‘রোহিঙ্গা সন্ত্রাসবাদ ও অস্থিতিশীলতা’, কী ভাবছি?

সৈয়দ ইফতেখার : রোহিঙ্গা সংকট যে দিন দিন তীব্র হচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘চোরের মায়ের বড় গলা’, মিয়ানমারকে বোঝাতে এই প্রবাদটি অহরহ আমরা লেখি। এখন দেখছি, মিয়ানমারের বাসিন্দা রোহিঙ্গাদের বেলায়ও এই প্রবাদ যথাযথ মিলে যাচ্ছে! যতই দিন যাচ্ছে, কক্সবাজারে বাড়ছে রোহিঙ্গা প্রভাব-আধিপত্য। এমনিতেই বাঙালির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি রোহিঙ্গার বাস কক্সবাজারে— এর মধ্যে এমন অযাচিত কর্তৃত্ব শঙ্কা জাগাচ্ছে মনে।
ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়া হবে। লাখ খানেক রোহিঙ্গার জন্য সেখানে উন্নত মানের আবাসস্থল তৈরি। খরচ কত জানেন? এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের জন্য সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করেছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ভাসানচরের অবস্থান। জোয়ার ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সেখানকার ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা রক্ষা করতে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ তৈরি করা আছে। তৈরি হয়েছে, সুন্দর ১২০টি গুচ্ছগ্রামের অবকাঠামো।
ভাসানচরে আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরকার সর্বাধুনিক ব্যবস্থা রাখার পরও, রোহিঙ্গাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অনিহা। তারা যেতে চান না সেখানে। কত বোঝানো হচ্ছে, প্রকৃতার্থে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অবশেষে সম্প্রতি বিশাল বহরে রোহিঙ্গাদের ভাসানচর পরিদর্শন। এক সময়ের ভিকটিম আজ মাথায় চড়ে বসলো কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন অনেকে। এখনই বলার সময় আসেনি তা। কিন্তু যারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। ৪০ রোহিঙ্গা ভাসানচরের খুঁটিনাটি ঘুরে দেখলেন। এক রকম ‘পিকনিক মুডে’। ফিরে এসে নানামুনির নানা মত! ঘর নাকি ছোট! আলিশান ঘর এখন তাদের চাওয়া! বাংলাদেশেই কোটি মানুষের এখনও মাথা গোঁজার নির্দিষ্ট স্থান নেই, অথচ তারা বাঙালি। আমাদের নিজেদের নাগরিক। আর তিন বছরে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়ে এখন মগের মুল্লুকের শ্লোক শোনাচ্ছে!

ভাসানচরের পরিবেশ ভালো না। ঝড় হতে পারে, ওই এলাকা নিচু, পানি উঠলে নাকি মানুষ মারা যাবে- কত কী কথা। রোহিঙ্গাদের টালবাহানা দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না! আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাইবার ক্রাইম দমন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব রোধে কাজ করছে, কিন্তু সাধারণ রোহিঙ্গা ও তাদের নেতারা যে প্রকাশ্যে গুজব ছড়াচ্ছেন তা প্রতিরোধ করবো কীভাবে! এমনকি ক্যাম্প ছেড়ে যে গুটি কয়েক রোহিঙ্গা ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। আবদুর শুক্কুর ওরফে হুজুর পরিচয়ে ফোন করে হুমকি দেয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। তাই ক্যাম্পে ভাসানচরের বিষয়ে কোনো প্রচারণাই করা যাচ্ছে না ঠিকমতো। এতে পরিস্থিতি হচ্ছে আরও জটিল। মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে, বাংলাদেশ তাই নানামুখী সংকটে।

তিন বছরে বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্ম হয়েছে এক লাখ ১০ হাজারের মতো শিশু। বছর বছর সন্তান জন্ম দেয়া এই জাতির কাছে ঘর তো বড় লাগবেই! খোদ আর্ন্তজাতিক বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনের মতে, এতো জন্মহারের কারণে ক্যাম্পের পরিবেশ আজ ঝুঁকিতে। নতুন শিশুর খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা নিয়ে জটিলতা দেখছে সংস্থাটি। সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে এ নিয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আগামী দুই-তিন বছরে আরও দেড় লাখ জন্ম হলে করবেন কি তারা! জন্ম নিয়ন্ত্রণে অচিকীর্ষু রোহিঙ্গাদের অবস্থা অন্যান্য দেশের শরণার্থীদের মতো নয়। মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিমা দেশে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় শরণার্থীরা থাকলেও, এখানে তারা অবাধ! কোনো বাধাই মানার নয়। তারা যা ইচ্ছে করছে। যেমনটা ভাসানচর নিয়ে তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে! পারতপক্ষে সময় ক্ষেপণ করে এই সিদ্ধান্তই ভেস্তে দিতে চাচ্ছে রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গারা নিজেই স্বীকার করছেন, কক্সবাজারে সুবিধা বেশি। কী সেই সুবিধা? অবাধে চলাচল, দোকান করা-ব্যবসা করা। শ্রমিক হিসেবে সাধারণ কাজ করা ছাড়াও মাদকের ব্যাপক বিস্তৃতি তাদের মধ্যে। অনেক রোহিঙ্গা নেতা কোটিপতি বনেছেন কেবল মাদক ব্যবসা করে। ইয়াবা ব্যবসা। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আসে। যার দালাল রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পেই তারা নিজেদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। ছোটখাটো একটা প্রশাসনই চালান। শুধু মোবাইল ফোন নয়, ক্যাম্পগুলোয় থ্রি-জি নেটওয়ার্কের ইন্টারনেটও ব্যবহার হচ্ছে দেদারসে। অস্ত্র বেচাকেনা, সন্ত্রাসী কর্মকা-, অর্থের বিনিময়ে মানুষ হত্যাও করেন অনেকে। চুরি-ডাকাতি, অপহরণ- মুক্তিপণ আদায়, ধর্ষণ হরহামেশাই ঘটছে তাদের মাধ্যমে। যৌন ব্যবসা, সমুদ্র পথে নারী ও শিশু পাচার তথা মানবপাচারের সঙ্গেও জড়িত রোহিঙ্গা নেতাদের নাম (মানবপাচারে সহায়তাকারী কিছু বাঙালিও জড়িত বলে খবর পাওয়া যায়)। বাংলাদেশি পার্সপোর্ট নিয়ে বিদেশ যাত্রা, রোহিঙ্গা থেকে বাঙালি হয়ে যাওয়ার ঘটনাও অনেক। আমাদের দুর্নীতিকে কাজে লাগিয়ে বহু রোহিঙ্গার রয়েছে ন্যাশনাল আইডি কার্ড, স্মার্ট কার্ডও।

এতে দিন যত যাচ্ছে ততই অবনতি যাচ্ছে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা শিবিরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির। অভ্যন্তরীণ কোন্দলও রয়েছে ব্যাপক এই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এই পর্যন্ত (আগস্ট, ২০২০) কমপক্ষে ৫০ জন রোহিঙ্গা ক্যাম্পেই খুন হয়েছেন। এছাড়া ‘বন্দুকযুদ্ধে’ও নিহতের সংখ্যা প্রায় একই সমান। যার প্রত্যেকটির আড়ালেই রয়েছে এক একটি অপকর্মের সুতোর বাঁধন।

এরই মধ্যে রোহিঙ্গাদের হামলার শিকার হয়েছেন স্থানীয় অধিবাসী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা পর্যন্ত। স্থানীয় জনগণ ভুগছেন রোহিঙ্গা আতঙ্কে। ভবিষ্যতে আরও কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হবে। যা কক্সবাজারের পর্যটন খাতেও মারাত্মক প্রভাব ফেলবে কোনো সন্দেহ নেই। কথা হলো, এমনিতেই রোহিঙ্গারা অপরাধ প্রবণ। কিন্তু তাদের মদদদাতাও কেউ রয়েছে কিনা, তা শনাক্ত করে দেখতে হবে। সম্প্রতি একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের। গোয়েন্দা সংস্থাটির হয়ে জেএমবি বা জামাত-উল-মুজাহিদিন রোহিঙ্গাদের জঙ্গি প্রশিক্ষণে মদদ দিচ্ছে। পাক-মদদপুষ্ট জেএমবি’র কারণেই বাংলাদেশেও আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি বা আরসার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বাড়ছে ঝুঁকি।

আজাদ কাশ্মীর নিজেদের হাতে রেখে, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের দাবি করে আসছে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে। ভারত বারেবারে প্রমাণ করেছে, পাকিস্তান একটি জঙ্গি রাষ্ট্র, তাদের কাজই জঙ্গিবাদে কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়ন করা। ইসলামাবাদ এই কাজ করে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছে। যা নিয়ে চিন্তার ভাঁজ সবসময়ই দিল্লির কপালে। এবার যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো যায় তাহলে সেভেন সিস্টার্সের রাজ্যগুলো (উত্তর-পূর্ব ভারত) তো বটেই পশ্চিমবঙ্গের জন্যও তা মাথার ব্যথার কারণ হতে পারে। এতে ভারতকে পশ্চিম ও পূর্ব দুদিক থেকেই চাপে রাখতে পারবে পাকিস্তান। অন্যদিকে পাক মিত্র চীন উত্তরে নেপালকে নিয়ে ভারতের ওপর প্রতাপ আরও বাড়াতে মরিয়া। যা গেলো কয়েক মাসের লাদাখ অস্থিরতা ও লিপুলেখ-কালাপানি প্রসঙ্গেই স্পষ্ট।

পাকিস্তান কখনোই ১৯৭১-এর পরাজয়কে ভুলে যাওয়ার নয়। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের থেকেও বড় ভয় তারা পূর্ব বাংলাকে পেয়েছিল সেসময়। মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শোচনীয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর। ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে। আগামী বছর আমাদের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুসলিম ধর্মীয় আবেগকেও কাজে লাগাতে পটু পাকিস্তানিদের চক্রান্ত নৎসাত করতে— ভাবতে হবে আজ থেকেই।

এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে অন্য কোন কোন গোয়েন্দা সংস্থা তৎপর সেটিও খতিয়ে দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যম, বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরের সূত্র ধরে কাজ করলে হবে না। বঙ্গোপসাগরসহ এ অঞ্চল নিয়ে মাথা ব্যথা আছে এমন দেশগুলোর গোয়েন্দারা এ নিয়ে কাজ করছে। এখানে অভ্যন্তরণী কূটনীতি কতটুকু কাজে লাগানো যায় সেটিই বড় বিষয়। মিয়ানমারকে আমরা বন্ধু বললেও, তাদের আচরণ বন্ধুর মতো নয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে এখনও আমরা পরম বন্ধু পাইনি।

খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন অনেক আগেই বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে এ অঞ্চলে অনিশ্চয়তা ও অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে। এটি কেবল মিয়ানামার ও বাংলাদেশের নয় বরং এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের জন্যও সমস্যার কারণ হবে। পরে যা আবির্ভূত হতে পারে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে।’ শনিবার (১২ই সেপ্টেম্বর) দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ২৭তম আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামে (এআরএফ) একই কথারই পুনরাবৃত্তি করেন মন্ত্রী। বলেন ‘রোহিঙ্গারা যাতে তাদের নিজ ঘরে নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও মর্যাদা নিয়ে ফিরে যেতে পারে সেজন্য আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামকে এগিয়ে আসতে হবে। দ্রুত প্রত্যাবাসন জরুরি। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারকে বিশ্বাস করে না। আর মিয়ানমারও কথা রাখছে না। তাই আজ পর্যন্ত একজনও ফিরে যায়নি’। এভাবে চলতে থাকলে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে তাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। মিয়ানমার রাখাইন রাজ্যের পরিবেশের কোনো উন্নয়নই করেনি সেটিও স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তাই বলাই যায়, রোহিঙ্গা সন্ত্রাস ও অস্থিতিশীলতা নিয়ে সরকার ভাবছে। দেশে-বিদেশে কথাও বলে যাচ্ছে ঢের। চাওয়া হচ্ছে, ভারত, চীন ও রাশিয়ার একান্ত সহায়তা (যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজে থেকেই সরাসরি সহায়তার কথা বলছে)। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আশ্বাস বাক্যে ক্ষীণ হচ্ছে প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন। ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বোঝা থেকে যাচ্ছে বাংলাদেশেরই। মাসের পর মাস শুধু কেটেই যাচ্ছে, আলোচনায়। অন্যদিকে ঘোর অন্ধকার নেমে আসছে টেকনাফ-উখিয়ার আকাশে। সাদা চোখে না দেখে— আরও গভীর দৃষ্টি চাই।
লেখক : সাংবাদিক।

Please follow and like us: