিকে রাস্তায় কোনো গণপরিবহন নেই। এখন আমরা কী করতে পারি। আমাদের এক প্রকার বাধ্য হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চলাচল করতে হচ্ছে। অ্যাপচালিত বাইকাররা বলেন, আমাদের তো পরিবার আছে। আমরা কী করব। রাস্তায় বের হলেই প্রতিটা যায়গায় পুলিশ ধরছে। চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মামলা দিচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের কী খাওয়াবো? কেমন করে চলবে আমাদের পরিবার। কিভাবে বাসা ভাড়া দেব? সরকার যদি আমাদের দায়িত্ব নেয়, তাহলে আমরা সরকারের দেয়া কঠোর নির্দেশনা মেনে নেব। এমনকি ঘরের বাইরেও বের হব না।
এদিকে অবাধে চলছে ফুটপাতের দোকানগুলো। ক্রেতাদের ভিড়ও ছিল লক্ষণীয়। তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলেন, আমরা কী করব। আমাদেরও তো সংসার আছে। গতবছরের লকডাউনে প্রচুর ক্ষতি হয়েছে আমাদের। দেনার দায়ে ডুবে আছি। এবারের লকডাউনে আমাদের বেঁচাবিক্রি একদমই কমে গেছে। কিভাবে দেনা শোধ করবো। কিভাবে পরিবারকে নিয়ে বেঁচে থাকব আমরা।
গত রোববার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ১১ দফা নিষেধাজ্ঞায় সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত, ব্যাংক জরুরি প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে খোলা রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে একুশে বইমেলা এবং সিনেমা হলগুলো খোলা রাখা হয়েছে। সারাদেশে একযোগে সরকারের নিষেধাজ্ঞা আরোপের এরকম ‘লকডাউন’ এই প্রথম। গত বছর মার্চ মাসে করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সরকার অফিস-আদালত সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছিল। রাজধানীর মিরপুরের টোলারবাগ, রায়ের বাজার, ওয়ারী এলাকায় সংক্রমণ বেড়ে গেলে ১৪ দিন লকডাউন দিয়ে সব কিছু বন্ধ এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত রাখা হয়েছিল।

Please follow and like us: