রবি. নভে ১৭, ২০১৯

রবিশপে কেনাকাটায় ভোগান্তি

রবিশপে কেনাকাটায় ভোগান্তি

Last Updated on

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : টেলিকম সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রবির ই-কমার্স ওয়েবসাইট রবিশপ থেকে ‘স্যামসাং গ্যালাক্সি এম টোয়েন্টি’ ফোন কেনার জন্য অর্ডার করেছিলেন সুকর্ণ বিন শরীফ। তিনি যোগাযোগ করে নিশ্চিত হলেন তিন দিনে মিলবে ফোন।
১০ মার্চ অর্ডার দিয়েছিলেন। সেই হিসাবে ১৩ মার্চ পাওয়ার কথা ফোনটি। কিন্তু তিন দিন পেরিয়ে চার, পাঁচ, ছয়দিন পার হয়। বারবার ফোন করে যোগাযোগ করেন পেশায় প্রকৌশলী ওই ক্রেতা। রবিশপ থেকে একেকবার একেক কথা বলা হয়। এক পর্যায়ে তারা বলে ১০ দিনের কথা। অনেক রাগারাগির পর ২১ মার্চ আসে সেই ফোন।
ভুক্তভোগী শরীফ এই সময়কে বলেন, ‘তিন দিনে ফোন দেওয়ার কথা। কিন্তু দেরি হচ্ছে, এই বিষয়টি তারা জানানোরও প্রয়োজন বোধ করেনি। পরে আমিই ফোন দিলাম। তখন বলে তারা এখন ৭ থেকে ১০ দিন সময় নিচ্ছি। দেরির কোনো কারণ নিজেরা ব্যাখ্যা করেনি। আমি জিজ্ঞেস করার পর তারা বলে স্যামসাং ডেলিভারি দিতে পারছি না। আমি বললাম, আমি যখন অর্ডার দিয়েছি তখন তো এভেইলেবল ছিল। তারা কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি।’
অনলাইনে কেনাকাটা যেমন বাড়ছে, তেমনি আস্থার অভাব, প্রতারিত হওয়ার সংখ্যাও রীতিমতো উদ্বেগজনক। ভোক্তা অধিকারের বিষয়টি সেবাদানকারী সাইটগুলো সেভাবে গুরুত্ব দেয় না বলে অভিযোগ আছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো অনলাইন শপ চালু করার পর পরিস্থিতি পাল্টাবে বলে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
শরীফের মতো অনলাইনে কেনাকাটা করে অনেকেই ভোগান্তিতে পড়েছেন। সময়মতো পণ্য ডেলিভারি দিতে ব্যর্থ হওয়া, পুরোনো ও নষ্ট পণ্য গছিয়ে দেওয়া এমনকি ত্রুটিযুক্ত পণ্য ফেরত দিয়ে পরিশোধিত মূল্য যথাসময়ে ফেরত না পাওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে রবিশপের বিরুদ্ধে।
এমনকি এসব অভিযোগের বিষয়ে রবিশপের বক্তব্যও পাওয়া যায় না। বার্তাসংস্থা ঢাকা টাইমসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য চাইলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মেইলে প্রশ্ন চাওয়া হয়। কিন্তু ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও সেই মেইলের জবাব আসেনি। এরপর একাধিকবার যোগাযোগ করে একজন কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়।
সালেকীন তারিন নামে এক যুবক তার সহকর্মীর ক্রেডিট কার্ড দিয়ে টাকা পরিশোধ করেও একই অভিজ্ঞতা পান। বারবার নিজেরা যোগাযোগ করলেও রবিশপ থেকে ফোন পাঠানোর কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয় না। এক পর্যায়ে বলা হয়, স্টক শেষ হয়ে গেছে।
পরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে মামলা করার পর ফেসবুকে সেই তথ্য প্রকাশ করলে রবি থেকে বারবার যোগাযোগ করে ফোনটি নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। জরুরি বিধায় সে ফোনটি সালেকীন গ্রহণও করেন।
রবিশপের ফেসবুক পেজেই অভিযোগের পাহাড় : গ্রাহক ভোগান্তির এমন বিস্তর অভিযোগের নমুনা দেখতে পাওয়া যায় রবিশপের ফেসবুক পেজে। হাজার হাজার ক্রেতা তাদের বিরক্তি ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন সেখানে। এমনকি এও দেখা গেছে, কেউ একটি পণ্যের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রতারিত ভোক্তারা তাকে সাবধান করছেন। ভুক্তভোগীদের একজন রাশেদুল হাসান শাওন। তিনি লিখেন, ‘তারা আমার কাছ থেকে পণ্যের অর্ডার নিলো। ডেলিভারির সময় পেরিয়ে গেলে কাস্টমার কেয়ার এজেন্ট জানালেন পণ্যের স্টক নেই। এদিকে আমি ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধও করে দিয়েছি। এখন আমাকে বলা হচ্ছে অন্য একটি পণ্য কিনতে। আমার পরিশোধ করা টাকা ফেরত দিতে তারা এখন টালবাহানা করছে।’
আরেক ক্রেতা খলিলুর রহমান জানান, তিনি বেশ কয়েকবার রবিশপ থেকে পণ্য কিনে প্রতারিত হয়েছেন। তাদের ওয়েবসাইটে পণ্যের তালিকা দেওয়া থাকলেও তার বেশিরভাগই স্টক শেষ। অথচ বিক্রির সময় অর্ডার নেওয়া হয়। ডেলিভারির সময় হলে জানানো হয় ক্রয়কৃত পণ্যের স্টক শেষ।
মুশফিকুর অভিষেক নামের এক ক্রেতা লিখেছেন, ‘কদিন আগে আমি রবিশপ থেকে শাওমি রেডমি নোট ফাইভ এ মডেলের ফোন কেনার জন্য অর্ডার করি। মূল্য পরিশোধ করি স্টান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ পার হলেও পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার সময় হয় না রবিশপের। তখন আমি কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করেও সদুত্তর পাইনি।’
এসএম সায়েম নামের আরেক ক্রেতা লিখেন, ‘আমি রবিশপ থেকে ওভেন কেনার জন্য অর্ডার করি। পণ্যের মূল্য অগ্রিম পরিশোধও করি। আমার কাছে অর্ডার কনফার্মেশন এসএমএসও আসে। কিন্তু সাত দিন পার হওয়ারও পরও পণ্য ডেলিভারি দেওয়া হয় না। তখন আমি রবিশপে ফোন দিয়ে ডেলিভারি দেওয়ার সময় বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে কাস্টমার কেয়ার থেকে বলা হয় আজই পণ্য পৌঁছে যাবে। এভাবে ১৭ দিন পার হওয়ার পরও পণ্যটি হাতে পাইনি। এখন আমার চিন্তা হচ্ছে অগ্রিম পরিশোধিত টাকাটা হাতে পাব কি না।’
সৌরভ চৌধুরী নামের আরেক ক্রেতা লিখেন, ‘রবিশপ থেকে একটি ফোন কেনার জন্য অর্ডার করে আমি রীতিমতো প্রতারিত। পণ্য ডেলিভারির সময় পার হওয়ার পর কাস্টমার কেয়ার এজেন্ট জানায়, অর্ডারকৃত ফোনের স্টক নেই। তাই অর্ডার বাতিল করে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু ১৫ দিন পার হলেও টাকা এখনো ফেরত পাইনি।’
সাইকেল কেনার জন্য অর্ডার করে বিড়ম্বনায় পড়েছেন নাজমুস শাকিবুল হক। তিনি রবিশপের ফেসবুক পেজে অভিযোগ করেন, ‘আপনাদের পণ্য ডেলিভারি দেওয়ার সময় কি ৫ দিন? নাকি ১০-১৫ দিন? সাইকেল কেনার অর্ডার দিয়েছি ১০ দিন হয়ে গেল অথচ এখন পণ্যটি হাতে পেলাম না?’
পণ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন
এ তো গেল রবিশপের পণ্য ডেলিভারির সমস্যার কথা। এবার আসা যাক এদের পণ্যের গুণগতমান নিয়ে। রবিশপের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে পুরোনো, নষ্ট পণ্য ক্রেতাদের কাছে গছিয়ে দেওয়ার। এমনই একজন প্রতারিত ক্রেতা অমিত চাকমা। তিনি বলেন, রবিশপ থেকে আমি একটি নতুন রাইস কুকার অর্ডার করেছিলাম। তারা আমাকে পুরোনো দাগ-পড়া এবং মরিচা ধরা একটি রাইস কুকার গছিয়ে দিয়েছে। রবিশপের এ কেমন আচরণ?’
অমিত চাকমার মতোই প্রতারিত হয়েছেন নাবিল নিয়াজি। তিনিও পেয়েছেন পুরোনো ও নষ্ট ইলেকট্রনিক পণ্য। তিনি বলেন, ‘দেশে যত ই-কমার্স শপ আছে তাদের মধ্যে রবিশপের সার্ভিস সবচেয়ে খারাপ। তারা আমাকে একটি নষ্ট স্পিকার গছিয়ে দিয়েছে। রবিশপকে নষ্ট স্পিকার ফেরত নিয়ে টাকা দেওয়ার কথা বললে এখন তারা অস্বীকার করছে। অথচ আমার কেনা স্পিকারটিতে ১৮ মাসের ওয়ারেন্টি দেওয়া হবে বলে দাবি করা হয়েছিল।’
প্রতারিতদের বক্তব্য মুছে দেওয়ার অভিযোগ : রবিশপের ফেসবুক পেজ ঘেঁটে দেখা গেল, তাদের পণ্য কিনে প্রতারিত বা বিড়ম্বনায় পড়েছেন এমন ক্রেতাদের কমেন্টস বা অভিযোগ ফেসবুক থেকে মুছে দেওয়া হয়। পণ্য বা সেবার মান নিয়ে বারবার অভিযোগ করলে তাকে ফেসবুক থেকে ব্লক করে দেওয়া হয়। এসব অভিযোগের সুরাহা না হওয়ায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের দারস্থ হয়েছেন অনেকেই। এসব অভিযোগ নিয়ে রবিশপের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানতে চাইলে তারা তাদের মতামত জানাতে গড়িমসি করে। শেষে ই-মেইল মারফত অভিযোগ জানিয়ে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রবির করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি বিভাগের মিডিয়া, কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড সাসটেইনিবিটি ম্যানেজার আশরাফুল ইসলাম ফিরতি মেইলে জানান, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় পণ্যের সরবরাহ নির্ভর করে পণ্য নির্মাতা ও সরবরাহকারীর ওপর। তাই অনেক সময় গ্রাহকের প্রত্যাশিত সময় অনুযায়ী পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয় না; এটি বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের সীমাবদ্ধতা। তবে আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি সঠিক সময়ে পণ্যটি গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দিতে। কখনো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পৌঁছাতে না পারলে আমরা আগে থেকেই গ্রাহককে তা জানিয়ে দেই। এরপরও সম্মানিত গ্রাহকের এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে তা আমরা অবশ্যই খতিয়ে দেখব।’

Please follow and like us:
3